অটিষ্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে সমাজের দায়বদ্ধতা

প্রকাশিত: ১:০৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২১

অটিষ্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে সমাজের দায়বদ্ধতা

শেলী সেনগুপ্তা

আমাদের সমাজে এমন কিছু শিশু আছে যারা স্বাভাবিক শিশুদের মত নয়। তাদের দেহের গঠন আলাদা, তাদের আচরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ধীর বা অন্য রকম। এদের মধ্যে কেউ চোখে ভালো দেখতে পায় না, কারো হাঁটাচলায় অসুবিধা, আবার কারো অন্যের কথা শুনতে বা বুঝতে দেরি হয়, কেউবা বয়সে বড় হলেও শিশুদের মত আচরণ করে। এসব শিশুরা কোনো-না-কোনো প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে। এদের কেউ অটিজম কিংবা প্রতিবন্ধিতার শিকার।
এই মুহূর্তে অটিজম ও প্রতিবন্ধীত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। তবে আশার কথা হলো প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি রাষ্ট্র তার মানবিক হাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাষ্ট্র অভিভাবকহীন অটিস্টিক শিশুদের দায়িত্ব নেবে। বাবা-মায়ের অবর্তমানে রাষ্ট্র তাদের লালনপালন করবে। অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুর বেঁচে থাকার এবং তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এমনভাবে এগুলো চালু করা হবে যাতে ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের পর কেউ সেগুলো বন্ধ করতে না পারে। এজন্য সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ পাস করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সবচেয়ে বেশি আন্তরিকতা লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর কন্যা সায়েমা ওয়াজেদ এর ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষিত করছে আগের চেয়ে বেশি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩-তে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, বাক প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিতাসহ ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও তাদের জন্য অবকাঠামোগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। এসব শিশু যাতে সাধারণ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিবিড় শিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রত্যেক প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেয়া হচ্ছে। উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে অটিজম কর্নার। প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে। নীতিমালার আওতায় ৫০টি বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা প্রতিবন্ধীদের অবহেলা করেন। এরা নিজ পরিবারেই নিগৃহীত হয়। প্রতিবন্ধীদের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে অনেকে ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সবার জানা উচিত প্রতিবন্ধীরাও মানুষ।
অটিজম এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সরকার যথেষ্ট সচেতন এবং তাদের পূণর্বাসনে কাজ করে যাচ্ছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না তাদের প্রতি সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে।

প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতোই ভালোবাসা দিতে হবে। তাদের প্রতিবন্ধিতার ধরণ অনুযায়ী বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাকে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম শিখতে সাহায্য করতে হবে। অবশ্যই তাদের বিশেষ শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি। শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য ইশারাই ভাষা শিক্ষা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের নিজের কাজ নিজে করার প্রশিক্ষণ। এছাড়া তাদের নিজের কাজ নিজে করে বিভিন্ন ধরনের উপার্জনের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে হবে শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা। এই কার্যক্রম তখনই সফল হবে যখন আমরা এসব শিশুদের পাশে দাঁড়াবো।
এসব শিশুর জন্য সবসময় সুষম খাদ্য ও আনন্দময় পরিবেশ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তাদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং উদ্দীপনা প্রদানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের সময় দিতে হবে।
প্রতিবন্ধীদের খেলার ধরণ অনুযায়ী খেলাধুলার আয়োজন করতে হবে। যেমন,দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের গল্প শোনানো শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের সাথে দাবা খেলা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের সাথে গান-গল্প ও ছবি আঁকা।
প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নানাভাবে তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বুঝতে দেয়া যাবে না যে তারা অন্যদের মতো নয়।
বর্তমান সরকার অটিষ্টিক ও প্রতিবন্ধী শিহসুদের জন্য নানা সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা রেখেছে যা অনেকেই জানে না। তাই নিজ নিজ এলাকায় যদি এমন কেউ থাকে তাদের সঠিক সংবাদ ও সহযোগিতা প্রদান করা যেতে পারে, তাহলে তারাও এসব সুযোগ গ্রহণ করে উপকৃত হবে।
মনে রাখা দরকার পৃথিবীর কোন মানুষই সমাজের বোঝা নয়, প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থান থেকে সমাজের জন্য কিছু না কিছু করতে পারে। তবে সে জন্য তাকে গড়ে নিতে হয়। যদি আমরা আমাদের সমাজের প্রতিটি অটিষ্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুর সঠিক যত্ন নিয়ে তাদের অন্য স্বাভাবিক মানুষের মতো গড়ে উঠতে সাহায্য করি তাহলে ওরাও হয়ে উঠবে সমাজের অন্যতম সম্পদ।
তাই অটিষ্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি ইতিবাচক ও ভালোবাসার মানসিকতা নিতে এগিয়ে যেতে হবে। হয়ত এভাবেই একদিন তারা হয়ে উঠবে সমাজের অন্যতম চালিকা শক্তি।

 

 

ছড়িয়ে দিন