» শওকত আলীঃ যাঁর সাথে হেঁটেছি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে

প্রকাশিত: ১৩. ফেব্রুয়ারি. ২০১৮ | মঙ্গলবার

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি শওকত ভাইয়ের জন্মদিন।। তাঁর সাথে আমার একটা অদ্ভূত মজার সম্পর্ক ছিলো। অনেকটা গুরুগম্ভীর এই মাস্টার মশাইয়ের সাথে অনেকেই রসিকতা করতেন না। তিনি ছিলেন অমিশুক মানুষ। কিন্তু আমি সেই সুযোগটা নিতাম এবং পেতাম। তিনি লেখক শিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন। তাই ঠাট্টা করে প্রশ্ন করলাম, লেখক শিবির কি জামাত শিবিরের অঙ্গ সংগঠন? তিনি মুচকি মুচকি হাসতেন। বলতেন, ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। বিএ পড়ার সময় কশন নাইনটি টু ৯২-ক ধারায় অ্যারেস্ট হয়ে জেলও খেটেছি!
তিনি সংগীত মহা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাই দুষ্টুমি করে বলতাম, আজ কি রেডিওতে আপনি গান গাইবেন? শওকত ভাই হাসতেন। বলতেন, ভাগ্যিস মেডিক্যাল কলেজে দেয়নি! তাহলে আরো বিপদ ছিলো!
এভাবেই মজা করে আরো বলতাম, আপনি শহীদ পরিবারের সন্তান, আমিও। তবে তফাৎ হচ্ছে, আপনার বাবা ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আমার বাবা এখনো বেঁচে আছেন!
শওকত ভাই অবাক হয়ে বলতেন, তাহলে কি ভাবে শহীদ পরিবারের সন্তান?
-আমার বাবার নাম শহীদুল্লাহ।
এরশাদ আন্দোলনের সময় কবিদের মধ্যে দু’টি গ্রুপ হয়। এরশাদ বিরোধী ‘পদাবলী’ আর এরশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কবিকন্ঠ’। তিনি এসব খবরাখব জানতে চাইতেন। এক পর্যায়ে বলতেন- এই বেটা কবে যাবে?
আমিও রম্য করে বলতাম, এরশাদ সরকারকে হঠানো যাবে, অস্থায়ী। কিন্তু শওকত সরকার তো স্থায়ী।
-না রে ভাই, না। সেজন্য আগে-ভাগেই ‘সরকার’ বর্জন করেছি। কারণ, শওকত ভাইদের বংশগত উপাধি হচ্ছে- সরকার। তাঁর বাবার নাম ছিলো- খোরশেদ আলী সরকার।

ভাবী আর শওকত ভাইয়ের নামে এক অদ্ভূত মিল ছিলো। সামান্য দূরত্ব ছিলো ‘লী-রা’তে। মানে ভাবীর নামও শওকত, শওকত আরা। দু’জনের নামের পার্থক্য ছিলো লাস্টের ‘লী’ এবং ‘রা’।
ভাবীর এক বান্ধবী তাদেরকে এই নামেই ডাকতেন!
ভাবী সম্পর্কে খুব মজা করে বলতেন, ১৯৬১ সাল। ও ইডেনে পড়ে। আমার বন্ধুর ছোটবোন। ওর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। তাই হঠাৎ গোপনে আমরা বিয়ে করে ফেললাম। বিয়ের পর ও বলল, আমাকে একটা কিনে শাড়ি দেবে না? ফুটপাত থেকে একখানা লাল রঙের শাড়ি কিনে নিয়ে এলাম। ও সেই শাড়ি পরে নিউমার্কেটের এক স্টুডিওতে ফটো তুললাম। বিয়ের পর দু’জন দু’দিকে চলে গেলাম। আমি ঠাকুরগাঁও, আর ও হোস্টেলে।
আমি তাতে একটু বাড়তি সালাত দিয়ে বলতাম, বিয়ের পরেই শুরু হলো আপনাদের বিবাহিত বিরহ।
-ভালো বলেছো, বিবাহিত বিরহ!
-বাহ, ফুটপাতের শাড়ি!
-আমি তো তখন বেকার। আর সেটাই ছিলো তোমার ভাবীর জীবনে সেরা শাড়ি!
-সেরা নারীও বটে!

