অর্বাচীন – উপমা সাহিত্য আসর

প্রকাশিত: ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৪, ২০২১

অর্বাচীন – উপমা সাহিত্য আসর

কামরুল হাসান 
পরিবারের সাথে জাহাজে চড়ে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যাচ্ছিলাম। একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো। অপর প্রান্তের মানুষটি বল্লেন, ‘আপনি কি কামরুল হাসান?’ স্বীকার করতেই হলো। তিনি আত্মপরিচয় দিলেন এই বলে যে, ‘অধমের নাম গোলাম মোস্তফা।’ আমি বল্লাম, ‘আপনি অধম হবেন কেন?’ তার উত্তর, ”আপনি উত্তম বলেই আমি অধম।’ আমি বল্লাম, ‘না, না, তা হবে কেন? আমরা দুজনেই উত্তম।’ ওই বাহাসের ভিতর যা ফুটে উঠল তা হলো মানুষটি রসিক ও বিনয়ী। তার নাম গোলাম মোস্তফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। সম্প্রতি আমি কবি সৌমিত্র দেবের ছেলে সৌভাগ্যের জন্মদিন ঘিরে একটি রচনা লিখেছিলাম, সৌমিত্রের বন্ধু হিসেবে লেখাটি তিনি পাঠ করেন এবং মুগ্ধ হন। তিনি আমার টাইমলাইনে এসে আরও কিছু টুকরো ভ্রমণগদ্য, বিশেষ করে আমার রাষ্ট্রদূত বন্ধু মসয়ূদ মান্নানের সাথে বিক্রমপুর ভ্রমণের গল্প পাঠ করে, তার ভাষায় ‘অভিভূত’ হন এবং আমার লেখাকে তার ‘জাদুকরী’ মনে হয়, বিশেষ করে ফ্লাশব্যাকের ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করে। আমার লেখায় তিনি খুঁজে পান তার প্রিয় কিছু লেখকের এক কোলাজ। বঙ্গোপসাগরের ঈষৎ নীলাভ সবুজ জলে ভেসে চলা জাহাজে তার প্রশংসা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে সবুজ শান্তির এক দ্বীপের দিকে। নিজে বাংলার অধ্যাপক, পিএইচডি করেছেন বাংলা সাহিত্যে, সুতরাং তার বাক্যস্রোতে আমি ক্রমশ এক শুভ্র জাহাজ হয়ে উঠি।
তাঁরই আমন্ত্রণে শনিবার বিকেল ৪ টায় উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে যাই। জায়গাটি আমার খুবই চেনা, কেননা ওখানে কাটিয়েছি আট বছর, ছিলাম ৭/বি সড়কে, অথচ ৮ নম্বর সড়কটি আর খুঁজে পাই না। পিঠেপিঠি সংখ্যা হয়েও কেন যে সাত তার বর্ণমালার বিন্যাস দেখিয়ে চলে, আর আট লুকিয়ে থাকে আট কুঠুরিতে, কে জানে? পরে দেখি আট ডানা মেলেছে একটি সবুজচত্বরের দু পাশেই। বাড়ির নাম্বার মেলাবার আগেই একটি বাড়ির সমুখে অনেকগুলো গাড়ি দেখে বুঝে ফেলি সেটাই গন্তব্যস্থল। দোতালায় ওঠার সময় খেয়াল করিনি এটি একটি অফিস, ভেবেছি কোনো বাড়ির বৈঠকখানায় পৌঁছাব, পরে দেখি একটি বড়ো (হলঘর নয়) মিটিং রুমে পৌঁছালাম। রুমটির বিরাট অংশ জুড়ে এক কাঠের টেবিল, তাকে ঘিরে কালো চেয়ারগুলোতে অতিথিরা বসে আছেন, টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা লাল ভেলভেটে মোড়ানো বাক্সে রাখা ক্রেস্ট ও লাল কাগজে মোড়ানো ছোটো গিফট বক্সগুলো বলে দেয় এ অনুষ্ঠান সম্মাননা প্রদানের। সমুখের দেয়াল জুড়ে একটি ব্যানার তাতে মুদ্রিত অর্বাচীন – উপমা আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব। ব্যানারটির নিচে দেয়াল ঘেষে সম্মানিত অতিথিরা একটি সারিতে বসে আছেন। ব্যানারে প্রথম নামটি কবি ও গবেষক ড. গোলাম মোস্তফার, তিনিই প্রধান অতিথি। দীর্ঘকায়, চুলহীন চকচকে কোজাক মাথার তীক্ষ্ণ চোখমুখের মানুষটিকে চিনতে দেরি হলো না, কেননা হোয়াটসঅ্যাপে আমি এই অবয়বটিই দেখেছি। দূর থেকে আমাদের চোখাচোখি হলো, আমি গিয়ে বসলাম সেন্টার টেবিলটির অপর প্রান্তে, তিনি মৃদু হাস্য ও সামান্য মাথা নেড়ে তাতে অনুমোদন দিলেন।
অনুষ্ঠান ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, অতিথিদের পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ সম্পন্ন, তবে তখনো সম্মাননা ক্রেস্টগুলো দেওয়া হয়নি। তারা একসারি লাল গোলাপের মতো টেবিলে দীপ্যমান। মাইক্রোফোনে স্বাগত বক্তব্য দিচ্ছিলেন উপমা সম্পাদক সৈয়দা নাজমুন নাহার আর অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করছিলেন অর্বাচীন পত্রিকার সম্পাদক আকমল হোসেন খোকন। আজকের অনুষ্ঠান ও সম্মাননা বিতরণ মূলত দুটি সংগঠনের যৌথ আয়োজন। বেশিরভাগ অচেনা মুখসারিতে আমি দুটি চেনা মুখ দেখতে পেলাম। এরা হলেন কবি মাসুদুল হক ও কবি শামীম সিদ্দিকী। দুজনেই শিক্ষক, দুজনেই ঢাকার বাইরে থাকেন, মাসুদুল হক সুদূর দিনাজপুরে আর শামীম সিদ্দিকী খুব দূরে নয় ময়মনসিংহে। দুজনেই এবারের উপমা সাহিত্যপত্র সম্মাননা ২০২১ পেয়েছেন, মাসুদুল হক অনুবাদ সাহিত্যে, আর শামীম সিদ্দিকী কবিতায়। এক এক করে পুরস্কারপ্রাপ্তদের ক্রেস্ট, একটি সন্মাননা পত্র ও গিফট, অনুমান করি চীনামাটির মগ, দেওয়া হলো, তোলা হলো ছবি। সময় বাঁচাতে হাতে তুলে দেওয়া হলো কেবল কাঠের উপর খোদিত ক্রেস্ট, ফ্রেমে বাঁধানো মানপত্র ও অন্যান্য আইটেম নিজ হাতে পৌঁছে দিলেন সৈয়দা নাজমুন নাহার।
