» চেরি ফুলের সৌরভে

প্রকাশিত: ০১. ফেব্রুয়ারি. ২০১৮ | বৃহস্পতিবার

আনোয়ার চৌধুরী 
শৈশবে পাঠশালাতে পড়ার সময় আমরা বেশ কয়েকটি বিষয় মুখস্থ করেছিলাম যা এখনো বেশ মনে পড়ে। যেমন পৃথিবীর ৭টি আশ্চর্য জিনিসের নাম। সূর্যোদয়ের দেশ কোনটি ? নিশিথ সূর্যের দেশ কোনটি? সূর্য কোন দেশে প্রথম উদয় হয়? ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আমার বাবাই শিখিয়েছিলেন। সূর্যোদয়ের দেশ জাপান, নিশিথ সূর্যের দেশ নরওয়ে। একবার শেখার পর আর কখনো ভুলিনি। কিন্তু শিখলে কি হবে সূর্যোদয়ের দেশটিতো দেখার কোন সুযোগ হয়নি দীর্ঘদিন। ঐ দেশটি দেখার এক ধরনের সুপ্ত আকাক্সক্ষা তখন থেকেই মনে জাগে। আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয় চতুর্থ কি পঞ্চম শ্রেনীর একটি বইয়ে ‘ভিন দেশের ছেলেমেয়েরা’ নামে একটি পাঠ পড়ার পর। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা কেমন, ছেলেবেলায় তারা কি করে, কি পড়ে, কেমন পোষাক গায়ে দেয়,কিরুপ খেলাধুলা করে ইত্যাদি নানা বিষয়ের সরস বর্ননা ছিলো। জাপানী শিশুদের কথাও ছিলো। সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো জাপানী শিশুদের বর্ননা। তারপর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা ফেলে বিপুল সংখ্যক মানুষকে হত্যা করার রোমহর্ষক কাহিনী পড়েছি উপরে ক্লাশে। অত:পর আমার জন্মস্থানের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খোয়াই-সোনাই নদী দিয়ে অনেক জল গরিয়েছে। সেকথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাপানের অর্থনীতি, জাপানের বিস্ময়কর উন্নতির কথা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভুমিকা, নেতাজী সুভাষ বসুর জাপানে যাওয়া ও আযাদ হিন্দ ফৌজ গঠন, জাপানের সংস্কৃতি , জাপানে মার্কিন সামরিক ঘাটি স্থাপন ইত্যাদি নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু সেভাবে আর আগ্রহ থাকেনি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রনালয়ে চাকুরী করার সুবাদে হঠাৎ করেই জাপান ভ্রমণ করার সুযোগ ঘটে।
সময়টা ২০১৬ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। জাইকার (ঔধঢ়ধহ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়-ড়ঢ়বৎধঃরড়হ অমবহপু-ঔওঈঅ) কারিগরী ও আর্থিক সহায়তায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২য় কাঁচপুর,২য় মেঘনা ও ২য় গোমতি সেতু(সংক্ষেপে ‘কেএমজি’) নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বৈদেশিক সফরটি সম্পন্ন হয়। ১১ সদস্য বিশিষ্ট দলের টীম লিডার ছিলেন আমাদের মন্ত্রনালয়ের যুগ্মসচিব জনাব আবদুল হামিদ। অন্যান্য যারা ছিলেন তারা হলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জনাব আবদুস সালাম,উপ-প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন পাটোয়ারী,নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল মোল্লা, শাহাদাৎ হোসেন,আবদুল আলীম, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাহরিয়ার রহমান, ফরিদ উদ্দিন ও উপসহকারী প্রকৌশলী সীমা হালদার প্রমুখ । গাইড হিসেবে ছিলেন ঙৎরবহঃধষ ঈড়হংঁষঃধহঃং এষড়নধষ (ঙঈএ)র মি. শানজি ইউশিহারা(ঝযধহলর টংযরযধৎধ)। সিঙ্গাপুর এয়ার লাইনসের জাম্বো বিমানটি খুব ভোরে চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেয় বিশাল দলটিকে। দীর্ঘ ৮ ঘন্টার ট্র্যাঞ্জিট কাটিয়ে এসকিউ জেট উড়াল দেয় জাপানের ওসাকা শহরের দিকে। রাত দশটার দিকে কানসাই এয়ারপোর্টে নেমে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচি। এক রাশ ক্লান্তি নিয়ে ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইনে দাঁড়াই। বেশ সময় লাগে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা সারতে। বের হয়ে দেখি একটি সুসজ্জিত লিমুজিন নিয়ে চালক অপেক্ষা করছে। ওসিজি’র ব্যবস্থাপনায় প্রায় ঘন্টাখানিক জার্নি বাই বাস শেষে ঐড়ঃবষ হবি ঐধহশুঁ তে পৌছাই। লবীতে মাথা নুইয়ে সহাস্যে স্বাগত জানায় মিস আই কিমুরা (গং. ওশরসঁৎধ)নামে এক সুদর্শনা তরুণী। তিনিও ওসিজি’র অফিসিয়েল, এডমিন অফিসার। জানালেন থাকবেন আমাদের সাথে বাকী দিনগুলোতে। অত্যাধুনিক সুযোগসুবিধা সম্বলিত তারকা চিহ্নিত হোটেল হলেও রুমের আয়তন দেখে পিত্তি জ্বলে উঠে। আমাদের চেহারা দেখে অভিজ্ঞরা মিটি মিটি হাসে। আলাপচারিতায় জানা গেল জাপানে অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ ছোটই হয়। পরে অবশ্য এর ব্যতিক্রমও দেখেছি। এদিকে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। কিন্তু এত রাতে কোথায় খাবার পাওয়া যাবে? অভিজ্ঞ ও করিৎকর্মা পাটোয়ারী সাহেব থাকতে চিন্তা কি? আমরা কেবল তাকে অনুসরণ করি। হোটেল থেকে অল্প দূরে একটি ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরে ঢোকলাম । পাটোয়ারী সাহেব জাপানী ভাষা জানেন। দোকানীর সাথে বাতচিত তিনিই সারলেন। এটা ওটা দেখে কোন খাবারই পছন্দ হয়না। যদিওবা পছন্দ হলো বাঁধ সাধলেন শাহাদাৎ সাহেব ও স্বয়ং পাটোয়ারী সাহেবই । কারন একটাই, খাবারটি হালাল কিনা কিংবা খাবারের মধ্যে দোবুৎসু আবুরা(উড়ঁনঁঃংঁ ধনঁৎধ) দোবুৎসু ইউশি (উড়ঁনঁঃংঁ ুঁংযর) বুটা নিকু(ইঁঃধ হরশঁ),আরুকোরু (অৎঁশড়ৎঁ) ইত্যাদি আছে কিনা।অর্থাৎ যে তেল বা চর্বি দিয়ে রান্না করা হয়েছে তা কি প্রানীজ না উদ্ভিজ কিংবা পর্কের চর্বি আছে কিনা? দোকানী বেচারা বুঝাতে বুঝাতে হয়রান। কিন্তু রণে ভঙ্গ দেয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। অবশেষে অনেকটা অধৈর্য হয়ে কিনলাম একজাতীয় পাতা দিয়ে মোড়ানো ছোট্ট এক পোটলা ভাত! সাথে এক প্যাকেট তরল দুধ। রুমে এসে পাতা খোলে ভাতগুলো বের করে মুখে দিলাম। আতপ চালের ঠান্ডা ভাতের দলা। সঙ্গে কাচকি মাছ জাতীয় ছোট মাছের ভাজি কিংবা ছোট মাছের শুটকী অল্প কয়েকটি। কোন প্রকারে গলাধঃকরণ করলাম। তবে দুধটুকু তৃপ্তির সাথে খেলাম। নির্ভেজাল দুধ। ভাতও ছিলো নির্ভেজাল। তবে স্বাদে গন্ধে ভরপুর নয়। খেয়ে দিলাম লম্বা ঘুম।
পরদিন খুব সকালে উঠতে হলো। ব্রেকফাস্টে গিয়ে দেখি নানা রকম জাপানী খাবারের সমারোহ । অনেক জাপানী খাবারই অপরিচিত। আবার বেশ কিছু ইন্টারন্যাশনাল মেন্যুও ছিলো। জাপানীরা শাক সব্জি বা মাছ খুব বেশী সিদ্ধ করেনা। বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছের ফ্রাই দেখলাম। মসলা ছাড়া স্বল্প তেলে সিদ্ধ করা দামী সেমন(ঝবষসড়হ ) মাছও আছে তেমনি আছে টোনা ও অক্টোপাস জাতীয় নানা রকম মাছ। আছে আমাদের অতিপরিচিত শামুক ও কাকড়া জাতীয় জলজ প্রানীও। এক কোনায় একটি টেবিলে রাখা নানা রকম ভাত, দুধ,দই ও কলা পেয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাচঁলাম। অনেক সহকর্মীকে সেই টেবিলটি দেখিয়ে দিতেই সবাই যেন হুমরী খেয়ে পড়লো। হায়রে ভেতো বাঙ্গাল! তবে দুয়েকটি মাছ ছিলো খুব সুস্বাদু। বলা যায় তৃপ্তির সাথেই খেলাম ওটা।
ওসাকা জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। রাজধানী টোকিও এর পরেই এর অবস্থান। বসবাসের জন্য একটি উত্তম স্থান। এখানকার বিখ্যাত ওসাকা ক্যাশল একটি দর্শনীয় জায়গা। তাছাড়া ওসাকা মিউজিয়াম ও ওসাকা পার্ক দেখার মতো পর্যটন কেন্দ্র। আমরা দুইদিন ওসাকা শহরে ছিলাম বটে, কিন্তু শহরটা ঘুরে ফিরে দেখার তেমন সুযোগ পাইনি। একদিন চলে যাই হিরোশিমায়, অন্যদিন কুবে শহরে। ফলে যেটুকু দেখেছি তা কেবল আসা যাওয়ার সময় ও কিছুটা রাতের বেলা।
হিরোশিমা ঃইতিহাসের সাক্ষী এক নগরী
আমাদের যাত্রা শুরু হলো হিরোশিমা শহরের পানে। সবার মধ্যে একধরনের অনির্বচনীয় উত্তেজনা বিরাজ করছে! হিরোশিমা ও বিভীষিকা শব্দ দুটি যেন প্রায় সমার্থক। প্রথমেই হোটেল সংলগ্ন রেল ষ্টেশন থেকে মেট্রো রেলে করে গেলাম উমেদা রেল ষ্টেশনে। সেখান থেকে কিছুটা পথ হেটে গেলাম বুলেট ট্রেনের ষ্টেশন শিন-ওসাকা ষ্টেশনে। বুলেট ট্রেনে চড়ার সুযোগ হবে তা ঢাকা থাকতেই আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো। বুলেট ট্রেন মানে বিশেষ ধরনের দ্রুতগামী ট্রেন। বুলেট ট্রেন বলা যায় ডাক নাম । আসল নাম হলো ঔজ ঝধহুড় ঝযরহশধহংবহ যার তরজমা করলে দাঁড়ায় ‘নতুন ট্রাঙ্ক লাইন’। পুরানো লাইনের পাশাপাশি নতুন লাইন স্থাপন করে দ্রুত গতির ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা এটি। তবে সেটি উবফরপধঃবফ ষরহব । নির্ধারিত সময়ে সা করে ট্রেন এসে থামলো ষ্টেশনে । চেহারা সুরত ও চাল চলনে আধুনিকতা ও আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। ট্রেনের সামনের দিকটা দেখতে অনেকটা ডলফিনের মুখের মতো। চোয়ালটি বেশ দীর্ঘ। টিকেটের উচ্চ মূল্যে ট্রেনের মর্যাদা অনেকটা আঁচ করা যায়বটে। কেননা অন্য ট্রেনের তুলনায় খানিকটা নয়,অনেকটাই বেশী। ওসাকা থেকে হিরোশিমার ওয়ান ওয়ে ভাড়া ১০,৪৪০ ইয়েন। গাইড জানালো রিজার্ভেশন না হলে টিকেটের মূল্য শ পাচেক টাকা কম হতো। আমাদের জন্য সীট আগে থেকেই রিজার্ভ করে রেখেছিলো। গাইড টিকেট কেটে আনে। ঘড়ুড়সর ঝঁঢ়বৎ ঊীঢ়ৎবংং,গরুযড় বীঢ়ৎবংং,ঝধশঁৎধ ঊীঢ়ৎবংং. এই তিন ধরনের বুলেট ট্রেন চলাচল করে এই রুটে। তবে সবচেয়ে দ্রুত গতি সম্পন্ন হলো নজমি সুপার এক্সপ্রেস। আমরা নজমি সুপার এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ছিলাম। ট্রেন ষ্টেশনে থামার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খোলে যায় প্লাাটফরম ঘেঁষে। খুব সহজেই উঠে গেলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সিটে বসেই মন আনন্দে ভরে যায়। সুপরিসর আসন, বসতে খুব আরামদায়ক। সিটের সামনে বেশ খানিকটা খালি জায়গা। ফলে পা ছড়িয়ে বসা যায়। খুব মোলায়েম কন্ঠে ঘোষক বিভিন্ন গন্তব্যের নাম বলছিল। নামগুলিও বেশ সুন্দর। আবার প্রতিটি কামরার প্রবেশ পথের উপরে একটি করে মনিটর সেট করা আছে। ট্রেন ছাড়া মাত্রই ট্রেনটি যে যে ষ্টেশনে থামবে সেগুলোর নামধাম, ট্রেনের গতি ও ভ্রমণ বিষয়ক নানা তথ্য মনিটরে ভেসে উঠে। একই সাথে সুললিত কন্ঠে জানিয়ে দেয়া হয় একটু পর পর। ফলে যাত্রীদের উঠা-নামায় কোন অসুবিধা হয়না। টিম লীডার হামিদ স্যারের পরামর্শে আমি ষ্টেশনগুলির নাম লিখে রাখি একটি কাগজে। দুঃখের বিষয় পরে সে কাগজটি হারিয়ে ফেলি। তবে যতদূর মনে পড়ে শেষ গন্তব্যস্থল ছিলো হাকাটা। মাঝে অনেক ষ্টেশনের নাম দেখি কিন্তু দ্রুত গতির এ ট্রেনটি সব ষ্টেশনে থামেনা। যে ক’টি ষ্টেশনে থামে তার মধ্যে কুবে,ফুকুয়ামা,ককুরা,ওকায়ামা ইত্যাদির নাম মনে পড়ে এখনো। টোকিও থেকে হাকাটা পর্যন্ত ৩৫টি ষ্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে নজমি থামে মাত্র ১২টি ষ্টেশনে। বুজতেই পারছেন তার মর্যাদা । সকাল ৯ টা ৫ মিনিটে ট্রেন শিন ওসাকা ছেড়ে গিয়ে ১০ট ৩১ মিনিটের সময় হিরোশিমা ষ্টেশনে নামিয়ে দেয়। নজমি বুলেট ট্রেনের গতি ঘন্টায় ৩০০ কিলোমিটার। তবে ট্রেন যে খুব দ্রুতগামী তা সিটে বসে খুব একটা টের পাওয়া যায়না। আমরা একই ট্রেনে ওসাকা ফিরে আসি। গাইড জানায় জাপানী নজমি অর্থ ‘রিংয বা দঐড়ঢ়ব’ । শিন হিমেজি ষ্টেশনের নাম মনিটরে ভেসে উঠলেও ট্রেন সেখানে থামেনি। বুলেট ট্রেন চলে বিদ্যুতের মাধ্যমে। মজার ব্যাপার হলো ১৯৬৪ সালে চালু হওয়ার পর থেকে অধ্যাবধি কোন দুর্ঘটনায় পড়েনি কিংবা কোন যাত্রী আহত কিংবা নিহত হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা কখনো গন্তব্যস্থলে বিলম্বে পৌছেনি। ভাবা যায় কতটুকু কারিগরি দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা থাকলে একটি ট্রেন সার্ভিস এমন উচ্চ মান ধরে রাখতে পারে? জাপান ভুমি কম্পপ্রবণ দেশ । সেজন্যে শিনকানসেনে যুক্ত করা হয়েছে ভুমিকম্প সহনীয় প্রযুক্তি। নিজ দেশের রেল গাড়ীর কথা মনে করে কেবল আফসোসই করতে পারি। তবে জাপানীরা বুলেটের এই গতি নিয়ে সন্তোষ্ট নয়। তারা আরো দ্রুত গতির ট্রেন চায়। নিউ জেনারেশন বা নিউ ভার্সন ট্রেন চায়। আর সে ব্যবস্থাও নাকি অচিরেই হবে। গবেষণা শেষ। ৮/১০ বছরেরর মধ্যেই চালু করবে। ম্যাগনেটিক ট্র্যাক দিয়ে চলবে ট্রেন। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়েছে। দ্রুতগামী বুলেট ট্রেন যার গতি হবে ঘন্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার।

ঐতিহাসিক হিরোশিমা শহর। একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানী নগর। এর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস । হলে কি হবে জাপানের বাইরে ক’জনইবা জানতো এ নগরীর কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে মার্কিনীরা আনবিক বোমা নিক্ষেপ করে যে নারকীয় ধ্বংস যজ্ঞ চালায় তাতে এই শহরের নাম গোটা বিশ্বের কাছে পৌছে যায় মুহুর্তের মধ্যে। এক জলন্ত বিভীষিকার নাম হয়ে উঠে হিরোশিমা! একদিকে নারকীয়তার শিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি শান্তিকামী মানুষের সহানুভুতি অন্যদিকে যুদ্ধবাজদের প্রতি নিরন্তর ঘৃনা অদ্যাবধি চলছে।
রেল ষ্টেশন থেকে লিমুজিনে করে অল্প সময়ের মধ্যেই হিরোশিমা পীচ মেমোরিয়াল পার্কে পৌছে যাই। মুল ফটকের বাইরে থাকতেই মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয় “ আহ কি সুন্দর, আহ কি শান্তি!”। চারদিকে কেবল সবুজের সমারোহ। গেটের ভিতর প্রবেশ করেই বুঝলাম কি ভয়ঙ্করের ভিতর সুন্দরের বসবাস। আনবিক বোমার হ্রিং¯্র আক্রমণের কারনে যে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তার ভয়ঙ্কর স্মৃতি যেন এখনো জ্বল জ্বল করছে হিরোশিমা শান্তি পার্কের প্রতিটি স্থাপনায়।
হিরোশিমা পীচ মোমোরিয়াল পার্কটি একটি বিশাল এলাকা জুড়ে। ত্রিভুজ আকৃতির পার্কটি হিরোশিমা শহরের কেদ্রভুমিতে অবস্থিত। আনবিক বোমার বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট উন্মুক্ত মাঠে এ পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। দুটি নদী বেষ্টিত বিশাল স্কয়ারটির আয়তন ১লক্ষ ২০ হাজার বর্গমিটার। এই পার্কের নির্মাতা জাপানের বিখ্যাত স্থপতি কেনজো টাঞ্জ(শবহলড় ঞধহল)। ১৯৫৪ সালে এর নির্মান কাজ শেষ হয়। নদী ও সবুজ গাছপালার সমারোহে এক মোহনীয় পরিবেশ বিরাজমান। ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্ট মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র কর্তৃক আনবিক বোমা নিক্ষেপের ফলে যে দানবীয় ধ্বংস যজ্ঞ স্থানটির উপরদিয়ে বয়ে গিয়েছিল আজ তা কেবল স্মৃতি। পরিশ্রমী ও সৌন্দর্য প্রিয় জাপানীরা নারকীয় স্মৃতিকে পেছনে ঠেলে দিয়ে ধ্বংষ স্তুপের উপর যে অনিন্দ্য সৌন্দর্যের স্মৃতিসৌধ গড়ে তুলেছে তা তাদের আধুনিক, উদার ও শান্তিবাদী মননের প্রতিক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। হিংসা নয়, বিদ্ধেষ নয়,ঘৃনা নয়, অমানবিকতা নয়,নয় যুদ্ধের দামামা কিংবা জাতিতে জাতিতে বিরোধ নয়, কেবল শান্তি,কেবল ভালোবাসা,কেবল সহমর্মিতা এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে অনেক বিতর্কের পর বিশ্ব শান্তির প্রতিক হিসেবে গড়ে তুলেছে এই শান্তি পার্ক । তবে যুদ্ধের স্মৃতি কোনভাবেই মুছে ফেলেনি তারা। যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানবজাতি ও সভ্যতার জন্য এর হুমকি সম্পর্কে পৃথিবীর সকল মানুষকে সচেতন ও সক্রিয় করার লক্ষ্যে সকল উদ্যোগই গ্রহন করেছে। পার্কের উদ্দেশ্য কেবল নারকীয়তার শিকার ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষকে স্মরণ করা নয় বরং পারমানবিক বোমার ভয়াবহতার স্মৃতিকে মানব জাতির অনুভববে আনা।
পার্কটি অনেকগুলি স্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত। যেমন অঃড়সরপ ইড়সন উড়সব,ঈযরষফৎবহ’ং চবধপব গড়হঁসবহঃ,জবংঃ ঐড়ঁংব,ঐরৎড়ংযরসধ চবধপব গঁংবঁস,ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়হভবৎবহপব ঈবহঃৎব, ঐরৎড়ংযরসধ ঘধঃরড়হধষ চবধপব গবসড়ৎরধষ ঐধষষ,গবসড়ৎরধষ ঈবহড়ঃধঢ়য,চবধপব ঋষধসব,চবধপব ইবষষং, অঃড়সরপ ইড়সন গবসড়ৎরধষ গড়ঁহফ,ঈবহড়ঃধঢ়য ভড়ৎ কড়ৎবধহ ঠরপঃরসং,এধঃবং ভড়ৎ ঢ়বধপব, গবসড়ৎরধষ ঞড়বিৎ ইত্যাদি। আনবিক বোমা হামলার ক্ষত চিহ্ন বক্ষে ধারণ করে শান্তির ললিত বাণী প্রচারে শান্তি পার্কের প্রতিটি ধূলি কণা যেন সচেষ্ট। একদিকে হিং¯্রতার অন্যদিকে শান্তির, একদিকে ভয়ঙ্করের অন্যদিকে সৌন্দর্যের রুপ যেন ফোটে আছে পার্কের সর্বত্র।
গাইডের পরামর্শে আমরা প্রথমেই আনবিক বোম্ব গম্বুজ(অঃড়সরপ ইড়সন উড়সব/অ-ইড়সন উড়সব) চত্তরে প্রবেশ করি। সামনে উচুঁ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি ভগ্ন ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটি ৩ তলা বিশিষ্ট। চারদিকে বেষ্টনী দেয়া। আনবিক বোমা হামলার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে শান্ত নদী মতোয়াসু(গড়ঃড়ধংঁ)। ভবনের ভিতরে প্রবেশ করা যায়না। গেটে তালা দেয়। বাহির থেকেই দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা ভবনটির চার পাশ ঘুরে ঘুরে দেখি যুদ্ধোন্মাদনার নারকীয় স্মৃতি। গেটের দুই পাশের দেয়ালে আনবিক বোমা হামলার নানা তথ্য খোদাই করে লেখা আছে। নীচে কালো পাথরেও নানান তথ্য লেখা আছে। দেয়ালের পাশে নীচের ওয়াক ওয়ের উপর বিশালাকৃতির বই পত্র ও সাময়িকী। দর্শণার্থীরা যাতে আনবিক বোমার ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হতে পারে সেজন্যই বোধ করি এমন ব্যবস্থা। অনেক দর্শণার্থী দাঁড়িয়ে কিংবা ফুটপাতে বসে খুব আাগ্রহ নিয়ে পড়ছে। আনেকই ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমরাও তাই করি। দেখলাম অনেকেই বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। জাপানীদের কাছে অবশ্য ভবনটি এবহনধশঁ উড়সব নামে পরিচিত।