১৯৮৯ এ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘দোজখের ওম’ বেরিয়েছে। তখন টরন্টো প্রবাসী আমার বন্ধু খসরুকে কিছু বই পাঠিয়েছিয়াম আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক এবং শওকত আলীর। বইগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন খসরুর শশুড়। তিনি খুব ধর্মপরায়ন নামাজি ছিলেন। গল্প-উপন্যাস দেখে একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, কিছু হাদিস-কোরানের বই দিতা। যেমন, ‘দোজখের ওম’ দিয়েছো।
শওকত ভাই হাসতে হাসতে খুন। হাসি থামিয়ে বললেন, ইলিয়াস অনেক বড় মাপের লেখক। তাঁর লেখায় পরাবাস্তবতা থাকে। তাঁর সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, ‘কী পশ্চিম বাংলা, কী বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক। ইলিয়াসের পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম’।

এই সব রসিকতার কারণে শওকত ভাই আমাকে পছন্দ করতেন। আমি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক প্রতিরোধ’এ কর্মরত। অফিস সচিবালয়ের ভেতরে ইডেন বিল্ডিং-এ। আমাদের ঈদ সংখ্যা বের হবে। তাঁর লেখার জন্য আমাদের সম্পাদক আরেফিন বাদল ভাই ফোন করে বলে দিয়েছেন।
আমাদের পত্রিকা ছাপা হতো ১ রাম কৃষ্ণ মিশন রোড অর্থাৎ ইত্তেফাক কার্যালয় থেকে। মুদ্রণ কাজ তদারকি করে চলে যেতাম- টিকাটুলির সেই ৪২-বি হাটখোলা বাসায়। একটা পুরনো বাড়ি। তারপর চলতো চা, গল্প-গুজব। মন দিয়ে শুনতাম তাঁর কৈশোরের কথা, জন্মভূমি রায়গঞ্জের দিনগুলির কথা, জন্মভূমির মাটি হারানোর গভীর বেদনা, দেশ বিভাগের কথা, পশ্চিম বংগের উত্তর দিনাজপুরের থেকে পূর্ব বাংলার দিনাজপুরে চলে আসার কথা। কিছুটা নষ্টালজিয়া হয়ে বলতেন- স্বদেশ কি ভাবে বিদেশ হয়ে যায়!
শওকত ভাইয়ের কথাটা আজ আমিও বেদনার সাথে দীর্ঘশ্বাস মেশিয়ে বলি, স্বদেশ কি ভাবে বিদেশ হয়ে যায়! আমি দ্বৈত নাগরিক। কানাডা থেকে বাংলাদেশে যেতে হলে নো-ভিসা নিয়ে যেতে হয়। তাই নিজ দেশে যাই বিদেশি হয়ে!

খ]
আমি বেশ কিছু দিন ৭১ ঠাটারি বাজারে ছিলাম। এই দিকেই থাকতেন মতিউর রহমান অর্থাৎ মতি ভাই, আলী ইমাম আর রিটন । লুৎফর রহমান রিটন থাকতো ১২ ওয়ারিতে। শেষোক্ত দু’জনকে খুঁজলাম। সময় কাটানোর জন্য কাউকেই পেলাম না। উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে হাঁটতে বিনা নোটিশে হাজির হলাম শওকত ভাইয়ের বাসায়। তিনি জগন্নাথে যাচ্ছেন ক্লাশ নিতে। আমার হাতে সময় থাকায় তার সঙ্গী হলাম। ভাবলাম, বাংলা বাজারে গিয়ে প্রকাশকদের সাথে আড্ডা দিয়ে আসি এবং চিত্ত দা’র সাথে দেখা করে আসি। আর মুক্তধারায় আমার নিয়মিত বিল জমা থাকে। বিলটাও নিয়ে আসি। কারণ, তখন আমি রেডিওতে অনুষ্ঠান করা ছাড়াও নিয়মিত সাপ্তাহিক চিত্রালী এবং সাপ্তাহিক পূর্বাণীর সাহিত্য পাতায় বই পরিচিতি লিখতাম। ফ্রি বই পেতাম। পত্রিকার যৎসামান্য বিল বাদেও মুক্তধারা প্রতি বই পরিচিতি লেখার জন্য দশ টাকা করে সম্মানী দিতো। এই বিধান পৃথিবীর আর কোন প্রকাশক করেছিলো কিনা, আমার জানা নেই।

