অপুর স্বপ্ন

প্রকাশিত: ১২:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২১

অপুর স্বপ্ন

অপুর স্বপ্ন

 

“করোনা ‘কে আর করি নে ভয়
পড়বো মাস্ক, হবো সচেতন, করবো জয় ”

উৎসর্গ : যারা ‘করোনা’ আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেছেন।

 

কাজী আনারকলি

( অপুর বাবা মাঝারি ব্যবসায়ী। অনেক কষ্টে নিজের উপার্জিত অর্থে ঢাকায় একটা নিজস্ব ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। কিন্তু ২০২০সালের প্রথম দিকে করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব আর অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর মিছিলের কারণে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। একদিকে যেমন তার ব্যবসার ধ্বস নামে, অন্যদিকে ওনি ও ওনার স্ত্রী করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হন।

শিখার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা। ঢাকায় একটা আলিশান ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকেন। শিখা ও অপু ইউনিভার্সিটিতে একসাথে পড়ে। অনার্স পরীক্ষা শেষ। থিসিস পেপার জমা দেয়ার দিন থেকেই দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। লকডাউন ঘোষণা করা হয়।এরপর থেকে কোয়ারেন্টাইনে আছে সবাই)।

দৃশ্য : ১

চরিত্র : শিখা, অপু
স্থান : ক) শিখার বাসা খ) অপুর বাসা
সময় : সন্ধ্যা।

(টেবিলের উপর রাখা মোবাইল টোন বেজে উঠলে শিখা দৌড়ে গিয়ে সেটা অন করে।)

শিখা : হ্যালো , অপু ? কেমন আছিস ?

(ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কন্ঠ ভেসে আসে)

অপু : শিখা , এই মাত্র আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো ।

শিখা : উদ্বেগ প্রকাশ করে। রিএ্যাকশন) কী বলছিস ? উল্টা পাল্টা ! আন্টি কিভাবে মারা গেল ?
অপু : ইটালি থেকে ছোট মামা আসছেন। এই কয়েক দিন হলো।মা বাবা ওনার সাথে দেখা করতে গেছিল।
শিখা : তারপর ?
অপু : ওখান থেকে আসার পর বেশ কদিন তো ভালই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মা’র জ্বর এল। আর সেই সাথে কাশি ছিল। ইউনাইটেড হসপিটালে ভর্তি করছিলাম। করোনা টেস্ট করা হলে গতকাল পজিটিভ ধরা পড়ে। আজ, এই আধঘন্টা হলো ….

( অপু কাঁদতে থাকে। শিখার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে)

শিখা : তুই ওনাদের যেতে দিলি কেন ? তুই জানিস না , এর পরিণাম যে এমন হবে ? ‘করোনা’ কী মারাত্মক ভাইরাস ! টিভিতে বারবার ঘোষণা দিচ্ছে। প্রতিদিন চীন, আমেরিকা, ইতালি, ইংল্যান্ডে…. হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ভাইরাস ইন্ডিয়া, বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের দেশের ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তাররা পর্যন্ত এ থেকে নিস্তার পাচ্ছে না ?

অপু : আমার কথা শুনলে তো ! আমি বলেছি , যেওনা, যেওনা। মা তো আমার কথার কোনো পাত্তাই দিল না। ভাই অসুস্থ শুনেই দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। শেষে বাবা আর কি করবে ? বাধ্য হয়ে নিয়ে গেল।
শিখা : আন্টি আঙ্কেল ‘করোনা’ আক্রান্ত হইল, তুই আমাকে একবারও জানাবার প্রয়োজন বোধ করলি না ?
অপু : আসলে লজ্জায় প্রথমে কাউকে বলতে চাইনি।
শিখা : লজ্জা ! কীসের লজ্জা ! কেউ ‘করোনা’ আক্রান্ত হলে গোপন না করতে টিভিতে সারাক্ষণ ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে, আর তুই কি না ….এত ইনফিরিয়র কমপ্লেক্সে ভুগিস কেন রে ?
অপু : থাক না ওসব, বাদ দে। মা চলে গেছে । মাকে তো আর ফিরে পাবো না ? এখন বাবাকে কিভাবে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তায় আছি।
শিখা : আমি কী বলে যে তোকে সান্ত্বনা দিব ? এমনিতেই প্রতিদিন ধানমন্ডি, নারায়ণগঞ্জ , মিরপুর , করোনা আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর সংবাদ শুনে ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ছি।
অপু : আমি এতিম হয়ে গেলাম।
শিখা : প্লিজ, ধৈর্য ধর। সব আল্লাহর হুকুম। দোয়া কর। আন্টিকে যেন আল্লাহ বেহেশত নসীব করেন।
অপু : ঠিক আছে। রাখি রে।

(বলেই অপু কাশতে থাকে। )

