» ৮৭ ভাগ মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী ঃআইনমন্ত্রী

প্রকাশিত: ২৭. জুন. ২০১৯ | বৃহস্পতিবার

কামরুজ্জামান হিমু

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন,৮৭ ভাগ মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং আইনের শাসনের মূলনীতি। সরকার বিশ্বাস করে যে সকল নাগরিকের ন্যায়বিচারে প্রবেশের সমান অধিকার এবং নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার অধিকার থাকা প্রয়োজন। আমরা এও জানি যে, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশ যেখানে বিচারপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে আছে তাদের জন্য আইনী পরামর্শ গ্রহণ এবং আইনী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য। আর তাই, নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ জনগোষ্ঠীর আইনি অধিকার নিশ্চিতকল্পে সরকার ২০০০ সালে “আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০” প্রণয়ন করেছে এবং জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান অফিসের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় ব্যাক্তিদের ন্যায় বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে আইনগত সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।
আজ বুধবার ঢাকায় বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে লিগ্যাল এইড অফিসারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস (আরজে) এ্যাপ্রোচ ইন মেডিয়েশন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আরজে’ আপস মীমাংসার একটি অনন্য পন্থা। এখানে অংশগ্রহণমূলকভাবে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। এটা সালিসের মতই একটি প্রক্রিয়া হলেও কিছুটা ভিন্ন। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয়ভাবে দ্বন্দ্ব-বিবাদ মীমাংসা করা হয়, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বা ক্ষতি প্রশমনকে গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপশি অভিযুক্তের জবাবদিহিতা তৈরী ও তার আচরণের সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। যেন তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতিকর কাজ আর না করেন। এতে করে সমাজে শান্তি আসে, সম্প্রীতি বাড়ে এবং দ্বন্দ্ব-বিবাদ হ্রাস পায়। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে সাফল্যের সঙ্গে আরজে প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে জিআইজেড অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৭ সালে আয়োজিত আরজে বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জিআইজেড বাস্তবায়িত আরজে প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, জাস্টিস অডিটের তথ্যমতে ৬৮ ভাগ মানুষ আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হওয়া স্বত্ত্বেও ৮৭ ভাগ মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী। জাস্টিস অডিটে আমরা দেখেছি যে, শতকরা ৩০ ভাগ নাগরিকের প্রাথমিক দ্বন্দ্বের কারণ প্রতিবেশির সাথে ছোট-খাটো বিরোধ বা মারামারি যা স্থানীয়ভাবেই নিষ্পত্তিযোগ্য। আমরা এও জানি যে, বাংলাদেশের আদালতগুলোতে তিন মিলিয়নের অধিক মামলা জট রয়েছে যার বেশিরভাগই ছোটখাটো অপরাধের জন্য দায়েরকৃত মামলা।
আইন সহায়তার বিষয়টি নিয়েও নতুন করে ভাববার আছে এবং এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের সময় এসেছে। এখন পর্যন্ত আইনিসেবা বলতে আমরা আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তাকেই বুঝি। আইনি বিষয়ে তথ্য প্রদান, পরামর্শ ও মীমাংসাও কার্যকর আইনি সহায়তা যা একটি বিরোধের উৎপত্তিকালে প্রদান করা জরুরী। বিচার ব্যবস্থাকে আরো গতিশীল এবং জনমুখী করতে সঠিক সমস্যার সঠিক সমাধান; সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মামলাজট হ্রাস; এডিআর এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসা; থানা, কারাগার ও আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আটকে পরা বিচারপ্রার্থীদের সহায়তা পরিশেষে আইনিসেবা গ্রহণকারী বিচারপ্রার্থীদের সন্তুষ্টি বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপসহ প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করা আবশ্যক।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক আইনি কাঠামোয় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র অধীনে প্রত্যেক জেলা জজ আদালতে ‘জেলা লিগ্যাল এইড অফিস’ স্থাপনসহ সিনিয়র সহকারী জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তাগণকে পূর্ণকালীন লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে পদায়ন করেছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ইতিমধ্যে আইনগত সহায়তা প্রদান আইনের অন্তর্ভুক্ত। আর তাই লিগ্যাল এইড অফিসারগণ বর্তমানে আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমেও বিরোধ নিষ্পত্তি করছেন। ভবিষ্যতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘এডিআর কর্ণার’ বা ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ পদ্ধতি ব্যবহার করে আপোষ-মীমাংসার ক্ষেত্রে আধুনিক ও যুগোপযোগী পন্থা প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসায় লিগ্যাল এইড অফিসারগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে আমার বিশ্বাস। আইনগত সহায়তার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ স্বঃপ্রণোদিত, দ্রুত ও কার্যকর আইনিসেবা নিশ্চিত করতে জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারীত্ব স্থাপন বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং নীতি প্রনয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্যও অংশীদারীত্ব প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি যে, ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ হাজার। সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০১৬ সালে, এই লক্ষ্যমাত্রার ১৭৮% অতিরিক্ত অর্জিত হয়েছে। এই সংখ্যা নির্দেশ করে যে, ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সরকারি-বিসরকারি সংস্থার সক্ষমতা জানতে কার্যকর অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রশিক্ষণটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অর্জিত যৌথ সাফল্যগুলি পর্যালোচনা, পরিবীক্ষণ এবং ট্র্যাকিং এ সহায়তা করবে। আমি বিশ্বাস করি যে, এই প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইন সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এনএলএসএও আরো শক্তিশালী হবে। এই কার্যক্রমকে সামনে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওর মধ্যে কার্যকরী অংশীদারিত্ব স্থাপন পয়োজন। আরজে এবং মেডিয়েশন কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালীকরণে সরকার প্রয়োজনীয় গাইডলাইন/দিকনির্দেশনা প্রস্তুত করবে।
আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বিচারপতি খোন্দকার মূসা খালেদ, আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে কুলসুম, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশে জিআইজেড প্রকল্পের উপ জাতীয় প্রকল্প পরিচালক প্রমিতা সেন গুপ্ত বক্তৃতা করেন।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮০ বার

Share Button

Calendar

July 2019
S M T W T F S
« Jun    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031