যাই হোক। এক বার জয় কালি মন্দির থেকে হেঁটে হেঁটে মতি ভাইয়ের সাথে পুরানা পল্টনে সাপ্তাহিক জনতার অফিসে ফিয়েছিলাম আর সাপ্তাহিক বিচিত্রা তথা দৈনিক বাংলার ১ ডি আই টি এভিনিউ থেকে মতিঝিল হয়ে ১ রাম কৃষ্ণ মিশন রোডস্থ দৈনিক ইত্তেফাকে ফিরে এসেছিলাম শওকত ভাইয়ের সাথে। সেদিন শওকত ভাই তিন জন মানুষের উপকারের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে গল্প করেছিলেন। তারা হলেন মুনির চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান এবং শাহাদাত চৌধুরী।
মুনীর চৌধুরী ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র হবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন আর হাসান হাফিজুর রহমান জগন্নাথ কলেজে শিক্ষক হিসেবে সুযোগ করে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় শওকত ভাই চান্স পান নি; কিন্তু গল্প লিখে ইতোমধ্যে নাম কুড়িয়েছেন। সেই সুবাদে মুনির চৌধুরীর সুপারিশে জিসি দেব ভর্তি করে নেন। আর শাহাদাত চৌধুরীর কারণে বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লেখা হয়েছে। বিচিত্রার ঈদ সংখ্যার লেখা দেয়ার চাপ বা তাগিদের মূল্য অতুলনীয়।

আজও হয়তো আরো কিছু নতুন বিষয় জানা যাবে। বাসা থেকে বেরুতেই তাঁর একটা স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেলো। কিন্তু বাসায় ফিরে না গিয়ে গলির মোড়ে জুতা পালিশওয়ালার কাছে গিয়ে তা তালি মেরে, সেলাই করে রিক্সা ডাকছেন। পাচ্ছেন না। অগত্যা আমরা পুরনো ঢাকার বাহান্ন রাস্তার তেপান্ন অলি-গলি পেরিয়ে সদর ঘাটে দিকে যাচ্ছি। বামে শক্তি ঔষালয়, মেথর পট্টি রেখে বলধা গার্ডেনের পাশ দিয়ে টিপু সুলতান রোড ধরে ধোলাই খাল পাড় হয়ে, কলতা বাজারের ভেতর দিয়ে ইসিহাসের পথ ধরে ভিক্টোরিয়া পার্ক হয়ে সদর ঘাটের দিকে যাচ্ছি।

তিনিও ইতিহাসবিদের মতো বলছেন অথবা ক্লাশ নিচ্ছেন, ১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ঢাকার প্রথম মুগল সুবাদার ইসলাম খান এই দোলাই খাল খনন করেন। খালটি শহরকে সুরক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগের সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে খনন করা হয়েছিলো।
এক সময় এতে ছিলো ঝুলন্ত সেতু। সেই সাথে নানান বিনোদন। যেমন- সাঁতার কাটা, নৌকা বাইচ, বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে খালের দুই তীরে মেলা। অনুষ্ঠিত হতো। এবং পূজা শেষে মূর্তি বিসর্জন ইত্যাদি।
জানো, এখন ধোলাই খাল এলাকায় উৎপাদিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ মিলিয়ন মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে!
ধোলাই খাল নিয়ে আমরা ঠাট্টা করি। অথচ এই তথ্য আমার অজানা ছিলো!

পথে কত বিচিত্র দৃশ্য। ফেরিওয়ালা, রিক্সাওয়ালা, তাল-চাবিওয়ালা, হাওয়াই মিঠাই, হকার, কারখানায় লেদ মেশিনের শব্দ, ফুটপাতে টেপের পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি, মারামারি, ঢাকাইয়া বুলি এবং গালি, নেংটো টোকাইয়ের কান্না, হঠাৎ উর্দু ভাষা, রাস্তায় ড্রনের উপর মাচা বানিয়ে চুলা বসিয়ে ভাজা হচ্ছে পুরি-সিঙ্গরা, ছাদ থেকে ছাদে বানরের লাফালফি, রিক্সা রিক্সায় কুকুর সংগমের মতো জটিলতা, ঠেলেগাড়ির ধাক্কাধাক্কি এই সবের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের কথায়, কথোপকথনে বার বার ছেদ পরছে। কারণ, ভীড়বাট্টায় সমান্তরাল ভাবে হাঁটা যাচ্ছেনা। একবার শওকত ভাই আগে চলে যান, আমি পেছনে পড়ে থাকি। আবার তিনি পেছনে পড়ে যান। তবু মনে হচ্ছে- তাঁর সাথে হাঁটছি মানে, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে, ইতিহাসের ভেতর দিয়েই হাঁটছি। তিনি চাংখার পুল থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়া পার্কের ইতিহাস বলে যাচ্ছিলেন। কি ভাবে এবং কেনো ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম বদলে বাহাদুর শাহ পার্ক হলো, তা-ও ইউকিপিডিয়ার মতো জানালে। এবং তা লেখার স্বার্থে ইউকিপিডিয়ার কথাই তুলে দিচ্ছি-
“সদরঘাট এলাকায় ঢুকতেই লক্ষ্মীবাজারের ঠিক মাথায় ৭টি রাস্তা একত্রিত হয়েছে। এখানে ছিলো আর্মেনীয়দের ক্লাব ‘আন্টাঘর’ ছিল। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার পর এই ময়দানেই এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা পাঠ করে শোনান ঢাকা বিভাগের কমিশনার। সেই থেকে এই স্থানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। ১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত পার্কটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এক প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ শাসকেরা ফাঁসি দেয় অসংখ্য বিপ্লবী সিপাহিদের। তারপর জনগণকে ভয় দেখাতে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয় এই ময়দানের বিভিন্ন গাছের ডালে। ১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহি বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়- বাহাদুর শাহ পার্ক”।