শিখা : তুইও তো কাশতেছিস । তুইও কি …
অপু : না। আমি ঠিক আছি। তবে বাবার শরীরটা ভালো নাই রে।
শিখা : ওনাকে কি হসপিটালে ভর্তি করছিস ?
অপু : না। ওনি আগেই বলে দিছেন , হসপিটালে ভর্তি হবেন না। যা চিকিৎসা করার বাসায় বসেই করবেন । ওনার ধারণা, হসপিটালে ভর্তি করলে ওনার মৃত্যু আরো ত্বরান্বিত হবে। হসপিটালের ডাক্তাররা নাকি সবাই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। ওরা নাকি নিজেরাই অসচেতন। অনেক ডাক্তার এখন পর্যন্ত পিপিই পরে না , মাস্ক পরে না। মুখে সচেতনতার কথা বলে কিন্তু বাস্তবে ওরা অনেকেই মানছে না। সরকারি পিপিই , মাস্ক, স্যানিটাইজার কখন পাবে , এরজন্য হা করে আছে ! নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করতে চায় না। তো সাধারণ মানুষ কী করবে ? ইত্যাদি, ইত্যাদি…. তোকে কী বলব ?

(অপুর মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে শিখা এতোই মর্মাহত হয়েছে যে সে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলতেই ভুলে গেছে।’হঠাৎ মনে পড়ায় শিখা বিড়বিড় করে বলতে থাকে)

শিখা : ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অপু ওপাশ থেকে : হ্যালো, হ্যালো ? শিখা কি বলছিস ? আমি তোর কথা কিছু বুঝতে পারছি না। কী বিড়বিড় করছিস ?
শিখা : না, না। কিছু বলছি না। আসলে আন্টির মৃত্যুর খবরটা শুনে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। তাই ইন্না লিল্লাহ পড়তে ভুলেই গেছিলাম। আল্লাহ আন্টিকে বেহেশত নসীব করুন। আন্টির দাফন কাফনের ব্যবস্থার কথা ভাবছিস কিছু ?
অপু : কেমনে ভাববো ? যখন শুনছে মা করোনায় মারা গেছে তখন বড় ভাই ভাবী বলছে , আসতে পারবে না। আত্মীয়-স্বজন অনেককেই ফোন দিছি কিন্তু কেউ তেমন সাড়া দেয় নি। সবাই ইন্না লিল্লাহ পড়েই খালাস। মানে ফোন কেটে দিলো।
শিখা : পাষাণ, পাষাণ !
অপু : কী আর করবো ? থানায় ইনফরম করছি।
শিখা : খুব ভাল করছিস । আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্ট কিন্তু খুব দায়িত্বশীল হয়ে ওঠছে এখন। নিজের জীবন বাজি রেখে ওরা যেভাবে ত্রাণ বিলাচ্ছে, আর করোনা আক্রান্ত রোগীদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে !
অপু : আচ্ছা শিখা , আমি এখন রাখি । পরে কথা বলবো। দোয়া করিস।

(মা-বাবা বা ভাই-বোন দেখবে বলে শিখা ওড়নার আঁচলে তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফেলে।)

দৃশ্য : ২

চরিত্র : শিখা, শিখার মা ও বাবা , অপু।
স্থান : ক) শিখাদের বাসার ড্রইং রুম। খ) শিখার রুম।
সময় : বিকেল।

(একপাশের ডাবল সোফায় বসে শিখার মা ও বাবা মোবাইলে ফেইসবুক নিয়ে ব্যস্ত। অন্য পাশের সিঙেল সোফায় বসে শিখা টিভিতে বিভিন্ন দেশের করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু সংখ্যার তথ্য সমূহ দেখছে )

শিখার মা : ( শিখার বাবা কে লক্ষ করে। উদ্বেগ প্রকাশ, রিএ্যাকশন)
এই দেখ, দেখ। করোনায় চিটাগাং এ আজ নাকি তিন জন মারা গেছে ! একজনকে নাকি তার মেয়ে পানিটা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় নাই। কেমন নিষ্ঠুর মেয়েটা ! যে বাবা তাকে এতদিন লালন পালন করল, মৃত্যুর সময় কেউ তাকে খাবার দেবে তো দূরের কথা, পানিটা পর্যন্ত দিল না ?
শিখার বাবা : কী বলছ ? তুমি বাপের কথা বলছ ? যে মা সন্তানকে দশমাস দশদিন পেটে ধারণ করছে , যে মা নিজের ঘুম হারাম করছে ,নিজে না খেয়ে সন্তানরে খাওয়াইছে সেই সন্তান পর্যন্ত করোনার ভয়ে মাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসছে ? নারায়ণগঞ্জের সেই ছেলেটার কথা পড় নাই ? নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়িতে এসে ছোট ছেলে দেখে , মা করোনা আক্রান্ত। তখন ছোট ছেলে আর বড় ছেলে দুজন মিলে মাইক্রো করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে বলে গভীর জঙ্গলে নিয়ে মাকে ফেলে আসছে ! এবার বুঝ, মানুষ কত অমানুষ হইছে ?
শিখা : চীন, আমেরিকা,ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, ইন্ডিয়া,বিভিন্ন দেশের বিভ‌ৎস মৃত্যু মিছিলের কথা শুনে শুনে মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি , এর মধ্যে আবার নিজের দেশের এই অবস্থা !

