আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্য : মানুষজন ও সময়

প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২১

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্য : মানুষজন ও সময়

মোস্তফা মোহাম্মদ

চলমান সময়-সমাজ-জীবন ও জীবনবোধ নিয়ে যাঁরা সাহিত্যকর্ম করেছেন এবং যশস্বী হয়েছেন সেইসব লেখকের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। রচনা সংখ্যায় নয়, রচনার অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্যে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যে সমুন্নত অবস্থানে অধিষ্ঠিত হন, তাঁর কাছাকাছি আর কারও কথা কি আমরা ভাবতে পারি? কিংবা অতৃপ্তির বেদনাবোধের ফল্গুধারায় তাঁর সঙ্গে অন্য কারো মিল খুঁজে পাওয়া যায় কি? পাওয়া যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে ঢাকা শহরে জায়গা কিনেছিলেন স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে নি। মৃত্যু তাঁকে সে সময় দেয় নি। আর ইলিয়াস চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস রচনা করতে, মৃত্যু তাঁকে সে সুযোগ দেয় নি। ওয়ালীউল্লাহ্ মাত্র তিনটি উপন্যাস : ‘লাল সালু’, ‘চাঁদের অমাবস্যা’ ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ আর কিছু গল্প-নাটক লিখেই তিরোহিত হলেন। আর ইলিয়াস রচনা করেছেন মাত্র দুটি উপন্যাস, পাঁচটি গল্পগ্রন্থের গোটা বিশেক গল্প ও একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। রচনার সংখ্যাধিক্য না-থাকলেও এই দুই শিল্পীর গ্রন্থভুক্ত ভৌগোলিক পরিসীমা ব্যাপক। ওয়ালীউল্লাহ্ সুদূর ফ্রান্সে বসেই পাশ্চাত্যের অগ্রগামী মানসিকতাকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষজনের মতো করে পরিবেশন করলেন। সমাজের অন্তর্নিহিত অসত্য-শঠতা-ধর্মান্ধতাকে তিনি পাশ্চাত্যের শিল্প-দর্শনের অঙ্গীকারে আমাদের মতো করে পরিবেশন করলেন। তাঁর উপন্যাসের মজিদ, জমিলা, আরেফ আলি, মুহাম্মদ মুস্তফা, খোদেজা মধ্যযুগীয় মানসিকতায় আচ্ছন্ন আর কেউ কেউ প্রতিবাদ-ভাস্বর। সমাজবিকাশের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে যে অনাকাক্সিক্ষত ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার ও অন্ধ-অনুকরণ চলছিল তার বিরুদ্ধেই ওয়ালীউল্লাহ্র প্রতিবাদ।
বাংলাদেশের সাহিত্যে, বিশেষত গল্প, কবিতা, উপন্যাস এবং নাটকের ধারায় স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ষাটের দশক বিশেষভাবে উজ্জ্বল। এ-সময়ের ঢাকা কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা লক্ষণীয়। এ-সময়ের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন— এঁরা সাহিত্যের ঋড়ৎস ও ঈড়হঃবহঃ নিয়ে নতুন নতুন চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে শুরু করলেন। বিশেষ করে, বাংলা ছোটগল্প নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং আবদুল মান্নান সৈয়দকে নিমগ্ন থাকতে দেখা যায়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা সাহিত্যে বিরলপ্রজ-প্রতিভাবান শিল্পী। তাঁর গল্প-উপন্যাসের মানুষজন রাজধানী ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত অট্টালিকাবাসী থেকে শুরু করে রিকশাচালক, শ্রমিক, কবরখোদক, পাগল, নেশাখোর এবং গ্রামের সাধারণ মানুষজন, চাষি, কলু, নাপিত, মাঝি, রাজনীতিবিদ পর্যন্ত বিস্তারিত। এই বিস্তারকে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য প্রাণবান লেখক-শিল্পীদের জীবনাভিজ্ঞতা ও তাঁদের শিল্পদর্শনের সঙ্গে তুলনা করলে তাঁর অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য, গভীরতা ও বিস্তৃতি আমাদের শ্রদ্ধা ও বিস্ময় উদ্রেক করে।