তখন ঠিক সেই আলোচিত জায়গায় এসে তিনি ডান দিকে কলেজে চলে গেলেন। আমার মনে হলো- আবার কোনো ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’দের সন্ধানে সেই মোগল-পাঠানদের রাজ্যে অথবা তুর্কি আর সেন রাজার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে! আর আমি ৭৪ ফরাশগঞ্জ, পুঁথিঘর লি:-এর মুক্তধারার উদ্দ্যেশে বিউটি বডিং’এর দিকে হাঁটতে থাকি। শওকত ভাই ক্লাশ শেষ করে চিত্ত দা’র ওখানে যাবেন এবং আমরা এক সাথে ফিরবো। অনেক পুরনো স্মৃতি কি তীক্ষ্ণ থাকে, আবার নতুন স্মৃতি ম্লান হয়ে যায়। সেদিন কি কারণে জানি শওকত ভাইয়ের সাথে ফেরা হয়নি; তা মনে পড়ছে না।

শওকত ভাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ভোরের কাগজের সাহিত্য সাময়িকীর জন্য, ২৫ আষাঢ় ১৩৯৯ সালে অর্থাৎ পঁচিশ বছর আগে। তিনি সেই সাক্ষাৎকারে খুব খোলামেলা ভাবে নিজের কথা, সমসাময়িকদের অনেক অজানা কথা অকপটে বলেছিলেন। যেমন, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত শওকত ভাইয়ের ‘অচেনা’ গল্পের কথা। গ্রামে রাতের বেলায় বাড়ির পেছনে তিন নারী ভাবী, জা এবং ননদ খোলা জায়গায় প্রস্রাব করছে। তিন জনের প্রস্রাবের তিন রকমের শব্দ হচ্ছে! গোল বেড়া দেয়া জায়গায় চোর আটকা পড়ে তা শুনতে পায়। পুরো গল্পটি মনে নেই। এই অংশটুকু মনে আছে।
শওকত ভাই একটু সংশোধন করে মনে করিয়ে দিলেন- না, জা-ননদ না। তিন জনই জা। এ জন্য মহিলা পরিষদ থেকে তাকে ফোন করে আপত্তি জানিয়েছিলো।

আরেকটি গল্পের কথা জানিয়েছিলেন, তা বেশ মজার ব্যাপার। শওকত আলী ‘চৈত্র মেঘ’ নামে একবার একটি গল্প লিখেছেন। কাকতালীয়ভাবে তার কিছুটা সমরেশ বসুর ‘অকাল বসন্ত’ গল্পের সঙ্গে মিলে যায়, পরে সমরেশ বসুর প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিনি ‘চৈত্র মেঘ’ কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত করেননি।

