» ঢাকায় ও ডালাসে

প্রকাশিত: ০৬. জানুয়ারি. ২০১৮ | শনিবার

 

দিলরুবা আহমেদ

দেশে দেশে বহু দেশে ঘোরায় ,বহু ভাবে বহুজনকে বিবিধ লেবাসে দেখাও হলো যেন এই সুবাদে। প্রচুর পরিমানে একই ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন দেশে তবে দেশ ভেদে ভিন্ন মাত্রায় যেন ঘটছে ঘটনাগুলো। কিছু চাইবার আর দেওয়ার রীতিও তাই যেন বিবিধ।
মানত করে ফকিরকে পয়সা দেয়ার রেওয়াজ আছে আমাদের দেশে। রেওয়াজটার চর্চা বাড়তে বাড়তে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। প্রায়ই বিপদে-আপদে মনে হয়, ইশ দুটো পয়সা যদি ফকিরকে দেয়া যেতো! এটা এক ধরনের শর্টকাট পথে বিপদ মুক্তির প্রার্থনা। জ্বর হলো, গহনা হারালো, রাস্তায় পিছলে পড়ে পা ভাঙলো, তো দুটো পয়সা ফকিরকে দিতে ইচ্ছা জাগে মনে।
কিন্তু আমি এখন যেখানে থাকি, টেক্সাসের ডালাসে , সেখানে চিরচেনা আদলে ফকির পাবো কোথায়!
মাগো দুটো পয়সা দেন বলে কেউ দরজায় ধাক্কা দেয় না যখন-তখন। মাঝে মধ্যে অচেনা কেউ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের কাগজ বা কুপন দরজার ক্লিপে ঝুলিয়ে দিয়ে যায় । সেটাই প্রাইভেসিতে উৎপাত মনে হয়। আমার অজান্তে আমার দরজা পর্যন্ত চলে আসা, ব্যাপারটা এখন আর গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।
লেটার বক্স পর্যন্ত যা খুশি রেখে যেতে পারো, কিন্তু দরজা পর্যন্ত চলে আসাটা পছন্দনীয় নয়। অথচ ঢাকায় থাকতে এক সময় সকাল-বিকাল দরজায় ধাক্কা পড়তো, মাগো কয়টা পয়সা দেন, তিনদিন না খাইয়া আছি, বলে বসেও থাকতো , কেও কেও। কিন্তু গতবার যখন দেশে গেলাম এবং ভাবলাম কিছু ফকির খাওয়ানো উচিত তখন দেখা গেল ফকিরের প্রাদুর্ভাব।
আমার বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি দুটোই ধানমন্ডি লেকের এপার-ওপার। লেকের মাঝ দিয়ে যে পারাপারের সেতুটা আছে ওটা দিয়ে বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি করি, অবরোধ হরতাল কিছুই আমাকে আটকে রাখতে পারে না। তবে অসুবিধাটা হলো যে, বৃহত্তম ঢাকার ওপর দিয়ে নিত্যদিন আমাকে চলাচল করতে হয় না, তাই আমি ধরেই নিয়েছিলাম এখনো প্রচুর ফকির অবশিষ্ট আছে সর্বত্র। কিন্তু যখন দাওয়াত দিতে গেলাম তখনই বুঝলাম ব্যাপারটা ঠিক নয়। ফকির খুজে পাওয়াটা বেশ ঝামেলার ব্যাপার হয়ে দাড়ালো। হয়তো বা তারা আমার চলাচলের সীমানার বাইরে অবস্থান করছে। যত্রতত্র তাদের দেখতে পেলাম না। তারা হয়তোবা কোথাও দলবদ্ধ অবস্থায় আছে, কবরস্থানে, মসজিদে বা অন্য কোথাও।
অবশেষে আমি একজন ভিক্ষুকের দেখা পেলাম ধানমন্ডি মসজিদের পাশে। অধীর আগ্রহে তাকে দাওয়াত দিলাম এবং দায়িত্বও। অতোজন ভিক্ষুক নিয়ে অমুক দিন আমার বাসায় আসবেন। প্রথমেই জানতে চাইলো, কুকুর আছে কি না? বসার ব্যবস্থা কোথায় হবে? খাওয়া শেষে পান সুপারি থাকবে কি না, আসা-যাওয়ার জন্য বখশিশ দেয়া হবে কি না ,ইত্যাদি।
আমি প্রশ্নগুলো শুনে যারপরনাই গোছের অবাক হলাম তবে এক ধরনের