সম্ভবত নিজের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির কথাগুলো, স্বপ্ন-কল্পনাগুলো অপরের মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়ার জন্যই শিল্পের সৃষ্টি। এই সৃষ্টির জলতরঙ্গের অভিঘাতের প্রাণস্পর্শে উদ্দীপিত হয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সৃষ্টি, যা ভাষা নামক অমোঘ নিয়ামক-শক্তির ¯্রােতধারায় কাল পরম্পরায় বহমান। সেই জলতরঙ্গে কিশোর, সুবল, বাসন্তী, অনন্ত’র মনকে রাঙিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের উষ্ণতা-সিক্ততায় অভিষিক্ত হয়ে মহাকালিক জীবনসত্যের ঐক্যসূত্রে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ; যা সর্বজনীন জীবনসত্যে এবং মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ও বৈভবে উত্তীর্ণ হয়ে ঔপন্যাসিক সত্যে সমাদৃত হয়েছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের লোকজ গ্রামীণ জীবনের চিত্রাবলীর মধ্য দিয়ে। অবশ্য প্রাক্-সাতচল্লিশ পর্যায়ের বাংলা উপন্যাসের আলোচনায় কাজী আবদুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ এবং হুমায়ুন কবিরের ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসের মাধ্যমে যে গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ঘিরে এপিকধর্মী উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা পরে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ হয়ে আবুজাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’য় এসে সেই গ্রামীণ জীবনের মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার সিদ্ধিতে উপনীত হয়েছে। ‘নদীবক্ষে’, ‘নদী ও নারী’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ এবং ‘সংশপ্তক’— এই কটি উপন্যাসের পটভূমিকায় কথাসাহিত্যিকেরা ব্যক্তির অন্তর্গত জীবন ও বহির্বাস্তবতা, আশা, হতাশা, স্বপ্ন, সুখ, দ্বন্দ্ব, বিরহ, বিদ্রোহ, সংগ্রাম ইত্যাদিকে মানুষ-নদী ও গতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করতে চেয়েছেন। আর বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতম শিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর উপন্যাসের মাধ্যমে আধুনিক শিল্পের বিষয়গুলোকে দেশীয় উপাদানের সমন্বয়ে পাশ্চাত্যের ট্রিটমেন্টে উপস্থাপিত করলেন। অস্তিত্ব সংকটাকীর্ণ মানুষজনের জীবনের সংগ্রামকেই বিভিন্ন টেনশন, অভিজ্ঞতা আর অভিঘাতের সংশ্লিষ্টতায় ফুটিয়ে তুললেন। মানুষের জীবনের অস্তিত্বসঞ্জাত রূপালেখ্য নির্মাণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ দক্ষতার পরিচয় দিলেন, হয়ে উঠলেন আধুনিকতম শ্রদ্ধাশীল বাংলা ঔপন্যাসিক। আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুসুম, কপিলা, শশী ডাক্তার এবং কুবের মাঝি— এদের জীবনের সংকট ও মনোলৌকিক কর্মগুলোও তো পদ্মানদী এবং গাওদিয়া গ্রামের সংশ্লিষ্টতায় মুখর। পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে সংগ্রামী জীবন কিংবা গাওদিয়া গ্রামের সমাজ সনাতন মূল্যবোধাক্রান্ত সমাজ-বাস্তবতার মূল কেন্দ্রে মানুষ এবং মানুষের জীবনই প্রধান। আর আধুনিক উপন্যাস তো ব্যক্তির অনুভূতিতে সমাজবোধ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম :
শুধু একক অনুভূতি নয়, কোনো একক মহাপুরুষের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নয়, কোনো সাধক পুরুষের জ্ঞানচর্চা নয়, কিংবা কেবল সামাজিক বিকাশের ইতিহাস নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের কালপঞ্জি নয়, কিংবা কেবল আত্মপ্রতিষ্ঠার সংকল্প ঘোষণাও নয়, বরং জীবনযাপনের মধ্যে মানুষের গোটা সত্তাটিকে বেদনায় উদ্বেগে প্রকাশের দায়িত্ব নেয় উপন্যাস। এভাবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে যোগাযোগ ঘটে এবং ব্যক্তি মানুষ হবার জন্য তাগিদ পায় […] যেখানেই ব্যক্তির বিকাশ ঘটেছে, উপন্যাস সেখানেই হাজির হয়েছে তার আয়না হয়ে। কিন্তু ব্যক্তির স্বপ্ন ও সংকটত্বে কেবল সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিফলন করেই কিন্তু উপন্যাস ফুরিয়ে যায় না, ব্যক্তিগত সংকটকে শনাক্ত করে সামাজিক সমস্যা বলে এবং এইভাবে শিক্ষিত সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে সাহায্য করে। সংগঠিত শিক্ষিত সম্প্রদায় সচেতন হয় গোটা সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে।১

