আকাশ বিছিয়ে বুকে সবকিছু আকাশে রাখলাম

প্রকাশিত: ৯:২৩ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

আকাশ বিছিয়ে বুকে সবকিছু আকাশে রাখলাম

আসাদ মান্নান

[পরিচিত অল্প কিছু শব্দ দিয়ে অশ্রু বিজড়িত হৃদয়ের কান্না থেকে তুলে আনা এই কথাগুলো কথা নয়– টুকরো টোকরো বেদনার অগ্নিকণা।]

যাঁকে নিয়ে এই লেখা, জানি তিনি তো সবার স্যার , শুধু
আমার শিক্ষক — তবে এও জানে সকলে, তিনিও জানতেন
কবিতার নেশা যার রক্তে আছে সে কারও প্রিয় ছাত্র
হবার যোগ্যতা বেশি দিন ধরে রাখতে পারে না
যেমন পারিনি আমি কিছুটা স্বভাব দোষে বাকিটুকু যোগ্যতা ছিল না।
অনেকের মতো আমি তাঁর কোনো প্রিয় ছাত্র হয়তো ছিলাম না,
প্রিয় হবার পরীক্ষাও দেইনি,
তারপরও বলতে চাই
আমার এ অতি নিচু মাথার উপরে তাঁর দুটো
চরণের কত ধূলো জমে আছে!
কত.বার তাঁর সামনে দাঁড়াতেই
মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কথা
আমার মাথা নত করে দাও হে প্রভু তোমার চরণ তলে;
হ্যাঁ ,পঁতাল্লিশ বছর ধরে যতবার তাঁর সামনে গেছি, কিংবা
তার পাশে বিনম্র কদম ফেলে সামনে হাঁটতে গেছি
ততবার অবচেতনে কেন যে আমার শির বার বার নত হয়ে যায়,
আজ তিনি নেই, রবীন্দ্রনাথের সব গান
রক্তেভাষা তাঁর প্রিয় দুঃখিনী বর্ণমালা শহীদ মিনার স্মৃতিসৌধ
সুন্দরী নরম প্রিয় অভিজাত ছাত্রীটির বিনিদ্র নিঃশ্বাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল কারেন্সি
তাঁকে আর ফিরিয়ে আনবে না
তিনি চলে গেলেন আজিমপুর কবরস্তানে মায়ের আঁচলে
প্রিয় শিশু পরমে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে মায়ের ছায়ায়।
২.

কেন তাঁকে অসুখে দেখিনি

কোন পাপে আমি আজ তাঁর কবরের পাশে গিয়ে
নত হয়ে দাঁড়াতে পারিনি

সত্যই আমার কাছে তিনি একমাত্র স্যার নন,
স্যারের অধিক যদি আরো কিছু থাকে, তা-ই
চিরকাল গণ্য করে গর্ব ভরে আমি দাঁড়িয়েছি
দাঁড়াতে শিখেছি, পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে আছি ;
এভাবে শিক্ষক তিনি সকলের; শ্রেণির বাইরে
আমার স্বপ্নের বাতিঘর ! থাকবেন ভালো স্যার,
অনেকে এমনও বলে, যেখানে আনিস স্যার মৌনী
সেখানে ভাঁড়ের সাজে কেউ কেউ চেচামেচি করে
অনেকে হাতিয়ে নেন বুদ্ধি করে সমাজের খুঁটি
নকল পালকে কাক কোকিলের পোশাক পরেছে,
অন্যকে যে ছোট করে লজ্জাহীন বড় হয়ে চলে
তেমন স্বভাব নিয়ে কোনোকালে একটি টু শব্দ
উচ্চারণ করতে কিংবা হীন তুচ্ছ কথা
টেবিলে আড্ডায় সেমিনারে কারও মনে কষ্ট দিয়ে
কথা বলতে দেখিনি তাঁকে , কারও কাছেও শুনিনি
এমনকি বিরুদ্ধে মতের যারা তারাও বলেনি।
এমন আকালে আজ দুঃসময়ে তিনি চলে যান
হৃদয়ের সব অর্ঘ ঢেলে দিয়ে কেউ তাঁকে ফেয়ারওয়েল
জানাতে আসেনি ; কী করে আসবে ! ঘরে ঘরে লকডাউন…
লকডাউনে পুরো দেশ, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে
এ কেমন অদ্ভুত সান্ধ্যআইন চলছে– চলছে কার্ফিও করোনা!
আমার সহিত তাঁর দেড়মিনিট স্থায়ী শেষ কুশলবার্তায়
কী ব্যাকুল আকুল চিত্তে এরকম ছিল তাঁর আশীষ বচন :
”মান্নান! আমার শরীর খুব ভালো নেই; কষ্ট হচ্ছে”
ভালো থেকে, সাবধানে থেকো।’
আজ আমি ভালো নেই, আমরা কেই ভালো নেই;
স্যার! কী করে ভালো থাকি
যখন টিভির পর্দায় কাফনে মোড়ানো আপনাকে দেখি
কী নির্মম আচ্ছাদনে অভিমানে আপনার নিষ্প্রাণ শরীর;
যে শরীর আমাদের রক্তাক্ত শোকার্ত জাতীয় পতাকা
অপার গেীরবের খুশবু ঢেলে ঢেকে নেয় পরম আদরে
আপনাকে অন্তিম অভিবাদনে জাতির অন্তর খুলে খুলে
বিউগলের করুণ আওয়াজ কবরের নিস্তব্ধতাকে
টুকরো টুকরো করে সারা দেশে
বাঙালির তের শত নদী জলে তুলেছে কান্নার ঢেউ
বলুন আনিস স্যার ! সেখানে কী আমি ভালো থাকি?
আমি ভালো নেই, আমরা ভালো নেই।

আমাদের সম্মিলিত শোক কান্না-অশ্রু -ভালোবাসা
প্রণাম প্রণতি সব কিছু আপনার সঙ্গে যাচ্ছে
আজ যত ফুল আছে বাংলার গাছে গাছে বাগানে
সব ফুল রেখে আসি আপনার চরণ ধূলোয়
ধূলো তো মাটির অংশ যার কোনো ক্ষয় লয় ধ্বংশ নেই
আর দশটা লাশের মতো আপনি কিন্তু কবরে নেই
আমরা সবাই কাঁদি, কাঁদছি, কাঁদবো
আপনার ঐ কবর থেকে নিরাপদ দূরত্বে
আমরা যারা আপনার প্রস্থান সংগীত শুনতে পাচ্ছিি
হায়! আমরা কেউ আপনার কবরের সামান্য মাটি স্পর্শ করতে পারিনি

কী হবে আফসোস করে –
আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই আক্ষেপও নেই
নেই নেই নেই, কেন থাকেবে!

আমাদের কান্না-অশ্রু- ভালোবাসা
এত যে বিশাল এত ব্যাপ্ত দিগন্ত ছাপিয়ে
কবরের সামান্য মাটির ঢিল এসব কিছুকে
কী করে রাখবে! পারবে না তাই
আকাশ বিছিয়ে বুকে সবকিছু আকাশে রাখলাম…

ছড়িয়ে দিন