( শিখার মোবাইল বেজে ওঠলে শিখা ওর রুমে চলে যায়)

শিখা : হ্যালো ? ( মোবাইল রিসিভ করে)
অপু : (ওপাশ থেকে) হ্যালো ?
শিখা : হুঁ । অপু বল।
অপু : কাল আসবি তো ? বুড়িগঙার চরের বস্তিতে খাবারের প্যাকেট গুলো বিলি করতে হবে ।
শিখা : আসব না মানে ? অবশ্যই আসব।
অপু : শুনছিস ?
শিখা : কী ?
অপু : সেই চেয়ারম্যানের রিলিফ চুরির কথা ?
শিখা : কী আর বলব ? বাঙালি মানুষ হবে না কোনো দিন। ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী’ বুঝলি ?
অপু : রিয়েলি ! তুই ….

দৃশ্য : ৩

চরিত্র : অপু, কাজের বুয়া নাসিমা
স্থান : অপুদের বাসা
সময় : সকাল

অপু কাজের বুয়া নাসিমাকে ডাকে : নাসিমা, নাসিমা ?

নাসিমা ভয়েস ওভার : জ্বী ভাইয়া।

(নাসিমা ইন করে)

নাসিমা : ভাইয়া , কী রে ডাকছেন ?

(অপু মাথা নিচু করে বসে থাকে।)

নাসিমা : ভাইয়া, আমারে যে ডাকলেন?
অপু : না । বলছিলাম কী ? তুই ত বুঝতে পারছিস। আমাদের আর্থিক অবস্থা এখন আগের মত নাই। দুই মাস ধইরা আব্বুর ব্যবসা বন্ধ। এই ছোট ফ্ল্যাটটা আব্বু সুদিনে কিনে রাখাতে হয়তবা ভাড়া দিতে হচ্ছে না। নাইলে যে কী হত ! আম্মুর চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হইছে। যদিও আম্মুকে বাঁচাতে পারলাম না। তোর গত মাসের বেতন , এখন পর্যন্ত দিতে পারি নাই। আমার টিউশনি বন্ধ।

নাসিমা দৃঢ় কণ্ঠে বলে : ত কি হইছে ? আমি কি আপনাদের কাছে বেতন খুঁজছি ?
অপু : না । খুঁজিস নাই । কিন্তু তোর মা বাপের ….
নাসিমা : আপনি আমার মা বাপের কথা চিন্তা করতেছেন ? আপনি তো আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না দেখতাছি ! আমার মা বাপ ত কবেই মইরা ভূত হইয়া গেছে ! সেই ছোট কালে ! আমি ত বড় ভাইয়ের কাছে থাকতাম । একদিন খালাম্মার লগে দেখা হইল । আমি চইলা আইলাম। এরপর থেইক্কা খালাম্মারেই মা বইলা জানতাম। এখন খালাম্মা …

(নাসিমা কাঁদতে থাকে।)

অপু ধমকের সুরে বলে : কাঁদছিস কেন ? একদম কাঁদবি না। কান্না কাটি আমার সহ্য হয় না। দেখিস না, আমি একটুও কাঁদছি না ? পাথর হয়ে গেছি !

নাসিমা চোখ মুছে বলে : বড় ভাই, এখানে কাজ কাম নাই দেইখা আমারে ফালাইয়া গেরামের বাড়িতে চইলা গেছে। একটু জানায়ও নাই। খালাম্মা করোনা রোগে মইরা যাওনের খবর দেওনের পর বড় ভাই কইছে আমি যেন ওনার বাসায় না যাই। এই দুর্দিনে আমি আর কই যামু। আমার বেতন দেওনের কথা চিন্তা কইরেন না। শুধু তিন বেলা খাওন আর রাইতে নিরাপদে ঘুমাইতে পারলেই আমার সারব। আর কিচ্ছু লাগব না। বেতনটা পাইয়াই ভাইয়ের হাতে নিয়া তুইলা দিছি। এখন আমি কার হাতে বেতন তুইলা দেমু ? গেরামে যাওনের সময় একবারও ভাই কইল না ? ঠিক আছে না কইলে নাই । আমিও ফোনে জানাই দিছি, আমার এমন ভাই থাকনের চাইতে না থাকন ভালা।
অপু : ঠিক আছে । বুঝছি, বুঝছি। তুই যাবি না। তাইত ?
নাসিমা : জ্বী । একশ পার্সেন্ট !

(নাসিমা চলে যায়। অপু কাষ্ঠ হাসি হাসার চেষ্টা করে)

দৃশ্য : ৪

চরিত্র : অপু, অপুর বাবা, নাসিমা
স্থান : অপুদের বাসা
সময় : সকাল

(অপুর বাবা কাশতে কাশতে প্রাণ যায় আসে।)

অপু : বাবা , তোমাকে কত করে বললাম যে হসপিটালে ভর্তি হও। আমার কথা কিছুতেই গায়ে মাখলে না।
অপুর বাবা : আ রে , হসপিটালে ভর্তি হইয়া লাভ কী ? এই রোগের ওষুধ কি এখনো বাইর হইছে ? অনর্থক কতগুলা টাকা নষ্ট ! এখন তো মনে হইতেছে, না খাইয়াই মরণ লাগব। তর মারে কি হসপিটালে ভর্তি কইরা বাঁচাইতে পারছস ? আমারও যাওনের সময় হইছে । তর মা আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে। চিন্তা করিস না।

অপু কাজের বুয়া নাসিমাকে চিৎকার করে ডাকে : নাসিমা, নাসিমা ?

