» আরাধ্যা আসে নি

প্রকাশিত: ১৭. মে. ২০১৮ | বৃহস্পতিবার

শেলী সেনগুপ্তা
এক বৃদ্ধ ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছে। খুব সাধারণ বেশভুষা। মাথায় টাক, দেখলেই বোঝা যায় একসময় বেশ লম্বা আর সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। তিনি একটা আশ্রম চালান। আশ্রমটার নাম আরাধ্য নিবাস।
আজকাল এই আশ্রম নিয়ে পত্রিকাতে খুব লিখালিখি হচ্ছে। সবাই এটা নিয়ে খুব কৌতুহলের মধ্যে থাকে। শহরে শেষপ্রান্তে একটা আশ্রম, যার জন্য কোন সরকারি বা বিদেশি সাহায্য নেই, কিন্তু চমৎকারভাবে চলছে।
আশ্রম প্রাঙ্গনে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে খেলছে, কেউ কেউ ফুলগাছের পরিচর্যা করছে। এখানে প্রায় একশ অনাথ শিশুর বসবাস।
আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সবে যোগ দিয়েছ সবুজ আলো পত্রিকাতে। ছাত্রজীবন থেকে সখ সাংবাদিকতা করার। জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করে চাকরি পেতে সময় লাগার কথা না, পেয়েছিও।। অফিস থেকে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আরাধ্য নিবাসের সত্য কাহিনী নিয়ে ফিচার লিখার। তাহলেই আমার চাকরি স্থায়ী হবে। নাহলে পত্রপাঠ বিদায়। শুনেছি আমার যোগ্যতার জন্য সম্পাদকের একজন প্রিয় পাত্রকে বাদ দিয়ে আমাকে চাকরিতে নেয়া হয়েছে। সে ক্ষোভ তিনি ভুলতে পারছেন না । তাই এমন কঠিন শর্ত দেয়া হলো,সহকর্মীরা বলেছে, ‘ কঠিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, আজ পর্যন্ত কারও কাছে ওরা সাক্ষাৎকার দেয় না, খুব নিভৃতচারী এই আশ্রমের আধিকারিকরা’।
শুনে আমার জেদ চেপে গেলো। ভাবলাম, চেষ্টা করতে ক্ষতি কী। সাথে ক্যামরাম্যানকে নিয়ে চলে এলাম।
প্রথম দর্শনেই বৃদ্ধকে ভালো লেগে গেলো। আমাদের দেখে তিনি প্রশান্ত হাসি দিয়ে কাছে এলেন,
ঃ কী চাই? সাক্ষাৎকার?
ঃ হুম, শুনেছি আপনি কখনো সাক্ষাৎকার দেন না। কিন্তু আমাকে দিতে হবে। জীবনে প্রথম চাকরি, যদি সাক্ষাৎকার না পাই তাহলে পথে নামতে হবে। একটা চাকরি পেতে কষ্ট, পাওয়া চাকরি হারালে কি হবে আমার।
আমার কথা শুনে তিনি থমকে গেলেন। বিব্রত হয়ে টাকটা চুলকে নিলেন।
ঃ দেখুন, আমরা নিজেদের মতো এই শিশুদের নিয়ে বেঁচে আছি, কি লাভ আমাদের ঘাটিয়ে?
ঃ এতো সুন্দর একটা কাজ করছেন তাতো মানুষের জানা দরকার।
ঃ তাতে কী বিশেষ কিছু লাভ হবে?
ঃ আপনারা আশ্রমের জন্য কিছু ফান্ড পেতে পারেন।
ঃ দেখেন বাবা, আমরা ফান্ড চাই না। আমাদের যা আছে তা দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি, ফান্ডের দরকার নেই।
ঃ কিন্তু আমার যে চাকরি দরকার।
ঃ আমরা কি করতে পারি বাবা?
ঃ পারেন অনেক কিছুই, এই শিশুদের জন্য এতোকিছু করছেন,আমি কি দোষ করলাম?
