» হে অন্ধ জলের রাজা

প্রকাশিত: ০৩. আগস্ট. ২০২০ | সোমবার


আসাদ মান্নান

শপথ নিলাম তার, যে ঈশ্বর মাটি দিয়ে মহাশূন্যে তৈরি করলেন মেদিনীর প্রথম মদন; যে মদনে বাস করে বুনো জীব-জন্তু- জানোয়ার। শপথ নিলাম ওই চক্ষুহীন কুমারের নির্ঘুম প্রেমের।
রক্তমাখা এইমাটি অই রাঙা নদী মায়ের মুখের মতো সারাক্ষণ এই বুকে মিশে আছে। আহা কী মধুর এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রিয় মাতৃমুখ!
যে কিশোর মাকে ছেড়ে একদিন স্বপ্নের জাহাজে চড়ে পাড়ি দেয় অথই উজান, কেন সে মায়ের মুখ মনে করে আজ মধ্যরাতে খুব একা বসে আছে আলোহীন প্রদীপের নিচে? … কে না-জানে মায়ের মুখের চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু এ জগতে নেই। অই মুখ বুকে নিয়ে যারা হাঁটে আগুনের নিচে ঘুমন্ত মেঘের মতো একটা ছায়ার অন্তরালে তারা পাঠ করে অরণ্যের আত্মকথা, প্রকৃতির সজল জীবনী।
কে বলেছে মা নেই? আছে, আছে … মায়েরা কী করে মরে! মায়েরা মরে না। নক্ষত্রের শাড়ি পরে মা তো বেঁচে আছে অস্তিত্বের গহন জ্যোৎস্নায়। মায়ের চোখের ভাঁজে নিশি কেঁদে কেঁদে ভোর হয়- পুরনো নদীর মতো তার আলো সমুদ্রের জলে হাঁটে ফেনার সড়কে।
এক নির্বাক অচেনা পাখি উড়ে এসে বসে থাকে চৈতন্যের ডালে। বহুদিন অন্ধকারে বহুরাত ঘুমের আশ্রমে। তারপর নরোম কয়লা দিয়ে তৈরি করা এক টুকরো পর্দা কে যেন টাঙিয়ে দেয় চোখের পাতায়। মানুষ যদিও মরে তবু তার স্বপ্নজ্যোতি অন্ধকারে কবরের দুব্বা ঘাসে জোনাকির আলো হয়ে নাচে।
শীতের শোণিতে দ্যাখো কী দারুন বসন্তের হোমশিখা জ্বলে! সবুজ আত্মার নিচে লকলক করে লতিয়ে উঠেছে স্বপ্ন; তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে পাথরের নিচে চাপা উদ্ভিদের অগ্নিবীজ,মানুষের সমুদ্র সভ্যতা। অতঃপর কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে ভোর এসে দোর খোলে পৃথিবীর মোরগপাড়ায়- সুপ্রভাত তোমাকে জীবন!
যে-চাষা আশার লাঠি হাতে নিয়ে অন্ধ চোখে অরণ্যের জলসাঘরে হাঁটে,তার প্রেমে জমিনের ঘামশক্তি, কামক্ষুধা দিনে দিনে বাড়ে, ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে গোলার পরিধি।
২.
কে না-জানে, ক্ষুধার সমুদ্র গর্ভে কেন চাষা স্বপ্ন বোনে,কেন সে তসবির মতো আগুনের ফেনা গুণে গুণে তুলে দিচ্ছে উলুবনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা এই বুড়ো সভ্যতার জলের খোঁপায়।
চারিদিকে শুধু ক্ষয়,শুধু ভাঙনের জয়ধ্বনি,তার সঙ্গে যুক্ত হয় মনীষার নগ্ন পরাজয়। ক্ষয়রোগে সভ্যতার ফুসফুস ফুটো হয়ে গেছে; অঝরে ঝরিছে মৃত্যু। ভিতরে বাইরে কেন এত রক্তপাত ! তবু সে দাঁড়িয়ে আছে দেশে দেশে, আছে অই মগের মুল্লুকে।
অগ্নিমগ্ন বালুভূমি বুকে নিয়ে মৌনতার পিঠে চড়ে যে হাঁটে অরণ্যে একা কে সে জন, কী এমন মন্ত্র আছে তার হাতে?
ভাবো তো একবার, দৃশ্যটা কেমন হয়: পৃথিবীর নাভিকুঞ্জে প্রিয় কোনো নর কিংবা নারী নেই, ছায়া নেই; সূর্যটাকে ন্যাংটো করে সব আলো লুট করে নিয়ে গেছে জলের দস্যুরা; সমুদ্রকে কাৎ করে সবুজের মুখে ওরা আলকাতরা ঢেলে দেয় : নদীগুলো ছুটি নিয়ে চলে গেছে যমের বাড়িতে। ভাবো তো একবার, এ দৃশ্যে ঈশ্বর কেন সুন্দরের পরাজয়ে পাথরে ঘুমায়।
অই দ্যাখো,অপরাহ্নে যৌবনের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেয়া অশ্বগুলো বরফ নির্মিত এক আস্তাবলে একে একে ঢুকে যাচ্ছে। নতুন দিনের জন্য ভোর এসে সন্ধ্যার ডেরায় নুলো ভিখিরির মতো একা একা বসে থাকে প্রদীপের নিচে।
স্মৃতির আগুনে পোড়ে চাঁদ; চাঁদের ওলান থেকে ঝরে পড়ছে দুধ কিংবা জ্যোৎস্না নয়,এক অন্ধ প্রেমিকের রক্ত। হৃদয়ের হারিকেনে যখন ফুরিয়ে গেছে সব তৈল- বলো, তখন কী করে কবি একটা নারীর হাতে তুলে দেবে রক্তে ডোবা গোধূলি গোলাপ!
