অধরা টমটম গাড়ী

প্রকাশিত: ৪:৫২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২১

অধরা টমটম গাড়ী

 

মোজাফফার বাবু
কৈশোর শৈশবের কথা মনে পরলে মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করি,কত কষ্টই না দিয়েছি বাবাকে।
বিশাল বড় সংসার যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিদ্র। খরা অকাল বন্যা বিপর্যস্ত জলবায়ু এ যেন বাৎসরিক রুটিন বাঁধা বিষয় । অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি কৃষক ওকৃষির উপর অশনিসংকেত ।
তারই ধারাবাহিকতায় নিত্য নতুন অভাবের আগমনী বার্তা প্রতিনিয়ত দরজায় কড়া নাড়তো।
সামান্য আয় দ্বারা সংসারের ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব নয় , যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। পশ্চাতপদ কুয়াশাছন্ন পথপ্রান্তে ,একজন বাবা এই সমাজে প্রতিনিয়ত বাস্তবতার সাথে লড়াই করে যাচ্ছে। জীবন যুদ্ধে বেদনা বিধূর কতো নির্মম নিষ্ঠুর একটি গল্পের মাধ্যমে সেটাই বর্ণনা করা হলো ।
” বনিক সাহেব এক ধন্যাঢ্য ব্যাক্তি বতর্মান সমাজে বেশ কদর কারন সমাজে ‘ অর্থ প্রাচুর্য্য ‘ ভেদাভেদের মাপকাঠি,।
আর জীর্নশীর্ণ কুঠিরে পাশে থাকতেন দরিদ্র ছাপোষা কেরানী, যার দিন আন্তে পান্তা ফুরিয়ে যায় মনিমিঞার । অভাব তার নিত্য দিনের সাথী টিউশনি করে সংসার চালাতে হয় ।
পাশের বাড়ীর বনিক সাহেব তার মেয়ে ‘ নিলাসার ‘ বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছে । যেতে হবে কারন সে আর কেউ নয় নিকটতম প্রতিবেশী , তার সমাদর সবার আগে ।
তাই বাবা ও মেয়েকে রওনা হবে ‘ নিলাসার বিয়েতে ‘ বাবা জীর্ন ,শীর্ন জামা পড়ে , এমন সময় বাঁধ সাধে !
আদুরীনি- “ও বাবা বাবা , দাও জামাটা, ছিড়ে গেছে সেলাই করে দেই
ওখানে অনেক নামি দামি গন্যমান্য সুধীজন আসবে ।
বাবা বলেন, – ” মা মারে তোর সামান্য সূচের অগ্র দ্বারা সংসারে এত বড় ছিদ্র মেরামত করা সম্ভন নয়।”
সেই পশ্চাতপদ গঞ্জে , অন্ধকার অমানিশা বিরাজোমান ।
সমস্ত গুমোট ব্যাথা বুকে নিয়ে , বাবা আমাদের আগলে রাখতেন। কতনা যন্ত্রনা দিয়েছি ,উদিল মনে অতীতের সেই দিন গুলির কথা !
আজো গঞ্জে মফস্বলে সপ্তাহে সাধরনতো দুই তিন দিন হাটবার বসে , যেমন শুত্রু রবি অথবা সোম বুধ সেই দিন চাষীরা ,
তাদের ঘামে সিক্ত উৎপাদন কারি ফসল বিক্রি করে ভোক্তা ও পাইকেরদের কাছে ।
শৈশবে যখন বাবার সাথে হাটে যেতাম , হাট বার দিন হলে স্নান করে , তাড়াতাড়ি করে নাকে মুখে খাওয়া সারতাম ।,
বাবার পিছু আর ছাড়তামনা ” আ‌মাকে নিতেই হবে আমি হাটেই যাবই যাব ”
অভিমান করে বসে থাকবো রগের পরে, আর মা আমার বায়না, আর সংসারের দৈন্যতার অবস্হা প্রতি পদেপদে বুঝতো অভাবের নিকষ কালো মেঘ চারিদিকে ঘুরে,
মা অনুধাবন করতো , আমি যদি বাজারে যায়, বায়নায় বায়নায় বাবাকে
নাজেহাল করবো ।তায় পছন্দো করতোনা মা বাজারের যাওয়া ।
