আওয়ামি লীগের দালালি করলে কি কি মেলে?

প্রকাশিত: ৩:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৮

আওয়ামি লীগের দালালি করলে কি কি মেলে?

অদিতি ফাল্গুনী
আচ্ছা, আওয়ামি লীগের দালালি করলে কি কি মেলে? আমি মানুষটা খুব ছোট। আমাকে কি তবু কারো কারো কাছে ‘বড়’ মনে হয়? নইলে ২০১৩ সালে কিছু পরিচিত ব্যক্তি ফেসবুকে গুজব ছড়াচ্ছিলেন যে আমি যে মাপে লীগের ‘দালালি’ করছে তাতে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে নারী এমপি কোটায়…লেখক হিসেবে…মনোনয়ন পাব, তখন অনেক দু:খের ভেতরেও তাদের কল্পনাশক্তির প্রসারতা পড়ে গভীর সুখানুভব করেছিলাম। হলামই ভিখিরিনী, লোকে তবে ভাবে যে সরকার আমাকে ডেকে এমপি বানাতে পারে? তা’ এমপি হওয়া না হওয়া পরের কথা- বছর দুই একটি সবায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কাজের সময় পরিচিত অনেক শুভার্থী বলছিলেন যে একটু সরকারী উচ্চ মহলে তদ্বির করলেই চুক্তিভিত্তিক কাজটি নিয়মিত হতে পারে। শুনে ডিপ্রেসড হয়েছিলাম। না হয় জীবনে আমার অনেক ‘সফলতা’ নেই, তাই বলে চাকরি নিয়মিত করার জন্য ‘তদ্বির’ করতে হবে? আমি কি দু’পাতা রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ পড়িনি? হাতড়ে হাতড়ে ইংরেজি বই থেকে একাধিক বই অনুবাদ করিনি? .০৫ শতাংশ মাত্র জানলেও তৃতীয় একটি ভাষা শেখার চেষ্টা করি না? এবং ভাষাবিদদের মতে, নারী জাতি পুরুষ জাতির থেকে সর্বকালে সর্বদেশে কথা বলায় অধিকতর পারঙ্গম। 🙂 প্রমাণ আমি। আমার লিখিত ইংরেজি বা লিখিত ফরাসীর থেকে কথ্য ইংরেজি বা কথ্য ফরাসী সবসময়ই বহু বহু গুণে ভাল ও সাবলীল। বিশেষত: দ্বিতীয় ভাষাটি- হ্যাঁ, আমার নিতান্ত দক্ষিণ এশীয় উচ্চারণেই। লৈঙ্গিক বিশেষত্ব আর কি! সেই আমাকে তদ্বির করতে হবে? সায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধানের ত্রুটি ছিল না। কিছু লেখককে তিনি ডেকেই কাজ দিয়েছিলেন যাদের ভেতর আমিও ছিলাম। তবে, তিনি অধিষ্ঠিত হবার আগে যিনি মহাপরিচালক ছিলেন, তাঁর সময়েই একটি নিয়োগে প্রক্রিয়াগত কিছু ভুল থাকায়, সম্ভবত: সেই নিয়োগগুলোতেই কিছু সমস্যা আজো রয়ে গেছে। তাই নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কিছু উদ্বেগ আছে। ঐ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রীর সাথে অবশ্য সায়ত্তশাসিতক সংস্থায় থাকার শেষ দিনগুলোয় খানিকটা পরিচয় হয়- কাজের সূত্রেই। সম্ভবত: আমাকে তিনি অপছন্দও করেন নি। শুভার্থীরা উদ্বেগাকুল হয়ে বলেছে তাঁর কাছেই ত’ ‘তদ্বির’ করতে পারি।