সমুদ্রের অধিবাসী সন্ধ্যার মেয়েটি জানে: গোলাপে হৃদয় জ্বলে, কেরোসিনে আজ আর আগুন জ্বলে না। আহারে সময়! এরই নাম দুঃসময়।
৩.
অই দ্যাখো, সমুদ্রের রাক্ষুসে ডানার নিচে অন্ধকারে একটা সুগন্ধী নারী কী সুন্দর নগ্নতায় কী মধুর মগ্নতার সুরা পান করছে! নেশায় আচ্ছন্ন এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ঘড়িটা তাকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। এ দৃশ্যে সন্ন্যাসী সেজে ধ্যানাতুর শ্রী বুদ্ধের মতো চোখ মেলে জেগে ওঠে অই মৃত রাত।
দ্যাখো,সময়ের পরিত্যক্ত জরায়ুতে এক অন্ধ প্রেমিকের বেদনার জন্ম হলো; আজ রাতে কে তাকে আগুনপ্রেমে ডেকে নেমে হৃদয়ের উড়ন্ত নেশায়? … কে যেন আড়াল থেকে বলছে- প্রকৃত প্রেমিক আর প্রজাপতি ছাড়া অন্য কেউ নগ্নতায় এ নেশার আগুনে নামে না।
অই দ্যাখো, মেঘের পাঁজর ভেঙে নেমে আসছে বিদ্যুতের ফণা; তবু একা ঈশ্বরে একান্ত মগ্ন পাথরের গান শুনতে শুনতে অই জলশিশু হাওয়ার বেদীতে আজ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে: বজ্রনাদে চৌচির মৌনতা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শূন্য থেকে মহাশূন্যে শূন্যতার গহন গুহায়।
ভাবো তো একবার – নদী ও সবুজ ছাড়া কী করে প্রেমিক বাঁচে! পাহাড়ের পাদদেশে দক্ষিণের ঝরণাতলায় কী করে প্রেমিকা তার প্রেমিকের ওষ্ঠ্যে দেবে গোধূলির মেহেদিচুম্বন!
উপত্যকা জুড়ে শুধু আলুথালু দীর্ঘ কাশবন। পাতালের ফাঁদে পড়ে শূন্যতার হাহাকারে নিঃশব্দে মাতাল কাঁদে; আহা কী ক্রন্দন! যেন দেশহীন দেশপ্রেম পড়ে আছে এক মৃত পরিখায়।
পাখির কূজন কেন থেমে যায়? মেঘের উঠোনে কেন স্থবিরতা হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে আছে? নদীকে ডাঙায় রেখে জল কেন উড়ে যাচ্ছে পাহাড়ের নির্জন ডেরায়?
মধ্যদিনে মেহেদি পাতার রঙে অনিবার্য হাহাকার নাচে: শরীরে গোধূলি ওড়ে; প্রেমিকা পুরনো হয়, তবু প্রেম সতত সবুজ; কে তাকে উদ্ভিদপ্রেমে ডেকে নেবে বসন্তের কুসুম ডানায়?
৪.
কবিতার জন্মস্থানে হৃদয়ের পাতা ঝরে; তার সঙ্গে যদি রক্ত ঝরে! যদি যুক্ত হয় এই নারকীয় মিসাইল সভ্যতা!
রক্তপাতা ঝরে যাচ্ছে! …যাক। মৃত্তিকার মায়া ছেড়ে নক্ষত্রের মর্মমূলে জল উড়ে গেলে পাহাড়ের খাড়ি ভেঙে ভেঙে যে-ভাষায় কাঁদে দিশেহারা নদী সে-ভাষার ধ্বনি এক অন্ধ কবি ছাড়া কে আর অমন করে বাতাসের প্রাণে সমুদ্রের কান পেতে শোনে?
নদীকে জড়িয়ে ধরে সিনেমার নায়িকার মতো নগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভোর; বলো, কবি ছাড়া কে আর অমন করে সমুদ্রকে বুকে নিয়ে আগুনে ঘুমায়?
রূপালি ডানায় ওড়ে স্বপ্নবান সবুজ কিশোর; সমুদ্রের ফুল হাতে আগুনের অশ্রু চোখে একদিন প্রবাল কুড়োতে গিয়ে হঠাৎ করেই সে-কিশোর পাথরের নিচে চাপা স্বপ্ন থেকে ভুল করে কুড়িয়েছে বেদনার নীল সর্পমণি; মণি হাতে কিশোর দৌঁড়ুতে থাকে হরিণের পায়ে; …নিজের ছায়াকে খুঁজতে যে-কিশোর আগুনে নেমেছে সে-কিশোর এখন কোথায়?
পাহাড়ের নির্বাসিত ছায়াপুঞ্জ গায়ে নিয়ে শীতে আর্ত মেঘশিশু শুয়ে আছে ঘুমগ্রস্ত অগ্নিবনে; অমাবস্যা ভেদ করে ঝাউবনে দাউ দাউ জোনাকি মেয়েরা জ্বলে। ছুটি নেই,ছুটি … সমুদ্রের পাঠশালায় তবু কেন জলহরি বাজাল জলের ঘণ্টা,ঢং ঢং …।
কুপি আর স্বপ্ন জ্বেলে একদিন চুপি চুপি যে-শিশু পড়েছে উদ্ভিদের রমণকাহিনী তাকে কেন শুনতে হয় ইট পাথরের গান আর আকাশ বিদীর্ণ করা হৃদয়ের রক্তঝরা করুণ বিলাপ?