ভদ্রলোক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বলেই যাচ্ছি, ‘যদি চাকরি হারায় তাহলে আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে। গ্রামে বাবামার কাছে টাকা পাঠাতে পারবো না, ছোট বোনটার বিয়ের খরচ দিতে পারবো না’। আমার কন্ঠ বুঝি একটু চড়া হয়ে গিয়েছিলো, দেখি এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। বেশ অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন। এক নজরে তিনি আমার ভক্তির সবটুকু অধিকার করে নিলেন। একমাথা পাকা চুলের মাঝে সিঁথি কেটে সিঁদুর পরেছেন, হাতে শুধু দু’গাছ শাঁখা পরণে সাদা খোলের লাল পার শাড়ি। বয়সের সৌন্দর্যে তিনি আলোকিত করে রেখেছেন চারপাশ। মুগ্ধ হয়ে দেখছি তাকে, আমার কথা বন্ধ হয়ে গেছে। আমার বিনম্র দৃষ্টি অনুসরণ করে ভদ্রলোক পেছন ফিরে দেখে ব্যস্ত হয়ে গেলেন,
ঃ শরীর খারাপ, এর মধ্যে তুমি উঠে এলে কেন পারমিতা?
ঃ না না, এখন শরীর ঠিক আছে, ছেলেটা কে?
ঃ একজন সাংবাদিক, আমাদের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে।
ঃ কার চাকরির কথা বলছে?
ঃ তার নিজের।
ঃ কি হয়েছে?
আমি সাহস পেয়ে এগিয়ে গেলাম। পায়ে হাত দিয়ে সম্মান জানিয়ে বললাম,
ঃ যদি আপনাদের সাক্ষাৎকার নিতে পারি তাহলে আমার চাকরি টিকে যাবে , নাহলে বেকার।
ভদ্র মহিলা এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
ঃ রবি, বলেই ফেলো , আর কতদিন আমরা নিজেদের লোকচক্ষুর আড়ালে রাখবো, একদিন না একদিন আমাদের সবার সামনে আসতেই হবে।
ঃ তুমিই তো চাইতে না প্রকাশিত হতে, এখন তুমি বলছো?
ঃ হ্যা, ভেবে দেখলাম যদি নিজেরাই প্রকাশিত নাহয় তাহলে আমাদের অবর্তমানে সবকিছুর সঠিক ব্যাখ্যা নাও হতে পারে।
ঃ ঠিক বলেছো পারু।
ঃ হয়তো ভুলভাবে বিশ্লেষণ হবে আমাদের আরাধ্য’র অবস্থান, আমি তা চাই না।
ঃ বেশ তো পারু, আমি এতোদিন তোমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলাম।
ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে বললেন,
ঃ রবি, তুমি যে কী! তুমি এখনও আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকো?
ঃ হ্যা পারু, এখনও আমি তুমিময়।
আমাদের উপস্থিতি ভুলে দু’জনে একসাথে হেসে উঠলেন, ওঁদের হসির মধ্যে কি ছিলো জানি না, আমার মনে হলো মুহূর্তেই চারপাশে হঠাৎ আলোতে ভরে উঠেছে।

রবিউল মামুন আর পারমিতা ব্যানার্জী বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়াশুনা করতো। দু’জন দুই বিভাগের শিক্ষার্থী। তাও কেমন করে যেন দু’জনের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠলো। খুব সহজভবে মিশে দু’জন। মাঝে মাঝে টি এস সির চায়ের আড্ডায়, বইমেলার হৈ চৈ এ হারিয়ে যেতো। রবিউল মামুন সুন্দর আবৃত্তি করে, পারমিতা মনোযোগ দিয়ে শোনে। পারমিতা বাদাম ভেঙ্গে মামুনের হাতে দেয়। বাদামের দু’দানার একটা পারমিতার মুখের মধ্যে ফেলে দেয় অন্যটি নিজের মুখে। এক কাপ কফি ভাগ করে খাওয়া ওদের নিত্যদিনের ব্যাপার। মন চাইলেই রিক্সার