অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীশিক্ষা

প্রকাশিত: ১২:২১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮

অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীশিক্ষা


শেলী সেনগুপ্তা

বর্তমান কালে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের উন্নত দেশের উন্নয়নে নারীসমাজ ফলপ্রসূ অবদান রেখেছে। আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে।
প্রাচীন কাল থেকেই এটি হয়ে আসছে। পুরুষ যখন শিকার করতে যেতো, নারী তখন বাসস্থানের আশেপাশে ফলের বীজ ছড়িয়ে দিতো। এভাবেই নারীর হাতে প্রথম কৃষিকাজের সূচনা হয়।
একইভাবে কুঠির শিল্পের সূচনা ও প্রসার নারীর হাতে হয়। সভ্যতার শুরু থেকে নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
দীর্ঘকাল থেকে আমাদের দেশে নারীসমাজ প্রথাবদ্ধ সংস্কার ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক নানা সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। সন্তান প্রসব, সন্তান লালনপালন এবং গৃহকর্মসম্পাদনে নারীরা অনেক বেশি সময় দিয়ে থাকে। গৃহস্থালী এবং পারিবারিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কাজে নিয়োজিত নারীশ্রম অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বলে গণ্য হলেও জাতীয় আয় এর ক্ষেত্রে তার প্রতিফলণ লক্ষ্য করা যায় না।
প্রায় অর্ধশতক ধরে সংগঠিত নারী মুক্তি আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি , নারীর ক্ষমতায়নে নতুন ধ্যান-ধারণার বিস্তার ইত্যাদি অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বর্তমানে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণের পথ অধিকতর প্রশস্ত হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এদেশে রাস্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নারী অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাজে ক্রমবর্ধমান অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত নারীর শ্রমশক্তি প্রায় তিনকোটি , এর মধ্যে প্রশাসনিক ও ব্যস্থাপনা কাজে দশহাজারেরও বেশি। অনেক বেশী পরিমাণে নারীশ্রম মৎস্য, বনায়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নিয়োজিত। এছাড়া দেশের আরো এক একটি বড় অর্থনৈতিক খাত পোশাক শিল্পেও অধিকাংশ শ্রমিক নারী বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশি বৃহৎ ও ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাও এগিয়ে এসেছে। এই ক্রমবর্ধমাণ উদ্যোগ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে।
এখন বহির্বিশ্বের সাথেসাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির কর্মক্ষেত্রগুলোতে মূল ধারায় নারীর অবদান ক্রমশ বাড়ছে।
এই ক্রমবর্ধমাণ ধারাকে অব্যহত রাখার বা আরো বর্ধনশীল করার জন্য নারী শিক্ষার উপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একথা অনস্বীকার্য যেকোন উন্নয়নের জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।
এদেশের নারীরা বুঝতে পারলো এখন সময় হয়েছে ‘ রাঁধার পরে খাওয়া, খাওয়ার পরে রাঁধা’র চক্র থেকে বের হয়ে আসার, ঠিক তখনই আলোর পথের যাত্রী রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বেগম রোকেয়া নারী সমাজের সামনে একটা আলোকশিখা প্রজ্জ্বলিত করলেন যেন সেই আলোতে নারী এগিয়ে যেতে পারে।
নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে আরো বেশী সহায়ক ভূমিকা রাখছে বর্তমান নারীবান্ধব সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরে নারী শিক্ষার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবকিছুর মূলে শিক্ষাকে জায়গা দিয়েছেন। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারীর শিক্ষা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন, সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য খাদ্য কমর্সূচি রয়েছে। পৌরসভার বাইরে বিনাবেতনে দ্বাদশ শ্রেণি পযর্ন্ত ছাত্রীদের শিক্ষার সুযোগ আর মহানগরের বাইরে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তির সুযোগ রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হচ্ছে। নারী শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার একগুচ্ছ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে হবে, আর এটি করতে হলে সমাজের প্রধান অর্ধাংশ নারীকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা জানি নারী এবং পুরুষ, একটি পাখির দু’টি ডানার মতো। পাখির ওড়ার জন্য দু’টি ডানাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি ডানা দুর্বল হলে পাখির উড়ানরহিত হয়। তেমনি পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও শিক্ষা ক্ষেত্রে একইভাবে অগ্রসর হবে।
সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ সানন্দে গ্রহণ করে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে, এই এগিয়ে যাওয়া আমাদেরকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি শুধু বা তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আমরাও হয়ে উঠবো উচ্চ আয়ের দেশ, মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি আমাদেরও থাকবে। শুধু দরকার আন্তরিক সদিচ্ছার।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

April 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930