আইএলও কনভেনসন-১৩৮ এবং শিশুশ্রম নিরসন

প্রকাশিত: ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২২

আইএলও কনভেনসন-১৩৮ এবং শিশুশ্রম নিরসন

 

-মো. আকতারুল ইসলাম

বিশ্ব জুরেই সব মা-বাবাই চান তাদের শিশুর গায়ে যেন কষ্টের কোনো ছোঁয়া না লাগে, লেখাপড়া শিখে প্রকৃত মানুষ হয়ে যেন তারা মা-বাবার চাইতেও ভালো থাকে।

সময়ের পরিক্রমায় নিজের, সমাজের এবং দেশের আগামী ন্যস্ত হবে আজকে যে শিশু, তার ওপর। একটি জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির বীজ সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকে শিশুর মধ্যেই। একটি জাতির উন্নতির সঞ্চার হয় সুষ্ঠু পরিবেশে উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হওয়া শিশুর দ্বারা। একটি মহৎ জাতি গড়ে তোলার মূল পন্থা এটাই। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় কিছু শিশুর বেলায় ভাগ্যদেবতা খুব কঠোর এবং নিষ্ঠুর। বাবা-মার অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো শিশু সুস্থ্য সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া শেখে, আবার কিছু শিশু যেসময় তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সেসময় যায় খাবারের খোঁজে, জীবন বাঁচাতে সংসারের হাল ধরতে কাজের খোঁজে। যোগ দিতে হয় তাকে শ্রমে। অতিরিক্ত আয় করার চাপ, শিক্ষার ব্যয় বহণে ব্যর্থতা, শিক্ষার তুলনায় শ্রমের বিনিময়ে আয়ের বেশি মূল্য, অভিবাসন, পূর্ণবয়স্ক সদস্যদের বেকারত্ব বাবা-মায়ের বিচ্ছিন্নতা, ঋণগ্রস্থতা এবং শিশুদের হাত খরচের চাহিদা মূলত: এসকল কারণেই একটি শিশু শ্রমে নিযুক্ত হয়। বিশ্বের সব দেশেই এমন অবস্থা চলে আসছে বছরের পর বছর। বিশ্বব্যাপী শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে সেই ১৯৭৩ সালেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও তে কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স (Minimum age for admission to employment) সম্পর্কিত কনভেনশন ১৩৮ গৃহীত হয়। এ কনভেনশনটি আইএলও’র আটটি মৌলিক কনভেনশনের একটি। ২২ মার্চ’ ২০২২ তারিখে এ কনভেনশন অনুসমর্থনের মাধ্যমে সবক’টি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ।

এর আগে বাংলাদেশ সাতটি মৌলিক কনভেনশনসহ আইএলও’র ৩৫টি কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। এর মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৭২ সালে এক দিনেই আইএলও’র পাঁচটি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৮ ও ২০০১ সালে আইএলও’র অপর দু’টি মৌলিক কনভেনশন অনুসমর্থন করে। আবারও জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুসমর্থন করলো বাংলাদেশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রী পরিষদ আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুসমর্থনের প্রস্তাব পাস করে। প্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ জেনেভায় আইএলও সদর দপ্তরে বাংলাদেশের পক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান অনুসমর্থনের স্বাক্ষরকৃত পত্র আইএলও এর মহাপরিচালক গাই রাইডারের হাতে তুলে দেন।