নাসিমা ভয়েস ওভার : জ্বী, ভাইয়া আইতাছি।

নাসিমা : ( ইন করে) কন।
অপু : আব্বুর জন্য একটু আদা চা করে দেতো ।
নাসিমা : আদা ত নাই । শেষ হইয়া গেছে।
অপু : উহঃ সেড !

অপু : (নাসিমাকে ধমক দেয়) ত আর কি করবি ? খালি চা পাতাই একটু সিদ্ধ করে দে।

নাসিমা : ঠিক আছে। আনতাছি। চাল কিন্তু শেষ হইয়া গেছে । আর দুই দিন কি একদিন চলব।
অপু : আমি আর কি করব ? এগুলো খাওয়ার পর তিনজনে মিলে উপোস দেব !

(নাসিমা চা করতে চলে যায়। অপু মোবাইল টিপে টিপে বেশ কয়েকজনকে ফোন দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কেউ ফোন ধরে না।)

অপু বিরক্তির স্বরে বলে : এখন কেউ ফোন ধরবে না। বিপদের সময় বন্ধু চেনা যায় !

দৃশ্য : ৫

চরিত্র : শিখা, শিখার মা ও বাবা
স্থান : ক) শিখাদের বাসা খ) রাস্তায় গলির মোড়
সময় : সকাল

(শিখা হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায়)

শিখা : মা, আমি যাচ্ছি।
মা : ঠিক আছে। সাবধানে থাকিস । রিকশা করে যাবি ,আর রিকশা করে আসবি ।
বাবা : শিখা, কোথায় যাচ্ছিস ? আমি না নিষেধ করলাম অযথা বাইরে ঘুরাঘুরি করতে ?
শিখা : ( বিরক্তি, রিএ্যাকশন) বাবা, আমি ঘুরাঘুরি করতে যাচ্ছি না।
বাবা : তাহলে ?
শিখা : ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি।
বাবা : ইউনিভার্সিটি বন্ধ না ?
শিখা : হ্যাঁ, বন্ধ। কিন্তু স্যারেরা মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে আসে। ছাত্র ছাত্রীরাও যায়।
বাবা : এই রোগ ব্যাধির মধ্যে তোর ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার কী প্রয়োজন ? অনার্স পরীক্ষা ত কবেই শেষ হয়ে গেছে !
শিখা : বাবা , আমি যে থিসিস পেপার জমা দিছি , সেটাতে একটু প্রবলেম হইছে তাই স্যার আমাকে ওনার সাথে দেখা করতে ফোন দিছে । ওটাতে একটু সংশোধন করতে হবে। আমার টাইম নাই । আমি যাই। মা, দরজাটা বন্ধ করো তো। আমি এক্ষুণি চলে আসবো। এই যাবো আর আসবো।

(এক নিঃশ্বাসে শিখা কথা গুলো বলেই বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। লিফট বন্ধ থাকায় সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামে।)

বাবা : (শিখার মাকে লক্ষ করে) : বাজারের ব্যাগটা দাও । গলির মোড়ে ভ্যান ওয়ালার কাছ থেকে কিছু তরিতরকারি নিয়ে আসি। সবজি, জিনিস পত্রের যা দাম !

( শিখার মা ব্যাগ এনে দিলে শিখার বাবা, হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজার মেখে বেরিয়ে যান । গলির মোড়ে আসতেই শিখাকে দেখতে পান , একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। তিনি ভালো করে শিখা ও ছেলেটার আপাদমস্তক লক্ষ করেন।)

মনে মনে বলেন : ও শিখা না ? ও না বলল, ইউনিভার্সিটিতে ওর প্রফেসরের সাথে দেখা করতে যাবে ? এই ওর ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া ? এই ওর থিসিস পেপার শোধরানো ? আসুক বাসায় আজ ! ত ছেলেটা কে ? ( চিন্তিত হন, রিএ্যাকশন) মুখের মাস্কের জন্য তো ছেলেটাকে চিনতে পারছি না ! বেশভূষা দেখে ত মনে হচ্ছে না যে কোনো স্বচ্ছল ভদ্র ফেমিলির ছেলে ? পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল , পরণে ময়লা শার্ট ! উস্কো খুস্কো চুল !

( মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ওরা একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ে)

দৃশ্য : ৬

চরিত্র : শিখা, বাবা ও মা
স্থান : শিখাদের বাসা
সময় : বিকেল

বাবা : ( শিখার মাকে লক্ষ করে । রাগ, রিএ্যাকশন) কোথায় তুমি ? শুনছ ? হ্যাঁ ? কী ব্যাপার ? এতক্ষণ ধরে ডাকছি কানে যাচ্ছে না ? কোথায় ?