এখন সায়ত্তশাসিত সংস্থায় যতদিন আপনি ‘নিয়মিত’ না হন, ততদিন আপনি ‘পরিচালক’ হলেও আপনার ‘মর্যাদা’ সেখানকার সার্ভিস স্টাফের চেয়েও কম। ঐ প্রতিষ্ঠানে মহা শক্তিধর হলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সম্প্রদায়। তারা ‘পরিচালক’দেরই মানতে চায় না! আমি ক্ষুদ্র, চুক্তিভিত্তিক ‘উপ-পরিচালক’ মাত্র। কাজেই বছর দুই পরে কাজ খুঁজতে শুরু করলাম! এবং কাজের সুযোগ মিলে গেল দূর গান্ধার দেশে। ‘মহাভারত’-এ ন্যায়বিচারের প্রতীক গান্ধার রাজকন্যার দেশে যাবার দিন পারিবারিক বাধায় যাওয়া হলো না- সে আর এক কাহিনী! এরপর শুভার্থীরা আবার বললেন ‘সায়ত্তশাসিত সংস্থা’য় ফিরে যেতে। প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক আমাকে কয়েকবার বলেওছিলেন বিনা বেতনে ছুটি নিয়ে চুক্তি বর্দ্ধনের আবেদন করতে। তবে, ভার্সিটি থেকে বের হবার পর থেকে প্রাইভেট সার্ভিসের হাড়-ভাঙ্গা খাটনি আর চ্যালেঞ্জই এত বছরে মজ্জায় অভ্যাস হয়ে যাওয়ায়..(.ঐ মেছুনী যেমন ফুলের থেকে মাছের গন্ধই বেশি ভালবাসে)…আমি প্রাইভেট সার্ভিসেই থেকে যাবার কথা ভাবলাম।

তা’ উনিশ-কুড়ি বছর বয়স থেকে লিখছি আর ছাপছি। এখনো বড় কোন উপন্যাসের কাজে হাত দেয়া হয়নি। এসব ভাবতে ভাবতে ‘রোহিঙ্গা রেসপন্সে’র কাজে এলাম কক্সবাজার। আমার উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বা সুপারভাইজর মানুষ হিসেবে অসাধারণ! কত কাজ যে তাঁর কাছে শিখছি। মুস্কিল একটাই। কক্সবাজারে আমার প্রতিষ্ঠানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বা শিবিরে যারা যায় তাঁরা অনেক তৃণমূল স্তরের কর্মী। ‘চেইন অফ কম্যান্ড’-এ আমি যে স্তরে কাজ করি, সেখানে ক্যাম্পে যাওয়াই হয় না। তখন আঁখিজলে ভাসতে হয়। না যাওয়া হলো দূর দেশ/না শরণার্থী শিবির! তবে, হিউম্যানিটারিয়ান এমার্জেন্সি রেসপন্সে কাজের লোড স্বাভাবিক প্রাইভেট সার্ভিস জবের থেকেও অনেক বেশি। যেমন, গত প্রায় দু/তিনটা উইক-এন্ডেই দেখা যাচ্ছে দিন-রাত ধরে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। বিদেশী ডোনাররা ত’ রোবটের মত। সুন্দরী শ্বেতাঙ্গিনীর সোনালী চুলে ভুলবেন? তারা খুব মিষ্টি গলায় বলে দেবে-রাত একটা বাজুক কি দু’টা বাজুক- শুক্রবার কি শনিবার- রিপোর্টটা এখনি দরকার! এই কাজ আমার আগের কাজের থেকে আলাদাও খানিকটা। মনিটরিং-স্প্রেডশিট ছিল সদা ভয়ের বস্ত! তবে, একটি সায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আর একটি বিদেশী কাজ ছেড়ে তৃতীয় কাজেও যদি অস্থির হই, সেটা এতখানি বয়সে সত্যিই বাজে হবে। এজন্য প্রতিদিনই আমার সুপারভাইজর যখন আমাকে একটি নতুন কাজ দেন, ভয়ে ভয়ে ভাবি আজ আমি নিশ্চিত পারব না এবং তারপর সুপারভাইজর দয়া করে ‘স্যাক’ না করলেও আমাকে রিজাইন করতে হবে। জাপানে সামুরাইরা যেমন আত্মমর্যাদা বাঁচাতে আত্মহত্যা করতো! সেই ভয়ে দাঁত কামড়ে কাজ করতে থাকি ও একপর্যায়ে পেরে যাই। সুপারভাইজর হাঁফ ছাড়েন। যাক- একদম অন্য ট্র্যাকের মানুষ হলেও পারছি। কিন্ত সেটা পারতে গিয়ে বই-পত্র, লেখালিখি, ডিজিটাল তানপুরা…সব কিছু থেকে দূরে চলে যাচ্ছি।