ভবনটির একটি চমৎকার ইতিহাস আছে। যেখানে ভবনটি দাঁিড়য়ে আছে ওই এলাকটি ছিল হিরোশিমা নগরীর সবচেয়ে সুন্দর ও ব্যস্ত বানিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা। ১৯১২ সালে ভবন নির্মানের কাজ শুরু হয়। জাপানে তখন কাঠের তৈরী বাড়ী ঘরের প্রচলন ছিলো । কিন্তু ততদিনে জাপানীদের রুচিতে বেশ পরিবর্তন শুরু হয়। আধুনিক ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীর দালান কোঠার কদর বেড়ে উঠে। পূর্ব ইউরোপের চেকোশ্লোভাকিয়ার অধিবাসী নামকরা স্থপতি ঔধহ খবঃুবষ ও তার বন্ধু কধৎবষ ঐড়ৎধ এর যৌথ উদ্যেগেপরিচালিত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের বেশ নাম ডাক। তারা ১৯১০ সালে টোকিও শহরে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেন। অল্পদিনেই স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে জাপানের বিভিন্ন শহরে। তো হিরোশিমার গুরুত্বপূর্ণ ভবনটি নির্মাণের দায়িত্বও তারা পেয়ে যান সহজেই। লেটজেল সাহেব মনের মাধুরী মিশিয়ে আনিন্দ্য সুন্দর ভবনটির ডিজাইন করেন। তবে নির্মাণ কাজ শেষ হতে বেশ সময় লাগে। ১৯১৫ সালে ভবনটি উদ্বোধন করা হয়। নজরকাড়া ভবটির নামকরণ হয় ঐরৎড়ংযরসধ চৎবভধপঃঁৎধষ ওহফঁংঃৎরধষ চৎড়সড়ঃরড়হ ঐধষষ. তখন কে জানতো পরবর্তী তিন দশকের মধ্যেই তার সৌন্দর্যে কালিমা লেপন করা হবে। তার জীবনে নেমে আসবে অন্ধকার। আবার অন্যভাবে বললে ভবনটি যে উত্তরকালে ইতিহাসের অংশ হবে তা কিন জানতো হিরোশিমাবাসী কিংবা এর নির্মাতা লেটজেল? ভাগ্যিস লেটজেলকে এর বিভৎস রুপ দেখতে হয়নি । ধ্বংস যজ্ঞের বেশ আগেই ১৯২৪ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে এই গুণী স্থপতির জীবন অবসান হয়। আড়াল থেকে নিয়তি যেন হাসছিল। ১৯৪৫সালের ৬ আগষ্ট সকাল সোয়া আটটার সময় ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য আনবিক বোমার আক্রমন হয় হিরোশিমা নগরীর উপর। মিত্রশক্তির অন্যতম মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালায়। আনবিক বোমা নিক্ষেপের ফলে নগরীর ১ লক্ষ ৪০ হাজার লোক হতাহত হয়। ৭০ হাজার লোকের জীবন প্রদীপ সাথে সাথেই নিভে যায়। বাকী ৭০ হাজার মারা যায় আনবিক বোমার তীব্র বিকিরণের প্রভাবে নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে ধুকে ধুকে অসহনীয় যন্ত্রনা ভোগ করে। যারা বেঁেচ গিয়েছিল তাদের কষ্ট ছিলো আরো বেশী। তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে অর্ধমৃত হয়ে ছিল দীর্ঘদিন। অমানবিক যুদ্ধের দানবীয় স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয়েছে। শারীরিক ক্ষতের চেয়ে হৃদয়ের ক্ষত কোন অংশেই কম ছিলনা। তবে জাতি হিসেবে জাপানীরা খুব ভদ্র হওয়ায় ক্ষোভ ও ঘৃনা প্রকাশে শালীনতাবোধ ছিলো ষোল আনা যা এখনো আছে। নগরীর ৯০ হাজার বাড়ী ঘর ধ্বংস হয়ে যায় নিমিষেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন হলের সকল লোকই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে বোমার আক্রমনে যে অল্প কয়েকটি ভবন সম্পূর্ণ চুরমার হয়নি এ ভবনটি অন্যতম। ভবনের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও ষ্টিল ও সিমেন্ট দ্বারা নির্মিত গম্বুজসহ ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকে। সম্পূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়নি। সংস্কার করে পারমানবিক হামলার বিভীষীকাময় স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়া হয়েছে। সংস্কার কাজ শেষ করে ১৯৫৪ সালে ভবনটি বর্তমান অবয়বে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৯৬ সালে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষনা করে। ভবনের চারদিকে বেড়া দেয়া আছে। ভিতরেও নানা রকম ফুলের গাছ লাগানো আছে। গেটের পাশেই আনবিক বোমা হামলার ইতিহাস সম্বলিত বিভিন্ন প্রকাশনা রয়েছে দর্শণার্থীদের পড়ার জন্য জাপানী ও ইংরেজী ভাষায়। হিরোশিমা সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে একটি ফলক লাগানো হয়েছে যাতে লেখা আছে, অং ধ যরংঃড়ৎরপধষ রিঃহবংং ঃযধঃ পড়হাবুং ঃযব ঃৎধমবফু ড়ভ ংঁভভবৎরহম ঃযব ভরৎংঃ ধঃড়সরপ নড়সন রহ যঁসধহ যরংঃড়ৎু ধহফ ধং ধ ংুসনড়ষ ঃযধঃ াড়ংি ঃড় ভধরঃযভঁষষু ংববশ ঃযব ধনড়ষরঃরড়হ ড়ভ হঁপষবধৎ বিধঢ়ড়হং ধহফ বাবৎষধংঃরহম ড়িৎষফ ঢ়বধপব,এবহনধশঁ উড়সব ধিং ধফফবফ ঃড় ঃযব ড়িৎষফ ঐবৎরঃধমব খরংঃ রহ ধপপড়ৎফধহপব রিঃয ঃযব ঈড়হাবহঃরড়হ ঈড়হহবপৎহরহম ঃযব ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ ডড়ৎষফ ঈঁষঃঁৎধষ ধহফ হধঃঁৎধষ ঐবৎরঃধমব দ
আহা বেচারা লেটজেল! তার জন্য দুঃখ হয়। আজ খুব বেশী মানুষ হয়তো তাকে স্মরণ করছেনা। কিংবা অনেকেই হয়তো তার নামটিও জানেনা। তিনি শুধু হিরোশিমাতেই নয় টোকিওসহ জাপানের অন্যান্য শহরেও অনেক দৃষ্টি নন্দন স্থাপনার ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে জন্মভ’মি চেকোশ্লাভাকিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। জাপানের সাথে লেটজেলের সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে চেক সরকার তাকে তাদের টোকিও দূতাবাসে কমার্শিয়াল এটাচে হিসেবে নিয়োগ করে ১৯১৯ সালে। সরকারী দায়িত্ব পেয়ে লেটজেল পর্যায়ক্রমে জাপানের উল্লেখযোগ্য শহরগুলো পরিভ্রমণ করেন। ১৯২৩ সালের ভয়াবহ ভুমিকম্পে অন্য আরো অনেক স্থাপনার সাথে লেটজেলের ডিজাইনকৃত বিল্ডিংগুলোও ধুলিসাৎ হয়ে যায়। নিজের সৃষ্টির ধ্বংস যজ্ঞ দেখে লেটজেল মর্মাহত হন। তিনি মর্মযাতনা সহ্য করতে না পেরে ১৯২৩ সালের নভেম্বরেই নিজের রাজধানী প্রাগ শহরে ফিরে যান এবং বছর দুয়েক পরেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে শেস নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। দুনিয়ার বড় শিল্পীদের জীবনটাই যেন ট্র্যাজেডির ভিতর দিয়ে শেষ হয়। তাজমহলের স্থপতি ঈশা ও তার সহকর্মীদের আঙ্গুল কেটে দেয় মোগল বাদশাহ শাজাহান যেন নতুন কোন তাজমহল তৈরী করতে না পারে। কী বিচিত্র খেয়াল রাজ রাজাদের! যাকগে সেকথা, ফিরে আসি পীচ পার্কের কথায়।
আগেই বলেছি পার্কটি আসলে অনেকগুলি স্থাপনার সমন্বয়ে গড়ে তুলা হয়েছে। প্রত্যেকটি স্থপানাই যুদ্ধের ভয়াবহতা যেমন স্মরণ করিয়ে দেয় তেমনি বিশ্ব শান্তির কথা, মানবতার কথা ও জাপানীদের সহনশীল সংস্কৃতির কথাও স্মরণ করে দেয়। মতুয়াসো নদীর তীর ঘেঁষে পীচ ঢালা পথে খানিকটা এগিয়ে যেতেই দেখি বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বেশ তৎপর। পথচারীদের কাছে হাসিমুখে এগিয়ে কি যেন বলছে। খানিক পরেই দু’তিনজন আমাদের দিকেও এগিয়ে আসে। একটি সবুজ রঙের লিফলেট বিনয়ের সাথে হাতে দেয়। বললো তারা পারমানবিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করছে। আমরাও যেন তাদের উদ্যোগে শরীক হই সে আবেদন রাখেন। আমরা কিভাবে সম্পৃক্ত হবো এ প্রশ্ন করতেই স্মিত হেসে একজন লিফলেট পড়তে অনুরোধ করেন। লিফলেট জাপানী ও ইংরেজী ভাষায় লেখা। লিফলেটে কুইজ ষ্টাইলে অনেক প্রশ্ন ও উত্তর দেয়া আছে, কেবল হ্যা বা না বক্সে টিক চিহ্ন দিলেই হয়। যেমন আপনি পারমানবিক বোমা তৈরী নিষিদ্ধ হোক তা চানকি?পারমানবিক বোমা মুক্ত বিশ্ব চান কি? ইত্যাদি ইত্যাদি।সংগঠনে যারা জড়িত তাদের সকলের বয়সই সত্তুরোর্ধ হবে। আচরণে খুব বিনয়ী। সংগঠন চালান নিজেদের পয়সায়, কারো কাছ থেকেই কোন অনুদান গ্রহন করেননা। তাদের হৃদয় ছোঁয়া আবেদনে সাড়া দিয়ে আমি একটি ফরম পূরণ করি। তারা যেভাবে আমাকে ধন্যাদ জানালেন তা সারা জীবন মনে থাকবে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের আগ্রহ দেখে মনটা আনন্দে ভরে যায়। স্বার্থপর এই ধরাধামে বৃদ্ধ জাপানী নাগরিকদের এই নি:স্বার্থ প্রচেষ্টা সফল হোক এই কামনা করি। অনেকেই অন্যান্য স্থাপনা দেখার জন্য কিংবা সময়াভাবে এই বৃদ্ধদের খুব একটা সময় দিতে চাননা। বিদায়ের সময় বলি আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। চিনতে পারলেন কিনা বুঝা গেলনা কেবল আন্তরিক হাসি দিলেন। মনে হলো স্বর্গীয় হাসি।
একটু এগিয়ে যেতেই মতুয়াসু নদীর উপর স্থাপিত ব্রীজের উপর দিয়ে পার হলাম। ব্রীজের উপর থেকে এ-বোম্ব ডোমকে খুব স্পষ্ট দেখা যায় । আমরা ব্রীজে দাঁিড়য়ে অনেক ছবি তুলি। মৃদু লয়ে বয়ে যাওয়া কালের/ইতিহাসের সাক্ষী মতোয়াসু নদীকে দেখছে সবাই প্রাণভরে। যে সবুজের সমারোহ পরিবেশকে করছে আরো শান্ত/মনোমুগ্ধকর। ব্রীজ পেরিয়ে বা দিকে যেতেই একটি প্রশস্ত রাস্তা যা সেনোটপ ও যাদুঘরের দিকে এগিয়ে গেছে। দল বেধে বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে যাই। বহু বিদেশী দর্শণার্থীও দেখা মেলে। কিন্তু নেই কোন কোলাহল বা হৈচৈ। সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে গোটা প্রাঙ্গন। নানান গাছ গাছালীতে সুসজ্জিত । কোন কোন এলাকা নানান রঙের ফুলে ঢাকা।
মেমোরিয়্যাল সেনোটাফ(গবসড়ৎরধষ ঈবহড়ঃধঢ়য)

পার্কের অনেকটা কেন্দ্রস্থলে মোমোরিয়াল সেনোটাফ এর অবস্থান। এটি পীচ পার্কের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। কনক্রিট দিয়ে নির্মিত স্যাডল আকৃতির স্মৃতিসৌধটি একটি আচ্ছাদন হিসেবে কাজ করছে। এখানে আনবিক বোমার আঘাতে মৃত্যুবরণকারী সকল ভিকটিমের নাম খোদাই করে রাখা হয়েছে। ১৯৫২ সালের ৬ আগষ্ট সেনোটাফটি দর্শর্ণার্থীদের জন্য খোলে দেয়া হয়। আর্ক আকৃতিটি অনেকটা প্রতীকি অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিহতদের আত্মার আশ্রয়স্থল হিসেবে কল্পনা করা হচ্ছে। প্রতি বছর ৬ আগষ্ট স্মরণে যে অনুষ্ঠান হয় তখন এখানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরুপ পুস্প স্তবক অর্পণ করা হয়। বিদেশী রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান যখন হিরোশিমা সফর করেন তখন তাঁরা এখানেই পুস্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদেও প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এছাড়া প্রতিদিনই অনেক দর্শণার্থী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনও এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এটিকে বলা যায় পার্কের আনুষ্ঠানিক স্থান। তবে সবচেয়ে মনে দাগ কাটার মতো সেনোটাফের গায়ে জাপানী ও ইংরেজী ভাষায় খোদাই করা হৃদয় স্পর্শকারী এপিটাফ। হিরোশিমা ইউনির্ভাসিটির ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক ঞধফধুড়ংযর ঝধরশধ .
এপিটাফের ইংরেজী অংশ লিখেছেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে একটি ব্যাখ্যা ও সংযোজন করেন। ‘‘ চষবধংব ৎবংঃ রহ ঢ়বধপব,ভড়ৎ[বি/ঃযবু]ংযধষষ হড়ঃ ৎবঢ়বধঃ ঃযব বৎৎড়ৎ” ১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রফেসর সাইকা এপিটাফের ইংরেজী অনুবাদ করেন এভাবে ‘‘খবঃ ধষষ ঃযব ঝড়ঁষং যবৎব ৎবংঃ রহ ঢ়বধপব ভড়ৎ বি ংযধষষ হড়ঃ ৎবঢ়বধঃ ঃযব বারষ ” এবং তার উদ্দেশ্য বুঝানোর জন্য একটি ইংলিশ প্লেইক সংযোজন করেন। তিনি ‘‘বি ’’ বলতে ‘‘ ধষষ যঁসধহরঃু’’ শুধুমাত্র/ কেবলমাত্র জাপানী অথবা আমেরিকানদের বুঝানো হয়নি এবং ‘‘বৎৎড়ৎ ’’ ‘‘ বারষ ড়ভ ধিৎ ’’ যুদ্ধের ক্ষতি /ধ্বংস/ ভয়াবহতা/বিভিষিকাকেই বুঝানো হয়েছে। মুল উদ্দেশ্য হলো বিষয়টিকে রাজনীতিকরণ না করে হিরোশিমার ক্ষতিগ্রস্থদের স্মরণ করা।এখানেও জাপানীদের সহজাত সহনশীলতা,সৌজন্য, শিষ্টাচার ও শালীনতাবোধের প্রমান মেলে। শত্রুকে কথায় ঘায়েল করা কিংবা ঘৃনা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে ছোট করার মধ্যে যে কৃতিত্ব নেই জাপানীদের মধ্যে সর্বত্রই এমন বোধ বিরাজমান।
শান্তি শিখা(চবধপব ঋষধসব )ঃ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতীক
আনবিক বোমার আক্রমনের শিকার হিরোশিমাবাসীর স্মরণে শান্তি শিখা মনোমেন্ট পীচ পার্কে স্থাপন করা হয়েছে ১৯৬৪ সালে।এর প্রতীকি উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া থেকে আনবিক অস্ত্রের অবসান ঘটানো। শিখাটি ১৯৬৪ সাল থেকে অবিরত জ্বলছে। পারমানবিক অস্ত্র যতদিন পৃথিবীতে পারমানবিক অস্ত্র থাকবে ততদিন শিখাটি জ্বলতেই থাকবে। যেদিন পৃথিবী পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত হবে সেদিন শিখাটিকে নিভিয়ে দেয়া হবে। জানিনা সে শুভদিনটি কবে আসবে ধরাধামে। যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনায়দের শুভবুদ্ধির উদয় আদৌ হবে কিনা কে জানে। তারা মুখে শান্তির কথা বলে কিন্তু কাজ করে উল্টা। এ শিখা নিভে যাক,হিরোশিমাবাসীর স্বপ্ন সফল হোক এ কামনা করি।
শান্তি ঘন্টা(চবধপব ইবষষং)
পীচ পার্কে মোট তিনটি শান্তি ঘন্টা স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্যও বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা । সেগুলোও প্রতীকি। সবচেয়ে ছোট ঘন্টাটি শুধু পীচ মোমেরিয়াল অনুষ্ঠানের দিন বাজানো হয়। তবে এটি পীচ মোমোরিয়াল যাদুঘরে নিয়মিত প্রদর্শণ করা হয়। বড় ঘন্টাটি একটি কনক্রিট নির্মিত কাঠামোর মধ্যে ঝুলানো আছে। ঘন্টা বাজানোর জন্য দর্শকদের উৎসাহিত করা হয়। প্রায় সকল দর্শকই ঘন্টা বাজিয়ে বিশ্ববাসীকে শান্তির ডাক দেয়। তবে ধ্বনি কর্কশ নয় বরং খুবই মেলোডিয়াস। ফলে ঘন্টা বাজাতে কিশোর কিশোরীদের উৎসাহ বেশী দেখলাম। আমরাও বেল বাজিয়ে বিশ্ব শান্তির পক্ষে আমাদের অবস্থান জানিয়ে দিই। পীচ বেলও ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্থাপন করা হয়।
শিশুদের শান্তি স্মৃতিস্তম্ভ (ঈযরষফৎবহ’ং চবধপব গড়হঁসবহ)
আনবিক বোমা হামলার কারনে যে সকল শিশুর জীবন প্রদীপ নিভে যায় তাদের স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে চিলড্রেন্স পীচ মনুমেন্ট। একটি বালিকার ভাস্কর্য যার হাত উর্ধ্বে উঠানো এবং হাতে একটি ভাঁজ করা কাগজের তৈরী সারষ পাখি।ভাস্কর্যটি আসলে সত্য ঘটনার উপর নির্মিত হয়। সাদাকো সাসাকি নামে একটি কিশোরী আনবিক বোমা হামলার ফলে তীব্র বিকিরণের শিকার হয়ে মারা যায়। সে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলো। তার বিশ্বাস ছিলো যদি সে কাগজ দিয়ে ১০০০ সারস পাখি তৈরী করতে পারে তাহলে সে সুস্থ্য হয়ে যাবে। কিন্তু এক হাজার সারস পাখি তৈরী করার আগেই মর্ত্যলোক ছেড়ে চলে যেতে হয় তাকে। শিশুটির সে আকাঙ্কা স্মরণ করে সারা বিশ্বের শিশুরা কাগজ দিয়ে সারস পাখি তৈরী করে হিরোশিমায় পাঠিয়ে দেয় এবং তার মূর্তির পাশে সেগুলো রাখা হয়। মা সাদাকো তোমার আত্মা কি দেখছে সারা দুনিয়ার মানুষ কিভাবে তোমাকে স্মরণ করছে?

রেষ্ট হাউজ(জবংঃ ঐড়ঁংব)
রেষ্ট হাউজ মূলত: আনবিক হামলার শিকার একটি তিন তলা বিশিষ্ট ভবন। ১৯২৯ সালে তৈরী বিল্ডিংটি প্রথমে ছিলো দৃষ্টিনন্দন শপিং সেন্টার । বিশ্ব যুদ্ধের সময় জ্বালানী সংকট দেখা দিলে ১৯৪৪ সালে সেটি জ্বালানী বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ৬ ডিসেম্বর আনবিক বোমা হামলার সময় হিরোশিমার অন্য আরো অনেক বিল্ডিং এর মতো সেটিও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। ভবনে তখন ৩৭ জন লোক কর্মরত ছিলো। ৩৬জনই সাথে সাথে মৃত্যুবরণ করেন। শুধু একজন ব্যাক্তি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তার নাম ঋরুড় ঘড়সরৎধ। ৪৭ বছর বয়সি নমুরা তখন কনক্রিট নির্মিত বেজমেন্টে বসে কাজ করছিলেন। তীব্র বিকিরণ থেকে তিনি দৈবক্রমে বেঁেচ যান। ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তবে মৃত্যুবধি নারকীয় যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছে। তীব্র জ্বর, ব্যাথা, রক্তক্ষরণ,শ্বাস কষ্ট ও ডাইরিয়াসহ নানান রোগ ব্যাধির সাথে যুদ্ধ করে পরাস্থ হন। যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ভবনটিকে সংস্কার করা হয় এবং কাঠ দিয়ে ছাদ তৈরী করা হয়। তারপর ফুয়েল হল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তারপর ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত হয় কয়েকবার। কিন্ত ১৯৯৬ সালে আনবিক বোমা গম্বুজটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনার পর ভবনটি রক্ষা পায়। বর্তমানে নীচতলাটি পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র ও স্যুভেনির শপ হিসেবে,২য় ও ৩য় তলা অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বেজমেন্টেটি হামলার সময় যেরকম ছিলো সেরকমভাবেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ঈবহড়ঃধঢ়য ভড়ৎ কড়ৎবধহ ারপঃরসং
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ আগে থেকেই অবিভক্ত কোরিয়া ছিলো জাপানের উপনিবেশ। যুদ্ধের সময় বিপুল সংখ্যক কোরিয়ান নাগরিক জাপানে বসবাস করতেন ও বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। জাপনীদের সাথে তারাও বোমা হামলার শিকার হয়। প্রায় ৪৫০০০ কোরিয়ান যুদ্ধের সময় জাপানে মারা যায়। পরবর্তীতে জাপানের উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকি থেকে ৩ লক্ষ কোরিয়ান নিজ দেশে ফিরে যায়। তারা বোমা হামলার নারকীয় ক্ষত নিয়েই নিজ দেশে যায়। তাদের সকলের স্মরণে একটি মনুমেন্ট স্থাপন করা হয়েছে। মনুমেন্টটি কোরিয়ান জাতীয় প্রতিক দ্বারা সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়েছে। মনুমেন্টে লেখা আছে ‘ ঞযব গড়হঁসবহঃ রহ সবসড়ৎু ড়ভ ঃযব কড়ৎবধহ ঠরপঃরসং ড়ভ ঃযব অ-ইড়সন.ওহ সবসড়ৎু ড়ভ ঃযব ংড়ঁষং ড়ভ ঐরং ঐরমযহবংং চৎরহপব ণর ডঁ ধহফ ড়াবৎ ২০০০০ ড়ুযবৎ ংড়ঁষং”.
