শিরোনামঃ-

» আমেরিকান হতে

প্রকাশিত: ১০. ডিসেম্বর. ২০১৭ | রবিবার

দিলরুবা আহমেদ

তুষার ঝরানো রাতে এই এক বিয়েতে এসে এখন আটকে পড়ে গেছে, নিহার যথেষ্ট বিরক্ত লাগছে। তার পড়া আছে। রিসার্চ আছে। থিসিস আছে। এই রকম অযথা সময় নষ্ট করা তার পক্ষে খুবই বেমানান। রীতিমতো অযৌক্তিক। তবে সে ছাড়া মনে হচ্ছে বিশ্বময় সবাই মহা ফুর্তিতে আছে। নন্দিনীর তো কথাই নেই। পায়ে আলতা লাগচ্ছে। হাতে মেহেদী। গল্প করছে ঘুরে ঘুরে। হঠাৎ তাকে বললো,
নিহা গানটা মনে পড়ে? ওই যে ‘নামের মাঝে পাবে না তো সবার পরিচয়।’ কোন মুভির গান-রে?
নিহা ঠোট উল্টে বললো, হবে কোনো একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির গান।

বলেই নন্দিনী হেসে উঠলো। বললো, অনেকদিন শুনিনি তো কথাটা তাই অবাক লাগছে। ‘পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি’ রেডিওর বিজ্ঞাপন যেন। একদম খাটি দেশি আমেজে বললিরে। মনে হচ্ছে শত জনম আগে শোনা কথা। কতোদিন বাংলাদেশের সিনেমা দেখা হয় না।
আহ করে একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেললো। তারপর বললোও,
আর রেডিওতে সিনেমার বিজ্ঞাপন শোনা, সে তো যেন আদ্যিকালের পদ্যি বুড়ীর গল্প শোনা।
নিহা জিজ্ঞেস করলো, দেশে থাকলে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখতি।
নাহ্।
তাহলে আর আহ্ করছিস কেন?
বিদেশে আমি তাই। দেশি সব কিছুই অসাধারণ মনে হচ্ছে তাই। মিস করি। তুই বুঝবি না। তুই তো পড়া শেষ হতেই পগারপার হবি। তোর কি?
নিহা কোনো জবাব দিল না। গা-টা আরো এলিয়ে দিল থিয়েটার সিটের ভেতর। হাতে পপকর্নের প্যাকেট। খেতে ইচ্ছে করছে না। তারপরেও মুখে দিচ্ছে একটা দুইটা করে। চেয়ে রইলো বিশাল প্রজেক্টর টিভিটার দিকে। দেখছে ‘চিপার বাই দি ডজন’ (ঈযবধঢ়বৎ নু ঃযব ফড়ুবহ) ১২টা বাচ্চার কাণ্ড কারখানা।
নন্দিনী এবার নূপুরগুলো খুলে তাকে দিয়েছে ধরে রাখতে। কারন একটু আগেই দুহাত ভরে মেহেদি লাগিয়েছে, কিছুই ধরতে পারছে না। বেশ কয়েকবার বলেছেও, এখন নাকি তার রিয়েল বিয়েবাড়ি মনে হচ্ছে। বিয়ে শেষ, তারপরে বসে সবাই মেহেদি লাগাচ্ছে, আবার বলছে বিয়ে বাড়ি লাগছে। কতো পাগল যে আছে! যুক্তিও দিচ্ছে আমেরিকাতে বাংলাদেশের মতন নিয়ম করে একটার পর একটা নাকি সম্ভব না তাই যখন যেটা পারছে করছে। করা হচ্ছে এটাই নাকি কথা। বড় কথা। ভালই যুক্তি দাড় করিয়েছে। বাড়িময় এখন বিরিয়ানির খুশবু। এটাই শুধু বিয়ে বাড়ির মতোন। ঐদিকে