দুই
বাংলাদেশের উপন্যাসে মানুষ-জীবন ও প্রকৃতিকে ঋজু-সংহতভাবে আরো যাঁরা তুলে ধরেছেন তাঁদের মধ্যে জহির রায়হান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু ইসহাক, সেলিনা হোসেন, শওকত আলী, মাহমুদুল হক প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ এবং ‘সারেং বউ’ উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে গ্রামীণ এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাহিনী এসেছে। সামন্ত সমাজের অবক্ষয় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান প্রক্রিয়াকে বিন্যস্ত করে সাজিয়েছেন শহীদুল্লা কায়সার। গ্রামীণ-লোকজ জীবন নিয়ে রচিত হলেও প্রবাসী সারেং স্বামীর জন্য অপেক্ষমাণ গৃহবধূর জীবনের সরল-করুণ আবেগময় কাহিনীর নির্যাস ‘সারেং বউ’ উপন্যাস। আর শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’য় বাংলাদেশের মাঝিদের আশা-আকাক্সক্ষা, হতাশা-নিরাশা, স্বপ্ন ও বাস্তবময় জীবনের খ-চিত্র নির্মাণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। আবু ইসহাকের ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উপন্যাস অক্ষর-জ্ঞানশূন্য গ্রামীণ দরিদ্র-সরলপ্রাণ চাষিদের জীবন নিয়ে রচিত। একদিকে সংগ্রামশীল জীবন, অন্যদিকে রোমান্টিকতা— এই দ্বিবিধ কারণের সমন্বয়ে সৃষ্ট সংকটই উপন্যাসের প্রাণপ্রতিমা, যা বাংলাদেশের কাঁচামাটির গন্ধময় শব্দ-প্রতীকে ফটোগ্রাফিক ইল্যুশান সৃষ্টি করে; যেমনটি আমরা লক্ষ করে থাকি জহির রায়হানের ‘বরফ গলা নদী’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, কিংবা আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘কর্ণফুলী’, ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’, ‘ক্ষুধা ও আশা’য়। ঔপন্যাসিক চেতনানির্ভরতা ও সমাজবাস্তবতার যুগল সন্নিপাত ঘটেছে উপন্যাসগুলোতে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যুগমানস ও যুগসচেতনতা, সময় ও সংগ্রাম ইত্যাদিকে ধারণ করে উপন্যাসের ফর্ম, থিম ও কনটেন্ট নিয়ে পরীক্ষা করেছেন অনেকেই; জীবন এবং তৎসন্নিষ্ট বিষয়কে দেশজ উপাদানের সংমিশ্রণে আমাদের মতো করে কথাসাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য যাঁরা নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে আখতারুজ্জমান ইলিয়াস একজন।

তিন
আখতারুজ্জমান ইলিয়াসের (১৯৪৩-১৯৯৬) জন্ম বগুড়ায়। বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম. এ. করার পর থেকে বিভিন্ন সরকারি কলেজ হয়ে ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৯৬ প্রায় চুয়ান্ন বছরের জীবনে তিনি মোট পাঁচটি গল্পগ্রন্থ, দুটি উপন্যাস এবং একটি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছেন। লেখালেখির সূত্রপাত কবিতা দিয়ে হলেও একজন স্বনামখ্যাত কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তাঁর সিদ্ধি ঘটে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ প্রকাশের পর থেকেই প্রকরণ, শৈলী এবং আদর্শের দিক থেকে বাংলা কথাসাহিত্যের প্রচল ধারা থেকে ইলিয়াসকে খুব সহজেই আলাদা করা যায়। তিরিশি আধুনিকতার প্রবহমান গদ্যরীতির পরিবর্তে ইলিয়াস নিজস্ব মননশীলতায় চলিত রীতিতে আঞ্চলিক কথ্যরীতির সুকৌশল প্রয়োগ ঘটালেন, উপরন্তু ক্রিয়াপদের সুষ্ঠু প্রয়োগ ক্ষমতার নৈপুণ্যে এবং উপমা, প্রতীক, রূপকের যথোপযুক্ত ব্যবহারে তাঁর গল্পের ভাষা হয়ে উঠেছে সংহত ও ঋজু : অখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্যে গন্ধ আছে, শব্দে শক্তি আছে, উপমা-চিত্রকল্পে আছে জীবন-বাস্তবতার ছায়াভাস, যা মৌলিক এবং প্রাতিস্বিক। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬/৯৭— এই বিশ বছরে তাঁর মোট আটটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থগুলোর মধ্যেই ইলিয়াসের শিল্পদৃষ্টির নিদর্শন দৃশ্যমান হয় : ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ (১৯৭৬), ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮২), ‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫), ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬), ‘দোযখের ওম’ (১৯৮৯), ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬), ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৭), ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ (১৯৯৭)। বাস্তব সমাজচিত্রের সঙ্গে অতীত ঘটনাবলি এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে ‘কুহকী বাস্তবতায়’ ইলিয়াস প্রতিস্থাপন করলেন শিল্পী মনের সূক্ষ্ম বোধিসত্তার সচেতন প্রয়োগে তাঁর রচনার মধ্যে।
প্রতিভার একটি বড় দিক হলো প্রথাগত সমাজবাস্তবতাকে সত্যজ্ঞান না-করে তাকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের চেষ্টা করা। আর প্রতিভাবান শিল্পী শিল্পসাধনার কোনো আবর্তে বন্দি থাকতে চান না, যেমনটি চাননি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার প্রমাণ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’।
‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গ্রন্থে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’, ‘উৎসব’, ‘প্রতিশোধ, ‘যোগাযোগ’, ‘ফেরারী’, ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ মোট ছয়টি গল্প সংযোজিত হয়েছে। মধ্যবিত্তের সংসারের টানাপড়েন থেকে শুরু করে মৃত্যুচিন্তা, ঢাকা শহরের নি¤œবেতনভুক্ত কর্মচারীদের জীবনব্যবস্থা, প্রতিশোধকামী মানুষের জীবনচিত্র, স্মৃতিময় জীবনচিত্র, ফেরারি জীবন ইত্যাদি বিষয় অঙ্কিত হয়েছে। ইলিয়াসের গল্পে নামকরণের সার্থকতা খুঁজতে হবে প্রতীকী মেধায়-মননে এবং রূপকধর্মিতার মধ্যে। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের হতাশা, দুঃখ, নৈঃসঙ্গ ইলিয়াসের গল্পে উঠে এসেছে। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পে মৃত্যুচিন্তা নিমগ্ন ইলিয়াসের চেতনা রঞ্জু, সঞ্জু, ইলিয়াস সাহেব প্রমুখ চরিত্রের বক্তব্যে, কাজে ও চিন্তায় ভাষা পেয়েছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক ঘটনাগুলো গল্পটিতে স্মৃতি রোমন্থনের মধ্য দিয়ে চিত্রিত হয়েছে। ‘উৎসব’ গল্পে আলোরাঙা রাতে ঢাকা শহরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে কাম-ক্রোধ-বিরহ-মিলন প্রভৃতি জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় শব্দরূপ পেয়েছে আনোয়ার আলির বিবরণে।
‘প্রতিশোধ’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের লুটেরা স্বভাবের উঠতি যুবক সম্প্রদায়ের কার্যকলাপকে গল্পকার চিহ্নিত করেছেন। যারা ভ–দেশপ্রেমিক সেজে অনেক সুন্দরের সর্বনাশ করেছে তাদেরই একজন আবুল হাশেম। আবুল হাশেম রোকেয়ার স্বামী, ওসমানের ভগ্নিপতি। আবুল হাশেম ভ-, প্রতারক, শঠ এবং স্ত্রী রোকেয়ার হত্যাকারী। স্বাধীনতা-পরবর্তী নাগরিক জৌলুসে দিশেহারা এই আবুল হাশেমরাই দেশের হাজারো রোকেয়াদের জীবন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে; পারিবারিক সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যকে করে তুলেছে ক্লেদাক্ত। ওসমান এই গল্পের একটি প্রতিবাদী চরিত্র, সে তার ভগ্নিহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে প্রস্তুত। অর ‘যোগাযোগ’ গল্পে মানুষের সম্পর্কের বিভিন্ন স্তর পর্যায়ের বিশ্লেষণ লক্ষ করা যায়। এক আহত সন্তানের কষ্ট, উপরন্তু হাসপাতালের অন্যান্য রোগীর দুর্ভোগ, সবকিছু মিলিয়ে মাতৃময়ী রোকেয়ার অন্তর্নিঃসৃত বেদনাবোধ রোমন্থনের ছায়াচিত্র গল্পটিতে স্থান পেয়েছে। কলকাতাবাসী প্রদীপের বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে বসবাসকারী পিসীর বাড়িতে বেড়াতে আসার অভিজ্ঞতা, পিসীমার আদরে সময় কাটানো, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী একটি হিন্দু পরিবারের ব্যবসায়িক জীবনের ইতিবৃত্ত, পিসীমার পড়ন্ত-যৌবনের নেভানো সলতের অতীত স্মৃতি রোমন্থন এবং প্রদীপ নামের উদীয়মান যুবকের বয়সের বিচ্ছিন্ন চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে গ্রন্থের শিরোনাম-সূচক গল্প ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’। এই গল্পে বাংলাদেশের ¯িœগ্ধতা, রূপময়তা, রূঢ়সত্যের মাধ্যমেই শব্দরূপ পেয়েছে, যার মধ্য দিয়ে প্রদীপ তার বাবার স্মৃতি অবলোকন করতে পারে :
এদের সোনার বাঙলায় ঘরের ভেতরেও চাঁদ ওঠে নাকি? মশারির ফাঁক দিয়ে হাওয়া লাগে এসে। ধোয়া চাদরের জলে ধোয়া ও রোদে-পোড়া সাবানের গন্ধে গলা শুকিয়ে যায়। মাথার কাছে জানালাটা খোলা। জানালার নিচে বারান্দা। পিসীমার ঘরেও বানান্দার দিকে জানালা খোলা, সেখান থেকে পিসীমার জেগে থাকার ধ্বনি কানে আসে। শীতের রাতেও ঘরের জানালা খুলে ঘুমানো— এই অভ্যাস ছিল বাবার।
আসলে ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্পগ্রন্থের গল্পে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্বাধীনতা-পরবর্তী ও পূর্ববর্তী বাংলাদেশকে ও বাংলাদেশের মানুষের জীবনের হতাশা-দৈন্য ও আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনকে যৌনজীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন কোনো কোনো গল্পে।
মুক্তিযুক্ত-পরবর্তী সময়ের জীবনযাত্রার প্রকাশ দেখা যায় ‘খোঁয়ারি’ (১৯৮২) গ্রন্থের গল্পগুলোতে। মুক্তিযুদ্ধ-ফেরত অসৎ, প্রায়-লুটেরা স্বভাবের নব্যযুবক সম্প্রদায়ের অনৈতিক কার্যকলাপ, স্থিতাবস্থাহীন অর্থনৈতিক কর্মকা- ইলিয়াসের গল্পে একাধিকবার এসেছে। ‘খোঁয়ারি’, ‘অসুখ-বিসুখ’, ‘তারা বিবির মরদ পোলা’, ‘পিতৃবিয়োগ’— এই চারটি গল্পের অন্তর্নিহিত সত্য মূলত মানুষ ও মানুষের সমকালীনতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
‘খোঁয়ারি’ গল্পে অঙ্কিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার বাস্তব চিত্র। সমরজিত, ইফতিখার, ফারুক প্রমুখ চরিত্রের ক্রিয়াকলাপে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজচিত্র উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি বাড়ির দৃশ্য ইলিয়াসের গদ্যে ফটোগ্রাফিক ইল্যুশানে চিত্রিত :
আর ঠিক করবে কে?শুওরের বাচ্চারা ন’মাসে বাড়িটার কী অবস্থা করেছে। কে আসবে এখানে? ফারুক খুব জোর দিয়ে এইসব বললে কাচুমাচু মুখ করে ইফতিখার এদিক-ওদিক তাকায়। রান্নাশালার উল্টোদিকে পোড়া একটা ঘর। ইফতিখার বলে, এখানে কী আছিলো দোস্ত? সমরজিৎ তখন জাফরকে ওই ঘরটাই দেখিয়ে দিল, ‘যান, ওইখানে মাইরা দ্যান।’ গুটি গুটি পায়ে চলে গেলে সমরজিৎ বলে ‘বহুত আগে ওই ঘরে ঠাকুরের ভোগ রানতো।
— যে মুক্তিযুদ্ধের প্রবল জোয়ার মানুষের বুকে নতুন স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী হতাশা-নৈরাশ্যকে ইলিয়াস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গল্পের শরীরে বর্ণনা করলেন, যা সমসাময়িক গল্পকারদের রচনায় দুর্লভ। মুক্তিযুদ্ধে যে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল শত্রুর বিরুদ্ধে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সেই বন্দুকই স্বার্থান্বেষী কুচক্রীদের ইশারায় ব্যবহৃত হলো মুক্তিকামী জনতার ওপর— এইসবই এসেছে ইলিয়াসের বর্ণনায়।