গেরুয়া বসনধারী পুরোহিত অন্ধকার তার চোখে শিশিরের আলো ফেলে দেখে অচেনা চরের ঘাসে কুয়াশার পাণ্ডলিপি পাঠ করে নিমগ্ন কিশোর,তার স্বপ্নগুলো ক্লান্তির পালক মেলে পাখি হয়ে উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের ঘুমন্ত ফেনায়।
একটা নারীর কান্না বুকে নিয়ে নদী সারাক্ষণ খেলা করে এক ধাবমান উপত্যকা জুড়ে। কে যেন আড়াল থেকে তার কানে ফিসফাস করে,অবিরাম মন্ত্র দেয় : যদি রক্তে কৃষ্ণচূড়া ফোটে তবে অন্ধ অরণ্যের বন্ধ কান পেতে কোকিলের গান শোন; লাভ-ক্ষতি হিসাব না-করে হৃদয়ের পরিত্যক্ত খনি থেকে কয়লাময় মৃত্যু তুলে নাও।
৫.
সময়ের ডাকবাক্সে বসন্তের ডাক নেই;তবু কেন অই শূন্যতার মহাদ্বীপে কান পেতে বসে আছো? রক্ত থেকে গুচ্ছগুচ্ছ কৃষ্ণচূড়া ছিঁড়ে নিচ্ছে দস্যু মনহুর। তুমি কোন হুরীর আশায় বসে আছো উটের পিঠের মতো অই উঁচু শূন্যতার প্রতিবেশী মৌনতার স্তব্ধ মোহনায়।
শ্বাপদ সঙ্কুল ঘন অরণ্যের ঘুমের ভেতর এক অচেনা শিয়াল এসে মাঝে মাঝে হাঁক মারে : চিঠি আছে,চিঠি… দৌঁড়ে গিয়ে দেখি : অরণ্য উজাড় করে চিঠিহীন পড়ে আছে শাদা খাম, প্রাণের কঙ্কাল।
অই কঙ্কালের হাহাকার থেকে হামাগুড়ি দিয়ে ঘড়ির সুড়ঙ্গ পথে বের হচ্ছে এক অন্ধ কালো বিড়ালের থাবা;তার নোখ গেঁথে রাখে নক্ষত্রের তাজা নীল হিমালয়, অরণ্যের মাতাল পিপাসা।
পা ভেঙ্গে সময় যেন শুয়ে আছে প্রকৃতির ব্যভিচারী খাটে; কে ওকে চিকিৎসা দেবে,সেবা দেবে? …অন্নজল ঢেলে দেবে ক্ষুধার আগুনে?
বুকের ভেতরে এক কুকুরের তাড়া খাওয়া শিয়ালের পিঠে বসে আছে প্রিয় নদী যমুনার ঢেউ। যে-মেয়েটি যমুনাকে বুকে নিয়ে পাহাড়ে উঠেছে,তার বুকে কত নদী কত ঢেউ লুকিয়ে রয়েছে তা কি জানে যমুনার জল? যমুনার জলে আজ কাঁকড়া ছাড়া অন্য কোন শিকার মিলে না।
…যৌবনের ডিঙ্গি বেয়ে মধুগঞ্জে আজ আর মাধবী আসে না : তবু কেন করোটির অন্ধকারে পূর্ণিমাকে বেঁধে রাখে ইছামতি বালিকার গোপন ইশারা!
হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে নির্জনতা বসে থাকে পাহাড়ের কাঁধে। কুয়াশা বালিশ হয়ে ধরে রাখে আকাশের ঘুমাচ্ছন্ন মাথা। পানশালায় পরিত্যক্ত চেয়ারের নিচে শুন্য গ্লাসে ঢুকে পড়ে নেশাতুর মশা ও মাছিরা। স্তব্ধতার হাত ধরে রাত্রি হাঁটে রাজপথে একা;চিৎ হয়ে পড়ে আছে ল্যাম্পপোস্ট।
বাড়ি যাবো… বাড়ি কই? শাড়ি খুলে চোখ মারে পাড়ার মেয়েরা। ভাটার গোপন টানে সমুদ্রের তলপেটে কাম আর অন্ধকার ঘুমিয়ে পড়েছে। শীতের কামড় খেয়ে বসন্তের ইচ্ছেগুলো কোকিলের ডিম হয়ে পড়ে আছে পলাতক কাকের বাসায়; ঘাসবনে শিশির কুড়োতে গিয়ে ভালোবাসা কুড়িয়েছে কাফনের রঙ আর কবরের মাটি।
৬.