আর বাবা – ” ও খোকার মা, খোকা যাক না দেখছোনা আমার সাথে হাটে যাবে বলে খোকা সকাল থেকে সাজুগজু করে বসে আছে।
“ও খোকার মা — খোকা জাক”
ওমা মা আজকে আর বায়নাই করবোনা
বাবা – মিট মিট করে হেসে আমি আর খোকা সারা পথ গল্পো করতে করতে যাব
মা– আচ্ছা যাক, বলে মাথায় চুমু দিত।
বাবার পিছু পিছু থাকবা তা নাহলে ছেলে ধরা ধরে নিয়ে যাবে , আর কোনো বায়না করবানা,
আচ্ছা বাবা। ” – জী ,মা
বাবা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে , এক ঘাড়ে শার্ট আরেক ঘাড়ে পটলের বস্তা আর গরগরি টানতে টানতে আমরা দুজনে বাজারে ছুটতাম ।
আমি দড়ি দিয়ে বাঁধা প্যান্ট আর হাওয়াই শাট পরে গাছগাছালি সুশীতল পত্রপল্লভে ঘেরা ও পাখপাখালির কলতান মধ্যে দিয়ে শহরের যন্ত্রনা মুক্ত মেঠো পথ দিয়ে যেতাম ।
বাজারে দূরদুরান্ত থেকে কৃষানে উৎপাদিত ফসল , তড়ি তরিকারী হাতের তৈরী দ্রব্য সামগ্রী মাথায় ,সাইকেলে গরুগাড়ীতে করে নিয়াসে ।
আর হাটে পসরা সাজিয়ে বিক্রি করে ,আমরা ও বাজারে যথারিতি পটল নিয়ে বাজাড়ে বসে থাকতাম ,কতো খরিদার আসতো কত কথা বলতো
একদিন – বাবা বাজারের পটল বেচার সময় খরিদদারা কতনা যাচাই বাছাই কতনা কথা
— যারা পটল কিনতে আসতে সবাই বলে দ্রব্যের দাম কমায় দাম কমায়।
বাবা–রাগ করে বলে ফেল্লো ,” ও ভাই যে টাকা দিয়ে পটল উৎপাদন করেছি তার দামতো উঠেনা , সার বিজ পানি কিনতে যে খরচ হয়,তা উঠলেও হতো । তার চাইতে ” মাগনা ” নিয়ে যান !
বাবার পিছ পিছ আমি এ দোকান ও দোকান ঘুরতাম। পেপু বাঁশি, নাগরদোলা, মিষ্টি মিঠাই, চিতই পিঠা বাহারি দেখে , ‘মায়ের মানার কথা ‘ ভুলে যেতাম ।
বাজারে বাবার কাছে কত না বায়না করতাম !
“ও বাবা! আমি রসগোল্লা খাব ,আমাকে একটা বেলুন কিনে দাও , বাঁশি দাও , নাগরদোলায় চড়বো , আজ কিন্তু টমটম গাড়িতে চড়বোই চড়বো।”
আর ও কত কি ? কত আবদার !!!
অভাবের সংসারের জোয়াল কাঁধে তার মধ্যে মাঝে বাবা বায়না পূরন করতো, সে আর কেউ নয় , বাবা বাবা !
একদিন বাজারের দক্ষিন দিকে ‘ সার বিজ দোকানের মালিক ‘
ফজলু দফাদারের সাথে কথা বলছে ,
বাকিতে সার দেয়ার জন্য ,
বেটা বাবাকে বলে- ”বাকী নিলে কেউ বাকির টাকা পরিশোধ করে না , তার চাইতে আগাম ফসল বিক্রি করে দাও।
” বাবা বলে ” – মহাজন তাহলে সারা বৎসর উপোস করে মরতে হবে। ”
আর আমি পাশের পটল ময়রার দোকানে সাজানো বাহারি রঙ বে রঙের মিষ্টি রসুগোল্লা চমচম রসমালাই দেখছি।
চাকচিক্য ঝলমলে পোশাক পরা বাবু মিঞারা মিষ্টি খাচ্ছে মজমার কথা বলছে ।
বাবা ঐ দৃশ্য দেখে ,
তার অন্তর জালায় জ্বলতে লাগলো , সব কিছুই ভুলে গেল । আমার খোকা মিষ্টি খাবে বলে ,
– বাবা আমাকে মিষ্টির দোকানে নিয়ে মিষ্টি খাওয়ালো কিন্তু বাবা নিজে খেলনা , খাওয়া শেষে বাবা তার লুঙ্গি দিয়ে মুখ মোছালো।
এক পয়সা কম হল বলে দোকানদার কত কথা শোনালো !
বাবা বলছিল,” বাপু ,পরেরবার হাটে এসে দিয়ে যাব
– এই তল্লাটে কেউ আছে আমার কাছে দশ টাকা পাবে ? “।দোকানদার বেটা যেন কাবুলীওয়ালা , বড় বজ্জাত।