প্রফেশনালিজমের গন্ধ পেলাম।
আমার ড্রাইভারও দাড়িয়ে শুনছিল, পরে বললো, শখ করে কি কেউ আর

ভিক্ষা করে, এটা একটা পেশা, ব্যবসা।

আমার আম্মাকেও বললাম। আম্মা আমার কথাকে নাদান মার্কা কথা ধরে নিয়ে মনোযোগ না দিয়ে সোজা দরকারী ও জরুরী কথায় গেলেন। বললেন , ওদের তো টাইম বেধে দেয়ার কথা, দেয়নি? র্
আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, সময় তো আমার দেয়ার কথা, ওরা দেবে কেন?
আম্মা বললেন, এখন ওরাই দেয়। কারণ ওদের অনেক দাওয়াত থাকে একইদিনে। কোনটার পর কোনটা সেভাবে সাজিয়ে ঠিক টাইম দেয়।
বুঝলাম, এ জন্য ফোন নাম্বার নিয়েছে। আমি বাসার নাম্বার দিতে ইতস্তত করছিলাম দেখে আমাদের ড্রাইভার তার মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়েছে। আমি তো ড্রাইভারেরই মোবাইল ফোন দেখে অবাক হচ্ছিলাম। সে আমাকে আরো অবাক করে বললো, হানিফ্যারই তো মোবাইল আছে।
হানিফ আমাদের কাজের ছেলে। তাকে অবশ্য কাজের ছেলে বলাটা ঠিক হচ্ছে না, চাকর শব্দটা তো গুলি মেরে উড়িয়ে দেয়া উচিত, হয়েছেও তাই। এখন বলতে হবে, বেল বয়। আমি ঢাকায় নামামাত্রই সে আমার হাতে একটা ‘বেল’ (ঘণ্টি) ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, এটা বাজালেই আমি এসে দাড়াবো। রুমে রুমে তাকে ধরার জন্য সুইচের ব্যবস্থা হয়েছে। টিপ দেয়া মাত্রই সে এসে হাজির হবে। মনে হলো আমিই ফকির। কোনো ব্যাপারে কোনো জ্ঞান নেই। জ্ঞানহারা আসল ফকির।
পরদিন ফোনে খবর দিল কবে কতোজন আসবে। সন্তাহখানেক পরের একটা দিন দিল। তার আগে সব বুকড। ২টা থেকে ৩টার মধ্যে আয়োজন শেষ করতে হবে। আমার এখান থেকে অন্য জাযগায় যেতে হবে খেতে। এক পেটে এতো খাবে কি করে? আম্মা বললেন, না খেলে নিয়ে যাবে। ভালোই সমাধান। অ্যানারেক্সিয়া আজকাল আমেরিকার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। ইটিং ডিস অর্ডার। না খেতে খেতে না খাওয়াতেই অভ্যাস গজিয়ে যায়। তিনজন আমেরিকান মডেল সম্প্রতি শুকাতে শুকাতে শেষে মিশে গেছে, মানে মারা গেছে। আক্ষরিক অর্থেই অনাহারে মারা গেছে। ব্যাপারটা দুঃখজনক এবং ভালোই তোলপাড় তুলেছে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রীতে। টিভিতে এক মডেলকে দেখালো তার উচ্চতা পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চি, ওজন মাত্র ৮৮ পাউন্ড। উপস্থাপকের ভাবখানা-এরও মৃত্যু সন্নিকটে। যদিও সে মেয়ে জোরালো কণ্ঠে নিজেকে অত্যন্ত স্বাস্থ্যবতী দাবি করে গেল। প্যারিসের ফ্যাশন শোগুলোতে এখন নাকি মডেলদের সর্বনিম্ন ওজন বেধে দেয়া হচ্ছে।
যা হোক, সে রকম হাড় জিরজিরে কোনো ফকির অবশ্য দেখা গেল না দাওয়াতিদের মধ্যে তবে ঠিক ২টা বাজতেই মেহমানরা হাজির। অসাধারণ সময়জ্ঞান।
আমাদের রাধুনী ফরমায়েস অনুযায়ী রেধেছে। সে খুবই মন দিয়ে রেধেছে। বলেছে বারে বারে, রান্না ভালো না হলে তারা খাবে না। অনুষ্ঠান বর্জন-বয়কট হতে পারে। আরেক দিন তাহলে আয়োজন করতে হবে।
রাধুনী তার নিজের পক্ষ থেকেও একটা আইটেম তৈরি করেছে। সে দীর্ঘদিন

