» অন্য রকম থাইল্যান্ডে

প্রকাশিত: ৩১. মার্চ. ২০১৮ | শনিবার

 

মোহাম্মদ ওসমান ফারহান আল হারুন

বন, পাহাড় আর নীল সমুদ্র, ছিমছাম পরিবেশ, সাথে আধুনিকতার স্পর্শ ও নির্জনতা- বিদেশ ভ্রমনে এর বেশি আর কি চাই?

পাখির ডাকে ঘুমভাঙ্গা সকালের কথা শহুরে জীবনে আমরা অনেকটা ভুলে যেতে বসেছি। নগরের কোলাহল মুখর পরিবেশ থেকে দূরে নিজেদের মত থাকার প্রয়াসে থাইল্যান্ড সফরে বেরিয়েছিলাম ১৯শে ফেব্রুয়ারী, আমেরিকা প্রবাসী ভাইয়ের পরিবারসহ। যে “থাইল্যান্ডের” নাম মানুষ স্মরণ করে বিনোদনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে, আমরা ৮ জন সেখানে আবিস্কার করেছি “নয়নাভিরাম থাইল্যান্ড”, যেখানে নির্জনেও ছুটি কাটানো যায় সপ্তাহখানেক।
ব্যাংকক থেকে ফ্লাইটে এক ঘন্টা দূরত্বে অবস্থান সমুদ্র তীরবর্তী শহর “ক্রাবি। আন্দামান সাগর ঘেষা এই শহরটিতে প্রকৃতি তার রূপের সমাহার ঘটিয়েছে নানা দ্বীপুঞ্জের মাঝে। একেকটা দ্বীপ একেক রকম- পর্যটকে পরিপূর্ণ, সবুজ পাহাড়, সাগর আর বনভূমিতে রঙ্গিন। ব্যাংকক থেকে ক্রাবির ফ্লাইট মিস ছিল আমাদের জন্য প্রথম ধাক্কা। পরদিন সাত সকালে গাড়িতে যখন এখানে প্রথম পা রাখলাম, মনটা সবার ভাল হয়ে গিয়েছিল প্রাকৃতিক পরিবেশে। আক্ষরিক অর্থে “ক্রাবি” একটি আধুনিক গ্রাম, যার রাস্তাঘাট চমৎকার; চারিদিকে সবুজ ও ন্যাড়া পাহাড়, নতুবা চোখে পড়বে শস্যক্ষেত। ছিমছাম বাগান আর সবুজের সমারোহ আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিবে বাংলাদেশের বান্দরবনের কথা, কখনও মালেয়শিয়ার পাম বাগানের দৃশ্য। মুসলমান অধ্যুষিত এ পর্যটন শহরে প্রশান্তিময় মসজিদ চোখে পড়বে পথিমধ্যে, কখনও কখনও স্থানীয় সরল মানুষগুলো আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে হাসিমুখে, সালামের সাথে। বিদেশ প্রবাসী অভিজ্ঞ ভাইয়ের বদৌলতে রাজকিয় এক “ভিলায়” আমরা অবস্থান করেছিলাম ক্রাবিতে। সুইমিংপুল আর সুসজ্জিত বাগানে ঘেরা অত্যাধুনিক সেই বাসস্থানটি অস্টেলিয়ান মালিক ক্যারলিন যেন প্রস্তুত রেখেছিলেন আমাদেরই জন্যে। অবসরে সেখানে নিজের মত রান্না করে, গল্পে মজে চার দিন পার করে দিলাম পাঁচ তারকা হোটেলের মত সুযোগ সুবিধায়, সৃষ্টিকর্তার দয়ায়।
থাইল্যান্ড সফরের দ্বিতীয় দিনে “ প্যান বিচ” এর নয়নাভিরাম সৈকতে আমাদের চমৎকার সময় কাটে। পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি আলোয় শান্ত একটি পরিবেশ, ইউরোপীয় পর্যটকেরা একান্ত সময় কাটাচ্ছে নিজেদের মত। আরো চোখে পড়ে পাহাড়, বন আর সাদা বালির সমুদ্র; পাশেই পর্যটকদের জন্য বানানো ছিমছাম আধুনিক কাটেজ। দিনে ও রাতে সমুদ্র পাড়ে প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানোর জন্যে আদর্শ ব্যবস্থা। স্বপরিবারেও অনেকে আসছে এখানে সাগরে পা ভেজাতে, মাঝ বরাবর দন্ডায়মান