মা : (দ্রুত রান্না ঘর থেকে এসে বলেন) : কী হইছে ? এভাবে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছ কেন ?
বাবা : ( অগ্নি মূর্তি, রিএ্যাকশন) কী , আমি ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছি ? বাসায় বসে আছি বলে , তুমি এভাবে আমাকে অপমান করছ ?
মা : আচ্ছা , যা বলার তাড়াতাড়ি বল। আর অপমান করব না। আমি চুলায় রান্না বসাইছি ।
বাবা : তোমার গুণধর মেয়ে বাসায় ফিরছে ?
মা : কার কথা বলছ ?
বাবা : কার কথা আবার ? শিখার কথা । ওর ই তো এখন পাখা গজাইছে ! বাকি গুলা ত এখনো মাটির সাথে কথা বলে !
মা : তুমি কী বলতে চাইছ , আমার মাথায় ত কিছুই ঢুকতে চাইছে না !
বাবা : কেমনে মাথায় ঢুকব ? মাথায় ত খালি গোবর !
মা : দেখ , আমার সাথে উল্টাপাল্টা কথা বলবে না। আমার মাথা এমনিতেই গরম হয়ে আছে। কাজের বুয়া নাই । তুমি সারা দিন টিভি আর মোবাইল নিয়া বসে থাক। বাসার সমস্ত কাজ আমার করতে হয়।
বাবা : কেন ? আমি কাজ করি না ? ঘর মোছার কাজ ত আমিই করি ।
মা : হুঁ । এমন করা কর না! সারা ঘর বন্যায় ভাসে ! সেই আবার আমার শুকনা কাপড় দিয়া মুছতে হয়। আচ্ছা , রাখ ত ওসব কথা । শিখার কথা কি বলতে চাইছ , বল।
বাবা : ( মুখ বাঁকিয়ে, চোখ বড়োবড়ো করে) হুঁ । কী আর বলব ? শিখা বাসায় ফিরছে ?
মা : সে ত অনেক আগেই ফিরছে । সেই দুপুরেই ফিরছে। খেয়ে ওর রুমের দরজা লক করে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। কেন ?
বাবা : তোমার মেয়ে এতবড় ডাহা মিথ্যা কথা বলতে পারল ?
মা : ( অবাক হন, রিএ্যাকশন) ডাহা মিথ্যা কথা বলছে ?
বাবা : নয়ত কী ..?

(বাবা মা কে সব খুলে বলেন।)

বাবা : আমার মান ইজ্জত কিছুই থাকল না।
মা : মেয়ে এখন বড় হইছে ।
বাবা : ইউনিভার্সিটি এলাকায় হলে কথা ছিল না। সেই জন্য এই মহল্লার ভেতরে ? কোথায় ? ডাক ,ওরে। শিখা ? শিখা ?( বাবা শিখার রুমের দিকে ‌যেতে থাকে।
মা : আচ্ছা। আমি তো ডেকে দিচ্ছি ! ওয়েট করো না !

(বাবা গিয়ে শিখার রুমের দরজা নক করতে থাকেন। শিখা ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে বাবার অগ্নি মূর্তি দেখে অবাক হয় ।)

শিখা : ( রিএ্যাকশন) কি হইছে ?

বাবা : ( শিখার হাত ধরে ঝাকুনি দিয়ে) এই তোর ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া ? সত্যি করে বল , গলির মোড়ে যে ছেলেটার সাথে কথা বলছিস সেটা কে ? তার কাপড় চোপড়, বেশভূষা দেখে ত মনে হয় না কোনো স্বচ্ছল ভদ্র ঘরের ছেলে ?
শিখা : ( ক্ষোভ, রিএ্যাকশন) বাবা , এভাবে কথা বলবে না ।
বাবা : কিভাবে কথা বলছি ? আমাকে তোর কাছে কথা বলতে শিখতে হবে ?
শিখা : (চিৎকার করে) , বাবা , এখন তোমার এসব কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে না। তুমি চুপ করবে ?
বাবা : কী ? আমার সাথে ধমকে কথা বলেছিস ? আমার মুখে মুখে তর্ক করছিস ?
( বাবা শিখাকে মারতে যায়। শিখা রাগে দুঃখে গজগজ করতে করতে বিছানায় গিয়ে আছড়ে পড়ে ‌। রিএ্যাকশন)

মা এসে ধমকে বলেন : এ কী করছ ? উপযুক্ত মেয়ের গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছ ? শুধুই কী উপযুক্ত ? সে এবার অনার্স ফাইনাল দিছে।
বাবা : তাই বলে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবে ? জান তুমি , পাড়ার কয়েকটা ছেলে কিভাবে ওর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিল ? পাশের বিল্ডিং এর রশিদ সাহেব আর বোরহান সাহেব কী বাজে মন্তব্য করছিল ? আমার মেয়ে নাকি ইউনিভার্সিটিতে উঠে নষ্ট হয়ে গেছে ? আমার মেয়ে কোথায় যায়, কার সাথে ঘুরে আমি নাকি কিছুই খবর রাখি না ? তাও আবার এই করোনা কালে ?

