শিরোনামঃ-


» ১৯৭৫ সালে যেভাবে পালিত হয়েছিল বিজয় দিবস

প্রকাশিত: ১৫. ডিসেম্বর. ২০১৯ | রবিবার

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

১৯৭৫ সালে আগষ্টের ১৫ তারিখ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকগোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পরে। জাতীয় চার নেতাকে নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে কারাগারে হত্যা করে তারা চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তৎকালিন মোশতাক সরকার ঘাতকদের সুরক্ষা করেছিলো। এই সময়ের সবচেয়ে বড় রহস্য নিয়ে আজো কোন জোরালো আলোচনা সংগঠিত করা সম্ভব হয়নি। অথচ সেসময় কোনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে কলম ধরেনি। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের দেখা গিয়েছে মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। রাষ্ট্রদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রহস্যজনক ভাবেই নিরবতা পালন করেছে গণমাধ্যম ও বাঙালী সমাজ। মূলকারণ দিকনির্দেশনা বিহীন সমাজ ব্যবস্থা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর অনুপস্থিতি। আর এভাবেই রহস্য তার স্হায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করে। অপশক্তির কাছে নতজানু হয়ে পরে গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা। বেঁচে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে ইউরোপে। প্রচন্ড গ্লানি ও দুঃসহ জীবনের চাকা তখন থমকে ছিলো দুজনের। লন্ডনে শেখ রেহানার সাথে তখন একবার দেখা হয়েছিল অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপির। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য। তিনি ইংল্যান্ডেই বসবাস করতেন। ইংল্যান্ডে সেসময় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিলোনা। ঢাকার টিকাটুলী থেকে পিকাডেলি শহরে এক সরকারি সফরে গিয়ে ইত্তেফাকের সাংবাদিক শফিকুল কবির দুজনের দেখা পেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে ইত্তেফাক বার্তা বিভাগে আমি শফিকুল কবিরের পাশের টেবিলে বসতাম। তিনি আমাকে সুদর্শন তরুণ বলে স্নেহ করতেন। তার টেবিলে চায়ের আমন্ত্রণ জানাতেন। তিনি ছিলেন বেঁটে ও কালো। তবে তার চেহারা বেশ আকর্ষণীয় ছিলো সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। লিপি আপা, রেহানা আপা ইংল্যান্ডেও খুব নিরাপদে ছিলেন না। শেখ রেহানার স্বামী শফিকুর রহমান সাহেব তখন ইংল্যান্ডে কাজ করতেন। শফিক সাহেব টিকাটুলী ফিরে এসে দীর্ঘদিন এসব কথা কাউকে বলেননি। প্রায় পনেরো বছর সময় তিনি খুব কাছের কজন মানুষ ছাড়া কাউকেই ইউরোপে দেখে আসা গল্পের কথা জানাননি। আমি এসব জানতে পারি তার কাছ থেকে। এদিকে, গোটা দেশে শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের গভীর রাতে ধরে নিয়ে হয় হত্যা করা হতো না হয় কারাগারে পাঠানো হতো। বর্তমান সংসদের মাননীয় হুইপ চুয়াডাঙ্গার প্রখ্যাত নেতা ছেলুন জোয়ার্দার, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, সাবেক ডেপুটি স্পিকার অধ্যাপক আলী আশরাফ ছাড়া সারা দেশের অসংখ্য নেতাদের কারাগারে প্রেরণ করেই তৎকালিন সরকার ক্ষান্ত হয়নি। তাদের উপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। হত্যা করা হয়েছিল রক্ষীবাহিনীর সদস্যদেরও। হত্যা করা হয়েছিল জাসদের বিপ্লবীদের। হত্যা করা হয়েছিল অসংখ্য নেতা কর্মীদের। আগষ্ট মাস থেকে শুরু হয়ে যায় হত্যা যজ্ঞ। একের পর এক হত্যার দেশে পরিনত হয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন এসময়। এরই মাঝে ডিসেম্বর মাস এলো। দেশে সে বছর তীব্র শীত। উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা। ঢাকায় ও বিভিন্ন জেলা শহরে কারফিউ। ১৫ ডিসেম্বর সকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ধানমন্ডি বত্রিশ নং সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতে চাইলে সামরিক পোশাক পরিহিত সৈনিকরা বাঁধা দেয়। তিনি পরিচয় দিলে তারা তখন তাকে স্যার বলে সম্বোধন করে । কিন্তু সেদিকে যেতে দেয়নি। বাড়িটির চারপাশে সৈন্যদের সাঁজোয়া বাহিনী দিয়ে ঘেরা তখনও। টেলিফোনে ওয়ালিউর রহমান এর সাথে কথা বলে সেদিনের ঢাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন সেদিন শহরে কারফিউ। অফিস আদালত ফাঁকা ছিলো। রাজাকাররা মোশতাকের চারপাশে। শহরের বিভিন্ন স্থানে সাজোয়া বাহিনী দিয়ে ঘেরা। বিবিসি রাতের খবরে এসব তথ্য প্রকাশ করে। দেশের মানুষ ভিত সন্ত্রস্ত। বলার মতো বিশেষ কিছু নেই পঁচাত্তরের বিজয় দিবস নিয়ে। তবে ডঃ কামাল হোসেন তখন ইংল্যান্ডে। শেখ হাসিনা তাকে লন্ডনে একটি সংবাদ সম্মেলন করতে বলেছিলেন। তিনি সেটা করেননি সেদিন। আগষ্টের পরপর শেখ হাসিনা ডঃ কামাল হোসেনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি সেটা না করেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। প্রায় পাঁচ বছর তিনি দৃশ্যপটের বাইরে।

ডালিম-রশিদ-ফারুক একে একে বিদেশে চলে গেলেন। ঐ বছরই। বিমানবন্দর তাদের জন্য নিরাপদ ছিলো। তবে একদিন দেখা গেলো ফারুক-ডালিম দামী সুট প্যান্ট পরে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে লেঃ জেনারেল এরশাদ এর সাথে বসে গল্প করছেন। সেটা সুনির্দিষ্ট ভাবে দিন তারিখ হয়তো এখন বলা যাবে না। খুনিচক্র বিভক্ত হয়ে চলে যায় থাইল্যান্ড আর লিবিয়ার ত্রিপলী। নূর চলে যায় পরে কানাডায়। পঁচাত্তর এর পরিবেশ রাজাকারদের এতটাই উৎসাহিত করে যে পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমানে একাত্তরের অন্যতম ঘাতক গোলাম আজমকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। আগষ্ট মাস থেকেই প্রেক্ষাপট বদলে যায়। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস দীর্ঘ একুশ বছর পালিত হয় এমন এক আদর্শের ভিত্তিতে যেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার সুনির্দিষ্ট প্রমান পাওয়া গেলো। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে সাত মার্চের ভাষণ বাজালেই হামলা করা হতো। পঁচাত্তর এর বিজয় দিবসেই ঘাতকদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপ লক্ষ্য করা যায়। তখনো শোকে থমকে ছিলো আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। সবাই ছিলো শোকে বিহ্বল, হতবাক। এরপরই দৃশ্যপটে রাজবেশে আবির্ভাব ঘটল জিয়াউর রহমানের। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করার বিষয়টি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকাকালে স্বীকৃতি না পেলেও, কোথায়ও উচ্চারিত না হলেও পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সেটা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠলো।

লেখক: সাংবাদিক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৩০ বার

Share Button