হিরোশিমা স্মৃতি জাদুঘর(ঐরৎড়ংযরসধ চবধপব গবসড়ৎরধষ গঁংবঁস)
পার্কে আমাদের শেষ দর্শনীয় স্থান ছিলো পীচ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম। পার্কের সর্ব দক্ষিণে এর অবস্থান। যাদুঘরটি দুটি ভবনে বিভক্ত। একটি পূর্ব দিকে অন্যটি পশ্চিমদিকে। একটি ভবনে সংস্কার কাজ চলমান থাকায় বন্ধ আছে। ভবনের স্থপতি কেনজো টাঞ্জ(শবহলড় ঞধহল)। আমরা টিকিট কেটে লাইন ধরে দুতলায় উঠি। ভিতরে প্রবেশ করার পর কেমন যেন একটি অনুভুতি তৈরী হয়। বিভিন্ন সেকশনে বিভক্ত পুরো ভবনটি। আনবিক বোমা নিক্ষেপের কারনে নগরের যে ক্ষতি হয়েছে এবং মানুষের যে অবর্ননীয় কষ্টের কথা বিভিন্ন উপকরণ প্রদর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। নিহত ও আহত মানুষের ব্যাক্তিগত স্মৃতি চিহ্নগুলো অত্যন্ত যতেœর সাথে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্যালারীতে রাখা স্মৃতি চিহ্নগুলো কাঁচ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অনেকগুলি কক্ষ। শত শত মানুষ অত্যন্ত মনোযোগের সাথে দেখছে। সুনসান নিরবতা। অনেকের চোখ ভেজা। দৃষ্টি যেন ঝাপসা হয়ে উঠে। কাঠের, পাথরের কিংবা ধাতব পদার্থের মধ্যে স্মৃতি চিহ্নগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কোনটাতে কোন ছাত্রের স্কুল ড্রেসের অংশ বিশেষ যা বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, কোন ছাত্রীর মাথার চুলের বেনীতে ব্যবহৃত বেন্ট,ফিতা,কারো জুতার বা কাঠের তৈরী পাট খড়মের অংশ বিশেষ, কারো বাইসাইকেলের একটি চাকা, কারো ভগ্ন টিফিন বক্স,চায়ের কাপের ভগ্ন অংশ,চশমার ভাঙ্গা ফ্রেম,হাত ঘড়ির ফিতা, কলম বা পেন্সিলের ভাঙ্গা অংশ,স্কুলের খাতার কয়েকটি পাতা, কোন অফিস বা কারখানার হাজিরা খাতার দগ্ধ পাতা, কোন দুরন্ত বালকের খেলনার অংশ,ঘুড়ির নাটাই, কর্মজীবি মহিলার ছাতার বাট,পুরে যাওয়া অফিসের চেয়ার টেবিলের অংশ, চিকিৎসকের ষ্টেথোস্কোপের অংশ বিশেষ, ঝলসে যাওয়া মাথার খুলি,পাজরের হাড়,মাথার চুল,কিশোরীর চুলের বেনী,শ্রমিকের পুরে যাওয়া পোষাক ইত্যাদি অসংখ্য স্মৃতি চিহ্ন থরে থরে সাজানো আছে। কি নেই সেখানে? হিরোশিমাবাসীর প্রাত্যাহিক জীবনের সকল উপাদানই এখানে আছে যেগুলি ধ্বংসযজ্ঞের পর পাওয়া গিয়েছিলো। প্রত্যেকটি আইটেমের নীচে সংক্ষিপ্ত বর্ননা আছে। স্মৃতি চিহ্নটি কার, কোথায় পাওয়া গিয়েছে, কে কখন এখানে দিয়েছে ইত্যাদি তথ্য সন্নিবেশিত আছে। বলা যায় সেটি সবচেয়ে স্মৃতিকাতর বিষয়। শোক,বিষন্নতা ও গ্লানিময়তার এক মিশ্রন যেন দেখতে পাই এখানে। মিউজিয়ামটি ১৯৫৫ সালে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বের হওয়ার পথে লনে দেখলাম সাজিয়ে রাখা হয়েছে ব্রোসিয়ার ও পীচ ফরম। টেবিলে কলমও রাখা হয়েছে পারমানবিক অস্ত্র নির্মুল করার ও বিশ্ব শান্তির সপক্ষে লেখার জন্য। একটি ফরম নিয়ে লিখলাম শান্তির সপক্ষে। ব্রোসিয়ার পড়ে দেখলাম কেন এ যাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে তা সুন্দরভাবে লেখা আছে। আনবিক বোমা হামলার রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক , অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করা এবং মানবতা কিভাবে ভুলুণ্ঠিত হয়েছিল, হিরোশিমার মানুষ কিরুপ অবর্ননীয় নারকীয়তার শিকার হয়েছিলো , কি সুদূর প্রসারী অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছিলো তা বিশ্ববাসীকে জানানো সর্বোপরি বিশ্বকে আনবিক অস্ত্র মুক্ত করা ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে উদ্বুদ্ধ করতেই যাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।
মিউজিয়াম দেখার পর অফিস বিল্ডিং এর নীচে আমরা সবাই একত্রিত হই। এখানে আসেন হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর মফিজুল ইসলাম তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে । সঙ্গে ছিলেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। মফিজ সাহেব হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং এখানেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি আমাদের সহ প্রশিক্ষণার্থী প্রকৌশলী আকবর পাটোয়ারী সাহেবের বন্ধু। আকবর সাহেবও ইতিপূর্বে বৃত্তি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। আলাপচারিতায় জানা গেল মফিজ সাহেবের বাড়ী নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায়। সপরিবারে ভালোই আছেন। স্বামী-স্ত্রী জাপানী ভাষায় বেশ চোস্ত। বাচ্চারাও জাপানী ভাষা বেশ ভালই বলতে পারে। স্কুলে ভর্তি করেছেন। তবে সমস্যা হচ্ছে বাংলা ভাষা নিয়ে। বাচ্চারা বাংলা ভাষা ভুলতে বসেছে। এজন্যে বুদ্ধি বের করেছেন ভাবী নিজেই । প্রতি বছর দুই মাস গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে থাকেন বৃহত্তর পরিবারের সাথে। এতে ফলাফল ইতিবাচক হয়েছেন বলে জানান। মফিজ সাহেব জানালেন প্রতিবছরই কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী ছাত্র এখানে ভর্তি হয়। তাদের পারফরমেন্স ভালো বলে জানান। তিনি আরো জানান হিরোশিমায় বেশ কিছু বাঙ্গালী পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। দুয়েকজন বাংলাদেশী যুবক জাপানী ললনার পানিও গ্রহন করেছেন। সাইফুল ইসলাম সাহেব কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে জাপানে পাড়ি জমান । বেশ কয়েক বছর চাকুরী করেছেন। এখন তেজারতিতে আছেন। কথাবর্তাায় মনে হলো বেশ তরক্কি হাসিল করছেন। খুবই স্বজ্জন। জানালেন এখানে বাংলাদেশী কমিউনিটির সমিতি আছে। তারা একটি মসজিদ নির্মান করেছেন। রোজার সময় খতমে তারাবি নামাজ হয়। আর জুম্মার নামজতো হয়ই। তবে বাঙ্গালীর সহজাত ঝগড়াঝাটির বিষয়টিও আছে। সমিতি প্রথমে একটিই ছিলো। এখন একাধিক। মফিজ সাহেব ও সাইফুল সাহেব উভয়ই কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তি। তবে সার্বিকভাবে তারা ভাল আছেন বলে জানালেন। দেশের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করেন। আমি যুক্তি দিয়ে বলি কয়েকটি বিষয় বাদ দিলে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা,স্বাস্থ,কৃষি,যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। তাদেও সুপরামর্শ দেশের কাজে লাগবে বলেও মত প্রকাশ করি। তারা দেখলাম বেশ ধার্মিক। যোহরের নামাজের সময় হলে অফিসের বারান্দায় জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করলো যাতে আমাদের টিমেরও অনেকেই নামাজ আদায় করেন।
নামাজ শেষে লাঞ্চের পালা। কোথায় লাঞ্চ করা হবে এ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত হলেও জাইকার প্রতিনিধি দুজন এবং আকবর সাহেব বেশ নিশ্চিন্ত। বোধ করি তারা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন কোথায় লাঞ্চ সারবেন। আমরা তাদের অনুসরণ করি। সঙ্গে মফিজ সাহেব ও সাইফুল সাহেবও আছেন। বেশ কিছুটা সময় হেটে সদর রাস্তা থেকে কিছুটা ভিতরে একটি সরু রাস্তার পাশে দেখলাম বেশ কয়েকটি ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট । সামনে খাবার সাজিয়ে রাখা আছে। মাছ মাংস ভাত তান্দুর রুটি দেখেই জিবে পানি এসে যায়। মাত্র দুয়েক বেলা জাপানী খাবার খেয়েই যেন হাপিয়ে উঠেছে সকলে। ঢোকলাম ‘খানক ইন্ডিয়া’ নামক রেষ্টুরেন্টের ভিতর। রেষ্টুরেন্টের প্রবেশ দ্বারে বড় অক্ষরে হিন্দি, জাপানী ও ইংরেজী ভাষায় রেষ্টুরেন্টের নাম লেখা আছে। ভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবে দেয়ালে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি সাটানো আছে। আন্তরিক আমন্ত্রন জানান মালিক-কাম ম্যানেজার গোছের ব্যক্তিটির নাম সমর চৌধুরী, নিবাস এলাহাবাদের শহরতলীতে। দু’যুগেরও বেশী সময় ধরে আছেন এখানে। ওয়েটার নবরতন ও রাতুল ব্রাহ্মণ, উভয়ই উত্তর প্রদেশের লোক আর সাগর সিং এর বাড়ী উত্তরাখন্ড। সকলেই হিন্দি ও ইংরেজীতে বাত চিৎ করে। তবে দুয়েকজন জাপানীও আছে। কাশীরাম নামে একজন ওয়েটার বাংলাও বলতে পারেন। পাশের টেবিলে বসা মোম্বাইবাসী নারকারী বাবুর সাথে আলাপ জমে উঠে। তিনি বাংলা বলতে পারেন বেশ । ঢাকা এবং চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেছেন বছর দুয়েক আগে।
খাবারের মেন্যু পছন্দ করে অর্ডার দেয়া হলো। কিন্তু পরিবেশন করতে বেশ বিলম্ব হয়। ক্ষুধায় মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। স্যুপ,অন্তুন ও পাপর জাতীয় এক ধরনের খাবার, বিভিন্ন পদের ভেজিটেবল, মাছ, মুরগী, সাদা ভাত, নান রুটি, সালাদ ইত্যাদি দিয়ে ভোজন পর্ব শেষ করলাম। তারা বার বার বলতে লাগলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ সাহেব এখানে লাঞ্চ করেছেন। তিনি নাকি রান্নার ভুয়ষী প্রসংশা করেছেন। মনে মনে বলি ওটা হয়তো ওনার উদারতা। আসলে রান্না মোটেও ভালো ছিলোনা। একগাদা মসল্লার ঝোলের মধ্যে কয়েকটি চিংড়ি ছেড়ে দিয়ে স্যুপ তৈরী করেছে, একই ধরনের ঝোলের মধ্যে মুরগীর মাংস পিষে ছেড়ে দিয়েছে কিংবা অন্য কোন সামুদ্রিক মাছ। এক্কেবারে ঠগ বাটপারির অবস্থা। তবু ইন্ডিয়ান ফুডের ফ্লেবার পেলাম অতটুকুই কম কিসে!
আমাদের সাথে আসা মফিজ সাহেব সপরিবারে অন্য একটি টেবিলে বসে লাঞ্চ সারেন। আমার ধারনা ছিলো ওনারও আমাদের সাথে বসে খাবেন এবং সৌজন্য হিসেবে আমরা বিল পরিশোধ করবো। কিন্তু জাপানের নিয়ম হিজ হিজ হুজ হুজ। অতিমাত্রায় যান্ত্রিকতা, খুব খারাপ লাগলো। কিন্তু মফিজ সাহেব হাসিমুখে বললেন তারা ইতোমধ্যে এ ধরনের সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন। এখানে এটাই স্বাভাবিক। আবারো আলাপ হলো মফিজ সাহেব ও সাইফুল সাহেবের সাথে দীর্ঘক্ষণ। জানালেন এখানে তারা আছেন বেশ । চুরি ডাকাতি ঠগবাটপারি এদের সংস্কৃতিতে নেই একেবারেই। এখানে আছে কাজের সংস্কৃতি, আছে সততার সংস্কৃতি আছে সহনশীলতার সংস্কৃতি। দলাদলির ওস্তাদ বাঙ্গালী কমিউনিটি তাদের সহজাত অভ্যেস এখানেও চর্চা করছে রীতিমত পাল্লা দিয়ে। প্রথমেই একটি সমিতি ছিলো ,এখন দুটি, কবে যে তিনটি হয়ে যায় সেটা নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হলো মফিজ সাহেবকে।
হিরোশিমা ক্যাসল (ঐরৎড়ংযরসধ ঈধংঃষব)
হিরোশিমা পীচ মেমোরিয়াল পার্কের পর শহরের অন্যতম আকর্ষন হলো হিরোশিমা ক্যাসল। ইতিহাস,ঐতিহ্য,স্থাপত্যরীতি ও সর্বোপরি সৌন্দর্য বিবেচনায় এটি একটি অনন্য স্থাপনা। মফিজ সাহেবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে আমরা আই কিমুরা ও শানজি ইউশিহারাকে অনুসরণ করি। হেটে হেটেই এগিয়ে চললেন তারা ১৩ জনের বহরকে নিয়ে হিরোশিমা ক্যাসলের দিকে। এখানে ঢাকা শহরের মতো বাবুগীরির চল নেই। এই রিক্স্রা..এই খালি..এই টেক্সী ..এই সিএনজি ..এই মামা ধরনের কোন হাক ডাক জাপানের কোন শহরে শুনিনি। এখানে পদ যুগলের সদ ব্যবহার ষোল আনা। প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম ক্যাসলের সামনে। একটি লেক ,লেকের উপর কাঠের সেতু। সেতুর পরই হিরোশিমা ক্যাসলের গেট। আমরা সেতু ও গেটের সামনে দাঁিড়য়ে একাধিক ¯œ্যাপ নিই। আমাদের জন্য আগে থেকেই টিকেট কিনে রেখেছিলেন মিস আই কিমুরা। ক্যাসলটি অনেকগুলি স্থাপনার সমন্বয়ে গঠিত। স্থাপনাগুলি কাঠ,পাথর ও ইটের দ্বারা তৈরী। মূল ক্যাসল ১৯৪৫ সালেরর ৬ আগষ্ট আনবিক বোমা হামলার কারনে ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে মুল আদল ঠিক রেখে পূণ:নির্মাণ করা হয়েছে।বিভিন্ন স্থাপনার সামনে পিছনে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর গাছপালা ও ফুলের গাছ রয়েছে। আছে বিস্তর খোলা জায়গা। আমরা যে ক’টি কক্ষে ঢুকেছি সবগুলিতেই জাপানী ঐতিহ্যবাহী গৃহস্থালী ব্যবহার্য দ্রব্যাদি শৈল্পিকভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পজাত সামগ্রি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্্রও রয়েছে। দা,কুড়াল,ছুরি,চাকু, খড়ম, জুতা, হাড়ি পাতিলসহ নানা বিধ সামগ্রি থরে থরে সাজানো। তবে অধিকাংশই রেপ্লিকা। মূল আইটেমগুলি আনবিক বোমা হামলার কারনে ধ্বংস হয়ে যায়। বিল্ডিংগুলি আমাদের দেশের দুচালা ঘরের মতো । টালির ছাওনী। মেঝে কাঠের তৈরী। দেয়াল বিশাল বিশাল পাথর দ্বারা তৈরী। একটি পাথরের উপর আরেকটি পাথর এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে মনে হয় জোড়ে ধাক্কা দিলেই পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। কোন সিমেন্টের ব্যবহার দেখিনি। নির্মাণ কৌশল আদিরুপই স্থান পেয়েছ্ েদেখে বুঝার উপায় নেই যে ওগুলো পঞ্চাশের দশকে নির্মিত।
ক্যাসল নির্মানের সময়ই বেশ কয়েকটি পরিখা(গড়ধঃ)) খনন করে এর নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছিল। পরে ভিতরেও কয়েকটি পরিখা খনন করা হয়। পরিখাগুলিকে আসলে লেক বললে ভুল হবেনা। নির্মানের সময় নিরাপত্তার বিষয়টিই প্রাধান্য পেলেও বর্তমানে সৌন্দর্যের দিকটিই মুখ্য । লেকের স্বচ্ছ পানিতে রঙ বেরঙের মৎস কুলের অবাধ বিচরণ এর সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।ক্যাসলেল অন্যতম স্থাপনা হলো টেনসু বা মেইন টাওয়ার। ৫তলা বিশিষ্ট টাওয়ারটি কনক্রিট দিয়ে তৈরী যেটি প্রায় ২৭ মিটার উচ্চতার পথরের তৈরী একটি ফাউন্ডেশনের ২৬.৬ মিটার উপর দাঁড়িয়ে আছে। একেকটি ফ্লোরে এককে ধরনের জিনিসপত্র প্রদর্শণ করা হচ্ছে। যেমন প্রথম ফ্লোরে প্রাচীন হিরোশিমা, ক্যাশলের ইতিহাস,হিরোশিমার শাসন প্রনালী ও শাসকদের ইতিহাস, ক্যাশলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সারা দুনিয়ার ক্যাশলের ইতিহাস ইত্যাদি , দ্বিতীয় তলায় ক্যাশল শহরের ক্রমোন্নতি, শিক্ষা,সংস্কৃতি, উৎসব,শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থা,তৃতীয় তলায় বিভিন্ন ধরনের সমরা¯্র,গোলা বারুদ ইত্যাদি, চতুর্থ তলায় হিরোশিমার ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং পঞ্চম তলায় অবজারভেশন প্লাটফরম যেখান থেকে গোটা হিরোশিমা শহরকে দেখা যায়। শহরের অগনিত অট্টালিকার পাশাপাশি সবুজের সমারোহ শহরটিকে আরো আকর্ষনীয় করেছে। চোখ জুড়িয়ে যায় সবুজ গাছপালার মিতালিতে। ইতিহাসের সাক্ষী অটাগোয়া নদীর ধীরে ধীরে বয়ে চলার মনোরম দৃশ্য সত্যিই উপভোগ্য। কে বলবে প্রায় পৌনে এক শতাব্দী পূর্বে অপরিনামদর্শী যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র নায়কেরা ধ্বংস যজ্ঞে মেতে উঠেছিলো এ সবুজ শহরের উপর।
এই যে এত সুন্দর টাওয়ার এত বড় ক্যাসল নির্মিত হলো তার অল্প বিস্তর ইতিহাস তো জানা দরকার । কারা করলো কেন করলো, বিভিন্ন সময়ে কি কি পরিবর্তন হলো বা যোগ হলো ইত্যাদি। জানার সহজ উপায় হলো তথ্যকেন্দ্রে যাওয়া। গেলাম সেখানে । তারা হাসিমুখে ধরিয়ে দিলেন পাঁচ পৃষ্ঠার একটি ছোট্ট বুকলেট। তাছাড়া প্রতিটি ফ্লোরেই দায়িত্ববান কর্মচারী আছেন আপনার উৎসুখ মিটানোর জন্য। তবে এধরনের গ্রুপ ভিত্তিক ভ্রমনে সাধারনত সময় থাকে সীমিত ও নির্ধারিত, তাছাড়া এক জায়গায় বেশী সময় দাঁড়িয়ে থাকলে সফর সঙ্গীদের অনেকেই বিরক্তিবোধ করেন। আবার ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটিও অনেকে পছন্দ করেননা। ফলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। তবু ইতিহাস চর্চায় প্রচন্ড বাতিক থাকায় যেখানেই যাই চেষ্টা করি যৎসামান্য জেনে নিতে।
হিরোশিমা ক্যাশলের নির্মাতা হলেন মরি টেরুমোটো(গড়ৎর ঞবৎঁসড়ঃড়) নামে একন সামন্ত রাজা। নির্মাণ করতে সময় লাগে প্রায় ১০ বছর(১৫৮৯-১৫৯৯)। স্থানটি অটাগোয়া নদীর তীরে সমতল ভুমিতে অবস্থিত। একটু ব্যতিক্রমই বলা যায়। কেননা ক্যাসল সাধারনত পাহাড়ী এলাকায় কিংবা উচুঁ ভুমিতে নির্মান করা হয়। তখন হিরোশিমা নামে কোন শহরের অস্তিত্ব ছিলোনা। এলাকাটির নাম ছিলো তখন গকামুরা() যার অর্থ পাঁচটি গ্রাম। কিন্তু গকামুরা নামটি যেন কেমন। বড্ড সেকেলে,বিরক্তিকর সর্বোপরি মোটেও শ্রুতিমধুর না। সুরুচির জন্য খ্যাতিমান জাপানীরা একটি সুন্দর নাম খোঁজতে থাকে। পেয়েও যান একটি সুন্দও নাম। হিরোশিমা(ঐরৎড়ংযরসধ)! ‘হিরো’ নেয়া হয় মরি রাজ পরবারের প্রতিষ্ঠাতা হিরোমটো(ঐরৎড়সড়ঃড়) এর নামের প্রথম থেকে, আর ‘শিমা’ নেয়া হয় ফুকুশিমা মটোনাগা(ঋঁশঁংযরসধ গড়ঃড়হধমধ) নামে এক ভদ্রলোকের নামের শেষ অংশ থেকে। ফুকুশিমা মরি টেরুমেটোকে ক্যাশল নির্মানের জন্য এ স্থানটি নির্বাচনে সহায়তা করেছিলেন। কৃতজ্ঞতা স্বরুপ তার নামও অমর করে রাখা হয়েছে। তবে সারা দুনিয়াতেই নামের অর্থ নিয়ে বিতর্ক থাকে । হিরোশিমার ক্ষেত্রে থাকবেনা কেন? আনেকেই বলেন আসলে হিরোশিমা হিরোশিমা নামটি এসেছে ‘ ডরফব রংষধহফ ’ শব্দ থেকে। ক্যাশল এলাকায় অটাগোয়া নদীর মোহনায় অনেকগুলি বড় দ্বীপের অবস্থিতির কারনে। যাকগে সেকথা,নামে কি আসে যায়?
