অনলাইনে নারীদের হয়রানিকারীরা সাবধান

প্রকাশিত: ৯:২০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২১

অনলাইনে নারীদের হয়রানিকারীরা সাবধান

মোঃ মঈনউদ্দীন

তমালিকা সেন আর সুমন মালাকার। স্কুলজীবনে তারা ছিলো সহপাঠী, ভালো বন্ধু। তাদের এই বন্ধুতা একসময় প্রণয়ে রূপ নেয়। পড়াশুনা শেষ করে দুজনেই চাকরি করছে। এবার তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু বাধসাধল তমালিকার পরিবার। সুমন চাকরি করলেও বংশ মর্যাদায় আর সমাজে তার পরিবারের অবস্থানে অনেক পিছিয়ে। শেষমেষ পরিবারের সিদ্ধান্তেই তমালিকাকে ঘরবাঁধতে হলো অন্য এক পুরুষের সাথে। কিন্তু এই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারলো না সুমন। সে চেয়েছিলো পরিবারের অমতে হলেও দুজনে এক হতে! এক পর্যায়ে তার এই বিচ্ছেদ-বেদনা আক্রোশে রূপ নিল। দুজনের প্রেমের সময়কার কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি ও ভিডিও সে ফেসবুক এবং ইউটিউবে ছেড়ে দিল ভুয়া আইডি খুলে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্লাটফর্মে ঘুরতে থাকা এরকম ছবি ও ভিডিও একসময় তমালিকার বন্ধুদের নজরে আসে। তমালিকা জানতে পেরে খুব ভেঙ্গে পড়ে। ভয়,লজ্জা আর অপমানে সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়! অকালে ঝড়ে পড়ে একটি তাজা প্রাণ।

প্রযুক্তির আধুনিকায়ণের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নানা ধরনের সাইবার অপরাধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যার শিকার হচ্ছেন নারীরা। সাইবার জগতে নারীদের হয়রানির ক্ষেত্রটা ব্যাপক, বিস্তৃত। কারো হয়তো ফেসবুকে আইডি হ্যাক হচ্ছে, পাসওয়ার্ড চুরি করে একাউন্টের দখল নিয়ে সেই আইডি ঠিক করে দেওয়ার কথা বলে আবার চাওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। আবার কারো নাম, পরিচয়, ছবি ব্যবহার করে ফেইক আইডি খুলে ভিকটিমের ছবি ,ভিডিও,ইত্যাদি প্রচার করা হচ্ছে। অনেককেই করা হচ্ছে ব্লাকমেইল। পূর্ব পরিচয় বা প্রেমের সম্পর্ক বা অন্য কোনোভাবে পাওয়া ছবি, ভিডিও বা তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা বা টাকা দাবি করা হচ্ছে। কেউ কেউ সাইবার বুলিয়িং এর মুখোমুখি হচ্ছেন । মোবাইল বা অন্য মাধ্যমে অশ্লীল শব্দ, লেখা, ছবি বা ভিডিও পাঠিয়েও হয়রানি করা হচ্ছে নারীদের।

কিন্তু বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, সাইবার জগতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী এ ধরনের হয়রানির শিকার হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে অভিযোগ করেন না। এর একটি কারন হয়তো তারা ভয় পান যে, অভিযোগ করতে গিয়ে আবার অন্য কোনো হয়রানির শিকার হতে হয় কিনা। অথবা লোকলজ্জা বা অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও হয়তো তারা প্রতিকার না চেয়ে নীরবে নিজেদের গুটিয়ে নেন।

নারীদের সেই লোকলজ্জা কিংবা ভয়ের দিন এবার শেষ হতে যাচ্ছে। তেমনিভাবে শেষ হতে যাচ্ছে সাইবার জগতে নারী হয়রানিকারীদের দিন। সাইবার স্পেস যেন নারীদের জন্য নিরাপদ হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ গত ১৬ নভেম্বর, ২০২০ চালু করেছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের একটি সেবা। ঐদিন রাজারবাগের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এই সেবার উদ্বোধন করেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ ( আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি তার উদ্বোধনী বক্তৃতায় এই সেবা চালুর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বলেন, সাইবার হয়রানির শিকার নারীরা যেন ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নির্দ্বিধায় অভিযোগ করতে পারেন, সেজন্য আমরা এই ইউনিট চালু করছি। আমরা এই ইউনিটকে বলছি অল-উইমেন ইউনিট, কারন এখানে কাজকরা এবং সেবাদানকারীদের সবাই নারী।