প্রথমেই পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করতে এলেন কবি শামীম সিদ্দিকী। নিজের কবিতাকে পথিপার্শ্বের ফুলের সাথে তুলনা করে বললেন, বেশিরভাগ পথিকই, অর্থাৎ পাঠক, এড়িয়ে যায়, কেউ কেউ দেখে। তিনি জালালউদ্দিন রুমির একটি উদ্ধৃতি দিলেন যেখানে এই মহান পারসি ভাষার কবি বলেছেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তো বটেই, এই গ্রহটির তুলনায় মানুষ অতিক্ষুদ্র। কিন্তু এই ক্ষুূদ্র মানুষ তাঁর উপলব্ধিতে সমগ্রকে ধারণ করতে সক্ষম। শামীম স্তেফান মালার্মকে উদ্ধৃত করে বললেন, এই প্রতিভাবান ফরাসি কবি সবকিছুকে কবিতা ভাবতেন না। যেমন তিনি গাছকে কবিতার বিষয় ভাবেননি, কিন্তু গাছের কোটর থেকে একটি পাখির উড়ে যাওয়াকে কবিতার বিষয় ভেবেছেন। কাব্যাদর্শে মালার্মে ছিলেন টি এস এলিয়টের বিপরীত। শামীম সিদ্দিকী বড়ো হয়ে উঠেছেন কিশোরগঞ্জের গ্রামে, প্রকৃতির সবুজ পরিবেশে, নিজের কবিতাকে তার স্বচ্ছজলের মাছের মতো মনে হয়। কবিতা লিখছেন ত্রিশ বছরের অধিককাল, কিন্তু এই প্রথম কোনো স্বীকৃতি পেলেন। স্বীকৃতি পান বা না পান, কবিতা লেখার যে আনন্দ, যে কৌশল, সেটা তো আর কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের এই প্রাক্তন ছাত্র নিজে ঢাকা কলেজে পড়িয়েছেন, প্রচুর আড্ডা দিয়েছেন আজিজ মার্কেটে ও নাখালপাড়ায়। এখন চাকরিসূত্রেই চলে গেছেন পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে। স্মৃতি থেকে দুটি কবিতা পাঠ করলেন, দুটি কবিতাই ছন্দোবদ্ধ। প্রথম কবিতার শুরুটা,এরূপ, ‘তোমার নামটি নিলেই ফুল ফোটে একটি করে’। কবিতার নাম ‘রঙ। দ্বিতীয় কবিতা যে ঋতু প্রকৃতিতে সমাসন্ন, সেই গ্রীষ্মকাল নিয়ে। কবিতাটির প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে তার মনে পড়লো নেত্রকোণা শহরে একদল কুকুরের কথা যারা মধ্যরাতে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে জড়ো হয়ে ছিল। মাত্রাবৃত্তে লেখা কবিতাটির আরম্ভ এরূপ, ‘পড়ছে মনে রৌদ্র এবং কৃষ্ণচূড়া’। আরেকটি পঙক্তি ‘ভালোবাসার দৃশ্য কি কেউ ছিঁড়তে পারে?’
অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকমল হোসেন খোকনও দীর্ঘকায় মানুষ, তাতে গৌরবর্ণ মিশে নায়কোচিত আদল তৈরি হয়েছে। মাঝে মাঝেই বন্ধুদের নিয়ে রসিকতা করেন, যেমন সভায় উপস্থিত তার বন্ধু মাহবুব তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, শিল্প বলতে তো আমি ইন্ডাস্ট্রি বুঝি, তোরা আর্ট বুঝিস কেন? সঞ্চালক এরপরে যাকে ডাকলেন সেই মনসুর রহমান খানের জীবনের একটি অনন্য স্মৃতির কথা, যা তাকে বিস্মিত করেছে এর যোগসূত্রে, তাকেই তা বলতে বললেন। সলজ্জ মানুষটি (মনসুর রহমান খান) ১৯৮০ থেকে
১৯৮৬ এই ছয় বছর কর্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্যের মাসকাটে ছিলেন। সেসময়ে অনেকেই সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রবাস থেকে চিঠি লিখতো। একবার রুমানা চৌধুরী নামের এক কানাডাবাসী বাঙালি নারীর একটি চিঠি পড়ে তিনি এতটা আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন যে সেই অদেখা প্রবাসিনীর উদ্দেশ্যে তিনি এক দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। তিনি কবিতাটি শ্রোতাদের পাঠ করে শোনালেন। মজার ব্যাপার হলো আজ থেকে পয়ত্রিশ বছর আগে যাকে নিয়ে কবিতাটি লিখেছিলেন সেই রুমানা চৌধুরী আজকের অনুষ্ঠানে তার সমুখেই বসে আছেন। রুমানা চৌধুরী ছিলেন ব্যাডমিন্টনে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। তখন নারী ক্রীড়াজগৎ দাঁপিয়ে বেড়াত লীনু, ডানা, রুমানারা। অল্পবয়সেই বিয়ে হয়ে ছিপছিপে সুন্দরী রুমানা চৌধুরী কানাডা চলে যান, সেখানে বাস করছেন চল্লিশ বছর ধরে। এই যে মিটিংরুম, তার লাগোয়া যে অফিস তা রুমানা চৌধুরীর স্বামীর মালিকানাধীন। শ্বেতকায় মানুষটি বয়সের ভারে নুব্জ্য, হুইল চেয়ারে বসে ওই ঐতিহাসিক নাটকটি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাকে হুইল চেয়ার থেকে তুলতে ও বসাতে সাহায্য করছিলেন দুজন নারী, অনুমান করি তাদের মেয়ে হবেন। দেয়ালে জাহাজের ছবি দেখে ভেবেছিলাম হক এন্ড সন্স কোনো জাহাজ কোম্পানি। জাহাজের সাথে তাদের সম্পর্কটি কার্গোর নয়, মানবসম্পদের। তারা নাবিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন শিপিং লাইনে চাকরি দেন।