আকাশবালিকা একা চুল খুলে সমুদ্রের তীরে উরু ফাঁক করে নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে। মোহনার ঘুম থেকে উড়ে আসে শাদা কবুতর। কেউ তাকে শান্তি বলে,কেউ বলে রোদ;আমি বলি- প্রেম।
প্রেমে যে-আগুন আছে সে-আগুনে সূর্যোদয়ে খেলা করে হরিণ কুমারি। এ দৃশ্যে পাগল হয়ে জলবালা অবিরাম নাচে; গিরিবালা চেয়ে দেখে: আনন্দের হাত ধরে দূরে নাচে মাতাল নর্তকী। তার জলে স্নান করে নীলিমা পবিত্র হয়,হয় ঋতুবতী ।
ঈশ্বর নিজেও নাকি মাঝে মাঝে সমুদ্রবিহারে যান; প্রাচীনকালের রাজাদের মতো তিনিও লুণ্ঠন করে নিয়ে যান পরনারী; … দস্যুতার চিহ্নগুলো পড়ে থাকে অই জলবালিকার ঢেউ জাগা বুকে,যার রূপে অন্ধ হয়ে অভিমানে ঈশ্বর নিজের ঘরে আত্মহত্যা মহাপাপ বলতে বলতে বিষ পান করে মরে যান, হৃদয়ের ছাইভষ্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্বার জন্ম নেন। প্রত্যেক মুহূর্তে মানুষের, উদ্ভিদের আত্মা থেকে এইভাবে ঈশ্বরের জন্ম হয়, এইভাবে তার মৃত্যু হয়… এ এক অনন্ত চক্র,যার ফলে তার কোনও জন্ম নেই,মৃত্যু নেই – তিনি অনাদি অনন্ত।
হৃদয় কুড়োতে গিয়ে ভুল করে যারা সারাদিন ধরে কুড়িয়েছে অন্ধকার,অন্ধকার থেকে কুড়িয়েছে সমুদ্রের ফেনা, বেলাশেষে খালি হাতে নিরুপায় তারা ফিরে আসে।
শূন্যতার যুবরাজ দূরন্ত অশ্বের পিঠে চড়ে মরুভূমি পার হয়ে চলে যাচ্ছে; বলো, এত হাহাকার নিয়ে মানুষ কী করে বাঁচে, বেঁচে থাকে!
আকাশের পেট চিরে বের হচ্ছে পারদের মতো স্বচ্ছ দিন; অন্ধকার পাহাড়ের পায়ে টেস দিয়ে বসে থাকে; সন্ধ্যা তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে ঝোপের আড়ালে।
মৃত্যু ঈশ্বরের হাতে ধরা দীর্ঘ এক লাঠি। এ এক এমন লাঠি, যার কোন ক্ষয় নেই, জয় ছাড়া পরাজয় তার কাছে কখনও আসে না।
৭.
সমুদ্রের চুমু খেয়ে আমাদের কামশীলা নদীগুলো মাঝে মাঝে মত্ত হয়ে ওঠে। বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে শুয়ে থাকে উত্তরায় হিমের সম্রাজ্ঞী। বরফের শাড়ি খুলে খুলে যখন জলের পরী শাদা উরু ফাঁক করে নাচতে নাচতে সমতলে নেমে আসে, ঠিক তখনই আমাদের দক্ষিণের জলের সম্রাট দুর্বিনীত কামগন্ধে জেগে ওঠে;তার চোখে জ্বলে হারানো জলের ক্ষুধা, জঙ্গলের নিবিড় আশ্রমে যেন এক জ্বলজ্বলে চিতাবাঘ শিকার ধরার জন্য ওৎপেতে আছে। দূর থেকে ছুটে আসছে উন্মাদিনী ডাকিনীর পায়ের আওয়াজ; দ্যাখো দ্যাখো, বাতাস কী করে তাকে বুকে নিয়ে নাচে অই জলের মুদ্রায়!
অতঃপর ঘুমন্ত চিতার চোখে সারাক্ষণ টলমল করে গলন্ত সীসার মতো রাত্রি; দুঃস্বপ্নের জাগরণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চৈতন্যের বিপন্ন পাড়ায় ।
বরফের জামা গায়ে, গোঁফে জ্বেলে দীর্ঘ কালো শিখা যে-বিড়াল প্রত্যেক মুহূর্তে হানা দেয় জনপদে ইঁদুরের বাচ্চা ফেলে সে এখন জীবনশিকারী ; মানুষের মাংস খেয়ে, আত্মা খেয়ে তার ক্ষুধা পাহাড়ে উঠেছে : দ্যাখো,সমুদ্র কীভাবে তার লেজ ধরে বসিয়েছে নারকীয় নাচের উৎসব।
চারিদিকে অক্টোপাস অন্ধকার। বাতাসের ঘূর্ণি টানে উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের ছায়া;প্রলয়ের শিঙ্গা ফুকে জেগে ওঠে পাথর ফেরেস্তা। হরিণীর লাশ দেখে, বাঘিনীর আর্তনাদ শুনে নিরন্ন নদীর ক্ষুধা গর্জে ওঠে অরণ্যের পেটে : জলের মর্সিয়া শুনে দেবতারা উড়ে যায় চরের শ্মশানে; আকাশ পড়েছে ভেঙে ঈশ্বরীর ভাতের হাঁড়িতে। দ্যাখো, দুধের বাটিতে আজ নাগিনীর মধুরমিলন : ঈশ্বরের সন্তানেরা ভাত নয়, নরকের রুটি খেয়ে আগুনে ঘুমায়!
৮.
দুগ্ধহীন গাভীর ওলান থেকে মৃত্যুকে দোহন করে মাতৃহীন শিশু। ওই দ্যাখো, যুবতীকে ভালোবেসে যে-যুবক একদিন ছুঁয়েছিল আকাশের নাভি, আজ বাতাসের হাত ধরে তার দেহ ঝুলে আছে গাছের আগায়; আর গাছের গোড়ায় দ্যাখো, যুবতীর নগ্ন রূপে মাছিদের ভোজন উৎসব। এই দৃশ্যে ঘুম নেই শোকাচ্ছন্ন গাছের পাতায়। … চন্দ্রমুখী মেয়েটির লাশ বুকে আকাশ কী করে নাচে জলের গুহায়! যে কুকুর মনিবের মাংস খেয়ে বেঁচে আছে তার লেজে মাথা রেখে, কোনও হাঁক নেই, ডাক নেই, দ্যাখো কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন জঙ্গলের পণ্ডিত মশাই!