দৃশ্য : ৭

চরিত্র : অপু, দোকানি
স্থান : ওষুধের দোকান
সময় : বিকেল

(অপু একটা ওষুধের দোকানে যায়।)

অপু :(দোকানিকে) : ভাই , একপাতা এইস আর …. হবে ?
দোকানি : হবে।
অপু : টাকা পরে দেব।
দোকানি : স্যরি ভাই। আপনি যে ওষুধের নাম বলছেন, এগুলো আমাদের দোকানে নাই।
অপু : এইমাত্র বললেন যে আছে !

(দোকানি নীরব।)

অপু : বলেন যে বাকি দেবেন না। সোজা সাপটা কথা বললেই ত পারেন !
দোকানি : বুঝতেই যখন পারছেন ত দাঁড়ায় আছেন কেন ?

(অপু আরেক দোকানে যায়।)

দোকানি : ভাই, আমরা ত এই ওষুধ বেইচাই পেট চালাই। এই করোনা কালে বাকি চাইয়া লজ্জা দিয়েন না।

(অপু দ্রুত দোকান থেকে বের হয়ে আসে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কয়েকজনকে ফোন দেয়। ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।)

অপু : (রাগে দুঃখে ,রিএ্যাকশন ) উহঃ ! সেড !

দৃশ্য : ৮

চরিত্র : শিখা, নাসিমা
স্থান : ক) শিখাদের বাসা খ) অপুদের বাসা
সময় : সকাল

(কয়েক দিন পর শিখার কাছে একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন আসে।)

শিখা : হ্যালো, আপনি কে বলছেন ?

ওপাশ থেকে কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলে : আপু, আমি নাসিমা কইতাছি।
শিখা : ( অবাক হয়, রিএ্যাকশন) নাসিমা ? নাসিমা আবার কে ?

নাসিমা ওর পরিচয় দিয়ে বলে : আজ সকালে, মানে ভোরে …..
শিখা : কী ? অপুর বাবাও চলে গেছে ?
নাসিমা : জ্বী ।
শিখা : কোথায় ? অপু ত ফোন করে জানাল না।
নাসিমা : কিভাবে জানাবেন ? ওনিও ত জ্বরে .. আবোল তাবোল কইতাছেন ! ওনাদের আত্মীয় স্বজন কেউই ফোন ধরতাছে না।
শিখা : আঙ্কেলের লাশ ?
নাসিমা : পুলিশ এসে ….।

(শিখা ফোন কেটে দিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। শিখার রুমে মায়ের প্রবেশ। শিখাকে কাঁদতে দেখেন)।

মা : কী রে শিখা ? কাঁদছিস যে ? কী হয়েছে ?

শিখা : ( মা কে জড়িয়ে ধরে , ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে) মা , মা । ঐ যে , ঐ অপু । সেদিন যার সাথে কথা বলতে গেছিলাম। যার জন্য বাবা আমাকে মারতে এসেছিল। আসলে বাবা যা দেখেছে তা ওর আসল চেহারা ছিল না। ও আসলে খুব ভালো ছেলে । বুঝছো মা। ও খুব খুব ভালো ছেলে। আমাদের ক্লাশের ফার্স্ট ক্যাপ্টেন। চার-পাঁচ দিন আগে ওর মা মারা গেছে। আজ ওর বাবাও মারা গেছে। দুজনেই চার- পাঁচ দিনের ব্যবধানে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এখন সেও করোনার সাথে যুদ্ধ করছে …..। আসলে সেদিন আমরা দুজন মিলে ওর পরিচিত ‘করোনা’ আক্রান্ত একজন অসহায় রোগীকে হসপিটালে ভর্তি করতে গেছিলাম। এরপর আমরা বস্তিতে ত্রাণ বিলি করতে গেছিলাম। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটা টিম গঠন করছি। অপু হচ্ছে টিম লিডার …. কিন্তু এখন সে নিজেই ‘করোনা’ আক্রান্ত…. কী যে করব ? মা, বলো না ?

দৃশ্য : ৯

চরিত্র : শিখা, মা ও বাবা
স্থান : শিখাদের বাসা
সময় : দুপুর

(শিখা মুখে মাস্ক লাগিয়ে হাতে গ্লাভস পরে । শিখার মা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে টেবিলের উপর রাখেন)

মা : নে । এখানে ভাত তরকারি দিছি। ফ্রিজে রেখে তিন চার দিন গরম করে খেতে পারবে। ঐ কাজের মেয়েটা , নাসিমা । ওকে বলবি , টাইমলি যেন ওকে খাবার দাবার দেয়। আর এই পুঁটলিটাতে অল্প কিছু লং, এলাচি, দারুচিনি,আদা দিছি। কিছুক্ষণ পর পর অপুরে যেন লং,এলাচি, আদা… দিয়ে গরম চা খেতে দেয়। নাসিমাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলবি।
শিখা : ঠিক আছে মা।