এর ভেতরই এলো কোটা নিয়ে কাটাকাটি। মাত্র তিন শতাংশের মতো সরকারী চাকরির জন্য কত রক্তক্ষয় আর কষ্ট! কেন সরকারী চাকরির জন্য এত আর্তি? এখন অবশ্য বেতন সংস্কার হয়েছে। তবে, আমার বাবা যেমন ‘উপরি’ নিতে পারতেন না বলে অনার্সে নিজে চাকরি নেবার আগ অব্দি ঘরে-বাইরে দু’টো দু’টো চারটা জামাই পরতে হতো। নামকরা টিভি এ্যাঙ্কর সামিয়া রহমান ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ সমধর্মী একটি স্মৃতিচারণ করেছিলেন। স্কুলে যাবার একটি মাত্র সোয়েটার একদিন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও মেঘলা দিনে ধুতে দেবার পর শুকোয়নি। ছুটির দিন শেষে স্কুলে যাবার দিন তখন আধ-ভেজা সোয়েটার আয়রন করতে গিয়ে পুড়ে যায়। এটা আমাদের প্রজন্মের অনেক ছেলে-মেয়েরই গল্প যাদের বাবারা সরকারী চাকরি করতেন এবং ঘুষে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তারপরও কেন সরকারী চাকরির জন্য হাহাকার? প্রাইভেট সার্ভিসে হাড় ভাঙ্গা খাটনি বা অনিশ্চয়তা যেমন বিপুল, আবার বেতন বা অন্য নানা দিকে অনেক সুবিধাও আছে। অবশ্য এখন সরকারী কাজে অনেক বেতন। তবে, সরকারী চাকরির পাশাপাশি বাঙ্গালীর/বাংলাদেশীর এখন নিজেকে বিশ্ব বাজারের জন্যও প্রস্তত হবার কথা ভাবা দরকার। এই ত’ আজ সকাল থেকেই ডোনারদের কিছু রিপোর্ট ই-মেইলে পাঠাতে গিয়ে দেখছি কিভাবে ‘রোহিঙ্গা রেসপন্সে’ই পশ্চিমাদের পরই ভারতীয়রা সব আন্তর্জাতিক সংস্থায় দখল করে আছে নানা পজিশন! প্রিয় বাংলাদেশী তরুণ-তরুণী, বিসিএস গাইড বই মুখস্থ আর ‘ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’র মতো একটি সরকারী চাকরির পাশাপাশি নিজেকে বিশ্ব বাজারের জন্য কেন আমরা তৈরি করব না? নেপালী-সিংহলী-ভারতীয়-পাকিস্থানীদের হারিয়ে আমরা কেন দক্ষ হিসেবে স্বীকৃত হব না বিশ্ব বাজারে? তবে খাটতে হবে। রাত একটাতেও কাজ করতে হবে। শিল্প-সাহিত্য করণেওয়ালাদের জন্য সেটা আবার একটু ঝুঁকিপূর্ণ। শিল্প-সাহিত্যের ‘ভাইরাল ফিভার’ না থাকলে মানুষ কেন বড় প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে না বুঝি না (‘ভাইরাল ফিভার’টা আমাকে ইতোমধ্যে অল্প অল্প কাহিল করছে)! কোথাও কি আমাদের বাঙ্গালীদের ভেতরেও আলস্য প্রবল? তাই বাঙালী কবিতা লেখে সবচেয়ে বেশি, তারপর গল্প-উপন্যাস, তারও পরে প্রবন্ধ/নিবন্ধ আর সবচেয়ে কম করে অনুবাদ। হতে পারে!