এ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারও এক ধরনের আধিপত্য তৈরি হয়ে গেছে। আমরা পরবাসীরা দেশে হাজিরা দিলেই সেও গ্রাম ছেড়ে ওই ক’টা দিনের জন্য

আমাদের সেবায় ওখানে হাজির থাকেন। রিকু আমাকে বললো, চার আনা
সওয়াব সেও চায়, তাই একটা তরকারি তার। আমার সওয়াবে ভাগ বসালো। আমি নিমরাজি। কাকে বলবো, শাশুড়ি ননাসরা কেউ পাশে নেই। শাশুড়ি পৃথিবী ছেড়েছেন। ননাসরা দেশের বাইরে থাকেন।
বাসায় আছেন শ্বশুর। ওনাকে বললে তো অবাক হয়ে বলবেন, আরে গ্রামের এ মহিলা রিকু বেগম তো অসাধারণ লেডি! কি পিতামাতা ভক্ত। তাদের জন্য ফকির খাওয়াচ্ছে। দেখা যাবে উনি চার আনার জায়গায় আট আনা সাওয়াবই

ওই মেয়েকে দিয়ে দিতে বলবেন।
আমার মা শুনেই বললেন, আগেই বলেছিলাম আমার বাসায় ফকির খাওয়ানোর ব্যবস্থা করো। যাই হোক, আম্মা বললেন,এখন ওদের পান-সুপারি আর পারহেড বখশিশ দিতে যেন না ভুলি। তা হলে ভবিষ্যতে ওরা আর আমাদের দাওয়াত নেবে না। ওদের মাঝে প্রচার যদি হয়, এ বাড়ির লোকজন সুবিধার নয়, তবে আমাদেরই অসুবিধা, পুণ্য কামাইয়ের পথ বন্ধ।
আমাদের ড্রাইভার এসে বললো, ৪টার সময় যে দাওয়াতে ওরা যাবে ওখানে চা খাবে, তাই এখানে কোক দিলে কেমন হয়? ওরা জানে আপনি বিদেশ থেকে এসেছেন।
আমি খুবই গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে গেলাম। রসিকতা করছে নাকি এরা সবাই আমার সঙ্গে।
আবার এসে বললো, ভাবী তিনজন প্লেট আনেনি। আমরা পেপার প্লেট দেবো ভেবেছিল। ওরা জেনেছে আপনি বিদেশে থাকেন তো তাই ভেবেছে ঐ রকম।
আমাদের রাধুনী রিফু বলে দিয়েছে, তার প্লেট সে দেবে না। হানিফও না। ড্রাইভার তো নাই-ই। এখন ডিনার সেটের প্লেট বের করবে কি না জানতে চাইছে।
আরেকটা সমস্যা ফকিরদের প্লেট এরা কেউ ধোবেও না। ওদেরই ধুয়ে দিয়ে যেতে হবে। ভাগ্যিস আমার কাছে কিছু পেপার প্লেট ছিল। দিয়ে বাচলাম।
অবশেষে এক পর্যায়ে খাওয়ার পর্ব শেষ হলো। হাত তুলে মোনাজাত করা হলো। রিকুও তার বাবা-মায়ের নাম দিল ওদের, দোয়া করার জন্য, যেহেতু একটা আইটেম তার। মনে মনে খুবই মিস করলাম আমার শাশুড়িকে। উনি থাকলে এক ধাতানি দিয়ে আমার চার আনা সওয়াব নেয়া বন্ধ করতেন।
আমার জা (ভাসুরের বউ) এলেন ওনার বাসা থেকে অনুষ্ঠানের একদম শেষ পর্যায়ে। উনি শুনে হাসলেন শুধু। বললেন না কিছু। উনি আমার থেকেও বেশি বেচারা।
আমার কন্যাটি শুধু বিপুল উৎসাহে ওপর-নিচে দৌড়াদৌড়ি করে সব দেখলো। সে বড় হচ্ছে ইউএসএতে। অতএব আমাদের সব আয়োজনই নতুন তার কাছে। সবশেষে বললো, ডোন্ট ইউ থিঙ্ক মাম, ওদের ফ্লোরে বসে খাওয়ানোটা টু ইনডিসেন্ট। এর টোবা টোবা গাল দুটো গেলে দিলে কেমন হয়। টু ইনডিসেন্ট ফলাচ্ছে। আমার স্বামী সবাই চলে যেতে বললো, ওরা

