অন্তঃপুরে যে গান শুনি পাতাঝরার

প্রকাশিত: ২:১৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২১

অন্তঃপুরে যে গান শুনি  পাতাঝরার

শাহাদত বখ্ত শাহেদ
আবু জাফর মো. তারেক ৯০ দশক থেকে লেখালেখি করলেও তার লেখা ও তার সাথে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এটা আমার দুর্ভাগ্য বলে মনে করি । আমি চাকুরির সুবাদে সিলেটের বাইরে থাকার কারনে সিলেটের অনেক লেখকের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। অনেকের লেখার সাথে পরিচয় আছে কিন্তু ব্যক্তি যোগাযোগ নেই । অনেকের সাথে দুটোই আছে।
কবি তারেকের সাথে পরিচয় হয় ফেইসবুকের মাধ্যমে। পরবর্তীতে কেমুসাস বইমেলায়।
কবি আবু জাফর মো.তারেক ৯০ দশকের কবি। ইতিমধ্যে তার ৪ টি কবিতার বই বেরিয়েছে। “অন্তঃপুরে পাতাঝরার গান” তার পঞ্চম কবিতার বই। বইটিতে ৫০ টির অধিক কবিতা রয়েছে। বইটি প্রকাশ করেছে সিলেট ও বাংলাদেশের সুনামধন্য প্রকাশনী “বাসিয়া”। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ। মূল্য ১৫০/- ২০২১ এর বইমেলায় বইটি প্রকাশ পেয়েছে।
কবি তারেক একজন সমাজ সচেতন কবি বললে ভুল হবে না। তিনি জীবনকে যেভাবে দেখছেন উপভোগ করছেন তারই প্রতিচ্ছবি ফোটে উঠেছে এ বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতার
লাইনে।
প্রেমিক হৃদয়ের সরলতা ও জীবনের স্মৃতিময় সুখ-দুঃখকে সাবলীল ভাষায় তুলে এনেছেন বইয়ের প্রতিটি পাতায়।
সমাজের অনিয়ম ও অবক্ষয়ের অব্যক্ত কথা গুলো সাজিয়েছেন নিপুন হাতে।
স্মৃতিময় বাগান কবিতায় লিখেছেন
কবি :
আজ হঠাৎ স্মৃতির জানালায় ভেসে উঠে পুরোনো সেই স্মৃতিময় বাগান
আহা কী যে মধুময় স্মৃতি
আহা কত যে রাঙা
আহা কী মধুময় হাসি
কী মায়াবী চাহনি।
তারেক সামাজিক অবস্থাকে সুন্দর ও সহজ করে লিখেছেন যেমন
“আলোর মিছিল”কবিতায়
আজ যেন সর্বত্র আলো পরাজিত হচ্ছে
চারিদিকে আজ আধারের
জয়জয়কার
আলো যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে।
— আলোর বিকিরণেই তো আধার দূর হয়
আধার পরাজিত হোক
আবার শুরু হোক আলোর মিছিল।
কবি হতাশার ধূম্রজালে আটকা পড়লেও তিনি একজন আশাবাদী মানুষ।
“অনুজীব” কবিতায় লিখেছেন এভাবে
এক অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনুজীবের সাথে করেছি সন্ধি
মনকে রেখেছি খাঁচায় জীবন ঘরের
ভিতরে বন্দী।
কবে যে করেনা হবে ক্ষয়
বিজ্ঞানের হবে কভে জয়
বিধাতা রহম করো দ্রুত সফল হোক
বিজ্ঞানের ফন্দি।
প্রকৃতির সুন্দর মনোলোভা চিত্রকে নিজের মত করে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন তার
” নীলাভ আকাশ” কবিতায়
নীলাভ আকাশে সাদা মেঘেরা উড়ে উড়ে যায়
রোদেলা হাসিতে রংধনু শাড়ি পরেছে
আকাশ নীল গায়
উদাস বিকেল মন -পাখি উড়ছে আকাশের নীলিমায়
বাউরি বাতাসে স্বপ্নঘুড়ি বেড়ায় আকাশের সীমানায়।
কবি শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলি ছোট্ট কবিতায় নিয়ে এসেছেন তার
দক্ষ মুন্সিয়ানায়।
“নিশিরাত” কবিতায় কবি বলেন
নিশিরাতে ঘুম নেই জেগে আছি একা
আলোকিত শৈশব মনে আঁকে রেখা
শৈশবের মধুুময় স্মৃতি করে ঝলমল
ময়ূর পেখমে স্মৃতিরা ডাকে কেকা
পঙ্খিরাজে চড়ে স্মৃতির স্হান হয় দেখা
স্মৃতিতে আজও উজ্জল শৈশবের দলবল।
কবি তার মনোভাব ও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন “আমি কেন মহিরুহ হতে পারি না” কবিতায় যেমন
আমি ধ্যানী হব বৃক্ষের মত
যার মূল মাটিতে পুঁতে রেখে
মৌন ধ্যানে আকাশের দিকে
চেয়ে চেয়ে দুলে দুলে
কী যেন জপমালা করছে
হয়ত তার বেড়ে ওঠাট পিছনে
যার অবদান তার গুণকীর্তন করছে
কিংবা তার স্রষ্টার
একান্ত ধ্যানে মশগুল রয়েছে।
—-প্রচণ্ড ঝড়ের সময় কি
আরও বেশি দুলে দুলে
স্রষ্টার আরাধনা করে
একটা বৃক্ষ দেখতে দেখতে
বিশাল মহীরুহ হয়ে উঠল
আমি কেন মহিরুহ হতে পারি না।
কবি জীবনের স্বর্নময় সময়কে তোলে ধরেছেন বইটির নামকরণ কবিতায়-
আমার স্বপ্নেরা একদিন বৃক্ষের মতো
পত্রপল্লবে সবুজ ছিল
কিছু স্বপ্ন ছিল কুঁড়ির মত
সোনালি আভা ছড়ানো।
তোমার ভালোবাসার
ক্লোরোফিলের আবেশ মেখে
স্বপ্নেরা হয়েছিল আরও বেশি
সবুজ সতেজ।
একদিন দেখি আমার বাসার পাশে
একটি বৃক্ষ প্রচণ্ড ঝড়ে
দোমড়ে-মোচড়ে যায়
ফলস্বরূপ বৃক্ষের পাতা
আস্তে আস্তে হলুদাভ হয়ে যায়
পরবর্তীকালে মরে ঝরে যায়।
ঠিক তেমনই তুমি যেদিন চলে যাও
আমার জীবনে প্রচণ্ড ঝড় বইছিল
হৃদয় -ভাঙা ঝড়ে
জীবন দোমড়ে-মোচড়ে পড়েছিল
আমার স্বপ্নেরা বৃক্ষপত্রের মতো
মরে ঝরে যায়
আর স্মৃতিরা শুকনো পাতার মতো
অবিরত ঝরতে থাকে
আমার অন্তঃপুরে আজ
শুধু শুনি পাতাঝরার গান।
“অন্তপুরে পাতাঝরার গান” কবি আবু জাফর মো. তারেকের অন্তরআত্নার কিছু ভালোলাগা, মন্দ লাগা ও কিছু অনুভূতির অক্ষরচিত্র যা পাঠকের সামনে তোলে ধরেছেন। পাঠকরা তা পাঠ করলে অবশ্যই কবির আত্না শান্তি পাবে ও প্রচেষ্টা সফল হবে। বইটির বহুল প্রচার ও পাঠক প্রিয়তা পাক এই কামনা রইলো।
সিলেট
৯ এপ্রিল ২১