বাতাসে বিষাদসিন্ধু ওড়ে আর ঘূর্ণিতালে নাচে, যেন সভ্যতার রক্ত খেয়ে নগ্ন হয়ে নাচিতেছে এজিদবাহিনী; যেন ফোরাতের বাহু থেকে মুক্ত হয়ে ছুটে আসে নতুন কারবালা; দক্ষিণের চরে মৃত মহিষের কালো বাঁকা শিং হয়ে পড়ে থাকে মহরম চাঁদ। মেঘের আস্তানা ছেড়ে স্বজনের খোঁজে চাঁদ ছুটে যায় বাঘের কিল্লায়; সূর্য দেখে তার লক্ষ কোটি সন্তানের জ্বলজ্বলে কচি মুখে উঁইপোকা শুয়ে শুয়ে মৃত্যুকে পাহারা দিচ্ছে।
সমুদ্রের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে নাগিণীর বিষদাঁত – মৃত্যুর বিষাক্ত হিরা; সবুজ বদ্বীপ জুড়ে দ্যাখো, বাতাস কীভাবে ফণা তুলে ফুঁসে উঠছে! অরণ্যের গহন আঁচলে মুখ ঢেকে শূন্যতা ফুঁপিয়ে কাঁদে। বলো, মহাপ্রলয়ের থাবা মুক্ত মুহূর্তের স্বপ্ন আর শূন্যতাকে বুকে নিয়ে নিরীহ উদ্ভিদ শিশু কী করে বাঁচবে!
৯.
খোদা ও রসুল প্রেমে মুগ্ধ হয়ে সেজদা দিয়ে পড়ে কাঁদে যে-দেশের সরল মানুষ, হায়! সবুজ জলের সেই দেশে কী এমন পাপ জমেছিল! মানুষের রক্তে যারা পূর্ণ করে নেশার পেয়ালা,সে-সব দস্যুকে দিয়ে তাকে আজ ধুয়ে মুছে শুদ্ধ করে নিতে হয়!
সমুদ্রের নামে আজ খুৎবা পড়ে বাংলার ইমাম : হে প্রভু জলের পিতা! বলো, মানুষের অপরাধে বনের প্রজারা কেন সাজা পেল? নিরীহ গাছের মূলে লবণের বিষ ঢেলে কী সুখ তোমার! কেন যে রক্তের মতো জায়নামাজে নারী ও শিশুর লাশ নিয়ে খেলা করো হে অন্ধ জলের রাজা !
বাতাসে সাঁতার কেটে যে-শিশু মায়ের কোলে হাঁটে একদিন, সে এখন মহাশূন্যে কাকে খোঁজে? আজ এ পৌষের রাতে তার বুকে কে দেবে মায়ের মতো শীতের চাদর ? লাঙ্গলের ঈষ ঠেলতে ঠেলতে যে চাষা নিজেই আজ ঈষ হয়ে হাঁটে, নতুন চরের মতো ভালোবেসে কে আর অমন করে অই অন্ধ চাষাকে আশার বীজ, আলোঘুম দেবে? হে প্রভু দয়াল সিন্ধু! বলো, শুধু দয়া দিয়ে বাঁচে কি উদ্ভিদ? সেও চায় রক্তমাটি,ঘুমের মোহনা।
কে না জানে, শুধু দয়া দিয়ে মানুষ যদিও বাঁচে, শরীর বাঁচে না; তার চাই অবিনাশী মায়াতাপ, রহস্যবাহিত কালো একঝাঁক ঝিঁঝিঁর উল্লাস।
হে মুগ্ধ রঙিন প্রজাপতি! বলো, সুন্দরীগাছের ওম সঙ্গীহীন হরিণীকে কী করে জাগাবে! পুরুষ হরিণ ছাড়া কে আর অমন করে বাসনার জিহবা দিয়ে চেটে নেবে হরিণীর যৌবনের মধু?
সুন্দরবনের সেই বিখ্যাত লাবণ্যে আজ দ্যাখো, ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যুপাখি বসতি গেড়েছে। উদ্ভিদের প্রাণের সবুজ থেকে জন্ম নেয়া অবিনাশী বসমেত্মর পাখি সে-বনে কী করে যাবে, যে-বনে হরিণ নেই,বাঘ নেই। …সূর্য যদি লাল জামা গায়ে দিয়ে ফেরি করে দিনের খাবার,তবে নাকি মানুষের আয়ু খেয়ে বায়ু আর সাগর দেখে না।
সুচারু পোশাক পরা অশ্বারোহী ফেরেস্তারা উড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের তীরে; তারা বালি থেকে জিহবা দিয়ে শুষে নিচ্ছে জীবনের জল। করতলে মহাদেশ,ক্ষিপ্ত জলরাশি;সীমান্ত পেরিয়ে আসে জোয়ারের প্রতিশ্রুত ঢেউ; ভাষণে আগুন ভাসে,ক্ষুধার্তের বাসন ভাসে না : যে-বনে সঙ্গমরত শিয়ালিনী লাশ হয়ে ভেসে গেছে জলের ভেলায়, সে বনের হাওয়াকে সেলাই করে কী করে যে তৈরি হবে আসন্ন শিশুর জন্য নিরাপদ পাতার আশ্রম!