– “ও বাবা বাবা ,সন্ধ্যা হয়ে এলো যে বাড়ি চলো।”
এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর কাধে চড়ে আছি আমি। “ও বাবা টমটমে চড়বো, সবাইতো চড়ছে।”
“ বাবা – গাট্টির দিকে তাকায়ে আজ থাক বাবা , আগামী হাটে বাজারে বড় টমটমে চড়বো।
গঞ্জ থেকে বাড়ি এক ক্রোশ পথ ,গোধূলী সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে।
চারিদিকে আবিরের রঙ চড়াচ্ছে। সবার যেন তাড়া আছে।
বাবা জিজ্ঞাসা করলন- “খোকন, কষ্ট হচ্ছে ??”
আমি বাবার কাঁধে চড়ে বাঁশি বাজাছি , দূর হতে পূজা মণ্ডপের ঢোলের সানাইয়ের শব্দ ভেসে ভেসে আসছে।
বাসায় পৌঁছানোর সাথে সাথে মায়ের বকুনি –
“নিজের কাশির ওষুধ না কিনে ওর জন্য বাঁশি কিনে আনলে ?”
বাবা হুঁকা টানছিল আর কাশছিল। মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল আর আমার বাঁশি বাজানো শুনছিল।
একবার রোজার ঈদে বন্ধুরা সবাই নতুন নতুন জামা কাপড় কিনেছে । আমি লাল প্যান্ট জামার জন্য বায়না ধরেছিলাম ,
সে বার খরায় খেতের ফসল পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ।
সংসার চালাতে হিমসীম খাচ্ছে , শত কষ্টের মাঝে চাঁদনী রাত্রে দিন ‘ ঈদের কাপড় ‘ এনেছিল ।
বাবার কান্ড দেখে – মা বেশ রা্‌গ ,
মা – এত কষ্ট করে জামা আনার কি দরকার ছিল ।
বাবা- খোকা নতুন জামা পড়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরবে না ,
নাঘুরলে ওর মনটা ছোট হয়ে যাবেনা , বলে গরুর বিচলি কাটতে শুরু করলো ।
এখন শৈশব শেষে পূর্ণ যৌবনে পা দিয়েছি সংসারের জুয়াল কাঁধে ,
বাবা না ফেরার দেশে চলে গেছেন।এখন বুঝি বাবা কেন সারা বাজার ঘুরে বাজার করতো এখন বিষয়টা অনুধাবন করতে পারি।
আজ পশ্চাতপদ কুয়াশাছন্ন পথপ্রান্তে “কৃষক ও কৃষির সমস্যার” মূল সমস্যা ,সার বীজ পানি কিটনাশক ক্রয় করে , যে ফসল ব্রিক্রি করে তাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না ।
তারপর খরা বন্যা সিডার আম্পানতো লেগেই আছে । অনেক ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সংসারের খরচ হাতি চালানোর মতো।
এখন আমার বাজার করতে বাবার চাইতে ও আরো বেশী সময় লাগে কারন আমি আর বাবা সেই একই গ্রহের বাসিন্দা।
মাঝে মাঝে নীল আকাশেরদিকে চেয়ে চেয়ে ভাবি , নদী নালা খাল বিল হাওর বায়ড় দুই পাড়ের পতিত ও খাস জমি
যদি ফেলে না রেখে ‘সুষম বন্টননের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করতো ‘ ।
তাহলে প্রত্যাশিত শিশির ভেজা ভরে আলোয় আলোকিত হত ।
বাস্তব বড় কন্টোককীর্নো এখন যেন সবই স্বন্প ।
কেন বাবা নিজে মিষ্টি না খেয়ে আমাকে খাওয়াতো, কেনই বা বাবার ঔষুধের টাকা দিয়ে বাঁশি কিনেছিলাম।
কেনই অসুস্হ বাবার কোলে চড়ে এক ক্রোশ পথ এসেছিলাম , ইচ্ছে করলেতো হেটে আসতে পারতাম।
বাবা সেতো বাবাই ,বিশাল সংসার সীমিত আয়। নীল আকাশের দিকে চেয়ে থাকি আর ভাবি কখনও কি টমটমে চড়তে পারব ?

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com