এই অদ্ভুত যোগাযোগটি ঘটল অর্বাচীন-উপমার অনুষ্ঠানে যেখানে কে অর্বাচীন আর কেই বা উপমা বুঝতে বাকি রইল না কারো।
পর্ব ২
অদেখা রুমানা চৌধুরীকে নিবেদিত প্রেম ও মুগ্ধতার পঙক্তিমালা ৩৫ বছর পরে পাঠ করে শোনাতে পারলেন মনসুর রহমান খান। এও এক স্বার্থকতা বটে! মানসসুন্দরীকে যেন ভুলে না যান তাই নিজের কন্যার নাম রেখেছেন রুমানা। এসব শুনে হতবাক রুমানা চৌধুরী মনসুর রহমান খানকে তার লেখা একটি বই উপহার দিলেন। মানবী, বিশেষ করে যদি সে রূপবতী ও গুণবতী হয়, তবে কত যে পুরুষের হৃদয়ে নিভৃত দীপ হয়ে জ্বলে, আলো ছড়ায়, তার ইয়ত্তা নেই।
শিশু সাহিত্যিক মো. মোজাম্মেল হক ছিলেন ব্যাংকার, উপরন্তু ট্রেড ঔউনিয়নের নেতা ছিলেন, তাই, তার ভাষায়, তার কবিতা ‘খসখসে’। পেশাগত চাপে ও তার শুস্কতায় খুব বেশি কবিতা লিখতে পারেননি। তিনি মনে করেন সাধারণ মানুষ যেন কবিতা পড়ে বুঝতে পারে কবিদের সেরকম কবিতা লেখা উচিত। এখন ‘সাধারণ মানুষ’ আসলে কারা, কী তাদের কবিতা বোঝার ক্ষমতা এসব অমীমাংসিত বিষয় অস্পষ্ট রেখে, কবিতা তরল ভাষ্য হবে কি না তাও না জানিয়ে এই শিশু সাহিত্যিক জানালেন তিনি এখন তার নাতির জন্য ছড়া লিখছেন। নাতি যখন তখন শিশু হওয়ারই কথা।
হোসনে আরা সহকারি পুলিস কমিশনার হিসেবে অবসরে গেছেন। আমি যখন এই অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করছিলাম তখন স্বাগত বক্তব্যে সৈয়দা নাজমুন নাহার এই পুলিশ কর্মকর্তার কর্মনিষ্ঠা ও সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন। অবসর জীবনে এসে তিনি, আগেও লিখেছেন, কবিতা লিখছেন। তিনি সংক্ষিপ্তরূপে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখলেন।
উপমা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে কিন্তু এর শেকড় নরসিংদী, যে ভূমির সন্তান কবি শামসুর রাহমান, কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ও শহীদ মতিউর। এসব কথা বলছিলেন নরসিংদী প্রেসিডেন্সি কলেজের সভাপতি ড. মোয়াজ্জেম হোসেন যার গবেষণা নরসিংদী অঞ্চল নিয়ে। তিনি প্রায় শতাধিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছেন।
আজকের অনুষ্ঠানের চারজন বিশেষ অতিথি ড.
মোয়াজ্জেম হোসেন, হোসনে আরা, মো. মোজাম্মেল হক ও মনসুর রহমান খানকে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দিলেন আয়োজকরা। এই ক্রেস্টটির নকশা, আকৃতি ও উপাদান উপমা সাহিত্যপত্র সম্মাননা থেকে, সঙ্গতকারণেই, পৃথক। প্রথমটি বিশেষ অতিথিদের ব্যক্তিক সম্মাননা দ্বিতীয়টি কবি ও লেখকদের সাহিত্যকৃতির মূল্যায়ন।
আমাকে কিছু বলার জন্য আহবান জানানো হলে আমি এই অনুষ্ঠানে আমার যোগদানের পেছনের কাহিনীটি, সেই সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে ড. গোলাম মোস্তফার টেলিফোন আলাপ, বলি। গুণী মানুষটি যে ভীষণ বিনয়ী ও সৌজন্যবোধসম্পন্ন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাকে তুলনা করি ফলভারানত বৃক্ষের সাথে যে অহঙ্কারে ঊর্ধ্বে না তুলে ভূমিতে নামিয়ে দেয় শাখ। একথা বলি এ অনুষ্ঠানে আমি দুজন কবি মাসুদুল হক ও শামীম সিদ্দিকীকে বহুবছর ধরে চিনি। বলি এই যে ত্রিশ বছর লেখালেখির পরে কবি শামীম সিদ্দিকী প্রথম সম্মাননা পেলেন, এত দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হলো এ আমাদের সাংস্কৃতিক দৈন্য। এখন তো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হলে কোনো পুরস্কার জুটবে না, সাহিত্যের এমন রাজনৈতিক মেরুকরণ সামগ্রিক সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। এমন অনেক কবি বাংলা একাডেমি পেয়েছেন বা পাচ্ছেন যারা আসলে কবি নয়, রাজনৈতিক কর্মী। তাদের নাম ইতিহাস মুছে দিবে, তারা থাকবে কেবল বাংলা একাডেমির তালিকায় ও বোর্ডে, পাঠকের পাঠে বা সাহিত্যের ইতিহাসে নয়।