১০.
প্রত্যেক মুহূর্তে, জানি, মানুষের আয়ু খেয়ে বায়ুরাজ বাঁচে । কবর দুয়ারে এসে মুখ ঘষে জুতোর তলায়। তবু কেন গণিকাপাড়ার চাঁদ অন্ধকার বারান্দায় ঝাড়ু দিয়ে যায়?
প্রত্যেক পুরুষ চায় বসন্তের রং দিয়ে পছন্দের গাউন বানাতে; প্রত্যেক প্রেমিক চায় আফ্রিকার গহীন জঙ্গল ছেড়ে জিরাফের চোখ নিয়ে যেন ফিরে আসে পলাতক কাঁকনের হারানো চুম্বন।
আকাশে পাহাড় ছুঁয়ে শুয়ে আছে অই দূর অতীতের রঙধনু হ্রদ : লবণের ঢেউ আর নক্ষত্রের ছায়া গুনতে গুনতে গভীর জঙ্গলে একা একদিন ঢুকে পড়ে অনভিজ্ঞ নগ্ন বোকা নদী; জঙ্গলের অন্ধকার আর বহস্যের পাতা সরাতে সরাতে গোলাপী চাঁদের হ্রদে অই নদী হিস হিস শব্দ তুলে সাপ হয়ে নেমে যায়। কী এমন নেশা ছিল,কাম ছিল সে-চাঁদের জ্যোৎস্নারসে! প্রেম কি ছিল না? … হয় তো বা ছিল, হয় তো ছিল না।
জানি, প্রেমে আর কামে যারা কাপুরুষ তারা কেউ যুদ্ধ শেষে পরাজয় শিকার করে না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়: ডানাওয়ালা সাপ হয়ে উড়ে যাই আফ্রিকার অদৃশ্য জঙ্গলে,বাসনার জিহবা দিয়ে ছুঁয়ে দেখি গুহামূলে গোলাপের গোপন নির্যাস।
কিছু কিছু গোলাপের পাপড়ি আছে গোপনে লুকিয়ে রাখে ব্যথার পাহাড়, কিছু কিছু গোলাপের ব্যথা থেকে তৈরি হয় স্মৃতির পাথর। একটা দুপুর অই পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে – মাঝে মাঝে অন্ধকারে নক্ষত্রের চোখ নিয়ে উঁকি মারে। সেই কামাচ্ছন্ন দুপুরের মুখ থেকে রৌদ্র সরে গেলে জীবনের ফাঁকা ঘরে আজও কী আগের মতো আগুনের ঢেউ জাগে কাঁকনের উজান নদীতে ?
১১.
জীবের বাঁচার মধ্যে কী এমন নেশা আছে, রক্তপ্রেম জেগে আছে–তা কি জানে সমুদ্রের নিরঞ্জন পাখি? জানে কি অদৃশ্য প্রভু নিরাকার হরিদাস?…তিনি জানুন বা না-জানুন,অই হেমন্তের রোদ জানে : জীব মরে, জীবন মরে না; সে বাঁচে জলের মতো অবিনাশী রূপের খেয়ায়।
জীবনের প্রতিবাঁকে বার বার একটা নদীর ঢেউ জেগে ওঠে; অভিন্ন স্বভাব নিয়ে নদীকে জড়িয়ে ধরে জীবনের রঙ।
ঘোরে কিংবা গৃহে নয় আজ শুধু আশায় বসতি। ছিন্ন স্বপ্ন,ভিন্ন আশা,লন্ডভন্ড ভূমিচিত্র; তবু ভালোবাসা চিতার সাহস নিয়ে ঝাপ দিচ্ছে জ্বলন্ত চিতায় ।
দ্যাখো, আদম-সুরুত কী নিবিড় স্বপ্ন নিয়ে সুচারু দর্জির হাতে আবার সেলাই দিয়ে ঠিক করছে প্রকৃতির যোনি ও জরায়ু । প্রকৃত জন্মের টানে ছিঁড়ে যাচ্ছে জীবনের দীর্ঘ মরীচিকা;পাতার আড়াল থেকে উড়ে যাচ্ছে অচেনা নদীর বাঁক: জলের মুখোশ পরে স্বপ্নগুলো হামাগুড়ি দিয়ে পার হচ্ছে দিগন্তের আঁকাবাঁকা নদী। অই দ্যাখো আফ্রিকার অন্ধকারে চিতায় আগুন জ্বেলে মায়াবিনী সেই সাপ সেই যোনিপোকা বেরিয়ে পড়েছে আজ হৃদয়ের রক্তপথে।
এটা কোন রূপকথা নয়;উন্মাদ আশ্রম ছেড়ে এক অন্ধ ভিক্ষুকের ঝোলা থেকে লাফিয়ে পড়েছে মুদ্রা নয়, জীবন নামক এক অতি ক্ষুদ্র কানাকড়ি। এক অন্ধ রাজা হরিণ শিকারে গিয়ে সে-কড়ি কুড়িয়ে পান গভীর হ্রদের জলে ডুবে থাকা মেঘের খাঁচায়।
এসো হে বনের পশু,পক্ষীকূল! তোমাদের জন্মের দোহাই -এইমাত্র যে-শিশুর জন্ম হলো পতিতাপাড়ায়,তার নিষ্পাপ কোমরে অই কানাকড়ি নয়, বেধে দাও জীবনের দীর্ঘশ্বাসগুলো,তার সঙ্গে কিছু স্বপ্ন,কিছু আশা। এসো তার ছবি তুলে রাখি দেবতার ঘরে। … কে যেন আড়াল থেকে ফিসফাস করে : প্রকৃত দেবতা যিনি তাঁর নেই পিতৃপরিচয়।
১২.
