» ১০৯ হেল্পলাইনঃ বাল্যবিয়ে বন্ধে কন্যা শিশুর পাশে

প্রকাশিত: ৩০. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | বুধবার

মোঃ আলমগীর হোসেন

রাজিয়া স্কুল থেকে ফিরে দেখে তাদের বাড়িতে কয়েকজন মেহমান, এরমধ্যে একজন পরিচিত। সে বইখাতা রেখে হাতমুখ ধুয়ে মাকে খাবার দিতে বলে। রাজিয়ার উত্তর দেয় দিয়েছি মা। আজ আর খেলতে যাওয়ার দরকার নেই। সে কখনো তার মায়ের অবাধ্য হয়না। রাজিয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলেমেয়েদের সম্মিলিত স্কুল। ক্লাশে রোল তিন বা চারের মধ্যে থাকে। মেয়েদের মধ্য থেকে মেধাক্রমে সেই সবার আগে। শিক্ষকরা তাকে খুব ভালবাসে। উৎসাহ দেয় আরো ভালো করার। রাজিয়ারও স্বপ্ন মেডিকেলে পড়ার। এবছর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। সন্ধ্যার পর মেহমানের চলে যায়। রাজিয়া পড়ার টেবিলে বসে শুনতে পায় বাবা তার মাকে কিছু বোঝাচ্ছে। রাতে খাওয়ার সময় তার মা বাবাকে বলে আমাদের মেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভালো। স্কুলের স্যারেরাও বলেছে ও অনেক বড়ো হবে। সংসার চালাতে আমরা দুজনই আয় করছি। মেয়েদের লেখাপড়া শিখাতেতো কোনো খরচ হচ্ছেনা। সব খরচই তো সরকার দেয়। মাসে মাসে দুই মেয়ের স্কুলের উপবৃত্তির টাকাতো আমাদের মোবাইলে আসে। সেই টাকা থেকেই ওদের পড়া লেখার খরচ হয়ে যাচ্ছে। রাজিয়া বুঝতে পারেনা কেন তার বাবা পড়া বন্ধ করছে। সে অল্প কিছু খেয়ে ঘুমাতে যায়। পরদিন স্কুলে যায়, লেখাপড়া বন্ধ করার কথা শুনে মন কিছুটা খারাপ করে থাকে। স্কুল থেকে ফিরে তার মাকে বলে, মা বাবা কেন পড়া বন্ধ করে দিবে? মা বলে, ওসব তোকে ভাবতে হবেনা। তুই মন দিয়ে পড়। কয়েকদিন পর রাজিয়ার বাবা তার সামনেই মাকে বলে এই ছেলেই আমার পছন্দ। ছেলে বিদেশ থাকে, আর্থিক অবস্থাও ভালো। সব শুনে রাজিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল।

রাজিয়া ক্লাশে বিভিন্ন সময় বাল্যবিয়ের কথা শুনেছে। বইয়েও এই বিষয়ে আলাদা চ্যাপ্টার আছে। খবরের কাগজ ও টিভির সংবাদে দেখেছে বাল্য বিয়ে হচ্ছে। আবার কোথাও বাল্যবিয়ে বন্ধ হচ্ছে। এই ধরনের বিয়ে ঠেকাতে আইন আছে। তাদের বইয়ের পেছনে লেখা আছে, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ও বাল্য বিয়ে ঠেকাতে ১০৯ নাম্বার ফোন করা যায়। রাজিয়া আর এক মুহুর্তও দেরি না করে ১০৯ এ ফোন দেয়। ফোনের ওপাশ থেকে একজন নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করে কি জন্য ফোন করেছে জানতে চায়। রাজিয়া কিছুটা ভয় পেলেও ১০৯ এ যার সাথে কথা বলছে তার কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়। নির্ভয়ে তার সবকথা খুলে বলে। ১০৯ থেকে একজন কাস্টমার সার্ভিস প্রোভাইডার রাজিয়ার সাথে কথা বলে। রাজিয়াকে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার যোগাযোগ করার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দেয়। আরো বলে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে তার বাবার সাথে যোগাযোগ করবে।