নন্দিনী আবার ছুটে ছুটে আলতা-মেহেদি তার বরকেও দেখিয়ে আসছে। ন্যাকামি আর কি। মেরেড মহিলাদের প্রচুর আলগা ন্যাকামি থাকে। যেমন যে লাগিয়ে দিচ্ছে নন্দিনীকে সে বলছে আলতা সে নিজে লাগায় না কারণ তার স্বামীটি পছন্দ করেন না। পায়ের মধ্যে লাল রংয়ের দাগ দেবে তাতে এতো জনের পছন্দ অপছন্দের কি আছে? আরেকজন বললো, আমি তো কখনোই নূপুর খুলতে পারি না, ও লাইক করে না যে তাই। যেন কি এক বাধ্য জনগণ একেকজন। নিহা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে মুখ করে বসে থাকলো। ভাগ্যিস টিভিতে বাচ্চাগুলোর জন্য ভালো একটা মুভি চালিয়ে রেখেছে। তাই দেখছে। না হলে কি করতো সে জানে। মাঝে-মধ্যে নন্দিনীর নূপুরটা দোলাচ্ছে, টুংটাং শব্দ হচ্ছে। নন্দিনী বললো, নূপুরে শব্দ করিস না আমার বর ভাববে আমি তাকে ডাকছি। চলে আসবে।
কি কথা, যেন আর কারো নূপুর নেই। নিহা নূপুরগুলো ছুড়ে দিয়ে দিল। নন্দিনী এতেও হাসলো, এই মেয়ের হাসি কেউ বন্ধ রাখতে পারবে না। চন্দনা ভাবীর বেশ হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে যদিও বাজারে জোর গুজব ওনার বর কনট্রাক্ট মেরেজ করেছেন। ওই সবুজ কাগজের জন্য। কিন্তু ওনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে উনি বেশ আহ্লাদে আছেন। লাজু ভাবীকে নিয়েও একদল হাসাহাসি করছে। ভাবী নাকি আমেরিকাতে এসে প্রথম প্রথম পশ্চিম দিক খুজতেন নামাজ পড়ার জন্য। এখন ওনার কাছে একটা কম্পাস আছে, যেখানে যান নিজেই পূর্বদিক খুজে নেন। কাউকে জিজ্ঞেস করতে আর যান না। করতে গেলেই পুরাতন কথা পাড়তে হবে সবাইকে। মানুষও যেমন। চিনু ভাবীকে দেখা যাচ্ছে কিছুটা বিরক্ত শুধু। হবেই। কারণ ওনার শাড়িটা আজকে তিন নম্বরে চলে গেছে। ওনাকে ডিফিট দিয়ে উঠে গেছে শ্রাবণী আর আমাদের নন্দিনী। নন্দিনী খুবই আনন্দে আছে। একে তো সাজুনি বুড়ি। তার ওপর পড়েছে ঢোলের বাড়ি। হাত-পা কিছুই আজ আর বাকি রাখবে না মনে হয়। সবই সে সাজাবে।
মাঝে মধ্যে উঠে গিয়ে দেখে আসছে বাথরুম/রেস্ট রুমের সামনে লাইনটা কতোটা ছোট হয়েছে। এই এক কাণ্ড। এতো বড় প্রাসাদ আর সাকুল্যে ওই চারটে রেস্ট রুম। মানে হয় কোনো, সব কয়টা রেস্ট রুমের সামনেই অপেক্ষমাণ জনতা। যেন সিনেমা হলের লাইন। এই লাইন থেকেই কি নন্দিনীর বাংলা মুভির গানের কথা মনে পড়লো?
জিজ্ঞেস করলো, কেন জানতে চাইছিলিরে মুভির নামধাম? নন্দিনী উঠে এসে এবার তার পাশে চেপেচুপে বসে পড়লো। হাসলো, চোখ নাচিয়ে বললো, আছে কারণ।
বল, শুনি।
তার আগে বলতো কে বলেছিল ‘নিজ পাত্র হইতে পান কর’। ওই লম্বা লাইনটা দেখে মনে পড়েছে আমার।
নিহা হাসতে লাগলো, বললো, তুই কি এবার বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগানটা দিবি? যে যার পিসি খাও?
নন্দিনী ও দিকে চেয়ে বললো, বাপস, এতোক্ষণে হেডমিস্ট্রেসের মুখে হাসি ফুটেছে। আমি তো ভাবলাম তোকে ধরে নিয়ে বেড়াতে এসে কি-ই না ভুল করলাম।
নিহা হেসে উঠলো।
তার লম্বা বেণিটা সামনে টেনে দিতে দিতে বললো, কয়দিন আগেই ক্লাশেরই এক ছেলে, আমেরিকান ছেলে, আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের প্রধানমন্ত্রী কেন নিজের পিসি নিজে খেতেন?
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, মোরাজী দেশাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। উনি কাজটা কেন করতেন আমার জানা নেই। ইনডিয়ানরা গবেষণা করুক। অ্যাজ লং অ্যাজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কাজটা করছেন না আই ডু নট নিড টু নো দ্যাট। ক্লাসের আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে বললো, শুনেছি এটি নাকি খুবই উপাদেয়? সঙ্গে সঙ্গে প্রথমজন বললো, ডু ইউ ওয়ান্ট টু টেস্ট? চাইলে আমারটাও দিতে পারি। নন্দিনী হো হো করে হাসতে লাগলো। আশপাশের আরো অনেকেও।
নিহা এবার গম্ভীর হয়ে বললো, এখন আমাদের রাষ্ট্র প্রধানরা আমার মুখ-মান রাখলেই বাচি। অনেকেই হাসছে। নিহা সবাইকে হাসিয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে টিভি দেখতে মন দিল। চন্দনা ভাবী তার একগাদা লিফলেট নন্দিনীর হাতে দিয়ে আলতা লাগাতে বসলেন। নন্দিনী দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলো, কি করবেন এগুলো দিয়ে, ঘুরে ঘুরে কোথায় কোনটার দাম কম সেভাবে জিনিস কিনবেন !
মাথা খারাপ ভাবী, এতো সময় আছে, সবগুলো নিয়ে ওয়ালমার্ট সুপার সেন্টার-এ যাবো। সবই তো ওই একটা আস্ত মলের সমান এক দোকানেই পাওয়া যাবে। তাদের দেখালেই হবে। ঞবৎৎু, ঋরবংঃধ, শড়মবৎ, অনষবৎঃংড়হ, গরহরধৎঃ-এ এতো কমে দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে ওরাও দিয়ে দেবে ওই দামে। এটাকে এই দেশে বলে প্রাইস ম্যাচ (চৎরপব সধঃপয) ।