‘অসুখ-বিসুখ’ গল্পে মানুষের জীবনে ন্যায্য অধিকার ব্যাহত হওয়ায় যে চাপা অসন্তোষ ও ক্ষোভ জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে তার বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে। আতমন্নেসা, ফুলজান, মতিবানু, সোবহান— এ সকল চরিত্রের বহিরাঙ্গিক ও অন্তর্লৌকিক ক্রিয়াকলাপই ‘অসুখ-বিসুখ’ গল্পের মূল বিষয়। একটি নি¤œমধ্যবিত্ত সংসারের একাধিক সন্তানের জননী আতমন্নেসার আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-ব্যর্থতা সবকিছু মিলেই গল্পের বুনোট হয়েছে। মানুষের জীবনে সহ¯্র দুঃখের মধ্যেও একটুখানি ভালোবাসা ও রোগ-শোকের চিকিৎসা পাওয়ার স্বাভাবিক আবেদনের প্রকাশ ঘটেছে আতমন্নেসা চরিত্রের মধ্য দিয়ে। কাম-ক্রোধ, ঈর্ষা-বিষাদ সবকিছু মিলে গল্পটি ভিন্ন স্বাদে ভরপুর। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে এবং টানাপড়েনের দেশচিত্রকেই খুঁজে পাওয়া যায়।
‘তারাবিবির মরদপোলা’ গল্পে তারাবিবি, তার ছেলে গোলজার আলি, আসাদুল্লা প্রভৃতি উজ্জ্বল ক’টি চরিত্র। এই চরিত্রগুলোর অবদমিত কামনা এবং স্খলনের কাহিনীকে ঘিরেই গল্পের আরম্ভ এবং শেষ লক্ষ করা যায়। গোলজারের বাবা রমজান আলি। এই রমজান আলি তার স্ত্রী— অর্থাৎ গোলজারের মায়ের সম্পর্কিত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলে, “পোলায় বিয়াশাদি করছে, তোমার মুখ অহন ভি দস্তুর হইলো না। কহন কি কও, কথাবার্তা—।” এ-কথার উত্তরে তারাবিবি বলে : “তুমি কব্বরের মড়া পইড়া রইছো, কব্বরের মইদ্যেই থাকো। তুমি কী বুঝবা? তিরিশ বছর হইলো, তোমার ঘর করি, একদিন তোমারে সিধা হইয়া হাঁটবার ভি দেখলাম না। আর এই জামানার জুয়ান পোলাগো বদ খাসলৎ তুমি কী বুঝো?” এ গল্পে মূলত জীবনের অধোগতিকেই চিত্রিত করেছেন ইলিয়াস।
‘পিতৃবিয়োগ’ গল্পে মৃত্যুচিন্তাভারাক্রান্ত ভগ্নহৃদয় এক পুত্রের করুণ হাহাকারের কাহিনী থেকে জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কিত কথাশিল্পী ব্যক্তিক ভাবনা-চিন্তার গভীরতা পাঠককে প্রশ্নভারাতুর করে তোলে, যা জীবন ও মৃত্যুর লীলারহস্য সম্পর্কে মানুষের বোধকে শাণিত করে।
‘দুধভাতে উৎপাত’ (১৯৮৫) গল্পগ্রন্থে ‘মিলির হাতে স্টেনগান’, ‘দুধভাতে ওৎপাত’, ‘পায়ের নিচে জল’ এবং ‘দখল’— এই চারটি গল্প সংকলিত হয়েছে। গল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সমকালীন সময়, সমাজ, সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের মধ্যে যে আশা, নিরাশা, হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো তারই উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে।
প্রথম গল্প ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজ, সময়, সংকট ও সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে। এ গল্পের মিলি, লিলি, রানা, মনোয়ারা বেগম, আশরাফ আলি, আব্বাস পাগলা— কয়েকটি উজ্জ্বল চরিত্র। এই আশরাফ আলি— মিলি, লিলি ও রানার বাবা, মনোয়ারা বেগমের স্বামী আর তাদের পড়শী আব্বাস পাগলা (আব্বাস মাস্টার) এদের জীবনচিত্রের খ-িত অথচ জীবন অ্যালবাম গল্পটি। স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মানুষের নৈতিকতায় স্খলন দেখা দিয়েছিল। যে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল শত্রুসৈন্য তাড়ানোর কাজে তা-ই পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত হতে থাকে স্বার্থান্বেষী মহলের ইশরায় আমাদের দেশের মানুষের বুকে। এবং একশ্রেণির মানুষ হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠতে থাকে। ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পে এই অনুভূতি রূপায়িত হতে দেখা যায় :
‘আশরাফ আলী অফিস থেকে ফিরলে মনোয়ারা হৈ-চৈ করলো, এসব পাগল ছাগলের সঙ্গে এত বড় মেয়ে কিনা যেচে কথা বলে! কখন কী করে বসবে, এদের কিছু ঠিক আছে? আশরাফ আলী স্ত্রীর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত; ‘না, না, এদের অ্যাভয়েড করতে হয়। সব জায়গায় আজকাল আই বি-র লোক। কে যে কি ডিসগাইড নিয়ে আসে!’
‘আই-বি হবে কেন?মনোয়ারা বিরক্ত হয়,
‘তুমি কি এমন মস্ত বড়ো মানুষ যে তোমার ঘরে আই-বি ঢুকবে?’
‘আহা, আমি কেন?আমি কেন? দু’ একবার তোতলালেও আশরাফ আলী শেষ পর্যন্ত বুকে বল নিয়ে বলে, ‘তোমার ছেলে বড়লোক হচ্ছে বলে ভয় করে!’