তোমাকে ওদের সঙ্গে বসে খেতে ডাকেনি? আমি তো ভাবলাম সে দাবিও আসবে। ও হাসতে লাগলো।
আমার খুবই কান্না পেতে লাগলো। আমি যতোটা আগ্রহ আর হৃদয় দিয়ে ঘটনার আয়োজন করেছি মনে হলো ব্যাপারটা সে রকম হলো না। অনেকটা

দায়সারা গোছেরই হলো যেন ভিক্ষুকদের পক্ষ থেকে। যেন আমাকে উদ্ধার করে গেলেন তারা।
আমার শ্বশুর বললেন, ভবিষ্যতে এতিমখানায় খাবার পাঠিয়ে দিও। বাসায় ডেকো না। শ্রেণী বৈষম্যটা খুব বেশি চোখে পড়ে এভাবে ডাকাডাকিতে। আমি বললাম, তাই করবো।
এখানে টেক্সাসে ডাকাডাকির কোনো স্কোপ নেই। কাউকে ভিক্ষুক ভেবে ডেকে দরজার বাইরে মাটিতে বসিয়ে খেতে দেবো এমনটা সম্ভব নয়। তবে ভদ্রগোছের একটা শব্দ আছে হোমলেস। মাঝে মধ্যে রাস্তার আশপাশে সাইনবোর্ড হাতে এদের দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সাইনবোর্ডে লেখা থাকেহোমলেস, সাহায্য দরকার। আমার অফিসে যাওয়ার পথে একটা ব্রীজের নিচে জটলা বেধে থাকতে দেখি ওরকম ক’জনকে। দেখলেই দূর থেকে আমি জানালাটা তুলে দিই। উষ্কখুষ্ক চুল। ময়লা জামা-কাপড়ে ওরা প্রায়ই আমার নিষ্ঠুরতা দেখে। কিছু বলে না। ট্রাফিক সিগনালে দাড়ালেও কাছে আসে না।
এ দেশে হোমলেস কুকুর-বিড়ালেরও শেলটারখানা আছে। আর ওরা তো মানুষ। এদের জন্য সরকারি দায়িত্ব আরো বেশি। প্রায় টিভিতে অনুরোধ করা হয়, শেলটারে এদের ফিরে যেতে। ঝড়, বৃষ্টি, তুফানে কষ্ট না পেতে। বাস পাঠিয়ে এদের খুজে খুজে আনার পায়তারাও দেখা যায়। শেলটারে সব ফ্রি। শর্ত শুধু নিজের বিছানা নিজে করতে হবে। নিজের প্লেট নিজে ধুতে হবে এবং পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করা চলবে না। তারপরও দেখা যায় অনেকেই পথে ঘুরছে।
ইদানীং কেন এরা পথকেই পছন্দ করছে, প্রেফার করে তা নিয়ে সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা চলছে। এদের পথপ্রীতি আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। এতে জিন তথা জেনেটিক প্রভাব কতোটুকু তাও ব্যাখ্যার চেষ্টা চলছে।
অনেক ড্রাগ আসক্তও ভিক্ষুক স্টাইলে এসে বলে, গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেছে। পথে আটকা পড়েছে। তেলের জন্য পয়সা দিতে পারা যাবে কি না। ওই কাজটা করে অবশ্য পথঘাটে। বাসায় এসে হানা দেয় না। খুবই কমন ব্যাপারটা। ওরা একই রকমভাবে বারে বারে প্রায় সব সময়ই একই জায়গাতেই টাকা খুজতে আসে একই কারণ দেখিয়ে। নতুন কোনো কারণ কেন খুজে বের করে না বলার জন্য এটা নিয়েও নিশ্চয়ই কেউ না কেউ সহসা মনোবিজ্ঞানের গবেষণার খাতা খুলে বসবে।
একবার মলের ফুড কোর্টে খাচ্ছি আমি আর আমার মেয়ে। খুব ভদ্রগোছের এক লোক নীরবে টেবিলে টেবিলে সুন্দর পুথিতে চারধার বাধা একটা করে লিফলেট রেখে গেল। পড়ে দেখলাম সে বোবা। পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্য আর্থিক সাহায্য চায়। খেতে বসেছি যখন, তখন আরেকজন খাদ্যের জন্যই পয়সার আবদার ধরেছে। ভালোই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় এতে পাওয়া যাচ্ছে।
অনেকেই দেবে ভেবেছিলাম। দেখলাম, না, দুনিয়াটা অনেক কঠিন। দু’মিনিটের মাথায় নীরব কবি নিজেই কাগজগুলো তুলে নিয়ে অন্যদিকের