(এমন সময় শিখার বাবা আসে। বাবাকে দেখে শিখা বেশ থতমত খেয়ে যায়। শিখার মাও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। )

বাবা : শিখা, এই নে। এই টাকাটা ধর । নাসিমার হাতে দিয়ে আসিস। যা লাগে সে যেন কিনে নেয়। আর ঐ ছোকড়াটা , কী নাম যেন … অপু, অপু। ওকে সাবধানে থাকতে বলবি। ভালো হয়ে যাবে। ইয়ং ছেলে মেয়েদের ‘করোনা’ কিচ্ছু করতে পারবে না। মনে সাহস চাই। গায়ে ইমিউনিটি পাওয়ার চাই।

(শিখা টাকা হাতে নিয়ে একদৃষ্টে বাবার দিকে মিনিট ক্ষণ তাকিয়ে থাকে। )

শিখা : বাবা !
বাবা : (চোখ ইশারা করে, রিএ্যাকশন) আমি সব শুনেছি। যা। দোয়া করছি আমি।

শিখা : ( টলমল চোখে ) মা !
মা : তাড়াতাড়ি যা। দেরি করিস না। তুই কিন্তু বাসার ভেতর ঢুকিস না। নাসিমার হাতে দিয়েই চলে আসবি।
শিখা : (টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নেয়) ঠিক আছে , মা । আসি।

দৃশ্য : ১০

অপুদের বাড়ি। শিখা হ্যান্ড ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে । টিস্যু দিয়ে কলিং বেল চেপে ধরে। নাসিমা দরজা খুলে।

নাসিমা : আপনি , শিখা আপু, না ?
শিখা : হুঁ । তুমি নাসিমা ?
নাসিমা : জ্বী । আসেন , ভিতরে আসেন।
শিখা : ( টিফিন ক্যারিয়ার এগিয়ে দেয়) ধর। এখানে ভাত তরকারি আছে। তিন চার দিন ফ্রিজে রেখে গরম করে খেতে পারবে। মা দিয়েছে।

(নাসিমা বেশ খুশি হয়ে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নেয়। শিখা ড্রইং রুমে ঢুকে চারিদিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়)

শিখা : অপু কোন্ রুমে ?

(সাথে সাথেই অপুর কাশির শব্দ শিখার কানে আসে।)

নাসিমা : ঐ ত আবার কাশতে শুরু করছে।
আপু , আসেন।

(দুজনেই অপুর রুমে ঢুকে)

নাসিমা : ভাইয়া দেখেন , কে আসছে ?
অপু : কে ? ( তাকায়। রিএ্যাকশন) শিখা !
শিখা : হুঁ । (দ্রুত অপুর বিছানার কাছে এসে দাঁড়ায়। রাগ প্রকাশ করে।রিএ্যাকশন) আঙ্কেল নেই, তুই আমাকে একবার জানাবার প্রয়োজন বোধ করলি না ? নাসিমার কাছ থেকে শুনতে হল ? মোবাইলটা পর্যন্ত অফ করে রাখছিস ?

অপু : (শিখা কে দেখামাত্র কাশি থেমে গেলো) শিখা , তুই ? বাসা চিনলি কিভাবে ? আঙ্কেল তোকে আসতে দিল ?

শিখা : ( অপুর কপালে হাত দেয়) হুঁ । এখনো তো অনেক জ্বর ।
অপু : এ কী করছিস ? আমাকে ছুঁইছিস কেন ? তোরও ‘করোনা’ হবে।
শিখা : হোক ‘করোনা’ আমার। তুই না বাঁচলে আমার বেঁচে থেকে লাভ কী ? ( বলেই শিখা নিজেই হতভম্ব হয়ে যায়)
অপু : কী বলছিস ? ( অপু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শিখার দিকে)
শিখা : আমার ‘করোনা’ হবে না। বুঝতে পারছিস ? আমার হাতে গ্লাভস আছে। তাছাড়া তুই কি কনফার্ম যে তোর ‘করোনা’ হয়েছে ? টেস্ট করেছিস ?
অপু : না । তবে আমি যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তা একশ পার্সেন্ট শিওর ।
শিখা : তুই এতো শিওর হলি কেমন করে !
অপু : মা বাবা দুজনেই যেহেতু করোনা পজিটিভ ছিল। সেহেতু আমারও করোনা পজিটিভ সেটা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ? ওনাদের যে সিম্পটম দেখা গেছিল, ঠিক একই সিম্পটম আমার দেখতে পাচ্ছি।
শিখা : নিজে নিজেই ডাক্তার বনে গেছিস ! তুই কেন আমাকে ফোন করে জানালি না ? তুই যাবি বলে আমি সেদিন কত অপেক্ষা করলাম, জানিস ? এরপর ফোন করলাম। ফোন ধরলি না , কেন ?
অপু : আসলে …..
শিখা : আসলে কী ? আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারিস নি তো ?
অপু : না। ঠিক তা নয়। আমি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও , মৃত্যু অবধি তুই আমার পাশে থাকবি, সে বিশ্বাস আমার আছে। তবে ….
শিখা : তবে কী ?
অপু : সেদিন আসলে আমি গেছিলাম। তোদের বাসার সামনে নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোকে ফোন দেব , ঠিক সেই সময় আঙ্কেল আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
শিখা : ( উদ্বিগ্ন কণ্ঠে) তারপর ?
অপু : সে কথা গুলো নাইবা শুনলি ।
শিখা : ( হাসি মুখে) বাবার নেগেটিভ কথাগুলো তুই মনোযোগ দিয়ে শুনলি ? আর অমনি তুই অভিমান করে চলে এলি ! আমার ফোনটা বারবার কেটে দিচ্ছিলি !
অপু : আমি চাইনা, তুই আঙ্কেলের কথার অবাধ্য হয়ে আমার সাথে সম্পর্কে জড়াস।
শিখা : অপু, কথা বেশি বলবি না। আমি তোর সাথে সম্পর্কে জড়াব কি জড়াব না ,এটা সম্পূর্ণ আমার ডিসিশন। (নাসিমাকে লক্ষ করে) নাসিমা , অপু খেয়েছে ?
নাসিমা : না , আপু ।
শিখা : প্লেট ধুয়ে নিয়ে আস।

