» আমার কোনো ব্র্যান্ড নেই

প্রকাশিত: ০৩. মার্চ. ২০১৮ | শনিবার

জেসমিন চৌধুরী

নারী-অধিকারের আলোচনায় তসলিমা নাসরিন নিঃসন্দেহে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছেন অনেক আগেই। আমার লেখালেখির বিষয়বস্তু যদিও নিখাদ নারীবাদ নয়, তবু যখনই নারী অধিকার নিয়ে লিখেছি, কেউ না কেউ বলেছেন ‘এই এসেছেন আরো এক তসলিমা নাসরিন!’ গালিটা মন্দ লাগেনি। কেউ আবার বলেছেন, ‘আপনি ঠিক তসলিমা নাসরিনের মত নন, একটু অন্যরকম’। সেটাও মন্দ লাগেনি, কেউ হুবহু কারো মত না হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।

অনেকে বলেছেন, ‘আপনার লেখায় তসলিমা নাসরিনের চেয়ে বেশি বেগম রোকেয়াকে দেখতে চাই।’ সময়ের সাথে প্রয়োজন বদলায়, বদলে যাওয়া সময়ের দাবি মেটাতে ভিন্ন এপ্রোচের প্রয়োজন পড়ে। আমি তসলিমার সমসাময়িক, আমাদের সময়ের সমস্যাগুলো অতীতের চেয়ে ভিন্ন, কাজেই আমার বক্তব্য এবং প্রকাশ বেগম রোকেয়া থেকে তসলিমার কাছাকাছি হবে সেটাই স্বাভাবিক। এপ্রোচ যেমনই হোক না কেন, সবশেষে আমাদের কথাগুলো কিন্তু একই।

আজকাল ‘উয়োমেন চ্যাপ্টার’ও মনে হচ্ছে একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। নারী-অধিকারের কথা বলতে গিয়ে স্বর খানিকটা চড়ে গেলেই শুনতে হয়, ‘এসব উয়োমেন চ্যাপ্টার মার্কা কথাবার্তা।’ এই চ্যাপ্টারের সাথে আমার কোনো সখ্যতা নেই তবু নারী বিষয়ক একটা পোর্টাল যে আপনাদের মনে এতোটা স্থান করে নিয়েছে এবং মনের আনাচে কানাচে অস্বস্তির কারণে পরিণত হয়েছে জেনে ভালোই লাগে।

আগে আক্রমণ আসত শুধু মৌলবাদীদের কাছ থেকে, তারা তসলিমা বলে গালি দিত। আজকাল আবার তসলিমা নাসরিনের অন্ধ ভক্তরাও আক্রমণ করছেন, পুরুষ-ঘেষা বলে গালি দিচ্ছেন। আমি নাকি দুর্বল, পুরুষের কাছে অতি বিনীত, পুরুষ-বিদ্বেষী নই বলে নিজেকে জাহির করতে সদা ব্যস্ত।

কিছুদিন আগে একজনের এহেন মন্তব্যের উত্তরে বলেছিলাম, ‘আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক, পর্যালোচনা ভুল’। পর্যবেক্ষণ সত্য এই কারণে যে আমি আসলেই বিনীত; পর্যালোচনা ভুল একারণেই যে শুধু পুরুষের কাছে নয়, আমি সবার কাছেই বিনীত, ঔদ্ধত্য আমার স্বভাবেই নেই। পর্যবেক্ষণ সত্যি, কারণ আমি আসলেই পুরষ-বিদ্বেষী নই; পর্যালোচনা ভুল একারণেই যে আমি কারো প্রতিই বিদ্বষী নই, এবং কোনো কিছু জাহির করার প্রচেষ্টাও আমার মধ্যে নেই। আমি যা, আমি ঠিক তা-ই, ইনসাইড-আউট।

আমি বরং তাদের কাছে কৃতজ্ঞ যারা আমাকে অযত্নে এড়িয়ে যান, দলে টানেন না, খাতির করেন না, আবার গালিও দেন না; যাদের তাঁবু থেকে আমি অঘোষিতভাবে বিতাড়িত, যাদের কল্যাণে আমি খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে প্রতিনিয়ত সুপুষ্টু হচ্ছি।

নারী অধিকার বিষয়ে আমার যা কিছু বলবার আছে, তা আমার নিজের যাপিত জীবন এবং কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। নারীবাদ বিষয়ক পড়াশোনা আমার খুব কম, প্রায় নেই বললেই চলে। হুমায়ূন আজাদের ‘নারী’ ছাড়া এই বিষয়ে অন্য কোনো বই আমি পড়িনি, তসলিমা নাসরিনের কোনো বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। একারণেই হয়তো আমি আপনাদের সূত্রের মধ্যেই পড়ি না।। কাজেই আমার মত ক্ষুদ্র ‘তথ্য বিহীন’ ‘নারীবাদে অদীক্ষিত’ লেখককে ব্র্যান্ডিং এর চেষ্টা না করে ছেড়ে দিন। আপনারা আপনাদের মত কাজ করুন, আমি আমার মত কাজ করি। সে-ই ভালো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১২১৩ বার

Share Button