নন্দিনী বললো, গ্রেট বিজনেস আইডিয়া। চন্দনা ভাবী এবার নিহার দিকে চেয়ে বললো, আপনি বিয়ে করে ফেলুন। সংসার হোক। একগাদা লিফলেট আপনাকেও দেয়া যাবে।
পাগল আর কাকে বলে। একা বলে তাকে খেতে পড়তে হয় না! বিয়ে করলে লিফলেট ূেদবে। ধুর ! মুখে কিছু বললো না। শুনলো শুধু।
চন্দনা ভাবী যেন অবশ্য সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। বললেন, আমার হাতে খুব ভালো একটা ছেলে আছে। রিচার্ড নাম। খুব ভালো চাকরি করে। দেখতেও সুন্দর। নিহা অবাক হয়ে বোঝার চেষ্টা করলো, এটা কি কোনো ফান নাকি? বিদেশি ছেলে!
নন্দিনী যেন বুঝলো। বললো, আরে বাংলাদেশের ছেলে। খুব ভালো ছেলে। হ্যান্ডসাম বেতন পায়।
বোঝা গেল যোগসাজশে নন্দিনীও সামিল আছে।
চন্দনা ভাবী হেসে বললেন, ও আচ্ছা ও নাম বদল করেছে। এখন তো সবাই নাম বদলাচ্ছে না! ছেলে, বুড়ো, খোকা, কেউ বাদ নেই। নাইন ইলেভেনের খেসারত টানছে , টেনে যাচ্ছে।
নিহা একবার ভাবলো বলে কই আমার পরিচিতদের মধ্যে তো কেউ নেই যে নাম বদলেছে। আপনি এদের খুজে খুজে পান কোথায়? জিজ্ঞেস করলো, ধর্মও বদলেছে কি?
না, না, তওবা তওবা কি বলেন ? ধর্ম ঠিকই আছে। নন্দিনীর কাছে একটা বায়োডাটা দিয়েছি।
নন্দিনী বেশ হ্যা-নার মাঝামাঝি ভঙ্গি করলো। কাদবে না হাসবে যেন বুঝতে পারছে না। সে তো এটলিস্ট নিহাকে চেনে। একটু এদিক-ওদিক চেয়ে বললো, ওই জন্যই গাইছিলাম। নামের মাঝে পাবে না তো সবার পরিচয়। বলে হাসলো।
সে হাসলে আবহাওয়া ঠাণ্ডা হবে যেন। নিহা তখনও কট কট করে চেয়ে আছে দেখে বললো, আমি বাবা ঘটক না এটার। ছেলেটার যদি মতিচ্ছন্ন হয়, এতো বয়সে নাম বদলায় তাহলে আমি কি করতে পারি। আমি তো আর তাকে বলিনি আমেরিকান হতে। তারপর নিজের মনেই হাত নাড়িয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললো, কতোজনই তো আজকাল শুনছি এরকম করছে। রাজা-বাদশাহরা এককালে রাজ্য জয় করে এরকমই তো করতো, উপাধি নিতো। রাজাধিরাজ। পরমেশ্বর। এরাও আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়ে ভাবছে রাজ্য জয় করেছে। পাসপোর্ট করার সময় বাপ-দাদার দেয়া নামের কচুকাটা করছে। নিজের মমতা না থাকলে আমি কি করবো। তুই বা ক্ষেপছিস কেন?
নিহা শুধু হাতটা প্রথমে তুলে তাকে থামালো। তারপর চিরাচরিত ভঙ্গিতে নাকের সামনে হাত দিয়ে দুদিকে বাতাস করলো। পত্রপাঠ পাত্র বিদায়। নো সেকেন্ড থট। নন্দিনী হি হি করে হাসতে লাগলো। বললো, সব কিছু কি আর জয় করা যায়।