গ]
তিনি আড্ডাবাজ না। তবু আড্ডা দেয়ার জন্যও শওকত ভাইয়ের বাসায় যেতাম। তার সাথে একটি অদ্ভূত মিল ছিলো আমার। আমাদের জীবনে মিশে আছে গ্রাম, গ্রামের মানুষ। এখনো যেনো আমাদের গায়ে নদীর জল, কাদামাটির ঘ্রাণ লেগে আছে। যা থেকে আমরা কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারিনা। তিনি যখন বলেনঃ
“তখন বৃষ্টি শেষ হয়ে গেছে, শরৎকালের ব্যাপার। সে সকাল-বিকাল মাঠে আলের মধ্যে শুয়ে থাকে। আমি বললাম, কী করো এখানে, শুয়ে থাকো কেন? বলে, এখানে গান শুনি। কিসের গান? সে বলে, এই যে বীজ ফেলা হয়েছে ধানের, বীজটি যখন চারা হয়ে একটু একটু করে ওপরে উঠছে, গান গাইতে গাইতে উঠছে। ওই গানটা আমি শুনতে পাই। এটা শোনার পরে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল আমার। এই যে মাটির কাছের, তৃণমূলের মানুষ তাদের কল্পনা বলি, আবেগ বলি, প্রেম বলি এগুলো তাদের কর্মের সঙ্গেই যুক্ত। তারা প্রকৃতির একটা অংশ। এটা যখন অনুভব করি তখন প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে”। (দ্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১০)
প্রায় একই রকমের ঘটনায় শওকত আলী এক পর্যায়ে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল হয়ে যায়। বিকেল-সন্ধ্যার স্বন্ধিক্ষণে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বিলের পাড়ে সবুজ ঘাসের চাদরে শুয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। শীতল শান্ত বাতাসে ভালোবাসায় এক স্বর্গীয় আমেজ অনুভব করতাম। ঘুম ভাঙ্গার পর দেখতে পেতাম, ঝলমল নীলাকাশে চাঁদ জোছনা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

চারণভূমির লেখক শওকত আলী সেই গ্রাম বাংলাকে শত ভাগ তাঁর লেখায় কাজে লাগিয়েছেন চমৎকার ভাবে। অন্য আলোচকদের মূল্যায়ন দ্বিমত করার উপায় নেই। তাই তাঁদের ভাষায় বলা যায়-
‘সরল আঞ্চলিক লোকজীবনের কাহিনীবিন্যাসই তার লেখার প্রধান উপজীব্য। বঞ্চিত-লাঞ্ছিত গ্রামীণ সমাজের যে দুর্গতি তাও এসেছে কলমের ডগায়…। কারণ, শওকত আলী খুব কাছ থেকে দেখেছেন শোষিত মানুষদের দুঃখ বেদনা, হাহাকার বঞ্চনা আর গভীর অনুভবে তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছেন। এই সব শোষিত মানুষের জেগে ওঠা, বঞ্চনার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠা জীবন, ইতিহাসের পালাবদল, শাসকের পালাবদলের ধারায় অতি সাধারণ মানুষের জীবনের পরাজয় তাঁকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করেছিল’।
তাই কৃষক বিদ্রোহ, দুঃখ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, নারী পাচার, বেশ্যার দালাল, সাঁওতাল, বাঙালির নিন্মবিত্ত মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের পোড়খাওয়া সংগ্রামী জীবনের উত্থান, পতন, সংগ্রাম, ভালোবাসার নিবিড়ভাবে অত্যন্ত গভীর পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধান করে নিজের লেখা সমৃদ্ধ করেছেন নতুন মাত্রায়। তাঁর সৃজনশীল কথাসাহিত্যে অসামান্য সংযোজন করেছেন নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের আশ্রয়ে বাংলার প্রায় লুপ্ত ও বিস্মৃত ইতিসাস। তার উজ্জ্বল উদাহরণ দক্ষিণায়নের দিন, প্রদোষে প্রাকৃতজন, উত্তরের খেপ, কুলায় কালস্রোত, শুন হে লখিন্দর ইত্যাদি গ্রন্থসমুহ।
শুধু গ্রাম নয়; নগরজীবনের নষ্ট চিত্র, ক্লেদ-কালিমা, যন্ত্রণা-জটিলতা, ভাংগন-বিভাজন আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।

ঘ]
কবিতা দিয়েই শওকত আলীর লেখালেখির সূত্রপাত। কিন্তু কবিতার জগতে থাকেন নি। মাঝে মধ্যে মনের আনন্দে লিখতেন। আর তিনি গল্পের চেয়ে উপন্যাস লিখতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেনঃ
‘আমার ছোটগল্পের অনেক চরিত্রই পরবর্তীকালে আমার উপন্যাসে চলে এসেছে আমার জ্ঞাতসারেই। কারণ ছোটগল্পে আমি অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও চরিত্রের ডালপালা আমার মতো করে ছড়াতে পারিনি কিংবা এটাও হতে পারে, অসন্তুষ্টি আমার মধ্যে কাজ করেছে যার কারণে ঘটনা কিংবা চরিত্ররা পরবর্তীকালে উপন্যাসে বিস্তৃত হয়েছে। (মুখোমুখি শওকত আলী/ হামিদ কায়সার, কালি ও কলম/ জুলাই-আগষ্ট ২০১৩ সংখ্যা, ঢাকা।)