ঐরৎড়ংযরসধ এড়শড়শঁ ঔরহলধ ঃ শিন্টো মন্দির
ক্যাসলের ভিতর অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো শিন্টো ধর্মাবলম্বীদের উপাশনালয় যেটি ঐরৎড়ংযরসধ এড়শড়শঁ ঔরহলধ নামে পরিচিত। এত দিন জানতাম জাপানে বৌদ্ধ ধর্মাবল্মীরা সংখ্যাগরিষ্ট। কিন্তু এখানে এসে আমাদের ভুল ভাঙ্গলো। শিন্টো ধর্মের অনুসারীগন সংখ্যায় বেশী। তবে উভয় ধর্মেও মধ্যে অমিলের চেয়ে মিলই বেশী। মন্দিরটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো । আমরা মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করি। একজন যাজক প্রর্থনা করছিলেন তখন। তার সাথে কয়েকজন ভক্ত প্রার্থনায় যোগদেন। কোন ভিড় ভাট্টা নেই । নেই কোন কোলাহল। একটি শান্ত ¯িœগ্ধ পরিবেশ বিরাজমান। উপাসনালয়ে সেবিকা হিসেবে কাজ করছেন কয়েকজন কিশোরী। লাল সালোয়ার ও সাদা ট্রাউজার পরিহিতা কিশোরীদের দেখলে মনে হয় মর্তে যেন দেব শিশু নেমে এসেছে। মানুষ এমন সুন্দর হতে পারে ওদের না দেখলে তা বুঝানো যাবেনা। আমরা সৌন্দর্যের প্রতিক হিসেবে পরীকে কল্পনা করি, উপমা দিই। কিন্তু এ মন্দিরের কিশোরী সেবিকাদের কাছে পরীর সৌন্দর্য যে হার মানবে সে সম্পর্কে আমি শতভাগ নিশ্চিত! তদুপরি তাদের ন¤্র ব্যবহার ও মায়াবী চাহনীর মধ্যে এক ধরনের পবিত্রতা ফোটে উঠে। মন্দির প্রাঙ্গনের পরিচ্ছন্নতা দেখে বিস্মিত হই। তুলনা করি আমাদের উপমহাদেশের মাযার/ মন্দির/ আখড়াগুলির সাথে । যেখানে হরহামেশা ঠগবাটপারে গিজ গিজ করে। নোংড়া বসনে বসে থাকা সেবায়েতদের দৌরাত্ম ,খিস্তি খেউড়, লোভ লালসা ও মদ গাজায় আকন্ঠ নিমজ্জিত সাধু সন্নাসীদের আচরণের সাথে কোন মিল নেই এদের। এরা কোন স্থায়ী সেবিকা নন। একটি নিদ্দিষ্ট সময় পর তারা পরিবারে ফিরে যাবেন। লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবেন। বয়সে ওরা সবাই কিশোরী। মন্দির ও প্রার্থনার নিয়মকানুন সম্বলিত বুকলেট জাতীয় কিছু পুস্তিকা ঠিক ঠাক করছিলেন দুজন সেবিকা। কথা বলতে চেষ্টা করি,ওরাও আগ্রহের সাথে চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি জানিনা জাপানী তারা জানেনা ইংরেজী। ফলে ইশারা ইঙ্গিতেই কিছু বিষয় বুঝে নিলাম। একজন সেবিকা কয়েকটি বুকলেট দিলো পড়ার জন্য। মন্দির প্রাঙ্গনে একটি কাঠের বাক্স রাখা আছে। কেউ ইচ্ছে করলে কয়েন ফেলতে পারেন। তবে তার জন্য কোন আবেদন নিবেদন নেই। ধর্মাচারের জন্য কোন জুড়াজুড়িতো দূরে থাক, নেই কোন আহবান। সাকুল্যে ৪/৫ জন সেবক/সেবিকা ও যাজক দেখাশুনা করেন। কি শৃঙ্খলা বিরাজমান। এখানে বারান্দায় একটি একটি কার্প জাতীয় মাছের ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে,পাশেই একটি কাঠের সিন্দুক। এখানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলে মনোবাঞ্চনা পূরণ হয় বলে শিন্টো অনুসারীদের বিশ্বাস। এ উপাসনালয়টি জাপানের অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে গন্য করা হয়। আদি উপাসনালয়টি স্থাপন করা হয় ১৮৬৯ সালে মেইজি রাজবংশের ক্ষমতা আরোহনের প্রথম বছর। এটি স্থাপন করা করা হয় বশিন যুদ্ধের শিকার মানুষদের শোকে। ১৯৩৪ সালে এটি ভেঙ্গে নতুন করে তৈরী করা হয় এবং বর্তমান হিরোশিমা ষ্টেডিয়ামে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৩৯ সালে নাম হয় হিরোশিমা গকোকু শিরিন। ১৯৪৫ সালের আনবিক বোমায় এটি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে হিরোশিমা ক্যাশলের ভিতর নতুন করে হিরোশিমাবাসীর অনুদানে নির্মিত হয়। উপশানালয়ের শুচি শুভ্র পরিবেশ দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
হিরোশিমা থেকে ফেরার পথে বুলেট ট্রেনে বসে ভাবছিলাম শান্তির জন্য বয়স্ক মানুষদের আন্দোলনের কথা। তাদের একটাই চাওয়া – আনবিক অস্ত্র মুক্ত বিশ্ব। গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ তাদের সাথে আছে। এটাই তাদের শক্তি। তবে সবচেয়ে বড় শক্তি বোধ হয় নৈতিক শক্তি। নৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের দাবীর ন্যায্যতা আছে ষোল আনা। কিন্তু বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কেরা কি শান্তির পক্ষে আছে? দেশে ফিরে এসে পত্র পত্রিকা ও টেলিভিশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মি.ওবামার হিরোশিমা সফরের সচিত্র প্রতিবেদন দেখি। কি বলেছেন ওবামা হিরোশিমায়?
ওবামা সাহেব মে মাসের শেষ সপ্তাহে হিরোশিমা সফর করেন। তিনিই একমাত্র মার্কিন রাষ্ট্রপতি যিনি হিরোশিমা সফর করলেন। আনবিক বোমা নিক্ষেপের ৭১ বছর পর কোন মার্কিন রাষ্ট্রপতির সফর ছিলো একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জাপান সরকার ও সে দেশের পত্র পত্রিকার ভাষায় ‘ঐতিহাসিক সফর’। ওবামা সাহেব জাপানের প্রধানমন্ত্রিকে সাথে নিয়ে বোমা হামলায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিশৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তিনি বোমায় অঘাত প্রাপ্ত এখনো বেঁচে থাকা ৭৯ বছর বয়স্ক ঝযরমবধশর গড়ৎর ও ৯১ বছর বয়সী ঝঁহধড় ঞংঁনড়র এর সাথে কথা বলেন এবং কোলাকুলি করেন। ওবামা তার ২০ মিনিটের ভাষনে বলেন ‘ ৭১ ুবধৎং ধমড় ড়হ ধ নৎরমযঃ,পষড়ঁফষবংং সড়ৎহরহম ,ফবধঃয ভবষষ ভৎড়স ঃযব ংশু ধহফ ঃযব ড়িৎষফ ধিং পযধহমবফ’। তিনি আনবিক অস্ত্র মুক্ত পৃথিবীর কথাও বলেন। এ লক্ষ্যে নৈতিক শক্তির বিপ্লব ঘটানোর উপর জোর দেন। জাপানসহ গোটা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা ছিলো আনবিক বোমা ফেলার জন্য মি. ওবামা ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি মার্কিন সমর নীতির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি । তবে সহনশীল জাপানীরা এতে অন্তোষ্ট হলেও সংক্ষুব্দ নন। তারা ওবামার হিরোশিমায় উপস্থিতিকে স্বাগত জানায়। শান্তি আন্দোলনের নেতা বোমা হামালায় অঘাত প্রাপ্ত ঝঁহধড় ঞংঁনড়র এ বলেন ‘আমি বেঁেচ থাকতে তিনি এখানে আসবেন –আমি তা কল্পনাও করিনি। ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের প্রয়োজন নেই।” জাপানী সহনশীলতার আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো ঝযরমবধশর গড়ৎর এর আন্দোলন। ১২ জন মার্কিন ভিকটিমের অফিসিয়েল স্বীকৃতির জন্য তিনি চার দশক ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। ওরা যুদ্ধের সময় হিরোশিমায় প্রান হারায়। ওদের স্মরনে একটি স্মৃতি স্তম্ব স্থাপন করেছেন তিনি। ভাবা যায় কতটা সহনশীল ও মানবিক গুনের অধিকারী হলে পরম শত্রুর প্রতি এমন দরদ দেখাতে পারে?

কিউটো: হাজার বছরের রাজধানী
১৫ মে ওসাকা শহরকে বিদায় জানিয়ে কিউটো শহরে যাত্রা করি। আমরা উঠি গ্রান্ড প্রিন্স হোটেলে। একেবারে রাজকীয় পরিবেশ । ডাবল বেডের বিশাল কক্ষ। নামের সাথে সুযোগ সুবিধা ও জাঁকজমকের মিল আছে। আসলেই প্রিন্স। আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট সর্বত্র । চারিদিকে সবুজের সমাহার । একদিকে উচুঁ সবুজ পাহাড় অন্যদিকে সমতল ভুমি। রেষ্টুরেন্টে রকমারী খানাপিনার বিচারেও ওসাকার হোটেল হাংকাইয়ুর তুলনায় বেশ উন্নত। বেশ কিছু ট্র্যাডিশনাল ও অপরিচিত জাপানী খাবার ছিলো রেষ্টেুরেন্টে । হোটেলের অবস্থান শহরের কোলাহল থেকে বেশ খানিকটা দূরে একেবারে প্রকৃতির কোলে। বৈচিত্র পিয়াসী পর্যটকরা এমন পরিবেশই পছন্দ করে- জানালেন ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মী তাকিও ফুকুদা। হোটেল রুমে শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছিলাম। দেখলাম সাইড টেবিলে বেশ কিছু লিফলেট ও বুকলেট জাতীয় রঙ বেরঙের কাগজপত্র রাখা আছে। জাপানী ও ইংরেজী দু’ভাষাতেই লেখা। কিউটো শহরের দর্শনীয় স্থান, কিউটোর ইতিহাস ঐতিহ্য,সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, শহরের উত্থান পতনের কাহিনী, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য,রাজন্যবর্গের কথা, সামন্ত প্রভুদের ক্ষমতার লড়াই, যুদ্ধের বিভীষিকা, ক্যাসল, উপাসনালয়, ঐতিহ্যবাহী খাবার ইত্যাদির নানা বর্ননা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই। পড়তে পড়তে কখন যে নিদ্রা দেবী দু’চোখ বন্ধ করে দেয় বুঝতেই পারিনি। মনে হচ্ছেলি কল্পনায় কিউটো শহর ঘুরে বেড়াচ্ছি। জাপানের সবচেয়ে সুন্দর ও প্রাচীণ শহর কিউটো। প্রায় সহ¯্রাব্দ ব্যাপী ছিলো জাপানের রাজধানী।
পরদিন নাস্তা সেরে লিমুজিনে চড়ে রওয়ানা করি শহর ভ্রমণ করতে । জাপানী গাইড ও সহকর্মী পাটোয়ারী সাহেব আগে ভাগেই মোটামুটি একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরী করে রেখেছিলেন কখন কোথায় যাবেন। শহরের উপর দিয়ে বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে একটি নদীর তীরে দাঁড়াই। নদীর নাম হজো(ঐড়ুঁ))। খুব সুন্দর পাহাড়ী নদী । মৃদু ¯্রােত বয়ে যাচ্ছে। গভীরতা খুব বেশী না। কোথাও কোথাও হাটু পানি। নদীর পাড়ে ও নদীতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে শত শত ছাত্র/ছাত্রী নদী পরিস্কার করছে। ওদের হাতে ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করার নানা রকম হালকা যন্ত্রপাতি ও ঝোলা। প্রত্যেকের হাতে গ্লাভস। পায়ে গাম বুট জাতীয় জুতা। নদীতে ভাসমান খড়কুটো, কাগজের টুকরা,ছোট ছোট লতা গুল্মের দলা কিংবা অন্য কোন ময়লা জাতীয় পদার্থ হাতে কিংবা যন্ত্রপাতি দিয়ে সংগ্রহ করে কাঁধে রাখা ঝোলায় ভরে তীরে এসে বড় ড্রামে রাখছে। মিউনিসিপিলিটির কর্মীরা সেগুলো নিয়ে নির্ধারিত জায়গায় ফেলবে। ওরা সকলেই স্কুলের ছাত্র/ছাত্রী। ৫ম শ্রেনী থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত। নদীর তীরের ময়লা আবর্জনাও পরিস্কার করছে। তবে ময়লা আবর্জনার পরিমান অতি সামান্য। প্রত্যেকটি দলের নেতৃত্বে আছেন একজন করে শিক্ষক। শিক্ষকগন রঙিন ছাতা মাথায় দিয়ে ছাত্র/ছাত্রীদের কাজ দেখভাল করছেন। আমরা ওদের সাথে আলাপ করি। ছাতা মাথায় দাঁড়ি থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করি সে কোন ক্লাশের ছাত্রী । মেয়েটি সলজ্য হাসিতে জানালো ছাত্রী নন তিনি শিক্ষক। আক্কেল গুরুম! আসলে জাপানী মেয়েদের বয়স বুঝা বেশ কঠিন কাজ। জানালেন শহরের প্রত্যেকটি স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীরা বছরের একদিন পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে ছাত্র/ছাত্রীদের সচেতন করাই অভিযানের মূল লক্ষ্য। নগর কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই কাজটি করে থাকে। কোন জোড় জবরদস্তি নেই, নিজ দায়িত্বে স্বেচ্ছায় তারা এধরনের কাজে অংশ গ্রহন করে গৌরব বোধ করে। পৌর কর্র্তপক্ষ কেবল কাজটি সমন্বয় করে। শিশুদের মধ্যে কোন আলস্য কিংবা ফাঁকিবাজি দেখিনি। অবশ্য আলস্য কিংবা ফাকিঁবাজি শব্দটিই বোধ হয় জাপানের সংস্কৃতিতে নেই। যে কাজের সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলেছে তা না দেখলে বুঝানো যাবেনা। সকলে মনের আনন্দে কাজ করে যাচ্ছে হাসি মুখে। কয়েকটি দল নদীর তীরে বিশাল বিশাল ছায়া বৃক্ষের নীচে দাঁিড়য়ে পরবর্তী করনীয় জেনে নিচ্ছে দলনেতার কাছ থেকে। আমরা বেশ কয়েকটি গ্রুপের সাথে ছবি তুলি। বাংলাদেশের নাম শুনেছে কিনা জানতে চাইলে প্রায় সকলেই স্মিত হেসে না সূচক জবাব দেয়। কেবল একজন শিক্ষিকা পেলাম যিনি বলেন তিনি বাংলাদেশের নাম জানেন। কারন তার ভাই একটি আর্ন্তজাতিক সংস্থার কর্মী হিসেবে বেশ কিছুদিন ঢাকায় ছিলেন। আমি তাকে বাংলাদেশে আসার নিমন্ত্রণ জানালে খুশী হন। একটি দৃষ্টি নন্দন সেতু হযো নদীর দু’পারকে যুক্ত করেছে। আমরা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নদীর ও দুপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করি। এক পাশে কিউটো শহর অন্য পাশে নয়নাভিরাম সবুজ পাহাড় । পাহাড়ী নদীর কলধ্বনীতে চিত্তে প্রানচাঞ্চল্য জাগে।সেতুর উপর দাঁড়িয়ে অসংখ্য ছবি নিই। অনেক পর্যটক রিভার ক্রুজে মেতে আছে। হযো নদীর রিভার ক্রুজ বেশ জনপ্রিয়।
নদীর তীর থেকে শহরের দিকে ঢুকি। অসংখ্য দোকানপাট রাস্তার দুপাশে। নানা রকম ট্র্যাডিশনাল আইটেম সাজিয়ে রেখেছে। বড় রাস্তা থেকে ভিতরের দিকে অনেকগুলি সরু রাস্তা গিয়েছে। রাস্তার দুপাশে আবাসিক এলাকা। পুরোনো ষ্টাইলের বাড়ীঘর। কোমর সমান উচুঁ দেয়াল ঘেরা। বেশীর ভাগ একতলা বাড়ী। কাঠের কিংবা পাথরের তৈরী। বাড়ীগুলি আয়তনে খুব বড় নয়। প্রায় বাড়ীর ভেতরেই ফুলের বাগান। অনেক বাড়ীর গেইটেও লতা গুল্ম ও ফুলের সমাহার। রাস্তা বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। ঐতিহ্যবাহী বাড়ী ঘর দেখার জন্য পর্যটকরা এখানে আসে। আবার কয়েক শতাব্দী পুরোনো অনেক সামন্ত প্রভু বা রাজ রাজাদের বাড়ীঘরও আছে। সেগুলিকে যতœসহকারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে কিউটোবাসী বেশ সচেতন।
একটি রাস্তার মুখে দেখি একটি রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। রিক্সাটি বেশ জমকালো। রিক্সার সিটে এক অশিতিপর বৃদ্ধা ও দুপাশে তার দুজন নাতি নাতিœ বসে আছে। বৃদ্ধা মহিলাটি বেশ হাস্যেজ্জ্বল। বেশ মায়াবী চেহারা। খুব সুখি বলে মনে হলো। কিশোর বয়সের নাতি নাতনিরাও বেশ হাসিখুশি। গাইডের মাধ্যমে ওদের সাথে কথা বলি। ওদের সাথে ছবি তুলি। জানতে পারলাম রিক্স্রা কিউটো শহরের ঐতিহ্যবাহী যানবাহন। একসময় চলাচলের অন্যতম বাহন ছিলো, এখন কেবল সৌখিন লোকেরা কিংবা বিদেশী পর্যটকেরা রিক্সায় চড়ে শহর পরিভ্রমণ করে। এছাড়া জাপানের গ্রাম এলাকা থেকে যারা কিউটো আসে তাদের কাছে অন্যতম আকর্ষনীয় ইভেন্ট হলো রিক্সায় চড়া। একটি প্রথা বেশ প্রচলিত আছে যে কোন জাপানী মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে দাদী বা নানীসহকারে রিক্সায় চড়ে শহরের কোন মন্দিরে এসে প্রার্থণা করে। এতে নাকি বিবাহিত জীবন সুখের হয়। বুঝা গেলো কুসংস্কার কেবল আমাদের দেশেই নয় জাপানের মতো উন্নত দেশেও আছে –এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও!
পুরোনো শহর দেখে আমরা বিখ্যাত আরাশিয়ামা বাঁশ বাগানে(অৎধংযরুধসধ ইধসনড়ড় ঋড়ৎবংঃ)) প্রবেশ করি। এটি কিউটো অঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। জীবনে বাশ ঝাড় দেখেছি এন্তার কিন্তু বাঁশ বাগান কখনো দেখিনি । যদিও পাঠশালাতে পড়ার সময় যতীন্দ্র মোহন বাগচি’র লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘কাজলা দিদি’তে পড়েছিলাম ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ,মাগো আমার শোলকবলা কাজলা দিদি কই”। কিন্তু সেটা শুধু কবিতার চরনেই সীমাবদ্ধ ছিলো বাস্তবে দেখিনি। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে এলোমোলোভাবে বাঁশের ঝাড় লক্ষ্য করা যায় হর হামেশা। কিন্তু এমন সাজানো বাশের বাগান মনে হয় আর কোথাও নেই। বাগানের ভিতর দিয়ে দীর্ঘ সরু রাস্তা। শত শত পর্যটক সে রাস্তা দিয়ে দল বেধে হেটে চলছে। দু’পাশে বাঁশের ঘন সারি। মনে হয় লক্ষ লক্ষ বাঁশ দাড়িয়ে আছে মাথা উচুঁ করে। সুনসান নিরবতা। বাশগুলি বেশ লম্বা,সরু এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানো। বাঁকা কিংবা নুয়ে পড়া কোন বাশ নেই। অনেকটা সমআকৃতির । নেই কোন ‘আইখ্যা’। এক সহকর্মী রশিকতা করে বলেন জাপানীরা সরল বলেই ওদের দেশে আইখ্যাওয়ালা বাশ নেই। আর আমরা গরল বলেই আমাদের দেশে এত আইখ্যাওয়ালা বাঁশের ছড়াছড়ি! রাস্তা কখনো উচুঁ কখনো নীচু। রাস্তার দুপাশে হালকা ফেন্সিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক পর্যটক আবার টেক্সি ক্যাব চড়েও বাগান ভ্রমণ করছে। অনেক কিশোর/কিশোরী বাই সাইকেলে চড়েও ভ্রমন করছে। কিন্তু বিন্দুমাত্র বিশৃঙ্খলা নেই। বাগানের ভিতরে এক অনাবিল শান্তি যেন বিরাজমান। এখানকার বাশ দিয়ে নানা রকম হস্ত শিল্পজাত সামগ্রী তৈরী করা হয়।
টেনরুজি মন্দির(ঞবহৎুঁ –লর ঞবসঢ়ষব) ঃ
বাঁশ বাগান দেখার পর যাই এতদাঞ্চলের প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির টেনরুজি দেখতে। মন্দিরটি একটি মনোরম বাগানের মধ্যে অবস্থিত। সৌন্দর্যপ্রিয় জাপানী রাজন্যবর্গ তাদের ধর্মীয় স্থাপনাতেও নান্দনিকতার ছাপ রেখেছেন। কেবল স্থাপত্যকৌশলেই নয় প্রাকৃতিক দিকটাকেও তারা সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সামন্ত রাজা অংরশধমধ ঞধশধঁলর ১৩৩৯ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে ১৩৪৫ সালে সম্পন্ন করে। এক সময় এখানে রাজপ্রাসাদ ছিলো। তখনকার জাপানী রাজন্যবর্গ ও সামন্ত প্রভুদের দুর্গ ও মন্দির নির্মাণের বাতিক ছিলো বেশ। এ নিয়ে রাজায় রাজায় প্রতিযোগীতা হতো কে কত বড় ও কত সুন্দর মন্দির ও দুর্গ নির্মাণ করতে পারেন। সেগুলি ছিলো তাদের শৌর্য বীর্যের প্রতীক। বিশাল এলাকা ব্যাপী মন্দিরের অবস্থান। এর আয়তন ৩ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গমিটার। প্রধান ভবনটি ছাড়াও অসংখ্য ছোট বড় ভবন রয়েছে। কোনটি কাঠের তেরী , কোনটি বিভিন্ন পাথরের তৈরী। তবে সবগুলি ভবনই প্রার্থনার জন্য নয়। অনেক ভবন হল সদৃশ। কোনটি টিচিং হল, কোনটি লেকচার হল,মেডিটেশন হল, তাহুডেন হল, কিচেন ইত্যাদি। যাজক বা ধর্মগুরুদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয় এমন দুটি ভবনের নাম অহোজো ও কহোজো। মন্দিরের পূর্ব পাশে কাঠ ও পাথরের তৈরী দুটি রাজকীয় তোড়ণ দেখে সহজেই মন্দিরের মর্যাদা অনুমান করা যায়। তোড়নের উপর গৌতম বুদ্ধের মূর্তি ও ড্রাগনের পেইন্টিং সযতেœ স্থাপন করা আছে। তোড়ণ দুটির নাম ঈযড়শঁংযর মধঃব ও ঈযঁসড়হ মধঃব ) জাপানী ভাষায় এমন কঠিন নামগুলি মনে রাখা মোটেও সম্ভব নয়। এ কৃতিত্ব টিম লিডার আবদুল হামিদ স্যারের। তিনি সব সময় আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থানগলিরর নাম লিখে রাখার জন্য । আমি অনেক সময় তাই করেছিলাম বলে লিখতে সহজ হচ্ছে। এই মন্দির অসংখ্যবার অগ্নিকান্ডের শিকার হয়েছে । আর ১৮৬৪ সালে হয় মারাতœক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার । বর্তমান যে অবস্থায় আছে তা মেইঝি শাসকগন তৈরী করেন। তবে দৃষ্টি নন্দন বাগানটি মন্দিরের আকর্ষন বৃদ্ধি করেছে বহুলাংশে। রাজা মহাশয় এতদাঞ্চলে মহামতি বুদ্ধের বাণী প্রচারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রাচীন কিউটোর ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো এ মন্দিরকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করেছে।