চন্দনা ভাবী দেখলেন শুধু, কোনো কথা বললেন না। কিন্তু নিহা ছাড়লো না। একটু চুপ করে থেকে বললো, নাম্বার নিল না কেন? কোড নাম্বার। ৩২২, ৩৭৭, ৭৫ বা ৩৮ ।স্কুল থেকে বাচ্চা তুলতে গেলে যেমন কোড লাগে সেরকম। চায়নিজদের রাজত্ব শুরু হলে আবার যদি নাম বদলে তাকে টুংটাং বা চুংটাং রাখতে হয় তখন কি হবে। নম্বর নিলেই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করতো।
চন্দনা ভাবীর মুখটা থমথম করছে। যদিও এখনো কোনো মন্তব্য করছেন না। মন দিয়ে আলতা মাখছেন পায়ে। নিহা থামলো না, বললো, নন্দিনী, শোন, তোর যদি ছেলে হয় তখন ওর নাম রাখিস আমেরিকা আহমেদ। অহ্ সরি আহমেদ, মোহাম্মদ, ইসলাম নিয়েই তো সমস্যা? নাকি?
নন্দিনী খুবই বুঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বললো, আমরাই ভাবছি সমস্যা নাকি আসলেই তা সমস্যা তা অবশ্য আমি জানি না। আমি আমার বরকে জিজ্ঞেস করতে পারি। নিহা ঝাঝিয়ে উঠলো, চুপ, দৌড় তো তোর ওই মসজিদ পর্যন্তই। কিছু হলেই বরের ধারে ছুটে যাওয়া। নন্দিনী বললো, এখন জমানা বদলে গেছে। দৌড় এখন ওই আকাশ পর্যন্ত। নভেচারী কল্পনা চাওলা ওই আকাশে গিয়ে মারা গেছেন।
চন্দনা ভাবী এবার মুখ খুললেন, বললেন, জীবনে উন্নতি করতে গেলে অনেক কিছুই করতে হয়। সবকিছু নিয়ে তো আর বিচার করতে বসলে হয় না। যেভাবে যেটা সুবিধা সেভাবে সেটাই করতে হবে। এটাও এক ধরনের প্রাইচ ম্যাচ। পেশাব খেতে যদি পারে তাহলে এটা এমন কি? নামই তো বদল।
নিহা বিরক্ত হয়ে বললো, আপনি কিসের সঙ্গে কি মেলাচ্ছেন। চন্দনা ভাবী ততোধিক মুরব্বিপনার মুখভঙ্গি করে বললো, ডাইনোসরের গোষ্ঠি ধ্বংস হয়ে গেছে। রাজত্ব করে যাচ্ছে তেলাপোকা। সারভাইভাল ফর দি ফিটেস্ট।
নিহা অবাক হয়ে শুধু বললো, হো-য়া-ট?
চন্দনা ভাবী বললেন, হোয়াট আবার কি? দিস ইজ রিয়ালিটি। নিহা রণে ভঙ্গ দিল। তবে নন্দিনীর দিকে চেয়ে চন্দনা ভাবীকে শুনিয়ে বললো, শোন তুই তো এদেশে থাকবি। আমাকে ই-মেল করে জানাবি এসব নতুন প্রজাতি কতোদূর যেতে পারলো।
নন্দিনীও সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা কাজ পেয়েছে এভাবে বললো, সিওর, হোয়াট নট। জো হুকুম।
ভাগ্যিস তখনই হুলুস্থূল করতে করতে ঢুকলো একদল এমেচার বাজনা বাদকের দল। তাদের হৈচৈতে থেমে গেল মহিলা মহলের বাক-বিতণ্ডা। হারমোনিয়াম, তবলা, কি বোর্ড, গিটার আরোও কতো কিছু নিয়ে হাজির হয়েছে তারা দোতলার এই লিভিং রুমটাতে। এতোক্ষণ নিচতলাতে নেচে-গেয়ে মাতিয়ে এসেছে। ঝটপট তিন মিনিটের মাথাকেই গাইতে শুরু করলো একজন, শাহরুখ খানের মতোন পাঞ্জাবি, চুড়িদার, গলায় শাল বা ওড়না জড়ানো। কি সুরেলা গলা, নিহা সত্যিই মুগ্ধ হতে লাগলো। কতো সহজে গেয়ে যাচ্ছে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি গান। গানে গানে অনেকে নাচছেও। প্রচুর সাদা আমেরিকানও আছে। ছেলে পক্ষ শাদা, যদিও মেয়ে পক্ষ বাদামি। দু’তিনজন আমেরিকান যুবক নাচছে এমনভাবে যেন খুবই ভালো তারা হিন্দি-বাংলা বুঝতে পারছে।