শওকত ভাইয়ের কিছু কিছু কবিতা পত্রপত্রিকার ছাপাও হয়েছে। আমাকেও একটি কবিতা উৎসর্গ করেছিলেন। আমার সম্পাদিত ‘কথাশিল্পীদের কবিতা’য় ‘তবু যাবো’ শীর্ষক যে কবিতাটি দিয়েছিলেন, সেটা ছাপা হয়েছিলো দৈনিক প্রথম আলোতে আগস্ট ১৩, ২০০৪ সালে।
তাঁর কোনো কোনো গল্প-উপন্যাসেও কবিতার প্রভাব লক্ষণীয়। যেমনঃ
‘নয়নতারা কোথায় রে’ গল্পে পাই ‘যেখানে ধূসর কুয়াশার ভেতর দিয়ে চুঁয়ে পড়ে জ্যোৎস্না’, ওই ‘কুয়াশার মধ্যে অনাথ শিশুর মতো শুয়ে থাকে অন্ধকার’, স্তূপীকৃত খড় জ্বালিয়ে শীতের চাবুক থেকে রেহাই খোঁজে ছায়া শরীর, আসমান আর দিগন্ত একাকার করে উঠে আসে কৃষ্ণ মেঘ। (দ্রঃ শওকত আলীর গল্প উত্তরের চালচিত্র, সাহিত্য সাময়িকী, দৈনিক জনকন্ঠ, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ঢাকা)।
কবিতা সম্পর্কে তিনি আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তার অংশ বিশেষঃ

আমিঃ তরুণদের কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
শওকত আলীঃ এদের ‘নতুন কবিতা’ আমি পড়ি। ভালো লাগে। এরা রহস্যটাকে আরো সুন্দর করে প্রকাশ করে।
আমিঃ রহস্যটাকে সুন্দরভাবে প্রকাশ ঠিক বুঝতে পারলাম না, শওকত ভাই।
শওকত আলীঃ ধরো, ‘ভয়’ শব্দটাকে তারা আর ‘ভয়’ বলছে না। বলছে ‘তুমি’। এ ‘তুমি’ করে সম্বোধনটাই চমৎকার।
মঞ্জু সরকারঃ হ্যাঁ, তাই হচ্ছে। ‘ভয়’ কে তারা বলছে ‘তুমি’ কিংবা ‘আপনি’। এভাবেই কবিতায় ‘ভয়’ও প্রেমিকা হয়ে উঠছে।
শওকত আলীঃ হ্যাঁ, মঞ্জু ঠিক বলেছো।
আমিঃ এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শওকত আলীঃ বললাম তো ভালো। ‘ভয়’ যখন ‘তুমি’ হয়ে ওঠে, তখন কবিতা আরো বেশি আকর্ষণীয় এবং রহস্যময় এবং আবেদনীয় হয়ে উঠে। নতুন মাত্রা পায়।
আমিঃ দুর্বোধ্যতার অভিযোগকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
শওকত আলীঃ তা তো আছেই। তারপরও ‘ভয়’ যখন ‘তুমি’ তে পরিণত হয়, তখন তাতে একটা স্টাইল এবং একটা স্টান্ট দু’টোই থাকে। (দ্রঃ সাময়িকী, দৈনিক ভোরের কাগজ। ২৫ আষাঢ় ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ, ঢাকা)।

ং]
তিন ছেলে রেখে ১৯৯৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ভাবী চলে গেলেন। চলে যাবার পর শওকত ভাই ধীরে ধীরে মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ বার যখন দেখা করতে গেলাম, তখন অনেকটাই স্মৃতিভ্রষ্ট। স্মৃতি চলে যায়, স্মৃতি আবার ফিরে আসে। এক বার মনে করতে পারেন, পরক্ষণেই ভুলে যান। দুই-তিন বার নাম বললাম। একটু পর আবার প্রশ্ন করেন, তোমার নাম কি যেন, দুলাল? ভুলে গেছি।
আমি বললাম, ভুলে যান নি। নাম ধরেই তো ডাকলেন, বললেন!
সেদিন শওকত ভাইকে দেখে খুব খারাপ লেগেছে। সেই খারাপ লাগাটা আরো স্থায়ী ভাবে গাঢ় হলো ২৫ শে ফেব্রুয়ারি!

[জন্মঃ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ – মৃত্যুঃ ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮]

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১১৮ বার

Share Button