আমার পরে এলেন কবি মাসুদুল হক। ড. মোয়াজ্জেম হোসেন নরসিংদীর তিন কৃতি সন্তানের যে তালিকা দিয়েছেন তার সাথে কোরানের প্রথম বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের নামটি যোগ করলেন। একজন হিন্দু হয়েও কোরানের অনুবাদ এ কথাই বলে যে তিনি অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, কবিতাও অসাম্প্রদায়িক। মাসুদুল হকের শৈশব কেটেছে পুরনো ঢাকায় যে পুরনো ঢাকার মাহুতটুলিতে বাস করতেন শামসুর রাহমান, যে পুরনো ঢাকাকে অসামান্যরূপে চিত্রিত করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ধ্রুপদী উপন্যাস ‘চিলে কোঠার সেপাই’য়ে। যে ঢাকাকে নিয়ে অসামান্য গবেষণা করেছেন ড. মুনতাসির মামুন।
মাসুদুল হক সম্পর্কে আকমল হোসেন খোকন মজার তথ্য জানালেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নকালীন মাসুদুল হক নাকি একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে হলের বারান্দা ধরে হাঁটতেন, চায়ের দোকানে যেতেন। এটা দেখে খোকনের মনে হতো মাসুদ মনে হয় হতদরিদ্র ঘরের ছেলে, পোষাক আষাক তেমন নেই। পরে যখন জানলেন ফরিদপুর শহরে মাসুদের নানার বাড়ি আছে, পুরনো ঢাকায় তার বাবার বাড়ি আছে, তখন বুঝলেন মাসুদ দার্শনিক গোছের, আর সে পড়তোও দর্শনশাস্ত্র। মাসুদ পিএইচডি করেছে ড. হায়াৎ মামুদের তত্ত্বাবধানে। যেহেতু হায়াৎ মামুদ নিজে রুশ সাহিত্য অনুবাদ করতেন, তাই তার শিষ্য হিসেবে অনুবাদের দিকে ঝুঁকে আসে এই কবি ও প্রাবন্ধিক। গুরুই তাকে বিভিন্ন অনুবাদ করার পরামর্শ দেন। ইভগেনি ইভতেশেঙ্কুর নোবেল ভাষণ অনুবাদ করতে দিয়েছিলেন। মাসুদের প্রথম বড়ো অনুবাদ টি এস এলিয়টের ‘ফোর কোয়ার্টারস’, এরপর একে একে কাহলিল জিবরানের কবিতা, এ্যালেন গীন্সবার্গের ‘হাউল’ প্রভৃতি অনুবাদ করেছেন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে মাসুদুল হক আমাকে উপলক্ষ করে বললেন, কামরুল ভাইয়ের সাথে কুড়ি বছরের অধিক সম্পর্ক। তার সাথে অনেকগুলো সম্পর্ক। লেখালেখির সম্পর্ক ছাড়াও সে হলো আমাদের সহপাঠী খায়রুল হাসানের বড়ো ভাই, তৃতীয়,সম্পর্ক হলো সে আমাদের তখনকার তরুণ শিক্ষক আজফার হোসেনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন।
অধ্যাপক হায়াৎ মামুদকে মাসুদ বর্ণনা করেন এই বলে যে তিনি সত্যিকার অর্থেই তাঁর ছাত্রদের ফ্রেন্ড, ফেলো ও ফিলোসোফার বানিয়ে ছাড়েন আর ছাড়তে চাইতেন না। মাসুদের পিএইচডি শেষ করতে ১০ বছর লেগেছিল। আমার মনে পড়লো প্রখ্যাত পণ্ডিত সলিমুল্লাহ খানের লেগেছিল ১৬ বছর। মাসুদুল হক এর আগে কথাসাহিত্যের জন্য রাজশাহী থেকে ‘চিহ্ন’ এবং বগুড়া লেখক চক্রের পুরস্কার লাভ করেছেন।
এমনি সময়ে অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দেন দৈর্ঘ্যে আকমল হোসেন খোকনের প্রতিদ্বন্দ্বী কবি সৌমিত্র দেব। তবে এর চেয়েও বোধকরি দীর্ঘকায় গোলাম মোস্তফা। এদের মৌলিক মিলটি অবশ্য দৈর্ঘ্যে নয়, এরা সকলেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বা কাছাকাছি ব্যাচের।
পর্ব ৩
এবার সম্পাদনায় উপমা সাহিত্য সম্মাননা পেয়েছেন হামিদ রায়হান। তিনি নিভৃতে নিষ্ঠার সাথে সাহিত্যের সেবা করে যাচ্ছেন। মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশ করছেন সাহিত্যের ছোটোকাগজ ‘উত্তরপুরুষ’। কেন কবিজীবন এত প্রার্থিত, কেন একজন আমলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ শিখরে উঠেও একজন কবি হবার জন্য হা-পিত্তেশ করেন, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হামিদ রায়হান আল মাহমুদের তুলনা বা উদ্ধৃতি, কোনটি ঠিক মনে নেই, টেনে আনেন এই বলে যে আল মাহমুদের সময়কার জজ, ব্যারিস্টাররা আজ কোথায়? মানুষ তাদের ভুলে যায়, কিন্তু একজন কবিকে ঠিকই মনে রাখে। হামিদ রায়হান বল্লেন, আমাদের সংস্কৃতি হলো একজন কবি বা লেখক বা কীর্তিমান মানুষকে মৃত্যুর পরে সম্মান জানানো, তাকে নিয়ে হৈ-চৈ, অনুষ্ঠান, বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ ইত্যাদি করা। আসলে তো তা হওয়া উচিত কীর্তিমান বা প্রতিভাবান মানুষটির জীবদ্দশাতেই, যাতে সে পেতে পারে তার প্রাপ্য সম্মান, জানতে পারে তার স্বীকৃতি। তিনি এ প্রসঙ্গে কবি সমুদ্র গুপ্তকে নিয়ে তার জীবদ্দশায় ‘উত্তরপুরুষ’-এর সংখ্যা প্রকাশের কথা সভাকে জানালেন। আরও বল্লেন, আমরা পোষাককে, পদকে গুরুত্ব দেই, কবিপ্রতিভাকে নয়।