গানের মাঝে বিরতি পরা মাত্রই ‘ইমরান, ইমরান’ বলে নন্দিনী হাত উঠিয়ে স্টেজের দিকের কারো মনোযোগ পেতে চাইলো। নন্দিনীর হাতে আবার মেয়ের মা একটা পানের ট্রে ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। নন্দিনী এখন পান বিলানোর দায়িত্ব পেয়েছে। আপাতত টার্গেট ইমরান। শাহরুখ খানের নাম কি তাহলে ইমরান। কই ওই ছেলে তো ফিরেও তাকাচ্ছে না। নিহা দেখলো এদিকে আসছে এক আমেরিকান ছেলে। ও আল্লাহ এতো জেফ। নাম বদলেছে। মুসলমান হয়ে নাম নিয়েছে ইমরান, সামারাকে বিয়ে করার জন্য এতোকিছু করতে হয়েছে তাকে। এখন পানও খাও। নন্দিনীর থামাথামি নেই। পরক্ষণেই হাত ওয়েভ করে ডাকলোÑ রিচার্ড রিচার্ড, এবার নিহাকে অবাক করে মহান শাহরুখ খান এগিয়ে আসছেন। এই সেই জন !! এত সুন্দর গান করে একজন মানুষের এ কেমন মতি ভ্রম।
নিহা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। জানালা দিয়ে বাইরে ঝর ঝরিয়ে তুষার পড়া দেখতে লাগলো। কতো শুভ্র সুন্দর এই প্রকৃতি।
তবে নন্দিনীর সাহস খুবই বেড়েছে, সন্দেহ নেই এ ব্যাপারে নিহার। কারণ রিচার্ড সহকারে ঠিক তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। খুবই ইচ্ছে করছে জোরে একটা চিমটি কাটতে নন্দিনীকে। অথবা হিলটা দিয়ে ওর পায়ে জোরে একটা কিল মারতে, যাকে বলে ‘গুতা মারা’। কিছুই করা গেল না। তবে কতোক্ষণ ভদ্র থাকবে বুঝতে পারছে না। চেয়ে চেয়ে নন্দিনীর ঢং দেখছে।
নন্দিনী বলছে, এ হচ্ছে আমাদের রিচার্ড। দেশি নাম মোহাম্মদ আকলাম।
নিহা যেন শুনতে পায়নি, বললো, কি নাম? আকামা? নন্দিনী খুবই স্পষ্ট করে আবারও বললো, আকলাম। নিহা আবারও বললো, আকামা? আকামা মানে তো অপদার্থ, তাই না?
নন্দিনী চোখ বড় বড় করে বললো, কানে বাতাস যায় না।
নিহা খুবই স্বাভাবিকভাবে বললো, বাতাস ভয়ে থেমে গেছে, পরগাছা যদি ভেঙে পড়ে যায়।
রিচার্ড অবাক হয়ে বললো, হয়ার ইজ দি ট্রিহ্! কোন গাছ ভাংছে! কিভাবে? কোথায়? এবং ভয়ার্ত চোখে এদিক ওদিক তাকালো।
নন্দিনীর দিকে চেয়ে নিহা ফিক করে হেসে দিল, মনে মনে বললো, ছাগল আর কাকে বলে, এ রকম বুদ্ধিতে রিচার্ড হওয়াই সহজ। সে-ই যে পরগাছা তাও বুঝতে পারছে না।

2,002 total views, 0 views today

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৮৪৭ বার

Share Button

Calendar

February 2018
S M T W T F S
« Jan    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728