বাংলাদেশের নারীরা যতধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হন, তার প্রতিটি ব্যাপারে এই সেবার আওতায় অভিযোগ জানানো যাবে। এই ইউনিটের দেয়া তথ্যমতে যে সকল বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তারমধ্যে অন্যতম-ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকী, ফেসবুক বা অন্যকোনো সোস্যাল মিডিয়ার আইডি হ্যাক, পর্নোগ্রাফিক কন্টেন্ট ছড়ানো, র‌্যাকমেইলিং, ছবি বা ভিডিও এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়া, ফেইক আইডি তৈরি, হয়রানিমূলক অশ্লীল এসএমএস, মেইল বা লিংক পাঠানো, মোবাইলের মাধ্যমে সাইবার বুলিয়িং ইত্যাদি।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন মূলত একটি ফেসবুক পেজভিত্তিক সেবা। পুলিশ হেডকোয়াটার্স পরিচালিত Police Cyber Support for Women (PCSW) ফেসবুক পেজে ম্যাসেজ দিয়ে সংঘটিত অপরাধের বিস্তারিত জানাতে হবে। দায়িত্বরত নারী পুলিশ কর্মীরা দ্রততম সময়ে সাড়া দিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দেখবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন। এক্ষেত্রে তারা মূলত দুটি কাজ করছেন-ভিকটিমকে বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে মানসিকভাবে সুস্থ রাখছেন, অন্যদিকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়রানিকারী বা অপরাধীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিকটিমকে নিকটস্থ থানায় গিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হচ্ছে, সেক্ষেত্রেও পরিপূর্ণ সহায়তা করছে পুলিশের এই নারী সেবা ইউনিট। ম্যাসেজ ছাড়াও cybersupport.women@police.gov.bd ঠিকানায় ইমেইল করে কিংবা পুলিশ সদর দফতরের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ জানানো যাবে। তবে অভিযোগ যেভাবেই জানানো হোক না কেন, ভিকটিমের পরিচয় বা তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে প্রয়োজনীয় সেবা দিচ্ছে ইউনিটটি।

যাত্রা শুরুর পর থেকে ভিকটিম নারীদের অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিট। মাত্র দুসপ্তাহে এই পেজের ফলোয়ার ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ নিয়ে যোগাযোগ করেছেন ৩৫৬৫ জন যার মধ্যে ৯৪৬ জনকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়েছে, ৮৮৭ জনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বা ডকুমেন্টস চাওয়া হয়েছে, অবশিষ্ট ১৭৩২ জনের সাথে কথা বলে স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া চলমান।

পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সূত্রে জানা গেছে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে মিথ্যা আইডি বা বেনামে আইডি খুলে ভিকটিমের ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচার সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ৮১৯টি(২৩%), বিভিন্ন লিংক বা অ্যাপস ব্যবহার করে পাসওয়ার্ড চুরির মাধ্যমে আইডি হ্যাক এর অভিযোগ ৫৪৩টি (১৫%), পূর্ব পরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে বা অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কোনো অনৈতিক সুবিধা বা টাকা দাবি করার ঘটনা ৩২২টি (৯%), মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বুলিয়িং এর অভিযোগ ৩৩৮টি (৯.৫%), বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল এসএমএস, ছবি, ভিডিও বা অশ্লীল কন্টেন্টের লিংক পাঠিয়ে হয়রানি ৩১০টি (৮.৭%), অন্যান্য অভিযোগ ২৭২টি(৮%)। এছাড়া অনেক নারী ও পুরুষ নন সাইবার অপরাধের কথা জানিয়েও এই ইউনিটের সাথে যোগাযোগ করছেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিকটস্থ থানা বা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

‘নারীর জন্য নিরাপদ সাইবার স্পেস’ এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে পুলিশের এই সেবাটি চালু হয়েছে। যে কোনো ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছেন এমনটা বোঝার সাথে সাথেই ভীত বা লজ্জিত না হয়ে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিটে অভিযোগ করার কথা বলছেন এখানকার সেবাদানকারীরা। একইসাথে তারা কিছু বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন । যেমন-ব্যক্তিগত বা স্পর্শকাতর কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য সাইবার স্পেসের মাধ্যমে আদান-প্রদান না করা, এমনকি যার সাথে আদান-প্রদান করা হচ্ছে তিনি বিশ্বস্ত হলেও তা প্রদান করতে নিরুৎসাতিহ করা হচ্ছে। এতে প্রযুক্তিগত সমস্যায় নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোনোভাবেই একান্ত ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কাউকে না দেওয়া কিংবা এ ধরনের ভিডিও ধারন করতে অনুমতি না দেওয়া আবশ্যক। কারন আজকে হয়তো সে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ, কিন্তু সময়ের সাথে এই সুন্দর সম্পর্ক একই রকম নাও থাকতে পারে, কিংবা আপনার বা তার আইডি হ্যাক হতে পারে। তৃতীয়ত, ডিভাইস, ই-মেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টের নিরাপত্তা ফিচারগুলো জোরদার করা-শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার ও নিয়মিত তা পরিবর্তন, টুফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু, ইনবক্সে বা ই-মেইলে কোনো লিংক পাঠানো না হলে নিশ্চিত না হয়ে ক্লিক না করা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা যেমন সবক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে তেমনি সাইবার জগতে নিরাপদ বিচরণ নারীদের অধিকার। সাইবার ক্রিমিনালরা নানা ধরনের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নারীদের সেই অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে আসছিল। কিন্তু সেদিনইতো আর নেই। সাইবার স্পেসে নারীদের হয়রানি করে সহজে পার পাওয়া যাবে না। সরকার সবসময় পাশে আছে নারীদের ।