কথাসাহিত্যে উপমা সাহিত্য সম্মাননা পেয়েছেন আরেক নিভৃতচারী লেখক ফজলুল কাশেম। পাঠকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বল্লেন, একবার বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় তার ‘বাঘ’ নামের একটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছিল, একজন পাঠক মন্তব্য করেছিলেন আপনার ‘বাঘ’ নামের প্রবন্ধটি বেশ ভালো হয়েছে। সেই একই সংখ্যায় মাসুদুল হকের ‘বাঘ’ নামের কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল। এখন পাঠকরা লেখা দেখে, পড়ে না।
তিনি ‘প্রবাসী’ পত্রিকার কিংবদন্তি সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার কিংবদন্তি সম্পাদক জলধর সেনের উল্লেখ করলেন। সাহিত্যের মানের ব্যাপারে তারা কোনো আপোষ করেননি, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন। একবার পুরীতে সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে জলধর সেন সমুদ্রজলেই ডুবে যাচ্ছিলেন। তখন তাকে ডাঙায় টেনে তুলে জীবন বাঁচায় এক নবীন যুবক। স্বভাবতই যুবকের প্রতি কৃতজ্ঞ হন জলধর সেন। কিছুকাল পরে সেই যুবক ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় নিজের লেখা একখানি পদ্য নিয়ে হাজির। ইচ্ছা ছাপাবেন। সে পদ্য পাঠ করে জলধর সেন নাকি যুবককে বলেছিলেন, তুমি আমাকে পুরীতে সমুদ্রের যে জায়গা থেকে টেনে তুলেছিলে, সেখনে আবার রেখে এসো, আমি এ লেখা ছাপতে পারব না। এতটাই দৃঢ় চরিত্রের ছিলেন তারা।
ফজলুল কাশেম তার লেখক জীবনের কাহিনী বল্লেন, প্রথমে ছোটোদের পাতায় লিখতেন, কিন্তু তার লেখার পরিপক্কতা দেখে শুভান্যুধ্যায়ীরা বলেছিল, ‘তুমি বড়োদের পাতায় লিখো। দৈনিক বাংলায় আহসান হাবীবের কাছে যাও।’ মুক্তধারার প্রকাশক, একুশে বইমেলার সূচনাকারী কিংবদন্তি চিত্তরঞ্জন সাহার সাথে তার অনেক স্মৃতি রয়েছে। চিত্রালীর মাহফুজ সিদ্দিকীর সাথেও সখ্য ছিল গভীর। তিনি মাঝে লেখালেখি থেকে দূরে সরে গেয়েছিলেন। চিত্রালী ছেড়ে টিভিতে যোগ দিয়েছিলেন। ফজলুল কাশেম ছয়টি গ্রল্পগ্রন্থ ও একটি কাব্যের জনক। তার বেশ কিছু নাটক বেতারে প্রচারিত হয়েছে। ধ্রুপদী ঘরাণার এ লেখক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে ১৯৮৮ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পুরস্কার এবং ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সৌহার্দ্য পুরস্কার লাভ করেন।
কবি সৌমিত্র দেবকে যখন মঞ্চে আহবান করা হলো তখন তিনি প্রথমেই যে যৌক্তিক প্রশ্নটি তুললেন তা হলো এই সাহিত্য আসরটি কী করে আর্ন্তজাতিক উৎসব হলো? এই প্রশ্নটি আমার মনেও ঘুরপাক খাচ্ছিল। একটু দেরিতে এসে সৌমিত্র বসেছিল আমার পাশেই, আমার কাছেও তার একই জিজ্ঞাসা ছিল। এখানে তো ভিন্ন দেশ বা ভাষার কোনো কবি বা লেখক নেই। যে উত্তরটি আয়োজকরা দিলেন তা হলো রূমানা চৌধুরী বাংলাদেশের মেয়ে হলেও সে একজন প্রবাসী, বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে লিখেন। যাকে বলা হয় ‘ডায়াস্পোরা সাহিত্য’ তাতে নিয়োজিত তিনি। উত্তরটা মনোঃপূত হলো না সৌমিত্র বা আমাদের। ঢাকা থেকে দীর্ঘকাল সুদূর উত্তরবঙ্গে বসবাস করে মাসুদুল হকের নিজের লেখালেখিকে ডায়াস্পোরা সাহিত্য বলে মনে হয়, সভাকে তাই বলেছিলেন। যাই হোক, এ আসর কোনোরূপেই আর্ন্তজাতিক নয়, আর এটি হলো সম্মাননা প্রদানের অনুষ্ঠান, কোনো সাহিত্য উৎসব নয়। সম্প্রতি আমি সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণে গিয়েছিলাম সপরিবারে, সেখানে দেখলাম একটি স্কুলের মতো বারান্দাওয়ালা এল-সেপড ছোটো বাড়ির সামনেও ‘রিসোর্ট’ সাইনবোর্ড লাগানো। ব্যক্তিগত বাড়ি হয়েছে রিসোর্ট। বাংলাদেশে একটি সংস্কৃতি আছে একটি ভাড়া করা বসতবাটিতে বসানো কিন্ডারগার্টেনও ইন্টারন্যাশনাল, অথচ সেখানে না আছে কোনো বিদেশি ছাত্র, না আছে কোনো বিদেশি শিক্ষক। এও, অনুমান করি, তেমনি কিছু।
যাকে নিয়ে এ আসর সরগরম, যিনি, বলা যায়, আজকের আসরের মধ্যমণি, সেই রূমানা চৌধুরীর গ্রন্থতালিকা দেখে আমি বিস্মিত, হতবাক। বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তার গ্রন্থসংখ্যা ৪৫, এর মাঝে কিছু গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করেছেন, বেশিরভাগ নিজের লেখা। একই বছরে একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। তিনি তার কবিতা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ও বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি অনুবাদটি রাখেন। ফলে বইগুলো হয়ে ওঠে দ্বিভাষিক। মাসুদুল হকের মতো তিনিও বহুমাত্রিক লেখালেখি করেন। কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেন। তিনি উপমা সাহিত্য সম্মাননা পেয়েছেন ইংরেজি সাহিত্যে।