আব্বাস আলী মাস্টার গল্পে আব্বাস পাগলা নামে পরিচিত। তার এই পরিচিতির পেছনে স্বাধীনতা-পরবর্তী সামাজিক ভারসাম্যহীনতা নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করেছে। আব্বাস পাগলার আকাক্সক্ষা এখন একটি মাত্র স্টেনগান যার মাধ্যমে সমাজের রন্ধ্র থেকে অনাকাক্সিক্ষত অবিচারকে নস্যাৎ করতে পারবে। তাই সে বলে : ‘কইলাম আমারে একটা স্টেনগান দে! একটা স্টেনগান পাইলে ব্যাকটিরে আমি পানির লাহান ফালাইয়া দিবার পারি!’— ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পে স্বপ্ন ও বাস্তবের মাঝামাঝি অবস্থায় মিলি ও আব্বাস পাগলা চরিত্রের মধ্য দিয়ে স্বপ্নময় সোনালি ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশা লক্ষ করা যায়। আর মানবজীবনের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নভঙ্গের অদ্ভুত দিকগুলো নিয়ে রচিত ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পটি রচিত। অহিদুল্লা, অসিমুদ্দি এই গল্পের অন্যতম দুটি চরিত্র। জীবনের নানা টানাপড়েন এই গল্পে চিত্রিত হয়েছে। নি¤œবিত্ত, মধ্যবিত্ত— এই শ্রেণিচরিত্র নিরূপণে ইলিয়াসের গল্পের কাজ একান্তই বাস্তব জীবননির্ভর।
‘পায়ের নিচে জল’ গল্পে যমুনা নদী-বিধৌত গ্রামীণ জীবনের ঘটনার বিন্যাস দেখা যায়। এ-গল্পের সমস্ত অংশ জুড়ে আতিকদের পারিবারিক বিষয়-সম্পত্তির হাত বদলের ঘটনা জড়িয়ে আছে। আতিকরা ঢাকা শহরের বাসিন্দা। গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে ঢাকায় ধানমন্ডি-গুলশানের জায়গায় ইমরাত নির্মাণে প্রস্তুত। টাকার প্রয়োজনে আতিককে আসতে হয় বাপ-দাদার বিষয় সম্পত্তি বিক্রি করতে। গ্রামের চতুর আলতাফ মৌলভিই একমাত্র ক্রেতা। এই আলতাফ মৌলভি এবং অন্যান্য গ্রামীণ চাষির জীবনের খ-িত উদ্ভাস গল্পটিতে লক্ষ করা গেলেও বিদ্যুৎ ঝলকের মতো অত্র এলাকার সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ের সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে ‘দখল’ গল্পটি লিখিত হয়েছে। এই গল্পে বাংলাদেশের সমসাময়িক জীবনযাত্রার প্রতি ইলিয়াসের ঘৃণা ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। এর দুটি কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে :
এক.মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এক শ্রেণির লুটেরা স্বভাবের মানুষের স্বার্থান্বেষী কার্যকলাপ। বিশেষত লুটপাট, জুলুম, অত্যাচার ইত্যাদি।
দুই. যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হাহাকার এবং বিবেকের অধোগতি।
‘দখল’ গল্পে ইলিয়াস এই যৌথ বিষয়ের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন গ্রামীণ পটভূমিকায়। ঢাকায় বসবাসরত ইকবাল তার বাপ-দাদার বিষয়-সম্পত্তির খোঁজ-খবর নিতে এসেই এই বিপত্তির সম্মুখীন হয়। মুক্তিযুদ্ধ ইলিয়াসের গল্পে এসেছে সমাজ ও জীবন-বিকাশের অনিবার্য ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে : […] রাইফেল আরো কাছে আসছে। মানুষের চিৎকার এখন খুব প্রকট। […] কিন্তু ইকবালের কি রেহাই আছে? বাপের সম্পত্তি দখল করতে এসে সে এসব কী ঝামেলায় পড়লো! কবরের মাথায় দাঁড়িয়ে সিগন্যাল দেওয়া তার আর হয়ে উঠলো না।’ ‘দখল’ গল্পে সমকালীন দেশচিত্র অনবদ্যভাবে রূপায়িত হয়েছে।