হুড ফেলে অনেক দূরে চলে যেতো। রিক্সাওয়ালার সাথে মজার গল্প করে হাসাতো মামুন, পারমিতা মুগ্ধদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো। গল্পেরছলে গড়ে ওঠা সম্পর্কটা অল্পদিনেই গভীর হয়ে গেলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একজনকে পেলে অন্যজনকেও পাওয়া যায়। বন্ধুরা ওদের একসাথে ‘পারবিতা’ বলেই ডাকে। প্রায় সবাই ওদের সম্পর্কের গভীরতা জানে। কেউ কেউ বিষয়টা মেনে নিতে পারে না, আবার কেউ কেউ অতি উৎসাহী।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হতেই ওরা একসাথে থাকার তাগিদ অনুভব করলো। মামুন সরকারী চাকরি পেয়েছে। পারমিতাও একটা কলেজে পড়ায়।
একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে ওরা। বাড়িওয়ালা জানে ওরা স্বামীস্ত্রী। ঘর ভাড়া নেয়ার সময় তাই ই বলেছে। তার আগেই মামুন বেশ খানিকটা সিঁদুর নিয়ে পারমিতার সিঁথি ভরে দিয়েছে। সেদিন পারমিতা কিছুই বলতে পারেনি, শুধু দু’চোখ বেয়ে নেমেছিলো সুখের নদী। মামুন ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলো,
ঃ এ যদি হয় সুখের কান্না তাহলে সারাজীবন কাঁদো তুমি, আমার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদো। আমিও কাঁদবো তোমার মাথায় চিবুক রেখে।
পারমিতা জবাব দিতে পারে নি, ওকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো। কান্নার বেগ আরো বেড়ে গিয়েছিলো। কান্নার তোড়ে ওর দেহটা জোয়ারের সময়ের নদীর এর মতো ফুলে ফেঁপে উঠছিলো।
হয়তো আড়াল থেকে কেউ বিদ্রুপের হাসি হেসেছিলো। তাতে ওদের কিছু যায় আসে না। ওরা এখন বেপরোয়া।দু’জন মাস শেষে বেতন হাতে নিয়ে বাজারে বের হয়। পছন্দের জিনিস কিনে দু’জনের সংসার সাজায়। কিছু পছন্দ করতে হলে মামুন নির্ভর করে পারমিতার উপর, পারমিতা চায় মামুন কিছু মতামত দিক। দু’জনে তর্কাতর্কি করে আর কেনাকাটা করে। দেখা যায় যা কেনা হয়ে তা দু’জনেরই পছন্দের।
মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। যখন ওদের স্বপ্নের সংসার সাজানো শেষ ঠিক তখনই পারমিতার বাবার কানে গেলো ওদের সম্পর্কের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশভারী মানুষটা কোন এক বিকেলে মামুনকে ডাকলেন, সেদিন পারমিতা গানের ক্লাসে। মামুন গান ভালোবাসে তাই অনেকদিন আগে শেখা গানগুলো নতুন করে ঝাঁলিয়ে নিচ্ছিলো। মামুন বলে,
ঃ আমার সকাল হবে তোমার গানে, আমি ঘুমাতে যাবো তোমার গান শুনে।
ঃ বেশ তো, আমার দিনকাটবে তোমার কবিতার অনুরণন ধারণ করে।
পারমিতাদের ড্রইংরুমে বসে ভাবছিলো বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা, তখন দরজার পর্দা সরিয়ে ঘরে পা রাখলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক। মামুন সম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালো। মামুনের সামনের চেয়ারে বসলেন তিনি, মামুনকে একবারও বসতে বললেন না। ওর চোখে চোখ রাখে প্রশ্ন করলেন,
ঃ তুমি কি পারমিতা বিয়ে করতে চাও?