সেই যৌবনেই, তখন তিনি ব্যাডমিন্টনে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, স্বামীর সাথে চলে গিয়েছিলেন কানাডা। পাঁচ বছর লেগেছিল মনঃস্থির করতে প্রবাসে থাকবেন কি থাকবেন না। পরে যখন বুঝলেন, থাকতেই হবে, তখন স্থির হলেন। এরপরে কেটে গেছে সুদীর্ঘ ৪০ বছর। কিন্তু দূ্রে গিয়েই টের পেলেন মাতৃভূমিকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসেন। বাংলায় কলাম লিখতে শুরু করলেন ‘সুখের কথা, দুঃখের কথা, মনের কথা’। বাংলাদেশে থাকতে তিনি ইংরেজি দৈনিকে কবিতা বা গদ্য লিখতেন, কিন্তু কানাডা গিয়ে বাংলাদেশের জন্য তার প্রাণ কেঁদে ওঠে। তিনি গল্প কবিতা লিখতে শুরু করলেন বাংলায়। কিন্তু কানাডার বৃহত্তর পাঠকের কথা ভেবে নিজের লেখা অনুবাদ করতে লাগলেন। ফলে একটি বই দুই রূপে আবির্ভূত হলো। তিনি তার লেখা ‘একটি স্বপ্ন এনে দাও’ পড়লেন, এরপরে এর ইংরেজি অনুবাদ ‘Bring Me a Dream’ । কবিতাটির প্রেক্ষাপটে রয়েছে একটি সুন্দর গল্প। একবার তিনি তার মেয়েকে নিয়ে কানাডার একটি উপজাতীয় মেলায় গিয়েছিলেন, সেখানে তার মেয়ে একটি লাঠির মাথায় জাল লাগানো উপজাতীয়দের একটি প্রতীকি বস্তু কিনেছিল। মেয়েটি সেই জালটি মাথার কাছে রেখে ঘুমাতে যায়। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে তার মাকে একটা অদ্ভুত কথা বলে। সে বলেছিল, রাতে সে যেসব স্বপ্ন দেখবে তা ওই জালে এসে আটকে থাকবে। ভোরবেলা উঠে সে তা দেখবে।
প্রত্যেক কবিরই কিছু কবিতা থাকে যা পাঠকরা বারবার শুনতে চায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেমন ‘কেউ কথা রাখেনি’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনি, বাড়ি আছো?’ তেমনি রূমানা চৌধুরীর একটি কবিতা কানাডার শ্রোতারা বারংবার শুনতে চায়। কবিতাটিতে একজন পুরুষ তার প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করছে। রূমানা চৌধুরী বল্লেন, গত দশ বছর ধরে পুরুষ প্রেমের কবিতাটি পড়তে পড়তে তিনি অর্ধেক পুরুষ হয়ে গেছেন। তার ওই স্বপ্ন ধরার গল্প আমাদের যেমন আকৃষ্ট করেছিল, কবিতাটি তেমন করেনি। কিন্তু এই দ্বিতীয় কবিতাটির মোচড়টি ভালো লাগলো। যেখানে বিবাহিত জীবনের একঘেয়েমীতে ক্লান্ত স্বামী ‘প্রেমিক চাই’ এমনি বিজ্ঞাপন পত্রিকায় দেখে সেস্থানে উপস্থিত হয়ে আবিস্কার করলেন বিজ্ঞাপনদাত্রী তার নিজেরই স্ত্রী। স্বামী উপলব্ধি করলেন তার স্ত্রীও একঘেয়েমিতে ক্লান্ত। কবিতাটির নাম Snowflakes Keep Falling On My Head। এটি একটি ভালো ছোটোগল্পও হতে পারতো।
তিনি তার ইংরেজি উপন্যাস Shadow Over the Henna Tree এর ব্যাককভার থেকে পাঠ করলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কানাডার কিছু পরিবার বাংলাদেশে থেকে ৩০জন যুদ্ধশিশু দত্তক হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল। এই উপন্যাসটি এমনি এক যুদ্ধশিশু ময়নাকে নিয়ে রচিত উপন্যাসটির পেছনের পৃষ্ঠায় যে কাহিনীসংক্ষেপ (synopsis) ছিল তা শেষ হলো ৪ লাইনের একটি কবিতা দিয়ে। রূমানা চৌধুরী একে একটি মর্মস্পর্শী প্রেমের উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। যা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত যার স্বীকৃতিও পেয়েছেন কানাডা সরকার কর্তৃক ২০০০ সালে অন্টারিও ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে Woman of the Year সম্মাননা লাভ করে। তিনি একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, কাজ করেছেন কানাডা সরকারের অভিবাসন অধিদপ্তর ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মন্ত্রণালয়ে। বিদেশে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের মেয়ে রূমানা চৌধুরী।
সেই যে কখন সাহিত্য আসর শুরু হলো, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো, সন্ধ্যা গড়াল রাতের দিকে- চায়ের দেখা নেই। দর্শকদের মনোভাব আঁচ করেই বোধকরি ঘোষণা হলো জলখাবারের আয়োজন আছে। এর একটু পরেই প্যাকেটে খাবার চলে এলো, কিন্তু প্রার্থিত চায়ের দেখা নেই। এ ধরণের অনুষ্ঠানের খাবারের এবটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা আছে, অনেকটা বিয়ে বাড়ির খাবারের ফর্মুলার মতো, তাতে সিঙাড়ার সাথে একটি মিষ্টি থাকবে, বেশিরভাগ খাবারই হয় শুকনো- সমুচা আর কেক। বেশিরভাগ খাবারই আপনার গলা দিয়ে নামবে না, যদি না জলযোগ হয়। এই জল হলো চা বা কোমল পানীয় বা স্রেফ পানি।