টেনরুজি মন্দির থেকে বের হয়ে পাহাড়ী সরু পথ বেয়ে বিখ্যাত গোল্ডেন টেম্পলের দিকে এগিয়ে যাই। পথের দুধারে পুরোনো ষ্টাইলের বাড়ীঘর দেখতে পাই। অনেক দোকানপাটও রয়েছে রাস্তার দু’পাশে। দোকানগুলিতে হরেক রকম ট্র্যাডিশনাল আইটেমে ঠাসা । বিদেশী পর্যটকরা কেনাকাটায় ব্যস্ত। জাপানী সহকর্মী জানালেন এখানকার ট্র্যাডিশনাল মিষ্টি ও চা না খেলে কিউটো ভ্রমণই বৃথা হয়ে যাবে। তিনি একটি ষ্টলে নিয়ে গেলেন। কাঠের তৈরী ছোট্ট ঘর। তবে সামনের কাঠের তোড়ণ বেশ সাজানো। খুব সাধারন মানের বেঞ্চ ও টেবিল পেতে রেখেছে। দোকানটি চালান দুজন বয়স্কা মহিলা। এখানে নানা রকম মিষ্টি ও চা পাওয়া যায়। মহিলা দুজন মালকিন- কাম ওয়েটার। আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। কিন্তু পরিবেশনার গতি খুব ধীর। কোন তাড়াহুড়া নেই। আমরা গ্রীন টি ও হারবাল টি’র অর্ডার দিই, সঙ্গে মিষ্টি। বিভিন্ন রকমের তাজা সবুজ পাতা বাটির মধ্যে রেখে গরম পানি ঢেলে হারবাল টি তৈরী করে পরিবেশন করে। গ্রীন টি ও অনেকটা অনুরুপ। মিষ্টি দেয় চায়ের কাপের মতো একটি পাত্রে। চামুচের পরিবর্তে এক ধরনের কাঠি দিয়ে মষ্টি খেলাম। স্বাদ অনেকটা আমাদেও দেশের রসগোল্লার মতো। হারবাল টি কিছুটা তেতো তবে এক ধরনের বন্য ফ্লেবার ছিলো যা তৃপ্তিদায়ক। মহিলারা খুবই স্বল্পভাষী, জাপানী ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানেনা। আমরা আকারে ইঙ্গিতে কথা বললে কেবল হেসেছেন ¯েœহময় ভঙ্গিতে।
স্বর্ন মন্দির (এড়ষফবহ ঞধসঢ়ষব) ঃ ঐতিহ্যের স্মারক
কিউটোর সবচেয়ে আকর্ষনীয় ও দর্শনীয় স্থান হলো গোল্ডেন টেম্পল। বলা যায় যেকোন পর্যটকের প্রথম পছন্দ হলো গোল্ডেন টেম্পল। পাহাড়ের মধ্যখানে একটি ছোট্ট লেকের পাশে তিনতলা মন্দিরটি সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো। লেকের চারপাশে নজরকাড়া বাগান। মন্দিরের সামনে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। একটি রাস্তা ধরেই সকলে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু নেই কোন কোলাহল কিংবা হইচই। সকলেই মন্দিরকে সামনে রেখে ছবি তুলছে । আমরাও অনেক ছবি তুলি। রাস্তার দুপাশে নানান রকমের ফুল গাছের সারি। রাস্তাটি একে বেঁকে পাহাড়ের উপর উঠছে এবং স্থানে স্থানে মনোরম স্পট যেখানে ছবি তুলতে সকলেই ব্যস্ত। রাস্তায় প্রচুর দর্শণার্থীর ভিড়। একেবাওে চুড়ায় মহামতি বুদ্ধের ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে। সামনে মোমবাতি জ্বালানো হচ্ছে পূণ্য লাভের আশায়। দর্শণী দেয়ারও ব্যবস্থা আছে । তবে কালেকশন করার কেউ নেই। স্বেচ্ছায় একটি কালো সিন্ধুকের মধ্যে ফেলা যায়। একজায়গায় প্রচুর ধোঁয়ার ব্যবস্থা করা আছে পূণ্যে লাভের আশায়। পাশেই একটি বিশাল ঘন্টা স্থাপন করা আছে । দর্শণার্থীরা ঘন্টা বাজায় সোয়াব কামানোর আশায়। আমরাও ঘন্টার চেইন ধরে টান দিয়ে পূন্যি লাভের অংশীদার হওয়ার কোশেশ করি! তারপর পাথরের তৈরী দীর্ঘ সিড়ি বেয়ে নীচে নামি। এখানে একটি জমজমাট শপিং সেন্টার রয়েছে। আমরা টি শার্টসহ নানা রকম হস্তশিল্পজাত দ্রব্যাদি ও স্যুভেনির কেনাকাটা করি।
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছিল, কোথায় লাঞ্চ করবো সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হয়। এখানে কোন ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে নেই। অনেক ঘুরাঘুরির পর পেলাম মেকডোনালস। ঢুকলাম সেখানে। কি খাবো এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো ফিস বার্গার ,ভেজিটেবল বার্গার ও স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ পর্ব সারতে হবে। কিছুটা স্বস্তি পেলাম সকলে হালাল খাবারের ব্যবস্থা আছে দেখে। কিন্তু হা হতোম্মি! মাংসের আইটেম না থাকাতে পর্কের ভয় কেটে গেলো বটে কিন্তু নতুন উপদ্রবের আর্বিভাব ঘটলো । আকবর সাহেব ও শাহাদাৎ সাহেব জানালেন কি তেল দিয়ে খাবারগুলো তৈরী করা হয়েছে তা জানা দরকার ! ফ্রন্ট ডেস্কে বসা মেনাজার গোছের জাপানী যুবকটিকে যখন আকবর সাহেব জাপানী ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন কিসের তেল দিয়ে রান্না হয়েছে গোল বাধলো তখনই। অনেক কাগজপত্র ঘেটেও যুবকটি নিশ্চিত হতে পারেনি উদ্ভিজ্য তেল নাকি প্রাণীজ তেল দিয়ে রান্না হয়েছে। সে কোন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। সকলের ক্ষুধা এমন পর্যায়ে পৌছায় যে হালাল হারাম খুঁজে বের করার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। তখন বাধ্য হয়ে কিছুটা সংশয় নিয়েই বার্গার ও কোকাকোলার অর্ডার দিয়ে জটপট লাইন ধরে টেবিলে বসে বসে যাই। তৃপ্তির সাথে খাওয়া দাওয়া শেষ করে উঠার সময় দেখি দুই প্যাকেট অতিরিক্ত রয়ে গেছে। এক সহকর্মী ওগুলো সাথে নিয়ে নেন রাস্তায় খাওয়া যাবে বলে। কিন্তু বাড়লো কিভাবে ? কেউ কিছু বলছেনা। পরে বুঝতে পারি আকবর সাহেব ও শাহাদাৎ সাহেব খাননি। কিন্তু তারা আমাদের বুঝতে দেননি! উপোস থেকেও কোন অনুযোগ করেননি। তাদের সহনশীলতা ও নিজ বিশ্বাসের প্রতি দৃঢ়তা দেখে অভিভ’ত হয়ে যাই। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়।

আকাশি-কাইকিউ সাসপেনশন ব্রীজ ঃ সেতু নির্মাণে প্রযুক্তির যাদুকরী
সকাল সকাল নাস্তা করে রওয়ানা হই কুবে শহরেরর দিকে। বাহন লিমোজিন। উদ্দেশ্য বিখ্যাত সাসপেনশন ব্রীজ আকাশি কাইকিউ (অশংযর -কধরশুড়) দেখা। সেতুটি পার্ল ব্রীজ নামেও পরিচিত। কোবে প্রিফেকচার ও আওয়াজি দ্বীপের মধ্যখানে সেতুটির অবস্থান। ব্রীজটি পরিচালনার জন্য রয়েছে ঐড়হংঁ-ঝযরশড়শঁ ইৎরফমব অঁঃযড়ৎরঃু নামে একটি সংস্থা। বোধ করি এটাকে অনুসরণ করেই আমাদের দেশে বড় বড় সেতু নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছিল যা আজ সেতু বিভাগ নামে কাজ করছে। এ ব্রিজ দেখার শানে নযুল হলো আমরা জাপানে এসেছি বিভিন্ন ধরনের সেতু নির্মাণের উন্নত কৌশল,উন্নত প্রযুক্তি ও নির্মাণ কৌশল ও নির্মান সামগ্রি সচক্ষে দেখা ও ধারনা লাভ করা এবং কিভাবে আমাদের দেশের সেতু বিশেষ করে র্নিমাণাধীন ২য় কাঁচপুর,মেঘনা ও গোমতি সেতুতে কিভাবে কাজে লাগানো যায় তা সরজমিনে দেখা। আকাশি প্রনালীর উপর নির্মিত ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ১২ হাজার ৮শ ৩১ ফুট, উচ্চতা ৯শ ২৮ ফুট। মোট লেনের সংখ্যা ৬ এবং সাথে আছে ৪টি ইমার্জেন্সি লেন। এত প্রশস্ত ও উচুঁ সেতু আর কখনো দেখিনি। বেশি উচ্চতার কারন হলো সেতুর নীচ দিয়ে অসংখ্য বৃহদাকার যাত্রী ও পণ্যবাহি জাহাজ চলাচল করে। এত বড় ব্রীজে মাত্র তিনটি স্প্যান এবং সবচেয়ে বড় ও কেন্দ্রীয় স্প্যানটির দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৫৩২ ফুট। এটি সাসপেনসন ব্রীজেরর ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেন্ট্রাল স্প্যান হিসেবে স্বীকৃত। সেতুটিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য রয়েছে ২টি টাওয়ার যাদের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৯শ ২৮ ফুট। তাপের কারনে দিন শেষে সেতুটি প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। ব্রিজটির ডিজাইনার ছিলেন বিখ্যাত স্থপতি সতশি কাশিমা(ঝধঃড়ংযর কধংযরসধ)। তিনি এমনভাবে ডিজাইন করেন যাতে এখানদিয়ে বয়ে যাওয়া ৮০ মিটার/সেকেন্ড বায়ু প্রবাহকে মোকাবেলা করতে পারে । তদুপরি ৮.৫ রিক্টার স্কেলের প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভুমিকম্পকে সহ্য করার মতো শক্তিশালীও করতে হয়। নির্মাণের সময় প্রকৌশলীদের নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হয়। জাপানের সবচেয়ে ব্যস্ততম শিপিং লাইন আকাশি প্রনালী যেন বিন্দুমাত্র বাঁধাগ্রস্থ না হয় সেদিকটার প্রতি প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখতে হয়েছে তাদেরকে। ডিজাইনারকে মতিগতিহীন আবহাওয়ার মেজাজ মর্জির প্রতিও দৃষ্টি রাখতে হয়েছিলো। টাইফুন,হারিকেন,সুনামী ও ভুমিকম্প কোনটি এই প্রনালীতে হয়নি বা নেই? সবই আছে সবই ছিলো। ফলে সকলের ভয়ঙ্কর রুপের বা অগ্নিমূর্তির কথা বিবেচনায় নিয়েই এ বৃহৎ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা জাপানী প্রকৌশলীরা কোন বিদেশী প্রযুক্তির সহায়তা নেয়নি। নিজস্ব টেকনোলজি ব্যবহার করেই এত বড় প্রকল্প সফলভাবে সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সেতু ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত জাপানী প্রকৌশলীগন বেশ গর্বের সাথেই উচ্চারন করেন উপস্থাপনার সময়। ্এশীয় হিসেবে আমরাও এ গৌরবের অংশিদার। জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত উন্নাসিক ইউরোপ -আমেরিকার চেয়ে এশিয়া কম কিসে? এশীয় উন্নয়নের নেতৃত্বের আসনে জাপান আরো দীর্ঘদিন থাকবে বলেই অনেকের ধারনা।
সেতুটি নির্মানের পেছনে একটু ইতিহাস আছে । আকাশি প্রনালীটি প্রস্থে প্রায় ৪কিলোমিটার ও এর গভীরতা ১১০ মিটার। প্রনালীটি খুবই খর¯্রােতা যার ¯্রােত ৪.৫ মিটার/সেকেন্ড। এ প্রনালী পৃথিবীর ব্যস্ততম জলপথ। আকাশি প্রনালী জাপানের টাইফুনপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। ঝড়ের গতিবেগ প্রায়শই ঘন্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটারে পৌছে যায়। যাত্রীবাহী জাহাজ ও ফেরীর জন্য এ প্রনালী পার হওয়া ছিলো বেশ বিপদজনক। সত্যি বলতে কি এটি ছিলো জাপানের সবচেয়ে বিপদজনক জলপথ(ডধঃবৎ জড়ঁঃব)। দু’পারের মধ্যে পারাপারের ব্যবস্থা ছিলো ফেরী সার্ভিস। আর ফেরী চলাচলে দুর্ঘটনা লেগেই থাকতো। ১৯৫৫ সালে মারাত্মক ঝড়ের কবলে পড়ে দু’টি ফেরী ডুবে ১৬৮ জনের সলিল সমাধি ঘটে যার মধ্যে শতাধিক ছিলো নারী ও শিশু। এমনতর ঘটনায় জনগনের ক্ষোভ বাড়তে থাকে এবং সাথে সাথে আকাশি প্রনালীর উপর সেতু নির্মাণের দাবীও জোরদার হতে থাকে । জনদাবী ও বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্দি করে অবশেষে একটি সাসপেনসন ব্রীজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহন করে। হনসু প্রিফেকচারকে শিকোকু প্রিফেকচারের সাথে রেল ও সড়ক পথে সংযুক্ত করতে ঐড়হংযঁ-ঝযরশড়শঁ ইৎরফমব চৎড়লবপঃ নামে একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহন করে। ওটি ছিলো তখনকার সময়ে জাপানের সর্ববৃহৎ প্রকল্প । বলা যায় ফাস্ট ট্র্যাক বা ফ্ল্যাগশীপ প্রজেক্ট। প্রথমে পরিকল্পনা ছিলো মিক্সড অর্থাৎ একই সাথে রেল ও সড়ক সেতু নির্মানের । কিন্তু পড়ে নানা কারীগরি দিক বিবেচনা করে রেল চলাচলের প্রভিশন বাদ দেয়া হয়। দীর্ঘ সমীক্ষার পর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৮৮ সালের মে মাসে। প্রায় ১০ বছর লেগে যায় নির্মান কাজ শেষ করতে। ১৯৯৮ সালের বসন্তকালে যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি উন্মক্ত করা হয়। এটি ছিলো ঋতুরাজ বসন্তের উপহার! একটু ভাবুনতো জাপানের মতো দেশের যদি ১০ বছর লেগে তাহলে আমাদের মতো দেশের কত বছর লাগতো! এখানে ঐকিক নিয়মে অঙ্ক কষে বোধ হয় সময় বের করা যাবেনা। এতে করে এ বৃহৎ প্রকল্পটির বড়ত্ব ও গুরুত্ব দুটিই উপলব্দি করা যায়। খরচ হয়েছিলো ৫০০ বিলিয়ন ইয়েন। তবে হিসেবী জাপানীরা এ টাকা টোল আদায়ের মাধ্যমে সমন্বয় করার পদ্ধতি বের করে ফেলে। বর্তমানে দৈনিক গড়পরতা ২৩ হাজার গাড়ী সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করে । প্রতিটি গাড়ীকেএকবার সেতু পার হতে হলে দুহাজার তিশ টাকা টোল দিতে হয়। বছরে রাজস্ব আয় হয় সাড়ে ১৯ বিলিয়নের মতো। পরিবহন সেক্টরে রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে সেতুটি। তাছাড়া সেতু ও সংলগ্ন দু’পার এখন জাপানের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র । সেতুর কারিগরী কৃৎ কৌশল ছাড়াও এর দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্যশৈলী ও সেতুর উপর থেকে উসাকা উপসাগর ও চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায় এখানে । রাতে এ সেতু এক মোহনীয় রুপ ধারন করে। জাপানীদের দূর দৃষ্টি থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। আমরা সেতু পার হয়ে অপর পাড়ে আজওয়াজি দ্বীপ শহরে যাই। সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে দুপারে। সেখানে একটি চমৎকার রিসোর্টে নামি। রিসোর্টে শপিং মল ও রেষ্টুরেন্টসহ নানা রকম আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা রয়েছে। বৃক্ষরোপন করে পরিবেশটিকে আরো মোহনীয় করা হয়েছে। সাগরের তীরে বাঁধ দিয়ে দৃষ্টি নন্দন করা হয়েছে। বাঁধের পাশে ফুল প্রেমিক জাপানী ঐতিহ্য অনুসরণ করে আকর্ষনীয় বাগান সৃজন করা হয়েছে। আমাদের দেশেও বোধ হয় তাদের ইচ্ছেতেই যমুনা সেতুর ( বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু) পূর্ব পাড়ে যমুনা রিসোর্টেও সুন্দর বাগান করা হয়েছ। বাঁধে দাঁিড়য়ে উসাকা উপসাগর ও সেটু সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করি। সাগরের অপর পাড়ে সুউচ্চ পাহাড়ের দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সেতু পার হয়ে আমরা কুবে শহর প্রান্তে ফিরে আসি। নীচে নেমে ব্রিজ এক্সিভিশন সেন্টারে ঢুকি। এটি আসলে ব্রিজ সংক্রন্ত সায়েন্স মিউজিয়াম। এখানে সেতুটির নির্মাণ ইতিহাস, কিভাবে কত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে এ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে ,এর কারিগরী,আর্থিক, ব্যবস্থাপনা ও নান্দনিক দিক সম্পর্কে একটি চমৎকার প্রেজেন্টশন দেখানো হয়। তারপর সেতুর নীচে স্থাপিত ইৎরফমব গধরশড় গধৎরহব চৎড়সবহধফব নিয়ে যাওয়া হয়। এটি ছিলো এক বিস্ময়কর প্রমোদ ভ্রমণ! সেতুর নীচ দিয়ে টিউব আকৃতির বিশাল রাস্তা। রাস্তাটি তারের জাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে যাতে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে। রাস্তা থেকে থেকে সাগরের নজরকাড়া সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় ,সঙ্গে বাড়তি হিসেবে হিমেল বায়ু¯œান। এখানে আছে চমৎকার শপিং মল। সুভেনির শপ,কফি শপসহ রকমাররি দোকানপাট। একটি সেতুর নীচে এমন স্থাপনা নির্মান করা যেতে পারে তা ধারনা করাও কঠিন। উন্নত প্রযুক্তি ও উন্নত রুচির জাপানীদের পক্ষেই কেবল তা সম্ভব।
সেতু পারাপারের সময় ওসাকা বে ও সেটু সাগরে অসংখ্য বড় বড় জাহাজের চলাচল দেখতে পাই। এ প্রনালীটি দিয়ে প্রতিদিন ১৪০০ বড় জাহাজ চলাচল করে। দুটি সাগরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। এটি একটি আর্ন্তজাতিক চ্যানেল হিসেবে স্বীকৃত। মেরীটাইম ট্রাফিক সেফটি এ্যক্ট দ্বারা সুরক্ষিত। আবার মৎস সম্পদের জন্যও এলাকাটির খ্যাতি রযেছে গোটা জাপান জুড়ে।
আমরা যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা বলে যেখানেই যাই সেখানকার সড়ক নেটওয়ার্কের প্রতি খেয়াল করি। সচেতনভাবেই সড়কের নির্মান কৌশল, সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। জাপানের অধিকাংশ সড়ক বেশ প্রশস্ত(কোথাও ৪ লেন,কোথাও ৬ লেন কোথাওবা ৮ লেন)। নির্মান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনাও আমাদের তুলনায় উন্নত। আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার পাশে আবশ্যিকভাবে সাউন্ড বেরিয়ারের ব্যবস্থা রযেছে। ট্রাফিক সিষ্টেম সম্পূর্ণরুপে ডিজিটাইজ্ট। আর নাগরিকরা বা পথচারীগনও ট্রাফিক আইন মেনে চলে শতভাগ। ফলে একদিকে যেমন যানজট নেই অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনার হারও প্রায় শুন্যের কোটায়। কোন যানবাহন থেকে হর্ণ বাজানোর শব্দ কানে আসেনি। কি চমৎকার শৃঙ্খলা।
জাপানীরা পরিশ্রমী জাতি এটা আমরা জানি বই পুস্তক ও পত্র পত্রিকা পড়ে সেই স্কুল জীবন থেকেই। কিন্তু কতটা পরিশ্রমী তা সচক্ষে না দেখলে কিংবা কর্ম উপলক্ষ্যে জাপানে বসবাসকারী স্বদেশীদের কাছ থেকে না শুনলে বুঝা উপলব্দি করা যেতোনা। শিতোশি ইউজিন সাহেবের বয়স অনুমান ৭৫ বছরের উপর হবে। দীর্ঘদেহী এই ভদ্রলোক আমাদের লিমুজিন চালক। নেভি ব্লু প্যান্টের উপর ধবধবে সাদা ফুল শ্লিভ শার্ট ও গলায় লাল রঙের টাই পরিহিত কেতা দূরস্ত লোকটিকে দেখেই বুঝতে পারি জাপানীরা কতটা পরিশ্রমি। কানসাই এয়ারপোর্ট থেকে ওসাকার হোটেলে আমাদের ১২ জনকে নিয়ে আসে। আমাদের সকলের যথেষ্ট পরিমান লাগেজপত্র উঠানো ও নামানোর কাজটা তিনি একাই করেন। আমাদের কেউ কেউ সাহায্য করতে চাইলে তিনি স্মিত হেসে ক্ষমা চান! কর্তব্য পালনে তার বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই।
জাপানী অফিসিয়ালদের অধিকাংশই ফর্মাল ড্রেসে থাকতে পছন্দ করেন বলে মনে হয়েছে। তাদের আনুষ্ঠানিক ড্রেস মনে হয় সাদা শার্ট নেভি ব্লু প্যান্ট ও লাল টাই,কখনো কালো টাইও দেখেছি। প্যান্ট সবসময় ইন করে পড়ে। আর অধিকাংশেরই মনে হয় কালো চুল! তাদের চুল কি কখনো সাদা হয়না ! শুনেছি তারা কালো চুলই বেশী পছন্দ করেন বিধায় অন্য কোন রঙ মাখেননা। রমনীরাও পোষাক পরিচ্ছেদে বেশ শালীন ও রুচিশীল। তাদের চলাফেরায় একটি সভ্য জাতির প্রতিফলন দেখা যায় সর্বত্রই। তারা খুবই ভদ্র ও বিনয়ী। যেখানেই গিয়েছি তাদের ভদ্রতা ও বিনয়ের ছাপ লক্ষ্য করেছি। সর্বদা হাসিমুখে থাকে। গোমরামুখো কোন জাপানীকে দেখিনি। ‘আরাইয়াস্তু গোজাই মাস্ত’ বলে সধন করা তাদের রীতি। বিদায় বেলা মাথা নীচু করে সন্মান জানানোর ভঙ্গিটি সত্যিই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিক। উপকার করার জন্য যেন তারা সর্বদা মুখিয়ে থাকে। ধরুন কোন রাস্তা ,শপিং মল কিংবা অফিস আদালতের ঠিকানা জানতে চাইলেন কোন জাপানী পথচারীর কাছে, তিনি তখন তা চিনিয়ে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্ঠা করবেন। আপনাকে সেখানে পৌছে দিতে পারলেই যেন তিনি শান্তি পাবেন এমন অভিব্যাক্তি চেহারায় ফোটে উঠে। একদিন রাস্তায় বেরিয়ে এক জাপানী পথচারীর কাছে একটি শপিং মলের লোকেশন জানতে চাই। লোকটি প্রানপনে চেষ্টা করেন জায়গাটির ধারনা দিতে। কিন্তু কিছুতেই সঠিক লোকেশনটি খুঁজে পাচ্ছিলেননা, ইতোমধ্যে আরো ৩/৪ জন এসে জড়ো হয় এবং তারাও নানা রকম কসরত করেন। তারপর একজন তার ব্যাগ থেকে একটি যন্ত্র বের এর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে এক গাল হেসে হ্যান্ডসেক করে বিদায় নেন।আমি তাদের আন্তরিকতা দেখে বিস্মিত হই । তবে অতিমাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভর। আমরা যেমন ঢাকা শহরের যেকোন স্থান অনেকটা অবলীলায় বলে দিতে পারি তারা তা পারেনা। জিপিএস ঘাটাঘাটি করতে হয় হর হামেশা। মনে প্রশ্ন জাগে অতিমাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভরতা স্মৃতি শক্তি হ্রাস করছে কি?
