» হুমায়ূন আহমেদের কথা ভেবে

প্রকাশিত: ২০. জুলাই. ২০২০ | সোমবার

সালেহা চৌধুরী

১৯ সে জুলাই হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুদিবস। মনে পড়ছে তাঁর কথা। এই ব্যস্ত মানুষটি আমাকে দিয়েছিলেন সময়। কখনো বেড়াতে, কখনো নুহাশে, কখনো লেখা পড়ে শোনাতে গেছি তাঁর কাছে। জন স্টাইনবেকের ‘অফ মাইস এ্যান্ড ম্যান’ অনুবাদ করে তাঁকে দিয়েছিলাম। অনুবাদ তাঁর ভালো লাগে। বাড়িতে ফোন করেছিলেন তখন আমি ছিলাম না। আমাদের কেয়ারটেকারকে বলেছিলেন , সালেহা চৌধুরীকে বলো আমার বাড়ির দরজা তাঁর জন্য খোলা। এরপর থেকে যতবার ঢাকায় গেছি তাঁর বাড়িতে গেছি। যখনই মনে হয়েছে। রাস্তার এপার আর ওপার ছিল আমাদের বাড়ি। একদিন একটি ছোট প্রবন্ধ লিখে তাঁকে পড়তে দিয়েছিলাম। তাঁর ও সেমাসহিনির দুটো লেখা নিয়ে তুলনা। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে স্ইে ছোট প্রবন্ধ ছাপাতে দিলাম। কবি সৌমিত্র বলেছেন লেখা দিতে।
আমাকে রূপা নামের যে উপন্যাসটি উৎসর্গ করেচিলেন সেখানে লিখেছিলেন – উৎসর্গ
তিনি দূর দ্বীপবাসিনী / তাঁর পছন্দের জগত, স্টেইনবেকের /রহস্যময় জগত।/ আমার অল্প কিছু কাছের/ মানুষদের একজন। সালেহা চৌধুরী
শুধু কি উৎসর্গ? দুই কপি বই, ফুল আর মিষ্টি লোক দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আজো সেই আশ্বর্য মুহূর্ত আমাকে স্তদ্ধ করে রাখে। বেদনা বিধূর করে। সৌমিত্র বললো এই উৎসর্গের সঙ্গে একটি প্রবন্ধ দিন। আমি তাই তাঁর একটি লেখার সঙ্গে সেমাস হিনির একটি লেখার তুলনার প্রবন্ধ পাঠালাম। পাঠক পৃথিবীতে হুমায়ুন আহমেদ একবারই আসেন। তিনি একজন সুবিশাল সুন্দর আত্মা। সৌন্দর্য পিয়াসী সুন্দর একজন। নুহাশ পল্লি তাঁর অন্যতম প্রধান সৃষ্টি।

