আইনজীবীকে জরিমানা ভ্রাম্যমাণ আদালতের: ম্যাজিস্ট্রেটকে হাইকোর্টে তলব

প্রকাশিত: ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

আইনজীবীকে জরিমানা ভ্রাম্যমাণ আদালতের: ম্যাজিস্ট্রেটকে হাইকোর্টে তলব

রোববার দুপুরে আদেশ দেন বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ, ভ্রাম্যমাণ আদালতে আইনজীবীকে জরিমানা করায় দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা (এসিল্যান্ড) বিরোদা রানী রায়সহ তিনজনকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। গত  বৃহস্পতিবার বিষয়টি একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী কাজী হেলাল উদ্দিন।

পরে আদালত আগামী ২৭ ডিসেম্বর বুধবার  বীরগঞ্জ উপজেলার এসিল্যান্ড বিরোদা রানী, আইনজীবী নিরোদ বিহারি রায় এবং ল’ ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক বদরুল হাসান কচিকে স্বশরীরে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে জরিমানার আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারিও করেছেন আদালত।

গত ১৩ ডিসেম্বর বুধবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আইনজীবী নিরোধ বিহারি রায়কে ৫০০ টাকা জরিমানা করেন বীরগঞ্জের এসিল্যান্ড বিরোদা রানী রায়।

এদিকে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনারের—ভূমি (এসি ল্যান্ড) বরখাস্তের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবারও কর্মসূচি পালন করেছেন জেলার আইনজীবীরা। গত মঙ্গলবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিনোদ বিহারি রায়কে জরিমানা করার প্রতিবাদে আইনজীবীরা এই দাবিতে আন্দোলন করছেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির দাবি, আইনজীবীকে লাঞ্ছিত ও অবৈধভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ জন্য তারা বিরোদা রানী রায় এবং ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী মোহিবুল ইসলামের বরখাস্তের দাবিতে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন শেষে মানববন্ধন করেছেন জেলার আইনজীবীরা। গতকাল বুধবারও একই দাবিতে সমিতির কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। আইনজীবী সমিতিতে লিখিত অভিযোগে বিনোদ বিহারি রায় বলেন, ‘জমি সংক্রান্ত একটি মিস কেসে শুনানির জন্য এসি ল্যান্ডের কক্ষে গিয়ে ফাঁকা একটি চেয়ারে বসেন। এ সময় এসি ল্যান্ড বিরোদা রানী তার কক্ষে প্রবেশের কারণ জানতে চান। তিনি নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে জমি সংক্রান্ত একটি মিস কেসের শুনানির জন্য এসেছেন বলে জানান। তখন বিরোদা রানী এ বিষয়ে ভূমি কার্যালয়ের উপ-সহকারী মোহিবুলের সঙ্গে লেনদেন সেরে আসতে বলে তাকে দ্রুত কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এতে অস্বীকৃতি জানালে সহকারী কমিশনার কেসের শুনানি করবেন না বলে জানান। এর প্রতিবাদ জানালে বিরোদা রানী ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে আইনজীবীকে ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করেন।’

সাজা দেওয়ার সময় এসি ল্যান্ড তার বক্তব্যে বলেন ‘আমি আমার ক্ষমতা দেখালাম, পারলে আপনি আপনার ক্ষমতা দেখান’ এমন উক্তি করেছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী আইনজীবী নিরোদ বিহারি রায়। নিরোদ বিহারি আরও বলেন, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জরিমানা দিয়ে মুক্ত হয়ে বিষয়টি দিনাজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের জানাই। নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি এবং জেলা প্রশাসক মো. মীর খায়রুল আলমকে মৌখিকভাবে অবহিত করেন। ‘তিনি বলেন, ‘আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। আমি বিচার চেয়ে সমিতিতে আবেদন করেছি। এখন তারাই সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী সময়ে কী হবে।’

জানা গেছে, মো. সাহেব আলী নামের এক ব্যক্তির একটি জমির খারিজ আবেদনের (পুরাতন নাম বাতিল করা বা নামজারি) শুনানি ছিল গত মঙ্গলবার বীরগঞ্জ এসি ল্যান্ড অফিসে। সাহেব আলীর প্রতিপক্ষ হলেন মো. খায়রুল ইসলাম গং। সাহেব আলীর আইনজীবী হচ্ছেন নিরোদ বিহারি রায়। আর প্রতিপক্ষ খায়রুল ইসলাম গংয়ের আইনজীবী হলেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী মোহাম্মদ ওয়ারিস উল ইসলাম অলি।

আইনজীবী নিরোদ বিহারি রায়ের প্রতিপক্ষ আইনজীবী ওয়ারিস উল ইসলাম জানান, বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের গোপালপুর মৌজার একটি জমির খারিজ বাতিলের মামলা চলমান রয়েছে। সেই মামলার শুনানি ছিল মঙ্গলবার। সেদিন সকালে মামলার প্রার্থী মো. সাহেব আলীর পক্ষে শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য উপস্থিত হন নিরোদ বিহারি। শুনানির জন্য আগেই কক্ষে বসা ছিলেন ওয়ারিস উল ইসলাম ও তার সিনিয়র। পরে আইনজীবী নিরোদ বিহারি যখন আসেন, তখন এসি ল্যান্ডের কক্ষে আরেকটি মামলার শুনানি চলছিল। ওই সময় নিরোদ বিহারি নিজের পরিচয় দিয়ে এসি ল্যান্ডের অনুমতিক্রমে ভেতরে প্রবেশ করে বসতে চান। তখন বিরোদা রানী রায় তাকে বাইরে যেতে বলেন। কিন্তু নিরোদ বিহারি নিজের পরিচয় দিয়ে বসার অনুমতি চান। তখন প্রতিপক্ষের আইনজীবী ওয়ারিস উল ইসলাম এসি ল্যান্ডকে বলেন, ‘ম্যাডাম, আমরা আইনজীবীরা তো এভাবেই বসে থাকি।’ এ কথা শুনে এসি ল্যান্ড বলেন, ‘আপনি চুপ থাকুন।’ তাতে চুপ হয়ে যান ওয়ারিস উল ইসলাম। তখন সিনিয়র আইনজীবী নিরোদ বিহারি এসি ল্যান্ডকে এমন ব্যবহার করছেন কেন জানতে চান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক বেধে যায়। তখন এসি ল্যান্ড নিজের ক্ষমতাবলে নিজ কক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘোষণা করেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১৮৬ ধারা অনুযায়ী আইনজীবীকে ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক দিনের কারাদণ্ডের রায় দেন। এসব কারণে ওইদিন জমির খারিজ আবেদনটির ওপর শুনানি হয়নি। ওয়ারিস উল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রতিপক্ষের অ্যাডভোকেট। কিন্তু এর পরও এসি ল্যান্ডের আচরণে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেছি।’

এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করেও এসি ল্যান্ড বিরোদা রানী রায়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী মোহিবুল ইসলাম বলেন, বিচার চলাকালে কক্ষে প্রবেশ করা নিয়ে  সহকারী কমিশনার ও ওই আইনজীবী একে অপরের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এতে সরকারি কাজে বাঁধা দেওয়ার অভিযোগে আইনজীবীকে জরিমানা করা হয়। তাহলে তার বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ জানতে চাইলে মোহিবুল ইসলাম বলেন, তিনি আইনজীবীকে তর্ক করতে নিষেধ করেছিলেন। এ কারণে তাকেও জড়ানো হয়েছে।