জাপানীরা খুব সহনশীল বলে মনে হয়েছে। কাউকে কখনো রাগারাগি কিংবা বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে দেখিনি। কিংবা উচ্চ স্বরে কথা বলতে শুনিনি,কাউকে মোবাইল ফোনে কথা বলতেও দেখিনি। তাহলে কি তারা মোবাইল ফোনে কথা বলেনা?অবশ্যই বলে প্রয়োজন হলে ,তবে খুব কম কথা বলে, অপ্রয়োজনীয় কোন কথা কিংবা খেজুড়ে আলাপের সময় কোথায়? তারা তো কাজকেই প্রাধান্য দেয়,কাজের সময় গল্পে মেতে থাকার অবকাশ নেই মোটেও। সেখানে গল্পের সংস্কৃতি নয়, কাজের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বেশীর ভাগ সময় তারা ক্ষুদে বার্তা আদান প্রদানের মাধ্যমে কাজ সেরে নেয়। অফিস সময়ে অপ্রয়োজনীয় ফোন রিসিভও করেনা। আবার অফিস সময়ের পরে অফিসিয়েল বিষয়ে কারো সাথে আলাপ করেনা। তারা সর্বদা নিয়মকে অনুসরণ করে।
জাপানে অফিস আদালতে ও শপিং মলে আদর আপ্যায়নের কোন ধুম নেই। এমনকি চা বিস্কিটেরও তেমন কোন প্রচলন দেখিনি। আমরা যে ক’টি অফিসে গিয়েছি তারমধ্যে একমাত্র ঙৎরবহঃধষ ঈড়হংঁষঃধহঃং এষড়নধষ (ঙঈএ) সদর দপ্তর ছাড়া আর কোথাও চা পানের রেওয়াজ দেখিনি। তবে তারা সবাইকে এক বোতল ঠান্ডা পানি সরবরাহ করতে মোটেও কার্পণ্য করেনা। তাদের ধারনা আদর আপ্যায়নের মাধ্যমে অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়। অফিস কোন অতিথিশালা কিংবা ক্লাব নয়, কর্মের জায়গা। মিটিং এর সময় খানাপিনার এন্তেজাম করলে কাজের ব্যাঘাত ঘটে। আমাদের দেশে অফিস আদালতে বহুল প্রচলিত রেওয়াজ হলো মিটিং সিটিং মানেই হলো ইটিং এন্ড ড্রিংকিং। অনুসঙ্গ হিসেবে সস্তা খেজুড়ে আলাপতো থাকবেই। আমাদের শপিং মলগুলোতেও এন্তার খানাপিনার রীতি আছে। খুব ভালো করে চা সিঙ্গারা সমুচা স্যান্ডউইচ বার্গার কিংবা কাবাব খাইয়ে দু নম্বরি পণ্য গচিয়ে দিতে বাঙ্গালীর(ঘটি বাঙ্গালসহ!) জুড়ি নেই। ওরা ক্রেতাকে ঠকানো দূরে থাক ঠকানোর চিন্তাও করেনা। শপিং মলে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, দামদর করলেও কোন বিরক্তি প্রকাশ করেনা (যদিও অধিকাংশই ফিক্সড প্রাইসের দোকান) । কিন্তু চীন কিংবা ব্যাংককের বিক্রেতারা রীতিমত দুর্ব্যবহার করে। একসময় আমাদের ঢাকার গুলিস্তানের ব্যবসায়ীদের দুর্ব্যবহারের খুব দুর্নাম ছিলো । আর বঙ্গবাজার ও হকার্স মার্কেটগুলির কথা যত কম বলা যায় ততই মঙ্গল। তাদের টিকা টিপ্পনী ও খিস্তি খেউড় শুনলে কানে তালা দিতে হয়। তবে ইদানিং নাকি তারা খানিকটা ভদ্র হয়েছে! আমাদের কয়েকজন ধার্মিক সহকর্মী নামাজ জামাতে পড়ার পক্ষপাতি ছিলেন । কিন্তু জাপানের অফিস আদালত কিংবা শপিং সেন্টারেও তো আর মসজিদ নেই। জামাত পড়বেন কোথায়? তাহলে উপায় কি? যেকোন এক কোনায় সঙ্গে আনা চাদর কিংবা গামছা বিছিয়ে তারা জামাতে নামাজ আদায় করে নিতেন, কেউ কিছু বলতোনা চলাচলে খানিকটা বিঘœ ঘটলেও। মনে মনে ভাবী তারা কত সহনশীল। আর আমরা সামান্যতেই বিগরে যাই। মতের অমিল হলেই শালিনতার সীমা লংঘন করি। আমাদের নিজ দেশ, প্রতিবেশী মহান ভারত কিংবা শান্তির দূত সুচির মিয়ানমারে কি এমনটা সম্ভব?
নান ইন(ঘধধহ ওহহ) ঃ কোবে শহরের রসনা বিলাস কেন্দ্র
আকাশি সেতু দেখার পর আমরা কুবে শহরে যাই। নির্ধারিত এক জায়গায় বাস রেখে খানিকটা সময় এদিক সেদিকে ঘুরাফেরা করি। শহরটাকে দেখি । কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি আসার কারনে দৌড়ে একটি রেষ্টুরেন্টে আশ্রয় নিই। পাকিস্তানী রেষ্টুরেন্ট, নান ইন । ইংরেজী,উর্দু ও জাপানী এই ভাষাতেই রেষ্টুরেন্টের নাম লেখা আছে। ইন্ডিয়ান ও পাকিস্থানী খাবারের জন্য নান ইন এর খ্যাতি নাকি পুরো শহর জুড়ে। লোভনীয় মোগলাই খাবারের আয়োজন দেখেই জিবে পানি আসে। আয়তনে ছোট্ট রেষ্টুরেন্টের চেয়ার টেবিল দখল করে বসি আমরা। এক ভদ্রলোক বসে খাচ্ছিলেন ,চেহারা দেখে পাকিস্তানী বলেই মনে হলো। আমাদের এক সহকর্মী কৌতুহলবশত তার নামধাম ,সাকিন মায় কোন ধর্মের লোক তাও জানতে চেয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সন্মুখীন হয়। ভদ্রলোক রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যান এবং আর কখনো এমনতর প্রশ্ন না করার আদেশ জারী করেন। আমরাতো অবাক! কে না জানে যে বাঙ্গালী মানেই কৌতুহলপ্রবণ। সব কিছুই জানতে চায় । ভ্রমণকালে পাশের যাত্রীর নামধামসহ চৌদ্দ গোষ্ঠির ঠিকুজি উদ্ধার করতে না পারলে মনে শান্তি পায়না। তিনি কোথায় যাবেন কার বাড়ীতে যাবেন কি উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন বাড়ীর মালিক তার কেমন আত্মীয়,সেখানে কত দিন থাকবেন ইত্যাদি সকল বিষয়ই তার জানা চাই ! সহযাত্রী বিরক্ত হলেন কিনা সেটা দেখার সময় কোথায়! তিনি তো আর বেনিয়া ইংরেজ বা ফিরিঙ্গি নন যে, এড়রহম ভধৎ? বলেই ক্ষেমা দিবেন! সহকর্মীটি হয়তো ভেবেছিলেন শ্মশ্রুমন্ডিত মোহতারাম সম্ভবত তার দ্বীনি ভাই বা একই মিল্লাতের বেরাদর এবং তার জিজ্ঞাসায় খুশী হবেন মনে করেছিলেন! যাহোক তাকে বেশ কয়েকবার সরি বলে কোন রকমে নিভৃত করা হলো। পরে ম্যানেজার সাহেবের কাছ থেকে জানা গেলো তিনি আহমদীয়া মুসলিম,সাকিন ভারতীয় পাঞ্জাবের কাদিয়ান নামক শহরে। উচ্চ শিক্ষিত, এখানে ব্যবসা বানিজ্যে নিয়োজিত কয়েক দশক ধরে। এ রেষ্টুরেন্টের নিয়মিত খদ্দের। গাল গল্প মোটেও পছন্দ করেননা । এক অজানা কারনে উপমহাদেশীয় লোকদের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব আছে।
রেস্তোরার মালিকের নাম আসলাম ঘানি। পাঞ্জাব মুলুকের বাসিন্দা। একমাত্র কর্মচারী শেখ রিজওয়ান উদ্দিনের সাকিন কোলকাতার যাকারিয়া স্ট্রীটে। কি অদ্ভুত মিল! চির শত্রু দু দেশের দুজন বাসিন্দা মিলে একই ছাদের নীচে সুদূর জাপান মুল্লুকে একটি রেষ্টুরেন্ট চালাচ্ছেন! অবশ্য এমন উদাহরন পরে আরো দেখেছি। তো আমরা বেশ ক্ষুধার্থ থাকায় এবং খানিও খুব লোভনীয় হওয়ায় দ্রুত অর্ডার দেয়া হলো । কিন্তু একজন কর্মচারীর পক্ষে ১৩ জন বাঙ্গাল কাষ্টমারের খাবার সরবরাহ করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। যদিও অবস্থা বেগতিক দেখে ম্যানেজার সাহেব নিজেও হাত লাগিিেছলেন এবং এমনকি শেষতক আমাদের কয়েকজনও হাত লাগান। খাবার সুস্বাদু হওয়ায় পরিতৃপ্তির সাথে আহার পর্ব শেষ করি। মুরগি ও খাসির গরম কাবাবের সাথে গরম নান রুটি বেশ উপাদেয় ছিলো। আমাদের খাওয়ার পরিমান দেখে কোলকাতার ঘটি রিজওয়ানের তো ভিমরি খাওয়ার অবস্থা। সে কেবল ছেঁকে ছেঁকে রুটি নামাচ্ছে আর দিচ্ছে। তার চোখ ছানাবড়া এমনকি ভোজনে পটু বলে সুনামের অধিকারী পাক ভাই ঘানি সাহেবও তাজ্জব বনে যায়! ভেতো বাঙ্গাল এতো খানাপিনা জানে নাকি! মজার ব্যাপার হলো আমাদের জাপানী সহকর্মী দুজনও খাওয়া দাওয়ায় বেশ বাহাদুরী দেখান! কর্মচারী রাখতে এত কিপ্টেমি কেন জিজ্ঞেস করতেই ঘানি সাহেব এক গাল হেসে বলেন একজন কর্মচারীর পেছনে অনেক ব্যয়, লাভ করতে হলে কম জনবল দিয়েই করতে হয়। জাপানে উপমহাদেশীয় সকল রেস্তোরার একই অবস্থা। কম লোক বেশী কাজ। এটা তাদের ব্যবসায়িক পলিসি। আমাদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
রেষ্টুরেন্ট থেকেই জানা গেল রেষ্টুরেন্টের অদূরেই একটি মসজিদ আছে এবং কোবে শহরের একমাত্র মসজিদ। শুধু তাই নয় এটিই জাপানের প্রথম মসজিদ। আমরা কয়েকজন গেলাম মসজিদটি দেখতে। এক গম্বুজ ও দুটি মিনারসহ খুব সুন্দর দুতলা মসজিদ। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন্ মেজের মধ্যে দামী কার্পেট বিছানো। জানালায় দামী কাচঁ লাগানো। আমরা দু রাকাত কছরের নামাজ আদায় করি। বেশ কয়েকদিন পর মসজিদে নামাজ আদায় করতে পেরে এক ধরনের প্রশান্তি লাভ করি। মসজিদের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন খুব সুন্দর। সাদা মার্বেল পাথরের দেয়ালে কারুকার্য খচিত সোনালী পেইন্টিংস। বৃহদাকারের সোনালী ঝাড়বাতি ঝুলানো আছে। নীচ তলায পুরুষদের ও দুতলায় মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা। পাশেই ইসলামিক কালচারাল সেন্টার। সেখানে অনেক বই পুস্তক সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আরবী, উর্দু ও জাপানী ভাষায়। মসজিদের সামনে কয়েকটি গাড়ী ও এ্যাম্বুলেন্স পার্ক করে রাখা আছে। আছে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রও। দরিদ্র ও অসহায়দের বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা দেয়া হয়। কোন মুসলিম মারা গেলে দাফন কাফনের ব্যবস্থাও তারা করেন। বুকসেলফ এর মধ্যে অনেক ্ইতিহাস ঐতিহ্যের ও মসজিদ নির্মাণ ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে পত্র পত্রিকা ও বই পুস্তক আছে। জাপানে আমরা আর কোন মসজিদে যাইনি। তাই মসজিদ সম্পর্কে যা জানতে পারলাম সে সম্পর্কে একটু বলে নিই। আগেই বলেছি এটি জাপানের প্রথম মসজিদ। নির্মান কাজ শেষে ১৯৩৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। জাপানী, তুর্কি ও ভারতবর্ষের মুসলমানেরা ১৯২৮ সাল থেকে চাঁদা তুলে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঐতিহ্যাহী স্থাপত্য শৈলীতে মসজিদটি নির্মান করা হয়। মজার ব্যাপার হলো মসজিদের নির্মাতা বা নকশাকার কোন মুসলিম নন। তিনি ছিলেন ঔধহ ঔড়ংবভ ঝাধমৎ নামে চেক দেশীয় এক স্থপতি। তিনি ছিলেন সে সময়কার নামকরা স্থপতি। যোশেফ সাহেব জাপানে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন করে খ্যাতি অর্জন করেন। দুটি অবিশ্বাস্য বা অলৌকি ঘটনায় এ মসজিদের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমটি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোবে শহর মিত্র বাহিনী বিশেষত মার্কিন বিমান হামলায় ধুলিসাৎ হয়ে যায়/ ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো কোবের এই মসজিটি। দেয়ালে সামান্য কয়েকটি আচঁর ও দয়েকটি জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যাওয়া ছাড়া আর কোন ক্ষতি হয়নি। অথচ আশেপাশের সকল বিল্ডিংই বোমার আঘাতে ধুলিসাৎ হয়ে যায়। অলৌকিকভাবে মসজিদটি অক্ষত থাকে। দ্বিতীয় উদাহরন হলো ১৯৯৫ সালে ভয়ঙ্কর ভুমিকম্প। সে ভুমিকম্পের তান্ডবে কোবে শহরের সকল বিল্ডিং ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলেও মসজিদের কোন ক্ষতি হয়নি? দুটি ঘটনা নিয়ে যুক্তি পাল্টা যুক্তি আছে। অনেকের অভিমত এর বেজমেন্ট ও কাঠামো বিশেষভাবে তৈরীর কারনেই এমনটা হয়েছে। অন্যদের অভিমত হলো এর চেয়ে অনেক শক্ত ও উন্নত প্রযুক্তির তৈরী দালানকোঠা ধ্বংষ হলেও এটা কেন হলোনা। কারণ একটাই মহান আল্লাহই একে রক্ষা করেছেন।
রাতে প্রিন্স হোটেলে জাপানের ঐতিহ্যবাহী ডিনারে অংশ গ্রহন করি। বিশেষভাবে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী জাপানী খাবারের এলাহি কান্ড। খাবার পরিবেশনা ও ঐতিহ্যবাহী জাপানী পোষাকে সজ্জ্বিত পরিবেশনকারী মেয়েদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হই। কাটা চামচের পরিবর্তে জাপানী ষ্টাইলে কাঠি দিয়ে খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। কাঠি ব্যবহারে আমরা অনভ্যস্থ বিষয়টি বুঝতে পেরে ওরা আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। বলা যায় আমাদেরকে ট্রেনিং দেয় কিভাবে কাঠি দিয়ে খেতে হয়। প্রায় কুড়িটির অধিক আইটেম ছিলো। নানা রকমের ছোট মাছ ছিলো, ছিলো কাকড়াসহ কিছু সামুদ্রিক মাছ। তবে হালাল খাবারের বিষয়ে তারা যথেষ্ট সচেতন ছিলো।

শহর টোকিওঃ আধুনিক জাপানের রাজধানী
১৭ মে সকালে প্রিন্স হোটেলে নাস্তা সেরে যাত্রা করি রাজধানী শহর টোকিও পানে। বুলেট ট্রেনে ২ ঘন্টা ১০ মিনিটে পৌছে যাই টোকিও শহরে। আস্তানা শিনজুকু ওয়াশিংটন হোটেল। পাঁচতারকা হোটেল কিন্তু রুমের আয়তন দৃষ্টিকটুভাবে ছোট।ওসাকার হোটেল হাংকাইয়ুর মতো। আমাদের দেশে সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের রুমগুলো ছোট করে তেরী করতে পূর্ত বিভাগের লোকজন যেমন করিৎকর্মা, এখানকার হোটেল মালিকরা/নির্মাতারাও বুঝি এমনি। মনে হয় ওদের মাঝে অলিখিত বন্ধুত্ব আছে! ফ্রেস হয়ে বিকেলে বের হই ঙৎরবহঃধষ ঈড়হংঁষঃধহঃং এষড়নধষ (ঙঈএ) সদর দপ্তরে। মূলত: ওসিজিই কেএমজি(কগএ) ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের মূল কনসালটেন্ট। আমরা ওদের আমন্ত্রনেই প্রশিক্ষণে এসেছি। আমাদের সঙ্গে থেকে গাইড হিসেবে যিনি কাজ করছেন মি.শানজি ইউশিহারা মূলত ওসিজির ডেপুটি ডাইরেক্টর। তিনি বাংলাদেশ থেকে আমাদের সাথেই এসেছেন। এডমিন অফিসার মিস আই কিমুরা()। সদর দপ্তরের একটি কনফারেন্স হলে মি. শানজি ও তার একজন সহকর্মী কেএমজি নির্মাণ প্রকল্পের উপর যে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টশন উপস্থাপন করেন তা ছিলো বেশ তথ্যবহুল। প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরী দিকের সচিত্র উপস্থাপন ভালো লেগেছিলো। আমাদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নেন। তারপর গেলাম ওসিজির প্রেসিডেন্ট মি. ইজি ইউনেজাওয়া() সাহেবের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। হাসি খুশি মানুষ। মাথা নুইয়ে সহাস্যে স্বাগত জানান। বিনয়ের অবতার। আসলে ওসিজি একটি বিশাল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বজুড়ে এর খ্যাতি। ওখানে যারা বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন তাদের যোগ্যতাও বেশ উচুঁমানের। ওখানে দেখা হলো ওসিজিতে কর্মরত একজন বাংলাদেশী তরুন প্রকৌশলী পল্লব দেবনাথের সাথে । তিন বছর যাবৎ ওসিজিতে কর্মরত আছেন। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৯ সালে পাশ করে জাইকায় যোগদেন । তারপর ওসিজিতে। প্রসেঞ্জিত ঘোষ নামে আরও একজন বাংলাদেশী প্রকৌশলী এখানে কাজ করছেন বলে জানালেন। আমি হাসতে হাসতে বলি আপনাদের মতো মেধাবী প্রকৌশলীরা যদি দল বেঁেধ বিদেশে চলে আসেন তাহলে দেশের উন্নতি হবে কিভাবে? তিনি জানালেন দেশে কাজ করলে নানা ধান্দাবাজি ও অনিয়মের সাথে জড়িত থাকতে হয় যা বিবেকে বাঁধে। এখানে অনিয়ম দুর্নীতির কথা কেউ কল্পনাও করেনা। জানালেন এখানে বেশ ভালো আছেন। মাহিনা পাতি অনেক বেশী। যোগ্যতা থাকলে কদর আছে। বিদেশী বলে কোন বৈষম্য নেই। উপরে উঠার সিড়ি উন্মুক্ত। কেবল দরকার যোগ্যতা ও নিষ্ঠার। আমাদের টিমের বেশ কয়েকজন তার পূর্ব পরিচিত। আন্তরিকতাপূর্ণ আলাপ যেন শেষ হয়না। পল্লবের নিবাস চট্টগ্রামের শীতাকুন্ড উপজেলায়। সেখান থেকে বিদায় নেয়ার পথে আবার কনফারেন্স রুমে ঢুকতে হলো আপ্যায়িত হওয়ার জন্য ! বলে কি আপ্যায়ন! একটি কমলা ও এক বোতল পানি ছিল তখন মহার্ঘ। কেউ কেউ স্বগতোক্তি করলেন এক কাপ কফি হলে কতইনা ভালো হতো! নীচে নেমে খানিকটা পথ হেটেই একটি শপিং মলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলাম । ইতিমধ্যে মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেলে । করিৎকর্মা শাহাদাৎ সাহেব মার্কেটের এককোনায় খালি জায়গা পেয়ে জামাতের ব্যবস্থা করে ফেলেন। তার ইমামতিতে ছয়জনের নামাজ পড়া শেষ হয়। মার্কেটের ভিতর অনেকগুলি রেষ্টুরেন্ট। ওসিজির পক্ষ থেকে একটি ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে আমাদের সন্মানে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে । হোষ্ট ওসিজির ম্যানেজার মি. শিন হিসাদা()। হিলটন হোটেলের নীচ তলায় অবস্থিত রেষ্টুরেন্টের নাম অশোকা। নিঃসন্দেহে ভারতীয় নাম। ফ্রন্ট ডেস্কে বসা ম্যানাজার সাহেব আমাদের স্বাগত জানিয়ে প্রত্যেকের হাতে একটি করে ভিজিটিং কার্ড দেন। ভদ্রলোকের নাম দ্বিজিন্দ্র সিং ভারমা,মাদ্রাজী ব্রাহ্মণ। জানালেন ১৯৬৮ সাল থেকে রেষ্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। একটি বিষয় খেয়াল করলাম বিদেশে ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টের প্রায় সকল মালিকই ব্রাহ্মণ গোত্রীয়। এমনকি দিল্লী- আগ্রা কিংবা জয়পুরে দেখলাম রেষ্টুরেন্ট মালিক ব্রাহ্মণ। কিন্তু আমাদের দেশে কোন বামুন ঠাকুর রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা করছে বলে কখনো শুনিনি। আমার এক পরিচিতি ব্রাহ্মণ বন্ধুকে জিজ্ঞেস করতেই বলেছিলেন যারা রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা করে ওরা আসলে পাচক ব্রাহ্মণ। ওরা নীচু জাতের ব্রাহ্মণ। উচুঁ জাতের ব্রাহ্মণ কখনো এমন বৃত্তিতে নিয়োজিত হয়না। যাকগে ওসব জাতপাতের কথা। রেষ্টুরেন্টে ওয়েটার সাকুল্যে ৫জন। তাহির হুসেন ও কামাল উদিন হায়দ্রাবাদের,কিরণ সিং ওরিষ্যার ও বিশালদেহী মিস বার্ণিকা আফ্রিকার ঘানার বাসিন্দা। পরিবেশনার নমুনা দেখে বুঝ গেল নারায়ন সেবায় তারা খুবই পটু এবং আন্তরিক। বিভিন্ন পদের ভারতীয় খাবারের আয়োজন। তান্দুরী,দোসা,লুচি,পরোটা, নান,ভেজিটেবল,ছোলে ভটোরা,চিকেন ফ্রাই, খাসির কাবাব,বিরানী মায় দইসহ আরো কত কিছু। আর সফট ও হার্ড ড্রিঙ্কস জাতীয় নানা রকমের পানীয়তো ছিলই। তৃপ্তির ঢেকুড় তুলে বিদায় নিলাম অশোকা থেকে। আবারও আসার নেমন্তন্য জানিয়ে মি. ভারমা দুহাত জোড় করে নমস্কার জানালেন। সোজা হোটেল কক্ষে গা এলিয়ে দিলাম। দৈনিক ওয়াশিংটন পোষ্টে চোখ বুলাতে বুলাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি মনে নেই।
টোকিও শহরে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। সকালে বের হলাম সদলবলে জাপানের রাজার বাড়ী দেখবো বলে। রাজপ্রাসাদের সামনে গিয়ে জানলাম কর্তৃপক্ষ আগের নিয়ম পরিবর্তন করেছে। এখন প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ নিষেধ। বাহির থেকেই দেখতে হয়। অনেক সবুজ গাছপালা ভিতরে। রাজপ্রাসাদের সামনে বিশাল খোলা জায়গা। সেখান থেকেই রাজ প্রাসাদের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। বেশ কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে শহরে ফিরে আসলাম। রাজবাড়ীতে প্রবেশ করতে না পেরে কিছুটা আফসোস থেকে গেলো । তবে একরাতে হোটেলে শুয়ে শুয়ে টেলিভিশন দেখছিলাম । হঠাৎ দেখি রাজা ও রাজপ্রাসাদ নিয়ে নির্মিত একটি ডকুমেন্টারী দেখাচ্ছে। আগ্রহের সাথে পুরো ডকুমেন্টারীটি দেখলাম। খুব ভালো লাগলো । রাজার দৈনন্দিন জীবনও দেখালো। খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করেন রাজা মহাশয়। তিনি খুব দয়ালু । দেখলাম নিজ হাতে গোশালায় ঢুকে গাভীকে খড় খাওয়াচ্ছেন। রাজার চেহারায় সারল্য খুব ভালো লাগে। যাকগে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো।
টোকিও স্কাই ট্রি()ঃ টাওয়ার নির্মানে নব সংযোজন
রাজবাড়ী থেকে অনেকটা গলাধাক্কা খেয়ে রওয়ানা হই মূল শহরের দিকে। টোকিও শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান স্কাই ট্রি()। আসলেই দর্শনীয় স্থান। এমন যাদুকরী স্থাপনা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এটি আসলে ইট,বালি,পাথর ও ষ্টিলের সমন্বয়ে তৈরী একটি সুউচ্চ টাওয়ার। এ টাওয়ারের ব্যবহার বহুমুখি। এটি টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এর উচ্চতা ৬৩৪ মিটার বা ২০৮০ ফুট। এর শীর্ষে এন্টেনা লাগানো। টাওয়ারটি দেখতে অনেকটা বৃক্ষের মতো। এর উচ্চতা এতটাই বেশী যেন আকাশ ছুঁতে চায়। নীচের অংশ ত্রিকোনাকৃতির হলেও পর্যায়ক্রমে বৃত্তাকার রুপ ধারন করে। একেবারে উপরের অংশ সুচালো আকৃতির। ৩৫ তলা টাওয়ারের ৩টি ফ্লোরের অবস্থান মাটির নীচে। ১৩ টি অত্যাধুনিক ও দ্রুতগতি সম্পন্ন লিফট/ এলিভেটর ক্লান্তিহীনভাবে দর্শকদের উঠানো নামানোর কাজটি করে যাচ্ছে বিরতিহীনভাবে। অদ্যাবধি এক মিনিটের জন্যও লিফট অচল হয়নি। রয়েছে দুটি অবজারভেটরী ডেক। প্রথমটি ১১৫০ ফুট ও দ্বিতীয়টি ১৪৮০ ফুট উচ্চে। ডেকগুলি বেশ সুপরিসর,প্রথমটিতে ২০০০ ও দ্বিতীয়টিতে ৯০০জন লোক একসাথে অবস্থান করতে পারে। বাংলাদেশী ২৮২০ টাকায় টিকেট কেটে উঠে গেলাম লিফটে। ৩৫০ মিটার উচুঁতে একটি বিরতিস্থল। নামলাম সেখানে। গোলাকৃতির ডেকের চার পাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে গোটা টোকিও শহর দেখা যায়। একদিকে বিশাল সমুদ্র। শহরের ভিতর দিয়ে বেশ কয়েকটি নদী বয়ে গেছে। ডেকের পাটাতন স্বচ্চ পুরু গ্লাসের তৈরী যার উপর দাঁড়িয়ে নীচে রাস্তার সবকিছু দেখা যায়। গ্লাসের তৈরী পাটাতনের উপর জীবনে কখনো দাঁড়াইনি। নীচে তাকাতেই আমাদের অনেকের মধ্যেই ভয় ও এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়, অনেকের পা কাঁপে,অনেকের বুক ধরফর করে। গাইড আই কি মোড়া তা দেখে মিটি মিটি হাসে! আহ কি সুন্দর টোকিও শহর । এমন সাজানো ও জমকালো শহর যা থেকে চোখ ফেরানো যায়না। ডেক থেকে শুধু টোকিও শহরই নয় দূরে টোকিও উপসাগরও দেখা যায়। বিখ্যাত সুমেদা নদী শহরের বুক চিরে এঁেক বেঁকে বয়ে যাচ্ছে আপন মনে,কেউ তাকে বিরক্ত করছেনা। ময়লা ফেলা তো দূরের কথা এক টুকরা কাগজ ফেলার কথাও কেউ কল্পনা করেনা। ফলে সুমেদা তার আত্মমর্যদা নিয়ে সগৌরবে বয়ে যাচ্ছে । নাগরিক দায়িত্ব কাকে বলে তা জাপানীদের কাছ থেকে শেখা দরকার। শহরের মধ্যে যেমন নদী আছে তেমনি আছে দৃষ্টি নন্দন পাহাড়। তো ডেকের বা বিরতিস্থলে বসে বসে শুধু শহরের রুপ দেখলেই কি মন ভরবে? তাই রসনা বিলাসের জন্য আছে নানা রকমের খাবার দাবার সমৃদ্ধ ফুড কোর্ট । জাপানী ট্র্যাডিশনাল খাবার সুশি থেকে শুরু করে মায় কেএফসি ম্যাগডুনালস এর মজাদার খাবার ও ষ্টারবাক কফিসহ রঙ বেরঙের পানীয় সবই পাওয়া যায়। শপিং করার জন্য দোকানপাটের কোন অভাব নেই এই আকাশ বৃক্ষের পেটে। নজরকাড়া স্যুভেনির নান্দকিভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্যে।
টোকিও স্কাই ট্রি’র নামকরণেরও মজার ইতিহাস রয়েছে এবং এতে জাপানীদের গনতান্ত্রিক মুল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। নির্মানকাজ শুরুর আগেই নামকরণের কাজটি সেরে নেয়।জনগনের মতামতের ভিত্তিতেই তা করে। সেজন্যে কোন কুটতর্ক বা বাহাস হয়নি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে বেশ কয়েক বছর আগে সিলেট হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মানাধীন ভবন ও হলের নামকরণ নিয়ে কি তুলকালাম কান্ডইনা ঘটছিলো। তো ভোটাভোটিতে মোট ৬টি নাম সিলেক্ট হয়। এর মধ্যে টোকিও স্কাইট্রি নামটিই সর্বোচ্চ ভোট পায়। মোট ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোট কাষ্ট হয়। কাষ্টিং ভোটের ৩০ শতাংশ(৩৩ হাজার) পেয়ে টোকিও স্কাইট্রি প্রথম হয় এবং দ্বিতীয় হয় টোকিও এডো টাওয়ার নামটি। কর্তৃপক্ষ প্রথম নামটিই গ্রহন করে। ভোট গ্রহনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্থুল কিংবা সুক্ষè কোন কারচুপির অভিযোগই উঠেনি!