মামুন চোখ নামিয়ে নিলো। ছককাটা মেঝের দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালো। এবার আরো গম্ভীরস্বরে বললেন,
ঃ মুখে বলো, সাহস নিয়ে বলো।
ও সরাসরি চোখের দিকে তকিয়ে বললেন,
ঃ আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি শান্তচোখে তাকিয়ে আছেন ঠিকই কিন্তু ওঁর ফর্সা রঙ লাল হয়ে গেলো, সব রক্ত যেন মুখের মধ্যে এসে জমা হয়েছে।
ঃ তোমার বাবা আছেন?
ঃ দু’বছর আগে মারা গেছেন?
ঃ মনে করো, আমি তাঁর জায়গাতে গিয়ে তোমাকে একটা অনুরোধ করবো, তুমি কি রাখবে?
এবার মামুন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে, ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে বললেন,
ঃ তোমাদের বিয়েতে আমার আপত্তি নেই।
হতভম্ব মামুন কি করবে তা বুঝতে পারছিলো না। এবার তিনি আরো শান্ত কন্ঠে বললেন,
ঃ তবে তা যেন হয় আমার মৃত্যুর পর।
তিনি ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। মামুন বজ্রাহত গাছের মতো সোফাতে বসে পড়লো। ততক্ষণ বসে ছিলো জানে না। অনেক কলিংবেলের শব্দে সম্বিত ফিরে পেলো। কাজের ছেলেটা দরজা খুলে দিতেই পারমিতা ঢুকলো ড্রইংরুমে। ওকে দেখে বেশ অবাক হলো, কিছু বলার জন্য এগিয়ে আসতেই ওকে এড়িয়ে মামুন বের হয়ে গেলো। দরজায় দাঁড়িয়ে পারমিতা ওর যাওয়া দেখছে। ওর চোখ জুড়ে অগাধ জিজ্ঞাসা। কিন্তু মামুন একবারও ফিরে দেখে নি।

পরদিন ওর অফিসে গিয়ে মামুনকে পেলো না। সেদিন সে অফিসে আসে নি। মামুন নেই, কোথাও নেই। চেনা জানা কেউ ই বলতে পারলো না সে কোথায় গেছে। পরে শুনলো সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ওদের ভাড়া নেয়া বাসাটা তেমনই আছে। বাড়িওয়ালাকে সে দু’বছরের ভাড়া দিয়েছে, বলেছে শেষ হওয়ার আগে আবার দেয়া হবে। তবুও বাসা তাদের থাকবে। দু’বছর শেষ হওয়ার আগে মামুন বাড়িওয়ালার ব্যাংক একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিলো। একটা চাবি পারমিতার কাছে ছিলো। মাঝে গিয়ে সেখানে সময় কাটায়। ঘরটার আনাচেকানাচে খুঁজে বেড়ায় দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ভালোবাসা।
পারমিতা জেনেছিলো, ওর বাবার কথা রাখতে মামুন দূরে সরে গেছে। কিন্তু ঠিকানা দিয়ে যায় নি। ওর যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। তাও মেনে নিলো। ওদের স্বপ্নের সাথে যুক্ত ছিলো মিষ্টি একটা ছেলে, যে কিনা হামাগুড়ি দিয়ে ওদের কোলে উঠে আসে। এখন পারমিতা মনের জগতে সেই সন্তানকে দেখে দেখে দিন কাটায়। আত্মীয় পরিজনের শত অনুরোধে ওর আর বিয়ে করা হলো না। মনের ভেতর সবসময় অপেক্ষার মৃদঙ্গ বাজছে। জানে একদিন ওর রবি ঠিকই ফিরে আসবে, এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।
গানের চর্চা বাড়িয়ে দিয়েছে। সাথে চলছে কলেজের শিক্ষকতা। কিছুদিনের মধ্যে ভাইবোন সবার বিয়ে হয়ে গেলো, বাবা মারা গেলেন, একসময় মা ও ওকে ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন। যেহেতু সে বিয়ে করে নি, বাবার প্রভিনেন্ড ফান্ডের সব টাকা ওর নামে বরাদ্ধ হলো। ভাইবোনরাও সানন্দে তা মেনে নিয়েছে।
