হুমায়ুন আহমেদ নোবেল প্রাইজ পাননি

প্রকাশিত: ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০২০

হুমায়ুন আহমেদ নোবেল প্রাইজ পাননি

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

আজ হুমায়ুন আহমেদের ৭২তম জন্মদিন। তার জন্ম হয়েছিল কুতুবপুর গ্রামে। গ্রামটি নেত্রকোনা জেলায়। বাবা ছিলেন পুলিশের অফিসার। বাঙালীর সমাজে হুমায়ুন আহমেদ সাহিত্যের প্রভাব অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক। বারো বছর পূর্বে হুমায়ুন আহমেদ মৃত্যু বরণ করার পর লক্ষ্য করা গেলো বাঙালী সমাজে বেশ কয়েক বছর পত্র পত্রিকার পাতায় কিছু লেখালেখি ছাড়া তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নেই কোথায়ও। বিষয়টির সাথে হুমায়ুন আহমেদের সাথে পাঠকের একটি আত্মিক সম্পর্ক আছে বলেই আমার মনে হলো। কোটি কোটি হুমায়ুন পাঠক হঠাৎই পরাধীন হয়ে গেলেন। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুটা এমনই ছিলো বাঙালীর সমাজে। আজ তার জন্মদিন, আজ তার মৃত্যু নিয়ে লেখা উচিত হবে না। কিন্ত আমি মনে করি, হুমায়ুন আহমেদ এর মৃত্যুর প্রভাব পাঠক সমাজকে কি পরিনতিতে নিক্ষেপ করেছিলো সেটা একটু আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। এই সমাজে হুমায়ুন আহমেদ একজন ক্রেইজি লেখক। এই ক্রেইজিনেস কতটা ব্যাপক সেটা একবার বইমেলায় গেলে দেখা গিয়েছে। যে স্টলে হুমায়ুন আহমেদ বসতেন সেখান থেকে পাঠকের লাইন এতটাই বড় হতো যে এর শেষ প্রান্তের মানুষটির দিকে তাকালে আমার খুব অসহায় লাগতো তার জন্য। এই এতো পাঠক যেনো খরস্রোতা নদীতে বাঁশের সাঁকো ভেঙে পরে গেলেন হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর মৃত্যুর পর কয়েক বছর পর্যন্ত হিমু, মিসির আলী সহ যাবতীয় চরিত্রের ছদ্মবেশী মানুষরা একবারে চুপচাপ হয়ে যায়। তার সহধর্মিনীকে ঘিরে কিছু মানুষ দেখা গেলো কখনো কখনো। তার প্রকাশক মাযহার ভাইয়েরও একই পরিণতি। কোথায়ও কেউ যেনো নেই। তাহলে বিষয়টি কি ঘটছে সমাজে! হুমায়ুন আহমেদকে প্রত্যাখ্যান করারতো কথা নয়। তাহলে বিষয়টি কি। প্রভাব। আর কিছু নয়। বাঙালীর সমাজ হুমায়ুন আহমেদকে এমন নিষ্ঠুর ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এটাই বাস্তবতা। এটাই সত্য।