হুমায়ূন আহমেদের অন্ধকারের গান এবং সেমাস হিনির পারসোনাল হেলিকন
অক্সফোর্ড ডিক্সনারীতে ‘হেলিকনের’র অর্থ মন্দির। যেখানে এক অনšতকালের ঝর্না নিজের প্রাণের তাগিদে স্বতঃপ্রবাহিত। ওকে সকলে বলে হেলিকন পর্বতের আগানিপ্পে ঝরণা। সেমাস হিনি সেই ঝর্নাকেই স্মরণ করেন, সৃষ্টিশীলতা যখন ঝর্নাকে প্রবহমান করে। পাথরের ভেতর ঝর্না জাগা আর আমাদের হ্রদয়ের ভেতর ঝর্নার স্রোত একই ঘটনা। নানা কবিতায় এই উৎসকেই অভিনন্দিত করেছেন। গোস্পদে সাগরের মত কুয়োতে আকাশ দেখা, ছেলেবেলায় সেমাসের কাছে নেশার মত ছিল। বলতেন , কুয়ো থেকে কেউ কখনো আমাকে সরিয়ে আনতে পারত না। অন্ধকারের অতল জল, বালতি নামানো, ছাতলাপরা ইঁদারার প্রাচীন দেয়াল সবকিছুই গভীর রহস্য, এইসব রহস্যের শেষ নেই। কখনো অগভীর কুপে আগাছা টেনে তুলতে তুলতে জলের আয়নায় নিজের ছায়া দেখেছেন। সেই মুখের ছবির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে কিছু কীটপতঙ্গ। এই মুখ কী আমার! মনে মনে ভাবছেন। ঢেউ ভাঙ্গছেন। আবার জেগে উঠছে মুখ।
তারপর? খেলার শুরু। কুয়োতে শব্দ ছুঁড়ে দেন। কুয়োগুলো বিস্ময়করভাবে ফিরিয়ে দেয় ধ্বনি। যে শব্দগুলো ছুঁড়ে দেন তারা ফিরে আসে অন্য ভাবে, অন্য শব্দে। ইকোতে অর্থ যায় বদলে। বলেন নিট নিট। ফিরে আসে টনি টনি। এই খেলা থেকে সরে আসতে পারেন না। বলেন , মি মি হয়ে যায় এম এম। কেটে যায় কত দুপুর, কত বিকেল কুয়োর সঙ্গে কথা বলে। তারপর? হ্রদয়ের সরোবরে ডুব দিয়ে তুলে আনেন শব্দ কবিতা। বলেন ,আমি চাষ করেছি। আমার হ্রদয়ের জমিতে। বাবা তুলে আনতেন গোছা গোছা আলু। আর আমি তুলে আনি কবিতা। আমি এক চাষার ছেলে।
সেমাস হিনির কুয়ো প্রীতির মত হুমায়ূন আহমেদের কুয়ো-গল্প। তাঁর জীবনে কুয়ো নিয়ে আছে এক ভীতিপ্রদ ঘটনা। ছেলেবেলায় একজন চাচা তাকে হাত ধরে কুয়োর ভেতর নামিয়ে দেবার ভয় দেখাতেন। Ñ ছাড়লাম, এই হাত ছাড়লাম। হুমায়ূন আহমেদ ভয় পাওয়া বড় বড় চোখে কী দেখতেন সেখানে? কেবল অনন্তকালের রহস্য একটু ঘোমটা সরিয়ে বলে আরো সব বড় বড় রহস্যের কথা। আমরা ধারণা করতে পারি। সেমাসের কুয়ো অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার কোন মিল নেই কিম্বা আছে। পরবর্তীকালে একটি উপন্যাসে কুয়ো অভিজ্ঞতার কথা ঠিক সেমাস হিনিরই মত। তাঁর স্মৃতি কী তাঁকে কুয়োর ভেতরে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কোন গল্প বা উপন্যাস লিখিয়েছিল ? এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর আটষট্টি পাতার উপন্যাস , ‘অন্ধকারের গান’ যার উৎস আমাদের বলেন নি। ছেলেবেলার কোন কোন ঘটনা কখনো সচেতন ভাবে আবার কখনো অসচেতন ভাবে লেখায় আসে। অন্ধকারের গানে হয়তো এসেছে অসচেতনভাবে। কিন্তু সেখানেও আছে ভয়, রহস্য। যখন সেমাস বলেন ,To see myself to set the darkness echoing. তক্ষুনি আমার মনে পড়ে যায় অন্ধকারের গান। কিম্বা অতল জলের বুক থেকে ফিরে আসা শব্দাবলী। স্কুল শিক্ষকতার সময়ে, এক সামার ভ্যাকেশনে হুমায়ূন আহমদের তেরোখানা উপন্যাস পড়েছিলাম। আর একটা অনুষ্ঠানের জন্য সেমাস হিনিও আমাকে পড়তে হয়েছিলএকই সময়ে। তখনই সেমাসের কবিতা ‘পারসোনাল হেলিকন’ আর হুমায়ূন আহমেদের ‘অন্ধকারের গানের’ ভেতর মিল খুঁজে পাওয়া একটা ঘটনা ঘটে। একটি কুড়ি লাইনের কবিতা আর একটি আটষট্টি পাতার বই। কিন্তু তাতে কী? মিল যে অবিশ্বাস্য!