বিচিত্র বীজের গর্ভে সমুদ্রের ভ্রণ থেকে জন্ম নিচ্ছে পাতার আগুন…দ্যাখো দ্যাখো আগুনের আস্তানায় কী মধুর বাঘলীলা,তার পাশে অই শুনো হরিণীর প্রসববেদনা!
কোথায় পালাবে মৃত্যু- তার পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি দিয়ে শিশুরা আনন্দে নাচে;দূরে নাচে পৃথিবীর প্রধান নর্তকী। ঈশ্বরের বাগান বাড়িতে একদিন মহুয়াপালার সেই সাপুড়ের বাঁশি হাতে হুরীদের নাচঘরে ঢুকে পড়ে ছদ্মবেশী প্রেমের খলিফা।
অই দ্যাখো, কুমিরের নতুন কুমারি বউ ডাঙাতলে ডিম পেড়ে কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে! ডিমের খোসার মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আছে পক্ষিণীর লাজুক আকাশ। পাতার আড়ালে যার ছায়া জড়িয়ে ধরেছে অন্য এক ঘুমন্ত ছায়াকে আমি তাকে জন্ম থেকে জানি: সে এক উড়ন্ত দেবী, যে আমার আত্মার আগুন থেকে জন্ম নেয়া অবিনাশী হরিতের লীলাকুঞ্জে বসে থাকা বসন্তের ডাহুক বালিকা, অই ঘূর্ণি ঢেউ আর হাওয়া তাকে কী করে ভাসিয়ে নেবে নরকের নিশিপুরে!
আমার প্রেমের চেয়ে এত তীব্র গতিময় কোনও ঝড় কিংবা ঢেউ সমুদ্রের জলসাঘরে কেউ আজও জাগাতে পারেনি, অই রাজবংশী অর্ফিয়ুস কোন মন্ত্রে, কী করে জাগাবে তাকে!
একটা নির্ঘুম পাখি উড়ে যায় সীমান্তের দিকে; উড়তে উড়তে সে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল; আর তার পলাতক নিথর ছায়ার নিচে নিষ্পলক চেয়ে থাকে একফালি প্রেম; প্রেমের ভেতর থেকে উঁকি মারে একবিন্দু জীবনের রোদ;রোদের ডানায় মেঘ এসে বসে থাকে জলের আশায় : সমুদ্র নিজের চোখে তুলে রাখে মেঘের বেদনা।
শেষমেষ মৃত্যুই চূড়ান্ত সত্য; তবু তার চেয়ে বড় সত্য : ঈশ্বর নিজের স্বার্থে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন। এও সত্য জানি : একটা মানুষ মরে গেলে একজন ঈশ্বরের মৃত্যু হয়;একটা শিশুর জন্মচিৎকার শোনা গেলে মৃত্যুর ওলান চুষতে চুষতে বেঁচে যান আহত ঈশ্বর।
কে না জানে, মৃত্যুর পোশাক পুড়ে গেলে পুনর্বার জ্বলে ওঠে জীবনের মোম। মানুষ যেখানে তার পা রেখেছে সেখানে কী করে মৃত্যু অবিরাম শ্যামের বাঁশির মতো একলা একা বাজে!
কিছু কিছু বিখ্যাত লোকের মৃত্যু হলে আমারও খুব ইচ্ছে হয় : মৃত্যুর নিঃসঙ্গ মুখে আচ্ছা করে চুমু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার।
১৩.
যদিও বসন্ত প্রায় যায় যায়,বলে গুডবাই;তবু ঋষিবনে ঝড় ওঠে কোকিলের ডাকে। দ্যাখো, বাগানের রৌদ্রমধু খেয়ে নাচে বিকেলের ধূলো।
জন্মের পোশাক ছেড়ে রঙধনু গায়ে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে প্রজাপতি পাখি। এ এক এমন পাখি! উড়ে যায়, তবু পুড়ে পুড়ে ছাই করে বনের নীলিমা;নীলিমা সমুদ্রে নাচে, তার ছায়া পড়ে কাঁদে হৃদয়ের জলে ।
পাখির ডানায় চড়ে উড়ে যাচ্ছে জলের কুমারী; কে বলেছ, জলহীন বয়সে বসন্ত নেই,…নেই কোন জন্মের জীবাণু। আমি বলি, আছে , আছে … দ্যাখো, আমার বুকের মধ্যে সমুদ্র কী করে তার ধ্যানদ্বীপে জেগে ওঠা শ্যামল পাহাড়ে কুয়াশার জালে ঘেরা সূর্যকে টুকরো করে তার রঙ দিয়ে বানিয়েছে ময়ূরমহল। আমি সেই মহলের অন্ধকারে শুয়ে আছি চোখ বন্ধ করে।
বুকের গহন থেকে জলদেবী কুমন্ত্রণা দেয়: যে তোমার জন্মসঙ্গী,তাকে তুমি সময়ের ছুরি দিয়ে কাটো, টুকরো টুকরো করে ছুড়ে দাও রৌদ্রের ফেনায়, তারপর মৃত্যুর যোনিটা ফাঁক করে অন্ধকার থেকে জন্ম দাও আলোর শিশুকে।
১৪.