( নাসিমা প্লেট ধুয়ে আনলে শিখা টিফিন ক্যারিয়ার থেকে ভাত তরকারি নেয়। নাসিমা চলে যায়। অপুকে শিখা জোর করেই খাইয়ে দেয়। এর পর একটা এইস খাইয়ে দেয়। )

শিখা : এবার লম্বা একটা ঘুম দিবি , বুঝলি ?
অপু : তুই কি ম্যাজিক জানিস না কি ?
শিখা : কেন ?
অপু : ( সামান্য কাশি দিয়ে বলে) না। তুই আসা মাত্রই আমার শরীর প্রায় অর্ধেক ভাল হয়ে গেল যে !
শিখা : মনের জোর , বুঝলি ? তোর মোটেও করোনা হয় নি । দুশ্চিন্তার কারণে, আর এ কদিন তোর উপর যে ঝড় বয়ে গেছে না ! যে খাটাখাটি করছিস ! তাছাড়া আন্টি আঙ্কেলের এভাবে চলে যাওয়ায় তুই মেন্টালি খুব বেশি আপসেট হয়ে পড়ছিস। এই যা ! আর করোনা হলেই বা কি ? তোর মত ইয়ং ম্যান যদি করোনার সাথে যুদ্ধ করে হেরে যাস , তাহলে জিতবে কে বল ? আচ্ছা আমি যাই।
অপু : ( একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তুমি করে বলে ) তোমার হাতটা আমাকে একটু ধরতে দেবে ?
শিখা : ( অবাক চোখে তাকায় ) কী হল ? হঠাৎ তুই আমাকে তুমি করে বলছিস যে !
অপু : আমি না তোমাকে খুব ভালোবাসি !
( করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে)
শিখা : আমিও। ( অস্ফুট স্বরে বলে)

( শিখা বিছানায় অপুর পাশে বসে হাত বাড়িয়ে দেয়।)

অপু : (শিখার হাত চেপে ধরে ) তুমি পাশে থাকলে আমি অবশ্যই জিতব। করোনা আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।
শিখা : হুঁ । জান ?
অপু : কী ?
শিখা : মা কিন্তু বারবার তোমাদের বাসায় ঢুকতে বারণ করে দিয়েছে।
অপু : তো , ঢুকলে কেন ?
শিখা : ঢুকলাম ! আর বাবা আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক পজিটিভ।
অপু : কেমনে বুঝলে ?
শিখা : হুঁ । আসার সময় বাবা তোমাদের জন্য পাঁচহাজার টাকা দিয়েছে।
অপু : এখন টাকা দিয়ে কি হবে ? আমি টাকা দিয়ে কী করব ? বাবার ওষুধ কেনার জন্য দশটা টাকা কেউই ধার দিল না। বিপদে বন্ধু চেনা যায়।
শিখা : আমাকে বললি না কেন ?
অপু : তুই আর কত দিবি । অনেক তো দিয়েছিস।

( নাসিমা আসছে টের পেয়ে শিখা দাঁড়ায়)

শিখা : নাসিমা, নাসিমা ।

নাসিমা : ( টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসে) জ্বী ।
শিখা : ( ওর ব্যাগ থেকে টাকা, গ্লাভস, মাস্ক বের করে) নাও । এখানে পাঁচহাজার টাকা আছে। আর এই ধর , মাস্ক-গ্লাভস। এগুলো পরে দোকানে যাবে । এই টাকা দিয়ে যদি প্রয়োজনীয় কিছু লাগে কিনে আনবে। আর রাতে অপুকে খাবার পর আরেকটা টেবলেট খেতে দেবে। একটু পর পর লং, এলাচি,আদা চা দেবে। আমি আবার কাল দুপুরে এসে দেখে যাব।

(নাসিমা মাথা নাড়ায়। শিখা বেরিয়ে যায়। অপু শিখার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।)

রচনা কাল : ১৬/০৯/২০২০ ।

ছড়িয়ে দিন