জানি, এটুকু লেখার দায়েও ঘুরে-ফিরে ‘আওয়ামি দালাল’ আখ্যা জুটবে। আমার আশিটা গল্পের অধিকাংশ চরিত্র বাঙালী মুসলিম হলেও (যেহেতু এদেশেই আমি বড় হয়েছি), ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ‘বর্ণবাদী’ আখ্যা জুটবে। আহা- এদেশে শত শত মন্দির ভাঙা হলে আমার যেন শেয়ার দেবারও অধিকার নেই! আর হিজাব-নেকাব বিতর্ক? শত গালি আর কদর্য বিশেষণ পেয়েও বলবো আমার সোনালী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আজকের এই মাদ্রাসা চেহারা আমাকে depressed করে। তাতে আমাকে মানুষ যা খুশি বলুক! মজার বিষয় হলো আজ খোদ আরব-ইরাণ-আফগানিস্থানে মেয়েরা উল্টো হিজাব খোলার সংগ্রামে আছে।
গত দু’দিনে অন লাইনের পরিসরে মত প্রকাশের দায়ে নানা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হলাম আবার। খুবই অবাক করা যে প্রিয় বামপন্থীরাও রেগে গেলে আওয়ামি লীগের মতোই নারীকে ব্যক্তিগত পরিসরে কটু-কাটব্য করেন, একতরফা গালি দিতেই থাকেন। আমি কোন দলেরই কর্মী নই। স্বাধীন মানুষ। আমার ফেসবুকে সরকারের হাজারটা সমালোচনাও আছে। কিন্ত, কখনো এতটুকু ভিন্ন স্বরে কথা বললে আপনারাই যদি এত অসহনশীল হন, তবে বুর্জোয়াদের গালি দেন কেন? ওহ্- চীণে ত’ ফেসবুকই নাই- তাই না? আর রাশিয়ায় ত’ ভিন্ন মত হলে সাইবেরিয়া বা গুলাগেই পাঠানো হতো?

গত দু’দিনের নানা কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে সবচেয়ে বিষ্মিত হলাম অতীতের বিস্মৃতপ্রায় এক নারী সহকর্মীর মন্তব্য পড়ে। ঐ ভদ্রমহিলাকে আমি ভালমতো চিনতামও না। প্রায় তিন/চারশো জন সহকর্মী ঠাসা এক অফিসে আমি এবং সেই ভদ্রমহিলা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই ফ্লোরে ও ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম। তেরো মাস কর্মকালীন সময়ে তাঁর সাথে দু/তিনটির বেশি বাক্যবিনিময় হয়েছে বা হবার সুযোগ হয়েছে বলেও মনে হয় না। সেগুলোও এত ফর্ম্যাল কথা! হ্যাঁ, যে কোন কর্মক্ষেত্রের মতোই সেখানেও বিশ জন হয়তো আমার খুব প্রিয় ছিলেন বা আমি তাদের প্রিয় ছিলাম, দশ জনের সাথে হয়তো ছিল খানিকটা শীতল সম্পর্ক আর পঞ্চাশ জনের সাথে হয়তো নির্বিকার হাই-হ্যালো। তা’ আমি কিভাবে কোন্ অসংবেদী আচরণ বা মন্তব্য করলাম তা’ বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, ছাদের উপর ডাইনীংয়ে বাম দল থেকে এনজিওতে আসা এক নারী সহকর্মী, ‘কাপ-প্লেটগুলো খুব কোয়ালিটি না’ বলায় আমি বলে ফেলেছিলাম বটে যে ‘আমরা ত’ গরীব মানুষের জন্য কাজ করতে এসেছি’ এবং তাতে আমাকে উপস্থিত কয়েকজন খুব অভদ্রও মনে করেছিলেন। কিম্বা কখনো বলে ফেলেছি যে প্রতি পনেরো দিনে একটা সো-কলড মিটিংয়ে যে পরিমাণ খাবার অপচয় হয়, তাতে একটি বস্তির সব শিশুকে খাওয়ানো যায়! খালিশপুরে পাটকল বন্ধের সময় খুবই সেখানে কাজ করতে চেয়েছি যা পারিনি। তখন কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছিল উপর মহলের সাথে। আমার সেই বিস্মৃতপ্রায় নারী সহকর্মী সেসব নিয়ে কি কাণা-ঘুষা কখনো শুনেছেন? যাক- মেনে নিলাম আমিই অতি অসংবেদনশীল ও রূঢ়। আক্ষেপ নাই।