আইএলও কনভেনশন ১৩৮ এর মূল বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে (১) কনভেনশন অনুসমর্থনকারী দেশ শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকরী জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে এবং কাজে/শ্রমে যোগদানের ন্যূনতম বয়স ক্রমান্বয়ে এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত করবে, যা একজন অল্পবয়স্ক মানুষের পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, (২) ন্যূনতম বয়স বাধ্যতামূলক শিক্ষাগ্রহণের বয়স বা ১৫ বছরের চাইতে কম হবে না। তবে কোনো স্বাক্ষরকারী দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও শিক্ষার সুযোগসমূহ পর্যাপ্ত না হলে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৪ বছরকে ন্যূনতম বয়স হিসেবে ধরা যেতে পারে । (৩) স্বাস্থ্য, সেফটি বা নৈতিকতা বিপন্ন হতে পারে এমন কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছরের কম হবে না। তবে স্বাস্থ্য, সেফটি বা নৈতিকতা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়ে পর্যাপ্ত বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স ১৬ নির্ধারণ করা যাবে। (৪) অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সুবিধাদি অপর্যাপ্তভাবে বিকশিত নয়, এমন কোনো সদস্য দেশ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সাথে আলোচনাক্রমে এ কনভেনশনের প্রয়োগগত পরিধি প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত করতে পারবে। কোনো শিল্প বা সেক্টরকে এ কনভেনশনের আওতা বহির্ভূত রাখার সুযোগ রয়েছে। (৫) ১৩ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের এমন হালকা কাজে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে, যেগুলো তাদের শারীরিক বা মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক নয়। আইএলও’র এ কনভেনশনটি ১৮৯টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৩টি সদস্য রাষ্ট্র এ যাবৎ কনভেনশন ১৩৮অনুসমর্থন করেছে। ন্যূনতম বয়স হিসেবে এ কনভেনশন অনুসমর্থনকারী ৫৩টি দেশ ১৪ বছর, ৭৬টি দেশ ১৫ বছর এবং ৪৪টি দেশ ১৬ বছর নির্ধারণ করেছে। এ অঞ্চলীয় দেশসমূহ ন্যূনতম হিসেবে বয়স ১৪-১৫ বছর নির্ধারণ করেছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ ১৪ বছর পূর্ণ করেনি, এমন ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশুকে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ ১৪ বছর পূর্ণ করে, কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ করে নাই এমন ব্যক্তিকে কিশোর হিসেবে সজ্ঞায়িত করে তাদেরকে বিপদজনক যন্ত্রপাতির কাজে বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কিশোর নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০১ সালে নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রম সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন ১৮২ অনসমর্থন করে। কনভেনশনের আলোকে ২০১৩ সালে ৩৮টি কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০’ প্রণয়ন এবং এর আলোকে একটি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার আরো পাঁচটি খাত শুটকি তৈরির কাজ, পাথর সংগ্রহ, আবর্জনার ক্ষেত্রে কাজ এবং টেইলারিং এর কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ৮.৭ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিশুশ্রম নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসডিজির অভিক্ষা ৮ হচ্ছে- ‘স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিশুশ্রম নিরসন করা।

বিশ্বের সব দেশের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের এসডিজি হলেও আমাদের সামনে এসডিজি এবং সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ঘোষিত রুপকল্প-২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য। এসডিজির মূল থিম হচ্ছে- leave no one behind. এসডিজির মূল কথা চারটি জাদুকরী শব্দ ‘কাউকে পেছনে না ফেলে’। সমাজের কাউকে পিছিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন পূর্ণতা পাবে না। অন্যদিকে রুপকল্প-২০৪১ মানে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ মানে সেখানে থাকবে না কোনো দারিদ্র্য এবং মানুষের মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। আইএলও কনভেনশন-১৩৮, এসডিজি এবং রুপকল্প-২০৪১ এর প্রবাহমান ধারা একই মোহনায় মিলিত হয়েছে। সবক’টি লক্ষ্য পূরণেই অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে শিশুশ্রম নিরসন। শিশুশ্রম নিরসনের মাধ্যমে একই তরীতে মোহনায় পৌঁছানো সহজ হবে। এজন্য সরকার নিরলস কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ১২টি বিভাগীয় শহর এবং দু’টি উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এপর্যায়ে এক লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনা হবে। তাদের ৬ মাসের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ৪ মাসের কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এ সময়ে ঐ শিশুর বাবা-মাকে মার্চ’২২ থেকে মাসিক এক হাজার টাকা করে সম্মানী দেয়া হচ্ছে। এই ১০ মাসের উপা-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী নিজ নিজ কাজে দক্ষ ১০ হাজার শিশুকে সাবলম্বী করতে এককালীন ১৩ হাজার করে নগদ টাকাও দেয়া হবে।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ, আইএলওসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, দাতা সংস্থা এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোও শিশুর উন্নয়ন, বিকাশ এবং শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছে। কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স সম্পর্কিত আইএলওকনভেনশন-১৩৮ অনুসমর্থন বর্তমান সরকারের সাহসী এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আমাদের প্রত্যাশা সুষ্ঠু পরিবেশে বিকশিতশিশু, যে হবে জাতির আগামীর কর্ণধার, সে এখন থেকে ১৪ বছরের নিচে কোনো ধরণের শ্রমে নিযুক্ত হবে না। এটি শিশুশ্রমমুক্ত উন্নত বাংলাদেশের পথ নকশার স্বারক রেখা। এসকল পদক্ষেপের সফলতার ওপর দাঁড়িয়ে এসডিজির লক্ষ্য পূরণ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্পকে সামনে রেখে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০৪১ এর আগেইদেশ হবে উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা নিয়ে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার এবং প্রত্যয় হোক আমাদের সকলের এ প্রত্যাশা।
#
তথ্য অফিসার, পিআইডি, ঢাকা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

August 2022
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031