টেবিলের দিকে চলে গেল। কোনো রকম দ্বিতীয় প্রচেষ্টা বা তরিকা দেখা গেল না মন গলানোর জন্য। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ফকির বোধহয় একেই বলে।
গাড়ির ওয়াইপারের ভেতরও একদিন দেখলাম কে যেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিয়ে সাহায্য চেয়ে লিফলেট গুঁজে দিয়ে গেছে। আমার ঢাকাবাসী এক আত্মীয়া তাই শুনে বললেন, বাপরে আমেরিকান ফকিরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টও থাকে! সম্প্রতি এক মহিলা আবার ছেলেতে ফিরে যেতে চাচ্ছে অপারেশনের মাধ্যমে, যেটা করে সে প্রথমবার মেয়ে হয়েছিল, ছেলে জীবন পরিত্যাগ করে।

সে ইন্টারনেটে আর্থিক সাহায্য চেয়েছে। কে যেন তাকে পুরো টাকাটাই দান
করেছে যাতে সে আবার ছেলে হয়ে যেতে পারে। হয়েছেও। তারপর টিভিতে এসে কতোক্ষণ ছেলেমেয়ে উভয় সেক্সেই নিজের নিরন্তন অসন্তোষের বয়ান গাইলো। উভয় অবস্থায় দোটানায় দোদুল্যমান ফকির।
অতএব দান-খয়রাত চলছে বিভিন্ন ফর্মে, পরিপ্রেক্ষিতে। মান্ধাতার আমলের আমার চির চেনা ভিক্ষুক টেক্সাসে নেই বলে যে দান বন্ধ তা কিন্তু নয়।
স্যালভেশন আর্মির দান বক্সগুলো দেখলেই বোঝা যায় কি পরিমাণ বাক্স বোঝাই করা দানবীর রয়েছে ইউএসএ জুড়ে।
ফিরছিলাম সে ব্রিজের নিচে দিয়ে। বেখেয়ালে জানালা খোলা। এক হোমলেস দ্রুত এগিয়ে এলো কাছে। কি কুক্ষণে যে জানালা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। একটা চিৎকার তাকে এতো কাছে দেখা মাত্রই উঠে আসছিল। সে এসে বললো, তোমার সেল ফোনটা দাও তো, একটা জরুরি কল করবো।
কি আবদার!
আমি দ্রুত মিথ্যা বললাম, নেই। একে সেল ফোন দেবো! পাগল আমি? এবার বলে, তোমার গাড়ির ভেতর তো দেখছি ব্লু টুথ আছে। নাম্বার দিচ্ছি লাইন দাও।
এ যেন মামার বাড়ি তার। মামাতো বোনের দেখা পেয়েছে অনেককাল পর।
গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের ওপরই ব্লু টুথের সুইচ। সে নিজেই এবার হাত ঢোকালো গাড়িতে যখন, ব্লু টুথ অন করতে আর চিৎকারটা ধরে রাখা গেল না।
আর তখনই সবুজ বাতি। এক্সেলেটরে চাপ। ছুটে বেরিয়ে গেলাম। আর ওদিকে মিস্টার হোমলেস আমার চিৎকার শুনে নিজেও চিৎকার করতে লাগলো আর বলতে লাগলোÑ ‘কল ৯১১’। সম্ভবত অবচেতনভাবেই পাগলাটার মুখ থেকে পুলিশ ডাকার কথা ফসকে বের হয়ে এসেছিল। হয়তোবা ভটকে গিয়েছিল আমার চিৎকারে। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা বুঝি একেই বলে।
আর ব্লু টুথের কমপিউটাও কম না, সঙ্গে সঙ্গে ৯১১ শব্দটা ক্যাচ করে সংযোগ দিয়ে দিল যেহেতু সে সুইচ অন করেই দিয়েছিল। নার্ভাস আমি পুলিশকে যতোই বলি আমি ঠিক আছি, ওরা হয় বুঝলো না বা বিশ্বাস করলো না। সাইরেনসহ ছুটে এসে চারদিক থেকে আমাকে পথেই আটকালো। গাড়ির নেভিগেশন সিস্টেম বা সেল ফোনের কারণে এরা সহজেই আমাকে লোকেট করতে পেরেছিল। পুলিশকে আদ্যোপান্ত ঘটনাটাও জানাতে হলো।
এরপর আরো বহুদিন ওই রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করেছি কিন্তু ওদের ওই