অনেকদিন পর কুরিয়ার সার্ভিসে ওর একটা একটা বেশ বড় খাম এলো। খুলে দেখে মামুন শহরতলীতে বেশ বড় একটা জমি পারমিতার নামে লিখে দিয়েছে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে পাওয়া এই উপহার ওকে আনন্দ এবং কষ্ট দুইই দিয়েছে। আনন্দ পেলো মামুন মানে ওর রবি এখনও ওকে মনে রেখেছে আর কষ্ট পেলো একটিবার কোন সুযোগ না দিয়ে কোথায় চলে গেলো। একবারও যোগাযোগ করলো না।
জমিটা ওর স্বপ্নপূরণে সাহায্য করলো, বাবার প্রভিনেন্ড ফান্ডের আর নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে সে জমিতে একটা আশ্রম গড়ে তুললো। নাম দিলো ‘ আরাধ্য নিবাস’। বেশ কিছু টাকা ব্যাংকে রাখলো। প্রতিমাসের সুদের টাকা নিয়ে ‘ আরাধ্য নিবাস’ এর খরচ নির্বাহ করতো।সাথে চলছে নিজের কলেজের চাকরি। যা আয় হয় কৃপণের মতো সঞ্চয় করে রাখে।
আশ্রমটা ভালোই চলছিলো। বেশ কিছু অনাথ ছেলেমেয়ে নিয়ে পারমিতার দিন কাটে। ওদের পড়াশুনা নিজেই দেখে। স্বাস্থ্যচর্চার জন্য নিয়মিত আশ্রমের সামনে খোলাজায়গাতে বাগান করার কাজে নিয়োজিত করলো ,তাতে বেশকিছু শাকসব্জি উৎপাদন হচ্ছিলো, নিজেদের রান্নার সব্জিটুকু অনায়াসে পেয়ে যাচ্ছে। একটা পুকুর আছে, তাতে মাছের চাষ আর পুকুরের উপর হাসঁমুরগীর খামার করলো। শিশুদের জন্য উত্তম আমিষের ব্যবস্থা হয়ে গেলো।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে পারমিতার গড়ে তোলা আশ্রম সুন্দরভাবে চলছিলো। এক গ্রীষ্মের দুপুরে শানবাঁধানো ঘাটে অচেনা কেউ একজনকে বসে থাকতে দেখে আশ্রমের শিশুরা পারমিতার কাছে ছুটে গেলো। এখন ওর বিশ্রামের সময়, নিজেকে সবকিছু থেকে মুক্ত করে আপন মনে গান গাইছিলো। শিশুদের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জানতে চাইলো ,
ঃ কি হয়েছে, তোমরা সবাই এখানে কেন?
ঃ মামনি, কে একজন আমাদের পুকুর ঘাটে বসে আছে। জিজ্ঞেস করলে কিছু বলে না।
ঃ দেখতে কেমন তিনি?
ঃ একটু লম্বামতো, মাথায় চুল কম।
ঃ বুঝেছি, তিনি তোমাদের বাবা। যাও তার সমাদর কর।
শিশুরা প্রথমে অবাক হলেও পরে হৈ চৈ করে ছুটে গেলো। ওরা লোকটাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে আশ্রমের ভেতরে নিয়ে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যে সবার সাথে ওর ভাব হয়ে গেলো। সন্ধ্যার পর পারমিতার সাথে দেখা। পারমিতা তখন তুলসিতলায় প্রদীপ দিচ্ছিলো। প্রদীপ জ্বালিয়ে উঠে পেছন ফিরতেই দেখে ওর রবি বুকের উপর দু’হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধ চোখে পারমিতাকে দেখছে। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যাচ্ছিলো, মামুন এগিয়ে এসে ওর কপাল জুড়ে সিঁদুর লেপে দিলো। দু’হাতে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বললো,
ঃ ঐ সন্ধ্যাতারা সাক্ষী, আজ থেকে তুমি আমার বিয়ে করা বঊ।
ঃ তাহলে এতোদিন?
ঃ এতোদিন তুমি আমার ছিলে, আজ প্রকৃতি সাক্ষী রেখে তোমাকে বরণ করে নিলাম।
ঃ তাই বুঝি?