পাহাড় ছুঁয়ে আসতে। জেমস্ বন্ড ছবির অবিকল দৃশ্যপট আবিস্কার করলাম এখানে। এ যেন “কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা”। আমাদের মত জনবহুল দেশের মানুষের কাছে প্যান বীচের মাহাত্ম্য হচ্ছে, এখানে হকার, ফটোগ্রাফারদের পীড়াপীড়ি নেই; ফলে, যে যার মত গল্প করে, বই পড়ে কিংবা বিশ্রাম করে সময় কাটাতে পাড়ে নীল সমুদ্রের পাড়ে, যেকোন পোশাকে। শিশুরা ব্যস্ত বালি নিয়ে খেলায়, কখনও দোলনাতে চড়াতেই আনন্দ। ক্রাবির মত একটি প্রাকৃতিক শহরে যে সুপারমার্কেটও আছে, তা আবিস্কার করলাম রাতে, “ভিলাতে” ফিরে যাবার সময়। যে কোন কবি-সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীদের জন্যে ক্রাবির সমুদ্র সৈকত ও দ্বীপপুঞ্জ যে আদর্শ, বলাই বাহুল্য। থাইল্যান্ড মানেই যে “ ব্যাংকক” আর “পাতায়া” নয়, সেই ভিন্ন স্বাদ আস্বাদনের আশা আমাদের পূর্ণ হয় পরদিন নৌকায় বিভিন্ন দ্বীপ সফরে, নিখাদ প্রকৃতির সংস্পর্শে।
২০১৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ক্রাবির এক জাতীয় উদ্যান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয় বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ সফরে। নৌকায় চেপে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপ- সাগরের পানি কখনও সবুজ, কখনও নীল। স্বাস্থ্যকর বিশুদ্ধ বায়ু সেবন ও নয়নাভিরাম পরিবেশ অবলোকন শেষে প্রথম গন্বব্যস্থল জধরষবু ওংষধহফ। বিভিন্ন সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠানে দেখা দৃশ্যের অনুরূপ অনুভূতি এ দ্বীপে পাওয়া যাবে। পর্যটকরা বেশী ব্যস্ত সূর্য¯œানে। পরিবেশ-বান্ধব এ স্থানেও নেই কোন হৈ চৈ। যে যার মত সময় কাটাচ্ছে একাকী কিংবা প্রিয়জনের সাথে। মাঝে হাঁপিয়ে উঠলে খানাপিনার জন্য রেস্তোরা, এমনকি থাকার জন্য রয়েছে প্রাসাদসম বাড়ি। আমার কাছে মনে হয়েছে, শীতপ্রধান দেশের মানুষগুলো রৌদে গায়ের চামড়া পোড়াতেই সারি সারি নৌকায় এখানে আসে। স্বচ্ছ পানিতে দৌড়ঝাপ ও ছবি তোলাও চলছে কখনও। তবে সবচেয়ে উপভোগ করেছি স্বচ্ছ পানিতে মাছের বিচরণ। স্বল্প বসনার পর্যটকদের ভিড়ে সম্ভবত আমরাই ছিলাম পরিপূর্ণ পোশাকে, ঐ দ্বীপ সফরে!
যে দ্বীপেই যাওয়া হোক না কেন, সাজানো গোছানো পরিবেশ, দ্বীপের মাঝে রয়েছে সংরক্ষিত বনভুমি। সারাদিনের জন্যে নৌকা ভাড়া করে দ্বীপগুলো ঘোরা যায়; আবার একটি দ্বীপেও অনায়াসে একটি দিন পার করা সম্ভব। কোথাও পর্যটকের এবং সুযোগ সুবিধার কমতি নেই। তবে একেক দ্বীপের জলের রং একের রকম, পাড় ঘেসা সাদা বালি রৌদের উজ্জ্বলতায় চিকচিক করে। মূলত শহরে একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য “পোডা” “চিকেন”, “টুপ”, দ্বীপগুলো আদর্শ। বিকেলের দিকে আমরা আবিস্কার করলাম “আধুনিক ক্রাবি” যেখানে বিভিন্ন রিসোর্ট, বিপনীকেন্দ্র ও পর্যটকদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। তবে সময় স্বল্পতার জন্যে পর্যটন স্থানগুলোর মাঝেই এখানে অধিকাংশ সময়টুকু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এক সাথে অতিক্রম করেছি, খোদার অশেষ মেহেরবানীতে।