দলটাকে আর দেখিনি। দিন যায়। কি হলো ওদের জানি না। ওরাই সরে গেছে না পুলিশ ওদের ভাগিয়েছে তাও জানতে পারি-নি। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠে ওদের খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাই ওই পথে আসতে-যেতে। আমার পিচ্ছিটাও বিপুল উৎসাহে পথে আসা-যাওয়ায় ওদের খোজে। তার মায়ের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়েছে যারা তাদের যেন তার হাত থেকেও নিস্তার নেই।
হঠাৎ অনেকদিন পর অন্য জায়গায় আরেকটা ব্রীজের নিচে ওই ধরনের কিছু লোক দেখেই আমার বাচ্চাটা চেচিয়ে বলতে লাগলো, আই হ্যাভ হোয়াইট টুথ, নেয় নেনা নেয়। প্রথম প্রথম স্কুল যাওয়ার নতিজা।
সে পেছনে কার সিটে বসা। এখানে মাইনরদের ড্রাইভিং সিটের পাশে বসানোর নিয়ম নেই। আমি যতোই বলি চুপ চুপ সে ততোই চেচায়Ñ নেয় নেনা

নে, আই হ্যাভ হোয়াইট টুথ। নিজের দাতগুলোও দেখাচ্ছে। ওই পক্ষও কম

নয়। তারাও দাত দেখাচ্ছে। প্রতিযোগিতা যেন। হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো, ইউর মাম হ্যাভ ব্লু টুথ। চমকে চেয়ে দেখি, আই রে রে, আমার সেই ঐতিহাসিক বিখ্যাত প্রখ্যাত ফুপাতো ভাই-ই। হাসছে। আমাকে বললো, হাই।

মাথা খারাপ, তাকে বললো হাই। কিন্তু বাতি সবুজ হচ্ছে না। লালে ভাগতে পারছি না। ফিরে চাইলাম। তার হাতে ধরা সাইন বোর্ডটার দিকে চোখ পড়লো। হোমলেস। গৃহহীন। ছিল পথ, তা থেকেও একদিন বিতাড়িত করেছি। হঠাৎ মমতাবশে জিজ্ঞেস করে বসলাম,হাউ আর ইউ ?
সাথে সাথে সেই পাগল চিৎকার করে তিনটা ডিগবাজী খেয়ে দূরে চলে গেল। মাগো কি ভয়ংকর এক উলুর ধ্বনি দিল। বুঝলাম আমাদের এশীয় মমতায় ওরা অভ্যস্ত নয়। অথবা ওদের আমেরিকান কায়দায় সুখ বা বিস্ময়ের প্রকাশ বুঝতে আমি অক্ষম। যে মমতার দার কিছুটা খুলে ছিল ভয়ে আপনা থেকেই দ্রুত তা বন্ধ হয়ে গেল আমারও এক প্রচণ্ড চিৎকারের মধ্যে দিয়ে। আমিও যে আপন মনে চেচিয়ে উঠেছিলাম বুঝতে পারিনি প্রথমে, পরমুহূর্তেই বাতিটা সবুজ হতেই আমিও ভেগে  বাঁচলাম ।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৭২৯ বার

Share Button