পরদিনই উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাসহ রাজিয়াদের বাড়িতে এসে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলে। তার বাবাকে বাল্য কি ও কিভাবে আমাদের সন্তানদের ভবিষত নষ্ট করছে। এসব শুনে রাজিয়ার বাবা তার ভুল বুঝতে পারে। সে প্রতিজ্ঞা করে তার মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবে।

বিশ্বে কন্যাশিশুর সংখ্যা পায় একশ কোটি। বাংলাদেশে কন্যা শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি।কন্যা শিশুদের অগ্রযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয় ১৯১১ সালে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের মাধ্যমে । ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে নারীর উন্নয়নে কাজ শুরু করে । ১৯৭৫ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ উদযাপন করা হয় । আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯৫ সালে বিশ্বের ২০০ টি দেশের ৩০ হাজার নারী প্রতিনিধি “নারী ও কন্যাশিশুর অধিকারঃ মানবাধিকার” শ্লোগানে বেইজিং এ অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনে যোগদান করে । আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উদযাপন শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ এর ২(৫) ধারা অনুযায়ী, ‘বাল্য বিবাহ অর্থ এইরুপ বিবাহ যার কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক’। অপ্রাপ্ত বয়স্ক অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ বছর পূর্ণ করে নাই এমন পুরুষ এবং ১৮ বছর পূর্ণ করে নাই এমন নারী। ১৬ অনুচ্ছেদে রয়েছে ধর্ম, গোত্র ও জাতি নির্বিশেষে সকল পূর্ণ বয়স্ক নর-নারীর বিয়ে করার এবং পরিবার প্রতিষ্ঠার অধিকার রয়েছে. ১৬(২) অনুচ্ছেদে বিয়েতে ইচ্ছুক পূর্ণ বয়স্ক নর-নারীর স্বাধীন ও পূর্ণসম্মতিতেই বিয়ে সম্পন্ন হবে। শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ ছেলে ও মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ নির্ধারণের জন্য সকল দেশকে অনুরোধ করেছে। সিডো ১৬ (২)অনুচ্ছেদে অনুযায়ী শিশুকালে বাগদান ও শিশু বিবাহের কোনো কার্যকারিতা থাকবে না এবং বিবাহের একটি সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ ও বিবাহ নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এর ৮ অনুচ্ছেদে রয়েছে কন্যাশিশুর উন্নয়ন ও সকল ধরনের বৈষম্য দূর করতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতি- ২০১১ এর ১৮.১ অনুচ্ছেদে রয়েছে বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা ৫.৩ অনুযায়ী শিশু বিবাহ, বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক বিবাহের মতো সকল ধরনের প্রথার অবসান করতে হবে।

কন্যা শিশুদের জীবনের শুরু ভালো হলে পরিবার দেশ ও বিশ্ব সবচেয়ে উপকৃত হবে। দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় শিশুদের জন্য বিনিয়োগ বিশেষ করে কন্যাশিশুদের জন্য বিনিয়োগ। সরকার সকল প্রকার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কন্যাশিশুর অন্তর্ভুক্তি করার ওপর জোর দিচ্ছে। অধিক পরিমাণে নারী শিক্ষক দেওয়া হচ্ছে। কন্যাশিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং পরিবারসহ সকল ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি করা হয়েছে। শ্রেণি কক্ষে নিয়মিত উপস্থিতির জন্য কাজ করছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কন্যাশিশুর অংশগ্রহণ বেড়েছে । প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২ কোটি শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। স্কুলে হেলথ সার্ভিস প্রদান করবে সরকার । শিক্ষার্থীদের আরো বেশি শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হবে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১০৫ বার

Share Button

Calendar

October 2020
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031