আগেকার দিনে রাজা বাদশাদের যেমন বড় বড় দুর্গ ও প্রাসাদ নির্মার্ণের প্রতি ঝোঁক ছিলো বেশী, আর আধুনিক কালে নানা আকৃতির টাওয়ার নির্মাণের দিকে সরকার ও নগরপতিদের খেয়াল লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে দুনিয়ার কয়েকটি আলীশান টাওয়ারের নাম করা যেতে পারে। যদিও মানে গুনে কিংবা মর্যাদায় একেকটি একেক রকম। দিল্লীর কুতুব মিনার,প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার,কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টাওয়ার বা যুগল মিনার, কেএল টাওয়ার, টোকিও টাওয়ার,চীনের ক্যন্টন টাওয়ার ও হালের দুবাই শহরের বুর্জ আল খলিফা। ২০১২ সাল পর্যন্ত টোকিও স্কাই ট্রি ছিলো দুনিয়ার সব চেয়ে উচুঁ টাওয়ার। কিন্তু কয়েক বছর আগে নির্মিত দুবাই শহরের বুর্জ আল খলিফা স্কাই ট্রি’র মর্যাদা খানিকটা নীচে নামিয়ে দিয়েছে। এখন বুর্জ খলিফাই পয়লা নম্বরে আছে যার উচ্চতা ২৭২২ ফুট। টাওয়ার নির্মানে কত ব্যয় হয়েছে তা কি অনুমান করা যায়? মাত্র ৬৫ বিলিয়ন ইয়েন! স্থপতি নিক্কেন সেক্কী(ঘরশশবহ ঝবশশর) সাহেব বেশ দরদ দিয়ে এই আধুনিক স্থাপনাটির ডিজাইন করেছেন। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উৎকর্ষ ও নান্দনিক স্থাপত্য রীতির এক উৎকৃষ্ট নজীর হলো এই টাওয়ার। কাজ শুরু হয়েছিলো ২০০৮ সালের জুলাই মাসে আর শেষ হয় ২০১২ সালের ফেব্রয়ারী মাসে, উদ্বোধন হয় মে মাসে। জানা গেল নির্ধারিত প্রাক্কলন ও পূর্ব নির্ধারিত সময়েই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। আর আমাদের দেশে হলে কতবার সময় বাড়ানো হতো আর কতবার ব্যয় বৃদ্ধি করা হতো তার কি কোন শুমার থাকতো? ঠিকাদার ছিল ওবায়শি কর্পোরেশন। একই ঠিকাদার আশির দশকে আমাদের মেঘনা ও গোমতি সেতু নির্মাণ করেছিলো।
স্কাই ট্রি থেকে নেমে কিছুটা এগিয়ে হেঁটে হেঁটে দেখলাম টোকিও শহর। একটি আধুনিক ও উন্নত শহরের সকল বৈশিষ্টই আছে। লাঞ্চ করার জন্য বেশ কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট চেকটেক করে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঢুকলাম একটি রেষ্টুরেন্টে। ভাত রুটি সবজি মাছ মাংস সবই আছে। তবে রন্ধন প্রনালীতে বাংলা মায়ের ছাপ নেই। জাপানী ও ভারতীয় মিক্সড ষ্টাইলের। যাক আমরা খুশী হলাম ভাত পাওয়া গেছে বলে, শাহাদাৎ সাহেব ও পাটোয়ারী সাহেব খুশী হলেন হালাল খাবার পাওয়াগেছে এই কম কি। খেলাম ,তবে পরিতৃপ্তির সাথে না হলেও মন্দ ছিলনা । লাঞ্চ সেরে গেলাম শপিং সেন্টারে। রাস্তার দু ধারে অনেকগুলো জমকালো শপিং মল। কি নেই সেখানে,সুই সুতা থেকে এ্যারোপ্লেনের যন্ত্রাংশ সবই আছে! দীর্ঘ সময় ঘুরে শপিং শেষ করি আমরা। এখানকার শপিং মলের কর্মচারীদের ব্যবহার অত্যন্ত অমায়িক, হোক সে জাপানী কিংবা অন্য দেশীয়। এক দোকানে বাংলাদেশী এক যুবকের সাথে দেখা হয়। সে সেলসম্যানের কাজ করে। দাউদকান্দি উপজেলার বাসিন্দা তানভির হোসেন জাপানে এসেছেন ছয় বছর আগে। আহসান উল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনির্ভাসিটির ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জি নিয়ারিং ডিগ্রী নিয়ে শপিং মলে সেলসম্যানের কাজ করে তার তেমন কোন আক্ষেপ নেই। কেননা বছর দুয়েক প্রায় বেকার থেকে বিদেশে পাড়ি জমান। এখানে আছেন বেশ। বেতন ভাতা খারাপনা। ইলেকট্রনিক্সের জিনিসপাতির খুটিনাটি ভালো বুঝেন। তদুপরি জাপানী ভাষা রপ্ত করেছেন ভালোভাবেই । আমাদের যারা এ ধরনের দ্রব্যাদি কেনাকাটা করেছেন সে সহযোগিতা করেছে আন্তরিকতার সাথে। একটি দোকানে পেলাম মধ্যএশীয়ার যুবককে সেলসম্যান হিসেবে। মোহাম্মদ নাজির নামে এ যুবকের দেশ উজবেকিস্তান। নিজ ভাষা উজবেক ছাড়াও জাপানী ও ইংরেজীও ভালো জানেন। বাংলাদেশের নাম শুনেছেন তার এক বাংলাদেশী সহকর্মীর সুবাদে। কেনাকাটায় সেও সাহায্য করে।
স্বল্প সময়ের ভ্রমণে টোকিও সম্পর্কে জ্ঞান(!) লাভ করেছি অতি সামান্যই। তো অর্জিত জ্ঞান থেকে যৎকিঞ্চিত ধারনা দিই। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত টোকিও নামে কোন শহর ছিলোনা। বর্তমান টোকিও শহরের নাম ছিলো এডো (ঊফড়)। তখন প্রতাপশালী রাজান্যবর্গের সময়। এডো নগরীর খুব জৌলুস ছিলোনা, ছোট্ট ক্যাসল শহর হিসেবেই পরিচিত ছিলো। রাজধানী কিউটো ছিলো বেশ জমজমাট শহর। ১৬০৩ সালে টকুগাওয়া আইয়েসু (ঞড়শঁমধধি ওবুধংঁ) নামে এক সামন্ত রাজা ক্ষমতা দখল করে সরকার গঠন করে। তিনি এডো শহরকে জাপানের রাজনীতির কেন্দ্রস্থল হিসেবে গড়ে তোলেন। কয়েক দশকের মধ্যে এডোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্বের একটি জনবহুল নগরীর মর্যাদা লাভ করে এডো। এক পর্যায়ে টকুগাওয়া বংশের পতন ঘটে,ক্ষমতা লাভ করে মেইজি শাসকরা। ১৮৬৮ সালে মেইজি সম্্রাট কিউটো থেকে রাজধানী সরিয়ে এডোতে নিয়ে আসে। তিনি এডোর নতুন নামকরণ করেন ‘টোকিও’ যার অর্থ পূর্বাঞ্চলীয় রাজধানী। শুরু হয় টোকিওর জৌলুস। দিনে দিনে টোকিওর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। কালের পরিক্রমায় টোকিও বিশ্বের একটি জনবহুল ও আধুনিক নগরী হিসেবে পরিচিতি পায়। এ নগরীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভ্রমণ পিপাসু পর্যকটরা বার বার ফিরে আসে এখানে।এ শহরের দৃষ্টি নন্দন ক্যাসল,গার্ডেন,ঐতিহাসিক টেম্পল, জাদুঘর,আকাশ ছোয়া স্কাইট্রি ও টোকিও টাওয়ার,বিস্তৃত সবুজ মাঠ,অত্যাধুনিক শপিং মল,হোটেল,মোটেল,কালচারাল সেন্টার,দৃষ্টিকাড়া চেরী ফুল,মেট্রো রেল,পাতাল রেল, বুলেট ট্রেনসহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি সবকিছুই পর্যটকদের আকর্ষন করে। আমরাও স্বল্প সময়ের ভ্রমণে স্বপ্নময়ী এ নগরীর প্রেমে জড়িয়ে যাই। ছেড়ে আসার সময় পরাণের গহিনে বেদনা অনুভব করি। আবারও টোকিও ভ্রমণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছি। তবে এ নগরীর কষ্টের কথা বলা হয়নি। দু’বার তাকে অবর্ননীয় ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে হয়েছে। ১৯২৩ সালের ভয়াবহ ভুমিকম্পে লন্ডভন্ড হয়ে যায় এ নগরী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালে তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্বর বিমান হামলায় ঐতিহাসিক এ নগরী ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। কিন্তু সংকল্পবদ্ধ ও পরিশ্রমী জাপানীদের পরাজিত করা কি এত সহজ ! তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার ও কঠোর পরিশ্রম করে পুনরায় এ শহরকে একটি আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তোলে। টোকিও শহর আজ বসবাসের দিক থেকে পয়লা নম্বরে।
টোকিও বে অ্যাকুয়া লাইন()ঃ সাগর তলে সুরঙ পথ
জাপানের আরেকটি বিস্ময়কর স্থাপনা হলো টোকিও বে অ্যাকুয়া- লাইন() যার অন্য নাম হলো ট্রান্স টোকিও বে হাইওয়ে()। সাগরের ভিতর দিয়ে গাড়ী চলা এক বিস্ময়কর ঘটনাই বটে। আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে এর ভিতর ঢুকি। এটি আসলে সাগরের তলদেশ দিয়ে একটি সুরঙ পথ বা টানেল। টোকিও উপসাগরের উপর ব্রিজ ও টানেলের সমন্বয়ে গঠিত এই পথ। এই টানেল কানাগাওয়া প্রিফেচারের কাওয়াসাকি শহরের সাথে চিবা প্রিফেকচারের কিসারাজু শহরকে যুক্ত করেছে। টানেল তৈরীর ফলে দুই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল চিবা ও কানাগাওয়ার মধ্যে ভ্রমণ সময় যথেষ্ট পরিমানে হ্রাস পেয়েছে। আগে দুই শহরে যেতে সময় লাগতো দেড় ঘন্টা আর এখন লাগে মাত্র ১৫ মিনিট । এ টানেল যাতায়াতকে খুব সহজ করেছে। আগে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হতো। অ্যাকুয়া লাইনের মোট দৈর্ঘ ১৪ কিলোমিটার, ৯.৬০ কিলোমিটার টানেল ও ৪.৪০ কিলোমিটার ব্রিজ। এটি সাগরতলে নির্মিত বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ টানেল। ব্রিজ-টানেল ক্রসওভার পয়েন্টে একটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরী করা হয়েছে যার নাম উমিহোতারু()। উমিহোতারু হলো সাগরের উপর ভাসমান নগর। এখানে আছে বিশ্রামাগার,শপিং সেন্টার,রেষ্টুরেন্ট,কফি শপসহ আমোদ প্রমোদের রকমারী আয়োজন। দূর থেকে একটি ফেরীর মতো মনে হয়। পাঁচ তলা বিশিষ্ট ডেকের শীর্ষে রয়েছে পর্যবেক্ষণ ডেক। অবজারবেশন ডেকে বসে টোকিও উপসাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করি দীর্ঘ সময় ধরে। ওখান থেকে হানেদা এয়ারপোর্টে বিমান উঠা নামার দৃশ্য দেখা যায়। এমন আচানক স্থাপনা নির্মাণ করা কেবল জাপানীদের পক্ষেই সম্ভব। টানেলে বায়ু সরবরাহের জন্য টানেলের মধ্যখানে একটি টাওয়ার রয়েছে যার নাম কাযে নো টো() বা বাতাসের টাওয়ার()। টাওয়ারটি উপসাগরের স্বাভাবিক বায়ু থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। পাচ তলার প্রথম তিন তলায় গাড়ী পার্কিং এর জন্য নির্ধারিত স্থানে প্রায় ৫০০ যানবাহন পার্ক করতে পারে। চতুর্থ ও ৫ম তলায় রয়েছে যাত্রী ও পর্যটকদের বিশ্রাম, খাওয়া দাওয়া ও বিনোদনের ব্যবস্থা। শপিং শপ, কফি শপ, সুভ্যেনির শপ, রেষ্টুরেন্ট ইত্যাদির চমৎকার আয়োজন। রেষ্টুরেন্টে ট্র্যাডিশনাল জাপানী খাবারের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান মেন্যু’রও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে।ষ্টারবাক কফির স্বাদ নিই এখান থেকে। আমরা টানেল পার হয়ে টানেল মিউজিয়ামে যাই। সেখানে টানেল তৈরীর বিস্তারিত বর্ননা সম্বলিত প্রেজেন্টেশন দেখানো হয়। টানেল নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্নধরনের মেশিন ও যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রাখা হয়েছে । আমরা ঘুরে ঘুরে সেগুলি দেখি। টানেল নির্মাণের কাজটি খুব সহজ ছিলনা।জাপানের মতো উন্নত দেশের শুধু পরিকল্পনা করতেই ২৩ বছর লাগে আর নির্মাণ কজে সময় ব্যয় হয় প্রায় ৯ বছর। ১৯৮৯ সালে শুরু হয় নির্মাণ কাজ । ১৯৯৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণ খরচ পড়ে ১১.২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
টানেল নির্মান পরিকল্পনার সময় যাতায়াত সময় হ্রাস ছাড়াও আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো টোকিও ডাউন টাউনের মধ্যদিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের চাপ হ্রাস করা । কিন্তু টোলের পরিমান বেশী ধার্য করায় সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বহুলাংশে। খরচ কমানোর জন্য অনেক যানবাহন অন্য পথে চলাচল করে। একবার টানেল অতিক্রম করার জন্য টোল বাবদ ৩০০০ ইয়েন গুনতে হয়। ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ঊঞঈ)সিষ্টেমের কারনে টোল প্লাজায় কোন যানজট তৈরী হয়না। তবে শনি রবি ও সরকারী ছুটির দিনগুলিতে মাত্র ১০০০ ইয়েন দিয়েই টানেল পার হওয়া যায়। মানুষের আনন্দে সহায়তা করাই লক্ষ্য বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। আর আমাদের দেশে এর উল্টো ব্যবস্থা।
মাউন্ট ফুজিঃ পবিত্র স্থান
জাপানের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি ফুজি পর্বত। নানা নামে নামে পরিচিত এ পর্বত। মাউন্ট ফুজি, ফুজি সান,ফুজিয়ামা ইত্যাদি হরেক রকম নামে ডাকা হয়। তবে ফুজি শব্দের অর্থ নিয়ে জাপানী পন্ডিতদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে । একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কারো কারো মতে ফুজি অর্থ সম্পদ বা ধনদৌলত(), অথবা প্রচুর(), চিরঞ্জিব(),অশেষ(),অদ্বিতীয়() ইত্যাদি। এই পর্বত শৃঙ্গ জাপানের শিল্প, সাহিত্য,সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। নানা বিষয়ে অনুপ্রেরণা যোগায়। মাউন্ট ফুজি জাপানের ইতিহাসের অংশ ।
মাউন্ট ফুজি আসলে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি । তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমন্ত অবস্থায় আছে। ১৭০৭ সালের অগ্নুৎপাতের পর আর কখনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। জাপানের শীর্ষ তিনটি পর্বতের মধ্যে এটি অন্যতম। এ পর্বত শৃঙ্গ জাপানের ‘ঞযৎবব ঐড়ষু গড়ঁহঃধরহং ’ এর অন্যতম। ধর্মীয় পবিত্র স্থান হিসেবে গন্য করে বেশ ভক্তি শ্রদ্ধা করে জাপানীরা। ফুজির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউনেস্কো ২০১৩ সালে মাউন্ট ফুজিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করে। এ পর্বত শৃঙ্গের অবস্থান রাজধানী টোকিও থেকে ১০০ কিলোমিটর দক্ষিণ পশ্চিমে হনশু দ্বীপে। এর উচ্চতা ১২ হাজার ৩৮৯ ফুট । ফুজি জাপানের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। বছরের বেশীরভাগ সময় পর্বত শৃঙ্গটি বরফে ঢাকা থাকে । আমরা যখন লিমুজিনে করে টোকিও থেকে যাত্রা করি তখন এক অনির্বচনীয় উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। শহর ছাড়ার পর কিছু দূর যেতেই শুরু হয় উচুঁ নীচু আঁকা বাঁকা পাহাড়ী পথ।দু’পাশে উচুঁ পাহাড়ের নান্দনিক দৃশ্যে মন যেন আনন্দে নেচে উঠে। কোথাও পাহাড়ী নদী কোথাও লেক কোথাওবা সুদৃশ্য বাগান আবার কোথাও নানা রকম গাছগাছালীর ঘন ঝোপ নিমিষেই মন কেড়ে নেয়। বেশ খানিকটা পথ চলার পর দূর দিগন্তে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য দৃষ্টিগোচর হয়। ধবধবে সাদা বরফের টুপি পরিহিত এক পর্বত চূড়া যেন আকাশ ছুঁেয় আছে। সবাই আগ্রহ নিয়ে সেদিকে তাকাই। ওটা কি জিনিস সকলেই যখন জানতে আগ্রহী,তখন আই কী মুরা জানালো সেটিই মাউন্ট ফুজি যা দেখার জন্য আমরা যাচ্ছি। ওয়াও এত সুন্দর! খুব কাছে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি নামতে হবে। কিন্তু পথের যেন শেষ নেই! যতই যাচ্ছি ততই কাছে মনে হলেও বাস্তবে ফুজি আরো অনেক দূরে। অবশেষে নামলাম ফুজি পর্বতের পাদদেশে। এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য যেন হাতের কাছে ধরা দিলো! বাস থেকে নেমেই তাকাই উপরের দিকে। বিশাল পাহাড়ের চুড়া বরফে ঢাকা। কোন কোন দিকে মনে হচ্ছিলো বরফ গলে গলে পড়ছে। পাহাড়ে তেমন গাছপালা নেই। লাভার কারনেই কি এমন মরুভুমির মতো লাগছে!যেদিক থেকে তাকাই সেদিক থেকেই পিরামিড আকৃতির পাহাড়কে একই রকম মনে হচ্ছে।কখনো মনে হয় ফুজি যেন গভীর ঘুমে নিমগ্ন। জেগে উঠার কোন লক্ষ্মণ নেই। তিনশত বছর হলো তার কোন সাড়া শব্দ নেই। কিন্তু একবার যদি জেগে উঠে তখন কি হবে তার পাশে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের। কি হবে এমন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের। কি হবে যদি অগ্নিমূর্তি ধারন করে লাভা উদগিরণ করতে শুরু করে! ভাবতেই গা শিহরিয়ে উঠে!আনবিক বোমার চেয়ে জলন্ত লাভার শক্তি কোন অংশেই কম নয়!
পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে অনেক দৃষ্টি নন্দন দালানকোঠা,শপিং সেন্টার,তথ্য কেন্দ্র, রেষ্টুরেন্ট,বিশ্রামাগার, মিনি যাদুঘর ও টেম্পল। শত শত পর্যটকের ভিড়ে এলাকাটি গম গম করছিলো। সকলের দৃষ্টি পর্বত চূড়ার দিকে। ক্যামেরা ও সেল ফোনের ক্লিক ক্লিক শব্দ চারিদিকে। ফুজি পাহাড়ের চারদিকও কম সুন্দর নয়। চারদিকে পাহাড় আর লেক পরিবেশটাকে আরো মনোরম করেছে। আমরা শপিং সেন্টার,তথ্য কেন্দ্র, টেম্পল ও অবজারভেশন টাওয়ারে ঘুরাফেরা করি। টাওয়ারের পাশেই সুন্দর লেক। লেকের ওপারে পাহাড় ও খোলা জায়গা। সুভ্যেনির শপে মাউন্ট ফুজির দৃশ্য সম্বলিত নানা রকম রেপ্লিকা, টি-শার্ট ও ক্যাপ বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। কেনাকাটায় আমরাও অংশ গ্রহন করি। টোকিওতে গরম হলেও ফুজির পাদদেশে তাপমাত্রা ৭/৮ ডিগ্রীর মতো। তীব্র শীত ও প্রবল বাতাসে আমরা কাবু হয়ে পড়ি। গরম চা ও কফি খেয়ে খানিকটা চাঙ্গা হই।
ফুজি শৃঙ্গে আরোহন অন্যতম আকর্ষন। বছরের সকল সময়েই পর্বতারোহীগন এখানে আসে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম সময় হলো জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস। তখন বরফ পড়েনা। পর্বতারোহীগন তখনই ঝামেলাহীনভাবে পর্বত শৃঙ্গে আরোহন করতে পারে। জাপানে স্কুল কলেজ ছুটির সময় ছাত্রদের পর্বতারোহনে হিড়িক পড়ে। তাছাড়া দেশী-বিদেশী পেশাদার আরোহীগন তো আছেই। তথ্যকেন্দ্রের দেয়া বুকলেট থেকে জানা যায় এ পর্যন্ত ৩ লক্ষের অধিক মানুষ এ শৃঙ্গে আরোহন করেছে। উঠতে সময় লাগে ৮ ঘন্টার মতো আর নামতে ৩ ঘন্টা। এ পর্বত শৃঙ্গের প্রথম আরোহী হলেন একজন সন্ন্যাসী যিনি ৬৬৩ সালে আরোহন করেছিলেন। তবে তার নাম জানা যায়নি। পূণ্য হবে এই চিন্তা করেই তিনি দুঃসাহসী অভিযানে নেমেছিলেন। সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই এ পর্বত শৃঙ্গ জাপানীদের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে এবং তখন থেকেই মহিলাদের এ পর্বত আরোহন নিষিদ্ধ করা হয়। তবে মেইঝি রাজত্বকালে এ বিধি নিষেধ উঠে যায়। ১২৯০ সালে পর্বতের পাদদেশে টাইসেকিজি মন্দির কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। ঝরৎ জঁঃযবৎভড়ৎফ অষপড়পশ হলেন প্রথম বিদেশী যিনি এ পর্বত আরোহন করেন। তিনি ১৮৬৮ সালে এ পর্বত শৃঙ্গে পা রাখেন। পরে ঞযব ঈধঢ়রঃধষ ড়ভ ঃযব ঞুপড়ড়হ নামে একটি বৃহদাকারের বর্ননামূলক গ্রন্থ রচনা করেন যা পশ্চিমা বিশ্বে এ পর্বতকে বিস্তারিতভাবে পরিচিত করে। আর বৃটিশ রাষ্ট্রদুত ঝরৎ ঐধৎৎু চধৎশবং এর স্ত্রী খধফু ঋধহহু চধৎশবং হলেন প্রথম বিদেশিনী যিনি এ পর্বত অরোহন করেনে। এ দুঃসাহসী নারী ১৮৬৯ সালে এ কাজটি করে সারা জাগিয়েছিলেন এমন তথ্যই বুকলেটে দেখতে পাই। ভারতীয় উপমহাদেশের কোন ব্যক্তি এ পর্বত আরোহন করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য কর্তা কিছু ‘জানা নেই’ বলে নীরব থাকেন। পর্বতের শীর্ষে একটি রাডার ষ্টেশন রয়েছে যার দ্বারা টাইফুন ও বৃষ্টিপাতের খবরাখবর আগাম পাওয়া যায়। পর্বতের পাদদেশে জাপন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটি রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। এক অজানা কারনে এ পর্বতে উঠে আত্মহননের ঘটনাও ঘটে বিস্তর। এর মধ্যে একটি বড় অংশ তরুন তরুনী। এমন সুন্দর পরিবেশে কেন এমন জীবনবিনাশী কান্ড তা জানতে খুব ইচ্ছে হয়। হতভাগ্যরা কি মৃত্যুকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এমন কাজ করে? নাকি পবিত্র স্থানে মৃত্যুবরণ করে পরলোকে শান্তিতে থাকতে চায়? এর উত্তর হয়তো কেউ জানেনা। মনে মনে ভাবী জীবন বোধ হয় এমনি যার কোন অমরত্ব নেই যার কোন হিসেবে মিলেনা সবসময়। ১৯৬৬ সালে একটি বোয়িং ৭০৭ বিমান ১১৩ জন যাত্রী ও ১১ জন ক্রু নিয়ে পর্বতের কাছে বিধ্বস্ত হয়। ফলে সকলেই প্রান হারায়। ভয়-ভীতি ও সৌন্দর্য পাশাপাশি চলে! হে বিধাতা সৌন্দর্যকে অমরত্ব দাও।
ফেরার পথে একটি ছোট্ট শহরে রেষ্টুরেন্টের পাশে থামি লাঞ্চ করার জন্য। রেষ্টুরেন্টের নাম আলাদিন। সেদিন ছিলো শুক্রবার। অনেকেই ই জুমা’র নামাজ পড়ার আগ্রহ দেখায়,কেননা আগের জুমা পড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু মসজিদ পাবে কোথায়? এমন সময় একটি চীনা পর্যটক দলও থামে আমাদের পাশের রেষ্টুরেন্টে। নারী পুরুষ মিলে প্রায় ২৫/২৬ জন হবে। তারা মুসলিম, নামাজ পড়তে চায় তারাও । রাস্তার পাশেই একটি বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। বাড়ীটি একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর । সেখানেই রুমের ভিতর ও বাহিরে গাদাগাদি করে আমরা নামাজের জন্য দাঁড়ালাম । কিন্তু মুশকিল হলো খোতবা পাঠ নিয়ে। খোতবা কোথায় পাওয়া যাবে? কে পাঠ করবেন কে নামাজ পড়াবেন বা ইমামতি করবেন? সেল ফোন থেকে খোতবা বের করা হলো ,আমাদের সহকর্মী শাহাদাৎ সাহেব ও একজন চাইনীজ মুসলিম যৌথভাবে খোতবা পাঠ ও নামাজ পড়ালেন। এক অভিনব ব্যবস্থা। তবে তথ্য প্রযুক্তির কারনে সব কিছুই যে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে তা বুঝা গেল। তারপর লাঞ্চের পালা। রেষ্টুরেন্টটি মুসলিম পরিচালিত, হালাল খাবার পরিবেশন করে। সাদা ভাত,বিরানী,নান রুটি, সবজি, শিক কাবাব ও মুরগীর কারিসহ নানা রকম মুখরোচক খাবারে ভরপুর। তৃপ্তির সাথে লাঞ্চ সারা হলো।মালিক ওয়েটার জাপানী, ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানী। এখানে তিনচারটি রেষ্টুরেন্ট দেখলাম। পর্যটকরা উপমহাদেশীয় খাবারেরর স্বাদ নিতে পারে অনায়াশে।
জেএফই ষ্টিল মিল
একুয়া বে টানেল দেখে আমরা যাই জেএফই ষ্টিল মিলে। কাঁচপুর,মেঘনা ও গোমতি সেতু নির্মাণে বিপুল পরিমান ষ্টিল ব্যবহার হবে । আর এ মিল থেকেই তা সরবারহ করা হবে। তাই সরজমিনে দেখার জন্যে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় জেএফই ষ্টিল মিলে। জেএফই ষ্টিল কর্পোরেশন জাপানের একটি বৃহৎ কোম্পানী ,একটি যৌথ উদ্যোগ। ১৯৫০ সালে এর যাত্রা। অবশ্য শুরুতে এর নাম ছিলো কাউয়াসাকি ষ্টিল কর্পোরেশন । ২০০৩ সালে বর্তমান নাম ধারন করে। সংস্থাটি মুলত: ষ্টিল প্রোডাক্টস উৎপাদন ও বিক্রয় করে। আমাদেরকে অফিসের ভিতর একটি ছোট কনফারেন্স রুমে নেয়া হয়। সেখানে একজন পদস্থ কর্মকর্তা মিল সম্পর্কে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেন। মিলের ইতিহাস,মিলের ব্যবস্থাপনা,কাঁচামাল, উৎপাদন প্রক্রিয়া ,পণ্যের গুনগতমান সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা,পরিবেশ সংরক্ষন, সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে বর্ননা দেন। তারপর সরজমিনে মিল ও উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখানো হয়। এক বিশাল কর্ম যজ্ঞ । জেএফই বিশ্বের নামকরা ষ্টিল মিলের একটি। পিলার সদৃশ বিশালাকৃতির ষ্টিলের কাঁচামাল জলন্ত অগ্নিকুন্ডের মতো অটোমেটিক মেশিনে ফেলে ষ্টিলেরর পাত তৈরী করা হচ্ছে। একই মেশিনে পানি সরবরাহ করে ঠান্ডা করা হচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে শরীর হিম হয়ে যায়! প্রায় দু’ঘন্টা লাগে মিল ও উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখতে। মিলের সর্বত্রই সবুজ বৃক্ষরাজির সমারোহ। পরিবেশ বাঁচাতে কর্তৃপক্ষ খুবই সচেতন। মিলটি সমুদ্রের তীরে হওয়ায় জল পথেই পন্য সরবারহ করা হয়। বিদায়ের সময় ৪/৫ জন পদস্থ কর্মকর্তা বিদায় জানান। আমাদের বাস না ছাড়া পর্যন্ত মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এমনটাই তাদের সংস্কৃতি।
চেরী ব্লুজমঃ জাপানের সৌন্দর্যের প্রতীক
সবুজ বৃক্ষরাজি ও ফুলে ফুলে সশোভিত জাপানের একটি অন্যতম আকর্ষন হলো চেরী ফুল। জাপানীরা চেরী ফুল খুব ভালোবাসে। পাহাড়ের পাদদেশে, রাস্তার দু’ধারে, বাড়ীর সামনে, অফিস প্রাঙ্গনে কিংবা বিস্তির্ণ খোলা জায়গায় চেরী ফুলের বাগান এক স্বর্গীয় আবহ তৈরী করে। চেরী ব্রুজম জাপানের অন্যতম উৎসব, জাপানের সংস্কৃতির অংশ। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত সময়টা চেরী ব্লজমের উপযুক্ত সময়। আমরা মধ্য মে’তে গিয়েও ওসাকা, কিউটো ও টোকিও শহরে চেরী ফুলের যে সৌন্দর্য দেখেছি তা কখনো ভুলবনা।

টোকিও এসে আমরা বেশীর ভাগ সময় ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টেই খাওয়া দাওয়া করেছি। তবে সব রেষ্টুরেন্টই ইন্ডিয়ান না, অনেক রেষ্টুরেন্টের মালিক পাকিস্তানী । কোথাও কোথাও বাংলাদেশী রেষ্টুরেন্টও আছে। কিন্তু উপায় নেই, পরিচয় দিতে হয় ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট হিসেবে নইলে ব্যবসা লাটে উঠবে। কেননা এখানকার লোক ইন্ডিয়ান রেসিপিই খেতে পছন্দ করে। যদিও রেসিপি পাকিস্তানী কিংবা অন্য দেশের। একদিন সন্ধ্যার পর দূরে যেতে ভালো না লাগায় টিম লিডার হামিদ স্যারের পরামর্শে আমাদের ওয়াশিংটন হোটেলের নীচে গেলাম রাতের খাবার খেতে। গিয়ে দেখি এখানেও বিশাল শপিং মল। রেষ্টুরেন্টের সংখ্যাও কম নয়। ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টেও আছে বেশ কয়েকটি। আমরা কয়েকটিতে ঢুকে খাবার দাবারের অবস্থা পরখ করি। অনেকের সাথে কথা বলি। শেষমেষ বসলাম একটি রেষ্টুরেন্টে, নাম গান্ধী রেষ্টুরেন্ট। খাবার প্রস্তুত হতে খানিকটা সময় লাগবে বলে ম্যানেজার সাহেব আগেভাগেই ভারতীয় ষ্টাইলে দুহাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নেন। খুব বিগলিত চেহারা। বুঝা গেল খদ্দের বাগাতে খুবই পারঙ্গম। তো তার সাথে আলাপচারিতা শুরু হয়ে যায়। ম্যানেজার সাহেবের নাম মোহাম্মদ মর্তুজা, কোলকাতার দীঘার অধিবাসী, এখানে আছেন বছর কুড়ি যাবৎ। মালিক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খানের সাকিন পাকিস্তানের শিয়ালকোটে। রেষ্টুরেন্টের নাম ভারতের জাতির পিতার নামে। হেতু কি জানতে চাইলে বলেন পাকিস্তানী নাম দিলে খদ্দের পাওয়া যাবেনা। খদ্দের পেতে হলে রেষ্টুরেন্টের নামধামে কোননা কোন ভাবে ইন্ডিয়ান ছাপ থাকতে হবে। মালিকের ভাবখানা এমন যে,‘ইন্ডিয়ান নাম যেহেতু দিতে হবে ,তাহলে ভারতের জাতির পিতার নামেই দিই!” এ রেষ্টুরেন্টে নাকি একজন বাংলাদেশীও কাজ করেন। দীর্ঘ ৫ বছর পরে বেচারা দেশে গিয়েছে।
জাপানে প্রিফেকচারের(চৎবভবপঃঁৎব) ছড়াছড়ি। মোট ৪৭ টি প্রিফেকচার রয়েছে । তারমধ্যে ৪৫ টি রুরাল ও ২ টি আরবান। ওসাকা ও কিউটো আরবান, হোক্কাইডো সার্কিট বা টেরিটরী । টোকিও শহর একটি মেট্রোপলিশ প্রিফেকচার। প্রিফেকচার জিনিসটা কি জিজ্ঞেস করলে মিস আইকিমুরা জবাবে বলেন এটি একটি প্রশাসনিক ইউনিট। অন্য দেশে যেমন রাজ্য থাকে, জাপানে এর পরিবর্তে প্রিফেকচার। প্রত্যেক প্রিফেকচার পরিচালনার জন্য একজন প্রিফেক্ট থাকেন। তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।অনেকট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভর্ণরেরর মতো। কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা ও পুলিশেরর দায়িত্ব প্রিফেকচারের নিকট হস্তান্তর করে দেয়। তবে বাজেট ও ট্যাক্সের উপর ষোল আনা কর্তৃত্ব রয়েছে সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্টের। প্রিফেক্ট এর মেয়াদ চার বছর। তিনি জানান চীন এবং ফ্রান্সেও প্রিফেকচার সিষ্টেম চালু আছে। জাপানে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে ১৮৬৮ সাল থেকে। আমার তখন ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে। আমাদের সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে পাচটি ব্লক ছিল। প্রত্যেক ব্লকে একজন হোস্টেল সুপার থাকতেন একজন অধ্যাপক। আর প্রত্যেকে ব্লকে ছাত্রদের মধ্যে থেকে একজন প্রতিনিধি ছিল। তাকে বলা হতো ‘প্রিফেক্ট’। দেশের অন্য কোন কলেজের ছাত্রাবাসে এমন ব্যবস্থা আছে কিনা তা জানা নেই। তো প্রিফেক্ট সাধারনত সিনিয়র ছাত্রদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত বা মনোনীত হতেন। হোস্টেলে বসবাসকারী সকল ছাত্রই তাকে মান্য করতো। কর্মজীবনেও অনেককে গর্ব করে বলতে শুনেছি ‘আমি ওমুক হোস্টেলের প্রিফেক্ট ছিলাম’।

অফিস আদালতে আথিতেয়তা নিয়ে আমাদের মধ্যে বেশ আগ্রহ ছিলো। আমাদের পাশের দেশের দাদাদের কিপটেমী নিয়ে অনেক রসাত্মক গল্প চালু আছে। কিন্তু জাপানে এসে যা দেখলাম তাতে দাদারা উল্লসিত হতে পারেন! কোন অফিসেই এক বোতল পানি ছাড়া অন্য কিছু দেয়ার রেওয়াজ নেই। যুক্তি হলো অফিস আদালত কাজের জায়গা,কর্মস্থল,খানাপিনার মচ্ছবের জন্য নয়। যুক্তির ধার আছে মেনে নিয়েও সহকর্মীরা খুশী নন। আমরা তো বিদেশী মেহমান! বিদেশী পেলে(আর গায়ের রঙ সাদা হলেতো কথাই নাই) আমরা কত আপ্যায়ন করি! ওরা কিনা..! যাক সেকথা । শেষে মেনে নিলাম যে,পারস্পরিক রেওয়াজ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই ভালো। জাপানীদের ন¤্র ও ভদ্র আচরণে আমরা মুগ্ধ । কিন্তু কেন জানিনা চাইনিজ ও কোরিয়ানরা জাপানীদের এত ঘৃনা করে। দু’বার চীন সফরে গিয়ে দেখেছি জাপানীদের প্রতি ওদের ঘৃনার মাত্রা কত তীব্র। এটা সত্য যে কোরিয়া এক সময় জাপানের উপনিবেশ ছিলো, চীনের সাথে তাদের একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় জাপানীরা ওদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছে।

টোকিও শহরে বাংলাদেশী কমিউনিটি ঃ স্বদেশীদের প্রতি উপচে পড়া হৃদয়ের টান
টোকিও,হিরোশিমা,ওসাকা,কোবে ও হোক্কাইডু প্রভৃতি শহরে যথেষ্ট সংখ্যক বাংলাদেশী বসবাস করেন। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে অনেকে সুনাম অর্জন করেছেন। ব্যবসা-বানিজ্যেও অনেকে ভালো করছেন। কেউ কেউ আছেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো সন্মানজনক পেশায়। কর্মক্ষেত্রে কারো কারো দক্ষতা ও বিশ্বস্থতায় খোদ জাপানীরাই মুগ্ধ। দেশের মানুষের এমন সাফল্যের কথা শুনে বুকের ছাতির আকার বেড়ে যায়। আমার ভায়রা ভাই পলাশের বন্ধু ফিরোজ সাহেব থাকেন টোকিও শহরে দেড় যুগ ধরে। তার দুই বন্ধুসহ একদিন বিকেল বেলা চলে এলেন ওয়াশিংটন হোটেলে। দীর্ঘ সময় ধরে ওদের সাথে গল্প করে কাটাই। একজন চাকুরী করেন,অন্য দু’জন ব্যবসা। জানালেন শুধু তারা নন, সকল বাংলাদেশীই বেশ ভালো আছেন এখানে। ফিরোজ সাহেবের সাকিন বিক্রমপুর। জানালেন এখানকার বাংলাদেশীদের বারো আনাই বিক্রমপুরের বাসিন্দা। প্রবাসীদের সমিতি আছে,আছে বিক্রমপুর সমিতিও। স্বাধীনতা দিবস,বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারী ও ঈদ উদযাপন করা হয় সারম্ভরে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির জাপান সফরকালে তাঁকে বিপুল সম্বর্ধনা দিয়েছেন। দূতাবাসের সাথেও ভালো যোগাযোগ আছে। নবাগত রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা আসার পর পরিবেশ আরো ভালো হয়েছে। তিনি খুব আন্তরিক। ফোনে কথা বলিয়ে দিলেন। রাবাব আপা জানালেন মাননীয় প্রধানন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি যে আমার পূর্ব পরিচিত এবং আমার গ্রামেরই সন্তান এ কথা জেনে ফিরোজ সাহেব অনুযোগের সাথে বলেন আগে জানাইনি কেন। হাসতে হাসতে বলি তিনি একজন চৌকষ ডিপ্লোমেট। আশা করি তিনি আপনাদের সাথে আপনজনের মতোই ব্যবহার করবেন। ফিরোজ সাহেব জাপানস্থ বিক্রমপুর সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ সমিতির সাধারন সম্পাদক। তিনি জানান সমিতি ভাঙ্গার জন্য এক গ্রুপ এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেকান সময় অঘটন ঘটতে পারে। সেই পুরোনো কাহিনী। তার সঙ্গী দুজনও উচ্চ শিক্ষিত। তাদের কাছ থেকে প্রবাসী কমিউনিটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। ফিরোজ সাহেবসহ তিনজনই বছরে অন্তত একবার দেশে যান। তারা দেশে কিছু করতে চান। দেশের প্রতি টান আছে ষোল আনা। কিন্তু সেই একই অনুযোগ কেউ সহযোগিতা করেনা। বিনিয়োগ করতে চাইলে আমলাতান্ত্রিক হয়রানীর শিকার হতে হয়। তবু তারা দেশকে ভালোবাসেন, কল্পনা করেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। ইন হাস্ত ওয়াতানাম..এই তো আমার স্বদেশ! তারা আমাদেরকে ডিনার করান নীচের ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্টে। নানা রকম গিফট কিনে দেন,বাচ্চাদের জন্য হরেক রকম চকোলেট। আহা এ নাহলে স্বদেশী হয় কেমন করে!
প্রায় দু’সপ্তাহ কাটিয়ে চরে বসি সিঙ্গাপুর এয়ার লাইন্সের জাম্বো জেটে। নেমেছিলাম কানসাই এয়ারপোর্টে ,বিদায় হই হানেদা বিমান বন্দর থেকে। সিঙ্গাপুরে ট্রাঞ্জিটসহ প্রায় ১৬ ঘন্টা জার্নি করে ফিরে আসি নানা জঞ্জালে ভরা স্বদেশে। কিন্তু মন বলে শান্তি এখানেই, এখানেই!

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫৪৭ বার

Share Button