থাইল্যান্ডে বেড়াতে আসব, অথচ কেনাকেটা হবে না, কল্পনাতেও ভাবা দুস্কর। প্রিয়জনদের আবদার রক্ষায় থাই সফরের প্রায় শেষ দিন আমরা গেলাম আরেকটি প্রসিদ্ধ আধুনিক শহর “ফুকেট” এ। পথিমধ্যে ভাষাগত সমস্যার এক মধুর অভিজ্ঞতা হল রেস্টুরেন্টে খাবার কেনার সময়। নানা পদের হালাল খাবারের পসরা নিয়ে বসা বিক্রেতাকে খাবারের নাম জিজ্ঞেস করতে উত্তর মিলল- “ব্যা”, “ব্যা”, অর্থাৎ এটা খাসির মাংস, সাথে লজ্জার হাসি। এরপর ক্রাবি থেকে গাড়িতে তিন ঘন্টা দূরত্বে “ফুকেট” এ যখন প্রবেশ করছিলাম, অদ্ভুৎ সুন্দর এক অনুভূতি কাজ করছিল, সম্ভবত থাইল্যান্ডের তৃতীয় আরেকটি শহরে ঢোকার রোমাঞ্চে। আক্ষরিক অর্থে, থাইল্যান্ড দেশটির প্রকৃত রূপ উম্মোচন হয় রাতে; ফুকেটও তার ব্যতীক্রম নয়। এর খোসরতও আমাদের গুনতে হয়েছিল মন মতো শপিং এর সুযোগ না পেয়ে। অপরিচিত এ শহরে যে আশায় আসা, ঠিক তার বিপরীত পরিস্থিতিতে দামী এক শপিংমলে পুরো সময় কেটে গেল। তবে সাদা চামড়ার পর্যটকদের ভীড়ে থাই অধিবাসীদের দেখা মেলে এ শহরে, যাদের প্রায় হাসিখুশি ও ভদ্র মনে হয়েছে। পড়ন্ত বিকেলে যখন শহর ছেড়ে ফিরতি পথে রওনা হচ্ছি, ফুকেট তখন জেগে উঠছে। আবিস্কার করলাম- এখানেও সমুদ্রসৈকতে মানুষের বিচরণ, সূর্যাস্তের সময়ে। ফুকেটে এসে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘোরাঘুরি আর নিজেদের মত করে কেনাকাটার মাঝে অনেক তফাৎ রয়েছে, বিশেষত সময় যেখানে সীমিত।
থাইল্যান্ডের মানুষরা ইংরেজীতে দূর্বল, তারপরও শত শত মানুষ ছুটিতে কিংবা অবসরে এ দেশে আসছে। আতিথেয়তা আর সেবার মানদন্ডে থাইল্যান্ড যে অনেক এগিয়ে, তারই প্রমান পেলাম থাই সফরে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এ দেশে মানুষ আসে অনেক রকম নেতিবাচক চিন্তা নিয়ে, ছোটবেলা থেকে এরকম কথাই শুনে এসেছি। কিন্তু প্রকৃত বাস্তব হচ্ছে, কোন অশুভ ছায়াই আপনাকে স্পর্শ করবে না যদি সত্যিকার অর্থে আপনি সৎ থাকেন এবং জীবনযাপন করতে চান। শুধু পর্যটন শিল্প দিয়েই একটি জাতি কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, থাইল্যান্ডে না এলে তা উপলদ্ধি করা কঠিন। বাংলাদেশ থেকে দেশটির দূরত্ব বেশী না হলেও থাইল্যান্ড ও মালয়শিয়াকে আমরা অনুসরণ করতে পারি আমাদের পর্যটন শিল্পকে ঢেলে সাজানোর জন্যে। অদূর ভবিষ্যতে রাজধানী ব্যাংকক শহর ভালভাবে ঘোরার অভিপ্রায় নিয়ে থাই সফরের পরিসমাপ্তি ঘটে কিছু সুখস্মৃতি নিয়ে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩৬ বার

Share Button