উপদ্রত উপকূলে ছিঁড়ে গেছে প্রকৃতির নাভি; রঙহীন রক্তপাতে ভেসে গেজে সব ঝড় ; নিভে গেছে জোনাকির চোখ; আদিগন্ত শূন্যতায় যে বাজায় জলের সানাই তার চোখে পাথর জমেছে। পাথরে জীবন ঘষে অন্ধকারে কেন যে ময়ূর সেজে একা একা জলের নর্তকী নাচে, তুলি ও ক্যানভাস ছেড়ে কেন কাফনের রং নিয়ে খেলা করে অই অন্ধ মহাচিত্রকর, ছবি আঁকে জলের পাতায় … আমি কবি,আমি সব বুঝি : সমুদ্রকে বুকে নিয়ে কী করে লুণ্ঠণ করে নিতে হয় নতুন সাহারা; আমি সব জানি : কী করে নারীর গর্ভে আষাঢ়ের ঢল নামে; হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে ভূকম্পনে কেঁপে ওঠে মাটির জরায়ু। বীজনারী জন্ম দেয় বীজধান,বীজশিশু। চাষার নবান্ন থেকে অমৃতের গন্ধ আসে, তার পাশে অই শোনো অরণ্যের মায়াবী গুঞ্জন।
সমুদ্রে লবণঝড়ে উড়ে যাচ্ছে স্মৃতি ও জাহাজ, ..যাক; উজ্জ্বল দিনের চোখে মেঘের দেবতা আলকাতরা ছিটিয়ে দিয়েছে,…দিক।
শীতের কুয়াশামাখা ঘূর্ণিদ্বীপে বসন্তের দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো বার্ধ্যক্যের লাঠি হাতে কে হাঁটে বিবস্ত্র একা ?… কে সে জন? জন্ম থেকে জন্মান্তরে রোগে-শোকে,ঝড়ে ও ঝঞ্ঝায় অন্ধকারে যে থাকে ছায়ার মতো লোকে তাকে মৃত্যু বলে;কবিরা বলেন, জীবনের প্রধান প্রেমিকা;আমি বলি,সে আমার সূর্যমুখী আত্মার কোকিল।
১৫.
আঁতুড়ঘরের আলো আর সমুদ্রের অন্ধকার চুক্তি করে মিলননামায়। অতঃপর সেই নবজাতকের জন্ম হলো,যার আগমনে প্রথা মতে সুরেলা আজান দেয়া হলো : কৃষ্ণের মন্দির থেকে শোনা গেলো কী কী সুন্দর উলুধ্বনি!
আনন্দের জাগরণে বাতাসে হেলান দিয়ে জেগে ওঠে সমুদ্রের গান; রূপসী নার্সের মতো নক্ষত্রের শাদা দাঁত বের করে হাসে নিদ্রাহীন রাত ; রাশি রাশি ফুলের হলুদ গন্ধে সর্ষে ক্ষেত ভরে যায় বৃষ্টির ফোঁটায়; ঝাঁক বেঁধে গাঙচিল উড়ে আসে শ্যামল উঠোনে;অন্ধকারে এক দুঃখিনী মায়ের ওষ্ঠ্যে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল।
মহাশূন্য থেকে পা ও হাত ছুড়তে ছুড়তে একদিন মায়ামাখা এক স্বর্ণদ্বীপে নেমে আসে অই নগ্ন শিশু : আলোর ঝর্ণায় তার প্রথম গোসল; বাতাসের জ্যোৎস্না আর রঙ দিয়ে অন্ধকার কেটে কেটে তার জন্য তৈরি হলো ঘুমের মহল ।
নরম কয়লার ঘুমে নিমগ্ন শিশুর চোখে যিশু চুমু দেন,শুভেচ্ছা জানান : সমুদ্রের গান কিংবা জলের ক্রন্দন বুকে তুমি ছাড়া অন্য কেউ এইভাবে ঘুমোতে পারে না; ঘুমাও সমুদ্র শিশু, ঘুমাও …সূর্য আর জলের মহিমা নিয়ে বেঁচে থাকো কালের আঁচলে।
আমার মায়ের পায়ে সেজদা দিয়ে প্রণাম জানায় দক্ষিণের অই জলদেবী : ‘মা গো ! তোমার সন্তান যদি আমৃত্যু আমার প্রেমে ডুবে থাকে, এবং সে যদি বেগানা নদীর কাছে কখনও না যায় তবে তাকে শর্তহীন লিখে দেবো আমার সাম্রাজ্য। তুমি দেখো, একদিন তার এক হাতে জ্বলবে অরণ্যের শিখা, অন্য হাতে ধরা থাকবে জীবনের ক্ষুধা ও জাগরণ।
হে মাতা! তোমার পুত্র একদিন অরণ্যবালার কাছে বিক্রি করবে জলের কবিতা; এবং এ জন্য শুধু প্রতি ভোরে তার চোখে স্নান করবে আলোর সম্রাট। যদি সূর্যোদয়ে তার বুকে বেদনার বেলাভূমি চিকচিক করে, তুমি তাকে অন্ধকারে লুকিয়ে রেখো না;বরং যে বর্ণে রঙ আর গন্ধ আছে সে-বর্ণের শব্দ দিয়ে তার জন্য তৈরি করো অবিনাশী অক্ষরের সোনালি মন্দির (চলবে)

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৫৫ বার

Share Button

Calendar

September 2020
S M T W T F S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930