আকাশের মতো মহৎ আমার দাদা

প্রকাশিত: ১:২৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০২০

আকাশের মতো মহৎ আমার দাদা

তাহমিনা খাতুন

পিআইবির মহাপরিচালক, মোঃ শাহ আলমগীর আমার দাদা। যিনি তাঁর জীবনের কৃতি, সাধনা ও কল্যানের দীপ্তিকে বৃহত্তর ও মহত্তর জীবনপ্রবাহে সন্নিবিষ্ট করে প্রকৃত অর্থে একজন ভাল মানুষ হয়ে জীবন যাপন করে গেছেন। তিনি একজন যুগ পুরুষ। তাঁকে আমরা নানা পরিচয়ে আবিষ্কার করতে পারি। একদিকে তিনি ছিলেন বড় সংগঠক এবং প্রথিতযশা সাংবাদিক, অপরদিকে ছিলেন সমাজসেবক, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যসেবী। নানা পরিচয়ে তিনি বিভক্ত হয়েছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিচক্ষণতা, দক্ষতা এবং সফলতার অবদান অত্যন্ত সুস্পষ্ট।

“মানুষের ধর্ম” গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন
“আমাদের অন্তরে এমন কে আছেন যিনি মানব অথচ যিনি ব্যক্তিগত মানবকে অতিক্রম করে সদ্য জনানাং হ্নদয়ে সন্নিবিষ্টঃ। তিনি সর্বজনীন সর্বকালীন মানব। তাঁর আকর্ষনে মানুষের চিন্তার ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আর্বিভাব। মহাত্নারা সহজে তাঁকে অনুভব করেন সকল মানুয়ের মধ্যে তাঁর প্রেমে সহজে জীবন উৎসর্গ করেন। সেই মানুষের উপলব্দিতেই মানুষ আপন জীবনসীমা অতিক্রম করে মানবসীমায় উর্ত্তীণ হয়”।
দাদা নিজের জীবনসীমা অতিক্রম করে কিভাবে মানবসীমায় পৌছেছেন তাঁর উত্তর ও আমি পেয়ে যাই রবীন্দ্র বচনে । তিনি বলেছেন” যাঁদের গতি ত্যাগের দিকে, তপস্যার দিকে, যাদের জ্ঞান উপস্থিত প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়, কর্মস্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে, সেখানে আপন স্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে বড়ো জীবন সেই।
দাদার বৈচিত্রময় সফলজীবনের ব্যাপ্তীর বাইরে শৈশব থেকে বেড়ে উঠাও যে কতটা সুখকর আবেশ জড়ানো ছোট বোন হিসেবে স্মৃতি রোমস্থনের জন্যই আমার এ প্রয়াস । কতশত স্মৃতি আমাদের, কোনটা রেখে কোনটা লিখি! মনে পড়ে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া আমার দাদাকে । যে শিক্ষক আলোক-বর্তিকার মতো আমাদের দিয়েছিলেন আলোর সন্ধান। একজন সৃজনশীল শিক্ষক এবং অভিভাবক হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দাদা ছিলেন আমাদের কান্ডারী। দশ ভাই বোনের সংসারে পড়াশুনা করানোর জন্য আমাদের কারোরই কখনোই কোন গৃহশিক্ষক ছিলনা। বড়রা ছোটদের শিক্ষক বা অভিভাবক, আম্মার আরোপিত এ বিধিমতে আমি দাদাকে পেয়েছিলাম শিক্ষা গুরু হিসেবে । চমৎকার গুটি গুটি সুন্দর হাতের লিখার (আমাদের জন্য করে দেয়া) দাদার রংগিন বাংলা নোট এখনো মন উদাস করে দেয়।