ঃ হুম,এখন থেকে বাকী জীবন আমরা একসাথে কাটাবো।
সেই থেকে রবিউল মামুন আর পারমিতা ব্যানার্জী একসাথে এই আশ্রমে নিজেদের অবেলার সংসার শুরু করলো। দু’জন পরিনত বয়সের মানুষ নিজেদের আঁকড়ে ধরে জীবনের শেষ শেষ বাঁকটা পেরুতে চাইছে।

শুনতে শুনতে আমি মুগ্ধ। শুধু দেখতে ইচ্ছে করছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ভালোবাসায় নিমগ্ন দম্পতিকে।মনে হচ্ছে এমন জীবনগাঁথা সারা জীবন বসে শোনা যায়।
তবুও সাক্ষাৎকারের স্বার্থে জিজ্ঞেস করলাম কতদিন আগে আপনাদের বিয়ে হয়েছে?
দু’জনের হেসে প্রায় একসাথে বলে উঠলেন
ঃ পাঁচ বছর।
ঃ মাত্র পাঁচ বছর?
এবার রবিউল মামুন সাহেব বললেন,
ঃ আমরা তো জীবন সায়াহ্নে এসে বিয়ে করেছি।
সাথে সাথে পারমিতা ব্যানার্জী বললেন,
ঃ আমরা খুব ভালো আছি, আমাদের কোন ক্ষোভ নেই, দু’জন দু’জনকে নিয়ে খুব শান্তিতে আছি।
গল্পে গল্পে দুপুর হয়ে এলো। দু’জন বেশ ক্লান্ত, রবিউল মামুন সাহেব পারমিতা ব্যানার্জীকে বললেন,
ঃ চল পারু, তোমার ঔষধ খাওয়ার সময় হয়েছে।
পারমিতার হাত ধরে মামুন সাহেব আশ্রমের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। পারমিতা ব্যানার্জী যেতে যেতে বলে গেলেন,
ঃ দুপুর হয়ে এলো, তোমরা কিন্তু খেয়ে যেও।
যে প্রশ্নটা আমার মনের মধ্যে বার বার ঢেউ তুলছিলো তাতো জানা হলো না। আমি তাঁদের পেছন পেছন প্রায় ছুটে গিয়ে জানতে চাইলাম
ঃ তাহলে, ‘আরাধ্য নিবাস’ এর আরাধ্য কে? কোথায় থাকেন তিনি? এই আশ্রমের সাথে তাঁর সম্পর্ক কী?
আমার দিকে না তাকিয়ে দু’জন শেষ বিকেলের মানুষ ধীর পায়ে ঘরের মধ্যে চলে গেলেন।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেক সময় পার হয়ে গেছে, এবার ফিরতে হবে। কিন্তু জানা হলো না , কে এই আরাধ্য?
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন ক্যামেরাম্যান কালাম বললো,
ঃ বস, ভুল অইয়া গেছে।
ঃ কি ভুল?
ঃ বুড়াবুড়ির কথা শুনইতে শুনইতে আমি ছবি তুইলতে ভুইলা গেছি?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম, বললাম,
ঃ ভালোই হয়েছে, আমিও একটা প্রশ্নের উত্তর পাইনি। যাক, ভাগ্যে যা থাকে থাক, আমি এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করবো না। বিকেলে ফোটা এই সন্ধ্যামালতি দম্পতি নিজেদের গড়ে তোলা ভুবনে আনন্দে দিন কাটাক। লোকচক্ষুর অন্তরালে গ্রামের ঝোপঝাড়ে বেড়ে ওঠা সব গুল্মকে শহরের নার্সারীতে অথবা কারো ড্রইংরুমে শোভা পেতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

রেকর্ড করা সাক্ষাৎকারটা ডিলিট করে আমরা বের হয়ে পড়লাম। বিকেল চারটায় একটা ট্রেন আছে। ওটা ধরতে পারলে তিনঘন্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছে যাবো।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২২২ বার

Share Button