এবার মঞ্চে এলেন আজকের সভার প্রধান অতিথি কবি ও অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফা, যার আমন্ত্রণে আমি এখানে এসেছি। মানুষটি তার দৈহিক উচ্চতা, কালো চশমার পেছনে প্রখর দৃষ্টি ও চুলহীন চকচকে মাথা নিয়ে যখন মঞ্চে দাঁড়ালেন আমরা তখন খাবার খাচ্ছি। তিনি এমনিতেই দ্রষ্টব্য, এবার আকর্ষনীয় হয়ে উঠলেন কবিতা দিয়ে বক্তৃতা শুরু করায়। তার কণ্ঠস্বর প্রখর ও জাদুকরী।
পর্ব ৪
কবি গোলাম মোস্তফা শুরু করলেন কবিতা আউড়ে, ‘হলুদ শাড়িতে তোমাকে এত সুন্দর মানায়, ইচ্ছে হয় তোমাকে হরিৎবরণ পাখি বলে ডাকি।’ আরও কতিপয় প্রেমেভিজানো পঙক্তি আউড়ে গেলে বুঝি আবেগে ও প্রেমে এ কবি দুলছেন, তার বাক্যস্ফূর্তির বেগও উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। তার মানসপটে ভেসে এলো কিশোরগঞ্জের নিকলি হাওর, দেশপ্রেমের আবেগে বললেন, এ দেশ মরমীবাদের দেশ, এ দেশ দুঃখবাদের দেশ, এ দেশ শীতল, গীতল, নরোম মাটির দেশ, যে দেশে জন্ম নিয়েছেন লালন ফকির, হাসন রাজা, পাগলা নিতাই। আমার চা শীতল হচ্ছিল তবু তার গীতল ভাষণটির ছবি তুলতে নরোম এক অঞ্চলে গিয়ে পড়ি, যেখানে ললনা আধিক্য, যেখানে সকলেই পাগলা নিতাই। পোডিয়ামের বক্তা তো বটেই, ভাবাবেগে ভাসছিলেন সবাই, যে যৌবন অবলুপ্ত, সেই সোনালী যৌবনের ইচ্ছাপূরণের গল্প আজ অনর্গল বেরিয়ে আসছে। বললেন, আমরা কষ্ট পেতে পেতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠি। পজিটিভ সে স্পৃহা কিন্তু প্রতিশোধে বিশ্বাসী। প্রত্যাখানের আগুনে পোড়া পঙক্তিমালা হয়ে ওঠে আগুনসোনা। বললেন, কথার প্রেমে পড়ে তার প্রেমে পড়েছে অনেক অনুপমা, অনুমান করি শুধু কথার জাদু নয়, সেই দীপ্ত যৌবনে তার মাথাভর্তি চুল আর দীঘলগড়নও ভূমিকা রেখেছিল প্রেমসাফল্যে।
তিনি বললেন, তার তিনজন প্রিয় গদ্যশিল্পীর তালিকায় প্রথমজন হলেন বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেবের আলঙ্করিক ভাষা ভালো লাগে। দ্বিতীয়জন হলেন তারই শিক্ষক ড. হায়াৎ মামুদ, যার গদ্য বিশুদ্ধ ও সুললিত। তালিকার তৃতীয়জন এই আসরেই বসে আছেন, তিনি কামরুল হাসান। শুনে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। সবাই ঘুরে একবার আমাকে দেখে। এমন উচ্চ স্বীকৃতি, তাও এক সাহিত্যসভায়, বিদগ্ধজনের মাঝে, ঘোষণার মতো উচ্চারিত হলো। ভাবলাম এই তো আমার চরম স্বীকৃতি।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে যখন তার ফোন পেয়েছিলাম, তখন বলেছিলেন, আমার লেখায় তিনি তার প্রিয় কিছু লেখকের কোলাজ ও ঘ্রাণ খুঁজে পান। এখন বললেন আমি তার পছন্দের তালিকায় তৃতীয়, অনুভব থেকে তালিকায় উন্নীত হয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে রইলাম।
নিজের অতীত সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিনয়ী মানুষটি হয়ে উঠলেন অকপট, পার্হেসিয়া তাকে গ্রাস করেছে। বললেন, মাসুদুল হকরা এসেছে নগর থেকে, তারা সকলে নাগরিক। আমি এসেছি বগুড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। আমাকে নাগরিক কায়দা কানুন শিখতে হয়েছে। সময় লেগেছে বেশি। জাহাঙ্গীরনগরে কাটানো উত্তাল দিনরাত্রির স্মৃতিচারণে তিনি উত্তোরত্তর আবেগাকুল হয়ে উঠলেন। আকমল হোসেন খোকন ছিলেন তার রুমমেট, ক্লাসমেট নয়। সে মাঝে মাঝে কবিতা লিখতো আর মধ্যরাতে গলা ছেড়ে গান গাইতো। প্রেয়সী হলেই যেমন স্ত্রী হয় না, ক্লাসমেট হলেই তেমনি বন্ধু হয় না। সম্পর্ক বোঝাতে তিনি যে শব্দটি বললেন তা হলো চুম্বন, যেমন কবিতার সাথে চুম্বন। কবিরা যা দেখেন, যা অনুভব করেন, তা নিউরোনে প্রোথিত হতে হতে শব্দ হয়ে যায়, তখন কবিতা হয় হিরন্ময়। প্লাটো যদিও কবিদের নগরের বাইরে রাখতে চেয়েছেন, তবু কবিদের কোনো দেশকাল নেই। বললেন তিনি নিজেকে ‘কবি’ মনে করেন না, ‘কবি’ অভিধাটি আকমল হোসেন খোকন বসিয়েছেন।