আমরা তখন গৌরিপুরে। সম্ভবত ৭৭ সালের কথা, আমি ন্যাশনাল ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করবো। স্কুলের টীমের সাথে ময়মনসিংহ যেতে হবে জেলা পর্যায়ের খেলায় অংশ গ্রহণের জন্য । আম্মা আমাকে ঘরে রেখে বাইরে শিকল দিয়েছেন। কোন রকমেই খেলতে যেতে দিবেন না। সেবার আম্মার অনেক বকা মাথায় নিয়ে দাদা ছোট বোনটিকে নিয়ে স্কুলের টিমের সাথে নিজেও সাথী হলেন। গৌরিপুর গালর্স স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক রানী আপা সহ আমরা মেয়েরা বিদ্যাময়ী স্কুলের হোস্টেলে থেকে পরদিন খেলায় অংশগ্রহণ করি। দাদা হোটেলে থেকে পরদিন সাড়াবেলা বোনের হেফাজত করে সাথে নিয়ে বাসায় ফিরে আম্মার হাজার বকুনি হজম করলেন। এমনি করে কতবার কত ফাংশনে কবিতা, আবৃত্তি, গান গাওয়াসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামে দাদা নিজে সাথে করে নিয়ে গেছেন। নিজে পারফর্ম করেছেন আমাদের করার জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছেন। গৌরিপুরে একবার ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি সাতারে, উচু লাফে, দেীড়ে প্রথম হয়ে চ্যাম্পিয়ান হলাম, দাদার বন্ধু সুব্রত ধর শংকরদা আরো ক’জন যেহেতু আমি চাঁদের হাট করতাম আমাকে চাঁদের হাটের হিসেবে নাম লিখাতে চাইলেন দাদা সিদ্ধান্ত দিলেন যেহেতু আমি স্কুল থেকৈ খেলতে গেছি স্কুলের নামেই যেন খেলি, অথচ দাদা নিজে চাঁদের হাটের শীষ© একজন তখন।
এই বর্ণিল পৃথিবীকে ভালবাসার জন্য যে মানুষটির কাছে আমি মা-বাবার পর সবচেয়ে বেশী ঋণি তিনি আমার দাদা, শৈশব থেকে এখনো তিনি আমার শিক্ষা গুরু। কৈশোরে তাঁর হাত ধরেই আমার নিত্য নতুন অভিযান ও কবিতা পাঠ, কবিতা লিখার হাতে খড়ি, বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, কলেজে ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আমার কান্ডারী। মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার সে দিনগুলোর কথা, প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে দাদার সার্টের পিছনটা টেনে ধরে ধরে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়া, রেজাল্ট দেখতে যাওয়া, টিএসসিতে টাকা জমা দেয়া কিংবা হলের সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও দাদার হাতটি ধরে সামছুন্নাহার হলে প্রথম পদার্পন। যৌবনে তিনিই আমার অনুসরনীয়, অনুকরনীয় আলোকবর্তিকা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের হল সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, আমার পেশা এমনকি আমার সাংসারিক জীবনের পরিচয় সৃষ্টিতে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশী তিনি আমার এ বড় ভাইটি।
আমার ডাইরীর পাতায় আমাকে উদ্দেশ্য করে দাদার লিখাটুকু ১৯৮১ সালের । যখন আমি ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি । আজ প্রায় ৪০ বছর পরও দাদার কবিতা এখনো আমার শান্তনার আশ্রয় । ভীষণ মন খারাপ করা সময়টায় আকাশের দিকে তাকিয়ে দাদাহীন পৃথিবীতে এখনো দাদাকে পেয়ে যাই। নিজের কত শত বক্তব্যে যে দাদার লেখা প্রিয় এ কথাগুলো বলে বেড়িয়েছি। দাদা শুধু আমাদের কে আকাশের মতো মহৎ হওয়ার মন্ত্র দেননি। নিজের জীবনটাকে সত্যি সত্যিই আকাশের মতো মহৎ বানিয়েছিলেন, যেখানেই দাদার বিচরণ সেখানেই আলো জ্বালিয়েছেন তিনি। তাইতো আজ জোরালো কন্ঠে চিৎকার করে সবাইকে জানাতে চাই আকাশের মতো মহৎ আমার দাদা।

ছড়িয়ে দিন