অন্ধকারের গানে আছে বীনা, বুলু, ফরিদা। বীনা আর বুলু কুয়োর পাড়ে বসে চাপ চাপ চাপ বলে,ফিরে আসে পচা পচা পচা। বীনা আর বুলুদের ভীষণ পছন্দ এ কুয়ো। এখানে কেটে যায় অনেক সময়। বুলু বুলু বললে সেটা হয় লুবু লুবু। খেলার আর শেষ হয় না। সেমাস সেই আনন্দের কারণ বলেছেন Others had echoes, gave back your own call with a clean and different meaning শব্দগুলো ফিরে আসে অন্য অর্থ নিয়ে। নিজের সেই ডাকাডাকি, কী চমৎকার অন্য শব্দ হয়ে যায়।
Darkness Echoing   আর অন্ধকারের গান একই অর্থের কথাই বলে। ফিরে আসা শব্দের কথা। ‘অন্ধকারের গানে’ আরো মজার ঘটনা , সুখে দুঃখে কুয়োর ভূমিকা বদলায়। যদিও সে দাঁড়িয়ে থাকে একা, নিঃশব্দ। যখন বীনা আর ওর বান্ধবী গল্প করে, যখন বুলু পা হারায়, আর সন্তানদের নির্যাতনে ফরিদার যখন কিছু করবার থাকে না, হাতের সুখে ভয়ংকর ভাবে যখন মিজান সাহেব অন্ধকারে সšতান পেটাতে থাকেন, কিছু করতে না পেরে ‘ফিক ব্যথায়’ কষ্ট পায় ফরিদা। ফিক ব্যথা শব্দটি শুনে আমারও ফিক ব্যথা জাগে বুকে। যাতনা বা বেদনার দীর্ঘ বর্ণনা দেন না হুমায়ূন আহমেদ কেবল কলমের দু এক আঁচড় পাঠক বুঝতে পারে ফিক ব্যথার দীর্ঘ ইতিহাস। কে ভুলে যাবে তাঁর অসংখ্য চরিত্রকে। ‘অন্ধকারের গানে’ প্রথম রাতেই ফরিদা বারান্দা থেকে দেখেছিল কুয়ো থেকে উঠে আসা এক রমনী। ছায়ার মত। কোন ভয়ানক কারণে সেই ছায়ামূর্তি কুয়োতে বন্দি। ও মুখ দেখায় না। যেমন অন্ধকারে মিজান সাহেব সšতান পেটান তেমনি অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে কুয়োবতি। আবার হারিয়ে যায় কুয়োতে। কে কবে ওকে ছুঁড়ে দিয়েছে কুয়োতে কেউ জানে না সে কথা। তাই কুয়ো কখনো ভীতি, কখনো রহস্য, কখনো অন্ধকারের গান, কখনো সেমাসের নার্সিসিজম। কিন্তু ফিক ব্যথার ফরিদা ভয়ংকর হতে জানে না। যদিও ওর ক্রোধ কালো ও কঠিন। কষ্ট মেজ থেকে কুয়োবতি আর ফরিদা কেউই বেরিয়ে আসতে পারে না। আর তখনাই হুমায়ূন আহমদের কলম সক্রিয়, তিনি সৃষ্ঠিশীল।
সেমাস বলেন , কেউ আমাকে সরিয়ে আনতে পারত না কুয়ো থেকে। পুরণো কুয়ো, বালতিতে জল, গুল্ম, বসে থাকতাম সেই রহস্যের কাছে। কুয়ো আর আমি , ত্রে¯তান আর পেলানোরের শতাব্দী কালের রহস্যের মত অন্ধকার।
সেমাসের কুয়োতে ভাসে প্রতিবিম্ব। হুমায়ূন আহমেদের কুয়োতে ভবিতব্য।
যে কুয়োতে ভীতি, যে কুয়োতে স্মৃতি তাই অন্ধকারের গান। তাই পারসোনাল হেলিকন।
( সেমাস হিনি মারা গেছেন ৩ সে অগাস্ট ২০১৩ আর হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন ১ সে জুলইি ২০১২)

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮৫ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031