কবিতা ছেড়ে তিনি এলেন প্রেমের ভুবনে। পুরনো কথাগুলোই নতুন আবেগে বললেন যে প্রেম এক স্বর্গীয় ব্যাপার, প্রেমে পড়ে বলেই মানুষ বেঁচে থাকে, আর বেঁচে থাকে বলেই কবিতা লেখে। তিনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী থেকে অমর কিছু কবিতার পঙক্তি প্রেমিক আবেগে পাঠ করে স্বীকার করলেন প্রেমচেতনার সাথে দেহচেতনা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পতিতার ঘরে যে শিশুর জন্ম হয়, তার যেমন কোনো পাপ নেই, তেমনি কবিতা নিস্পাপ। সারমর্ম টানলেন এই বলে যে, কে যে কখন কার প্রেমে পড়ে যায়, কেউ জানে না। প্রেম নিয়ে এইসব প্রগলভ কথার শেষে তিনি ফিরলেন। তাকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠতে দেখলাম মাসুদুল হককে, কী বলতে কী (বেফাঁস) কথা বলে ফেলেন সেই শঙ্কা। গোলাম মোস্তফা তখন ‘ আমি নিত্যানন্দে নেচে চলি, করি যখন চাহে এ মন যা। ‘ কবিতা কী তার সংজ্ঞা নিরূপণে। বল্লেন, যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন কবিতা কী ও কেন তবে কোনো উত্তর পাবেন না, যদি জিজ্ঞেস না করেন, তবে হয়তো উত্তর পেতেও পারেন। কবিতা, তার মতে, এমন এক ইন্দ্রজাল যা ভাষিক উচ্চারণে মর্ত্যের মানুষের স্বর্গে যাওয়ার প্রয়াস।
রবি ঠাকুর বেঁচেছিলেন ৮০ বছর। কবিদের প্রার্থনা তো ওই একটাই, হে ঈশ্বর, রবি ঠাকুরের আয়ু দিও। নিজের জীবন সম্পর্কে বল্লেন, জীবনের তৃতীয় পর্ব চলছে। জন্ম থেকে ২০১০ পর্যন্ত প্রথম পর্ব, ২০১০ থেকে ২০২০ দ্বিতীয় পর্ব, আর তৃতীয় পর্ব শুরু হলো এ বছর থেকে। তাদের ব্যাচে ২২ জন ছিল ছেলে আর বাকি ৮ জন মেয়ে।
আমাদের ডক্টরেটরা প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে নামের আগে ড. লাগান আর ইনি বলছেন নামের সাথে ড. লাগানো নিজেকে জাহির করা এবং অপ্রয়োজনীয়। কবিদের নামের সাথে তো রীতিমতো অশ্লীল। ভাবুন তো ড. রবীন্দ্রনাথ কেমন শোনাত? আমরা তো ড. আলবার্ট আইনস্টাইন অথবা ড. সিমাস হীনি বলি না। অনেক শিক্ষক কবি তো ডক্টরের সাথে অধ্যাপকও জুড়ে দেয়। বুঝলাম এ মানুষটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে প্রকৃতিদত্ত বা অর্জিত প্রতিভাকে বেশি মূল্য দেন, চর্চিত জ্ঞানের চেয়ে তার কাছে সৃজনশীলতা বেশি দামী।
তার ভাষা যেমন গতিশীল, প্রক্ষেপন তেমনি জোরালো। এক মুগ্ধকরি বাক্যপ্রবাহের জাদুর ভেতর সম্মোহিত হয়ে রইলাম। মনে হলো আজ মধ্যরাত অবধি তিনি অনর্গল বলবেন, তেমন রসদ তার ছিল, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে তা শুনব। আয়োজকরা যদি খাদ্য ও পানীয়ের একটি প্রবাহ সচল রাখতে পারতেন, তবে তা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু চায়ের পরেই ইতি টানতে হলো একটি জমজমাট সাহিত্য আসরের দলবদ্ধ ছবি তোলা আর প্রধান অতিথি ও সভাপতিকে ক্রেস্ট প্রদানের মধ্য দিয়ে। সৈয়দা নাজমুন নাহার এর মাঝে এসে একটি ব্যাজ দিয়ে গেলেন, আমি তা কিছুতেই কোটে গেঁথে নিতে পারলাম না। সৌমিত্রের অভিমত ওটা লাগাতে সুচারু আঙুলের অধিকারিণী কাউকে লাগবে। একজনকে দেখলাম তার সুচারু আঙুলগুলো ক্যামেরার সাটার টিপে যাচ্ছে, আর দুজন, অনুমান করি তাদের মেয়ে হবেন, রূমানা চৌধুরীর স্বামী, অর্থাৎ তাদের বাবাকে হুইল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে বা হাঁটতে সাহায্য করছেন। মায়াবী চেহারার এক নারী বসেছিলেন, ঠোঁট তার হাস্যোজ্জ্বল, চারিপাশের কথার আলোতে আলোকিত মুখখানি। করো প্রেয়সী বা স্ত্রী হবেন।
সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজকের সাহিত্যের আসরটি শেষ হলো। বেতার বাংলার সম্পাদক কাজী সালাহউদ্দিন কবি জসিমউদ্দিনের স্মৃতিচারণ করলেন। সেটা ১৯৭৬ সাল। শাহবাগে অসুস্থ কবিকে নিয়ে তিনি হাঁটতে বেড়িয়েছিলেন, হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলেন দোয়েল চত্বর পর্যন্ত, যেখান থেকে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসটি দেখা যায়। জসিমউদ্দিন আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে পুরস্কার দিল না।’ সে বছর পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ইমামুর রশিদকে যাকে আমরা কেউ চিনি না, মনেও রাখিনি। বাংলা সাহিত্যে অমর রয়ে গেছেন কবি জসিমউদ্দিন, হাওয়ায় উড়ে গেছে ইমামুর রশিদ। একটা নতুন তথ্য পেলাম তার কাছে, জসিমউদ্দিনকে নাকি অন্তিম সময়ে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দিতে চেয়েছিল কর্তারা, তিনি নেননি। স্বীকৃতি নয়, তা তিনি জীবদ্দশাতেই পেয়েছিলেন, অবহেলা খুব গায়ে লেগেছিল, অপমানবোধ করেছিলেন কবি। সে বছরই মৃত্যুবরণ করেন তিনি, একাডেমিকে ভুল সংশোধনের কোনো সুযোগ না দিয়ে। এই ঐতিহাসিক ভুল বাংলা একাডেমি এখনো করেই যাচ্ছে। (সমাপ্ত)

 

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com