হুমায়ুন আহমেদ প্রসঙ্গ ব্যাপক। জটিল। হুমায়ুন আহমেদের পারিপার্শ্বিক সমাজটাই ব্যাপক। যেমন অনেকটা ‘হা’ করলেই হাটখোলার মতো। তবে মানুষ হিসেবেই তিনি এক মহাশক্তিধর মহাপুরুষ। জীবনকে তিনি চিনতেন। তার গল্পের মাঝেই গল্প, সত্য-বিশ্বাসে এক ধরনের মিশ্রণ ঘটে যেতো তার লেখায়। পাঠক মনের দরোজা-জানালা হুমায়ুন আহমেদ নিজ হাতেই খুলেছেন আবার বন্ধ করেছেন। লিখে লিখে মানুষ কাঁদিয়েছেন আবার হাসিয়েছেন। জানা-অজানার সহজ রূপে অবলীলায় লিখে গিয়েছেন কঠিন কথা। সহজ কথা কঠিন রূপে আর কঠিন কথা সহজ রূপে প্রকাশ করতে পেরেছেন তিনি। চরিত্র তিনি সৃষ্টি করেননি। চরিত্রগুলো তিনি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন। চরিত্রের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন সমাজটাই। নীল আকাশের নিচে নীলাকে নীল শাড়ি পড়িয়েছেন। হিমুকে পড়িয়েছেন হলুদ পাঞ্জাবী। মিসির আলীর খাওয়া পোশাকের ছয় নয় অবস্থা। এসব কিছুর মাঝেও হুমায়ুন আহমেদের অবস্থান স্বকীয়। যা আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। অনবদ্য এক চলা। গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র -নাটক কোনকিছুতেই কোনদিনও কেউ মুখ ফেরাতে পারেনি। এতসব গুনাগুনের চেয়েও সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হচ্ছে বাঙালীর সমাজে হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব। ঘরে ঘরে তার প্রভাব দশকের পর দশক এক মহাকান্ড ঘটিয়ে গিয়েছে। বাড়ি থেকে নীল শাড়ি পরে কতো তরুণী যে বের হয়ে গিয়েছে সেই প্রভাবে তার হিসেব নেই। বই মেলায় হলুদ পাঞ্জাবী পরে হিমুকে দেখা গিয়েছে মিছিলে। কখনো লাইট পোস্টের নিচে বসে সময় পার করতে দেখা গিয়েছে মিসির আলীকে। তারা সবাই কিন্ত পাঠক। এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারেননি, তবে তিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। এটা নজরুল ইসলাম পারেননি, যদিও তিনি বিদ্রোহী কবি। নজরুলের নামে বাঙালীর সমাজে আজোও একটি বিপ্লব সংগঠিত হয়নি কিন্ত। হুমায়ুন আহমেদের নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ যখন দর্শক জেনে যায় গোটা ঢাকা শহরে কতগুলো মিছিল বের হয়েছিলো সেটা এই প্রজন্মের মানুষরা জানেই না। ঘরে ঘরে মানুষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। রাজপথে নেমে আসে মিছিল আর শ্লোগান। প্রকম্পিত হয় শহরের দেয়ালগুলো। হুমায়ুন আহমেদ ধানমন্ডির বাড়িতে বসে আছেন, রাজপথে মিছিল চলছে-শ্লোগান। কি অদ্ভুত আবেগ তাড়িত সমাজ। এসব বিষয়ের পেছনে কি শুধুই সাহিত্যের উপাদান ছিলো নাকি আরো অনেক কিছু। আজ বাকের ভাই আর মোনা আপা দুজনই সংসদ সদস্য। কি অদ্ভুত আমাদের এই সমাজ কাঠামো, কি অদ্ভুত আমাদের এই সমাজের গল্পগুলো। কি অদ্ভুত ঘটনাগুলোর যোগসূত্র। আজ যদি আসাদুজ্জামান নুরের ফাঁসি হয় কে বের হবে তার জন্য। কিন্ত বাকের ভাইয়ের জন্য ঢাকা শহরে বের হলো মিছিলের পর মিছিল! কি অদ্ভুত আমার সমাজ। কি অদ্ভুত আমাদের চিন্তাজগত। কি অদ্ভুত হুমায়ুন আহমেদ। এই সমাজের কতো বড় অধিপতি তিনি ছিলেন। কতো বড় রাজত্ব তিনি গড়ে ফেলেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ নোবেল প্রাইজ পাননি, নোবেল কমিটি হয়তো হুমায়ুন আহমেদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। অথবা হুমায়ুন সাহিত্যের প্রভাব নোবেল কমিটিতে পরেনি। হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, ‘রাত্রি কখনো সূর্য পায়নি তাতে কোনো ক্ষতি নেই, কারন রাত্রি পেয়েছে অনন্ত নক্ষত্রবীথি’। এটাও বাস্তবতা। এটাই সত্য। আজ হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন। আজ শুক্রবার, জুম্মার দিন। পবিত্র দিন। আল্লাহ হুমায়ুন আহমেদকে বেহেশতের সম্মানজনক স্হানে রাখুন। অনন্তকাল তিনি সুখে থাকুক।

লেখক: সাংবাদিক,

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

December 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

http://jugapath.com