‘কীটনাশকের কীর্তি’, ‘যুগলবন্দি’, ‘অপঘাত’ এবং ‘দোজখের ওম’— এই চারটি গল্প নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘দোজখের ওম’ (১৯৮৯) শীর্ষক গল্পগ্রন্থ বিন্যস্ত। ‘কীটনাশকের কীর্তি’ গল্পে গ্রামের নি¤œমধ্যবিত্ত রমিজালীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে শহরের উচ্চবিত্তের সায়েবদের জীবনযাত্রার দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়। রমিজালীর বোন অসিমুন্নেসার কীটনাশক পানে আত্মহত্যার খবর রমিজালীর পিতা পত্র মারফৎ শহরে সায়েব-সুবোদের বাড়িতে কর্মরত রমিজালীকে জানানোর মাধ্যমেই গল্পের শুরু। রমিজালীর জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ট্রাক ড্রাইভার সোনামিয়া, তার আশ্রয়দাতা সায়েব, সায়েবের আদুরে কন্যা ও তার প্রাচুর্যখচিত জীবনেতিহাস। রমিজালীর সদ্যবিবাহিতা বড় বোন অসিমুন্নেসা— যে স্বপ্ন দেখতো, ধলেশ্বরী নদীতীরে ধান-কাউন-শর্ষে ক্ষেত্রের আল ধরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতো, শিহরিত হয়ে উঠতো কখনো কখনো, সে আজ মৃত। কেন অসিমুন্নেনা আত্মহত্যা করলো? মিরধাবাড়ির ম্যাট্রিক পাস যুবকের সঙ্গে কী সম্পর্ক অসিমুন্নেসার? এ-সকল সামাজিক সমস্যা আর সংকটই ‘কীটনাশকের কীর্তি’ গল্পের প্রাণবিন্দু। রমিজালী শহরের সায়েবের কন্যার মুখশ্রীতে খুঁজে পায় সহোদরার মুখাবয়ব, সায়েবকন্যার চুক-চুক করে লিচু খাওয়ার মধ্যে নিজ সহোদরার তেঁতুল চোষার তৃপ্তি আবিষ্কার করে :
এই চুকচুকটা এমনি তীক্ষè যে শুধু লিচু খেয়ে সায়েবের মেয়ে এর ধার ক্ষয় করতে পারে না, অসিমুন্নেতার তেঁতুল চোষাতেও এর প্রতিধ্বনি সমান জোরে বাজে। তাই এই বাড়িতে, এই কার্পেটে তেঁতুল তলায় দাঁড়িয়ে অসিমুন্নেসা হেসে গড়িয়ে পড়ে। […] ধলেশ্বরী থেকে বাতাস আসে। ইলিশের গন্ধ চোঁয়ানো বাতাসে রমিজের খিদে পায়। বুবুর লালচে-কালো চুল ওড়ে পাটের ছেঁড়া আঁশের মতো। বুবুর সাড়া পাওয়া যায় না।
শহুরে বড়লোক হলেই যেন তাদের এবং তাদের স্ত্রীদের দিনরাত মদ্যপান করতে হবে, ক্লাবে যেতে হবে, জুয়ার আড্ডা দিতে হবে— এই হীন মূল্যবোধ এবং পোশাকি সভ্যতা ব্যক্তিক আত্ম-উন্নয়নের কোনো কোনো সময় সহায়ক হলেও সার্বিক সমাজ উন্নয়নে কতোটুকু ফলদায়ক— এসব প্রশ্ন নিয়েই ‘যুগলবন্দি’ পাঠককে আকর্ষণ করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের শহুরে শিক্ষিত সমাজের হঠাৎ ভদ্রলোক হয়ে ওঠার মানসিকতাই গল্পের মূলসূর। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সারোয়ার কবির, জেসমিন কবির এবং আসগর। এই সারোয়ার কবির, জেসমিন কবির এবং আসগররা আজো সমাজের নানা স্তরে, নানা উপায়ে দর্পিতভাবে অস্তিত্ববান। এদের হাত থেকে আজো মুক্ত হয় নি সমাজ, সামাজিক মানুষজন এবং রাষ্ট্র।
ইউনিয়ন পরিষদের কেরানি মোবারক আলির পুত্রের অপমৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘অপঘাত’ গল্পের পটভূমি। মোবারক আলি— যার চাকরির বেতন আসে পাকিস্তান গভরমেন্টের অধীনস্থ বগুড়া জেলা ট্রেজারি থেকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর তাকে সন্দেহ করে মিসক্রিয়ান্টদের আশ্রয়দাতা হিসেবে। এই মোবারক আলির পুত্র বুলুর মৃত্যুতে বুলুর মা বলে ওঠে :
দ্যাখো তো চেয়ারম্যানের ব্যাটা, এ্যাঁ, তাঁই মরলো মায়ের সামনে, বাপের সামনে। মাও তো তার ব্যাটাক জান ভর‌্যা দেখা লিবার পারলো! আর হামার বুলু কোটে কার গুলি খায়া মুখ থুবড়্যা পড়্যা মলো গো, ব্যাটার মুখ কোনা হামি একবার দেখবারও পারলাম না গো, হামার বুলুর উপরে গজব পড়ে কিসক গো?
‘বুলু অপঘাতত মরে কিসক গো?’— ‘অপঘাত’ গল্পে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ ও তৎ-পরবর্তী সময়ের চেতনাগত রূপান্তরের মর্মান্তিক আলেখ্য বিবৃত হয়েছে। এই আলেখ্য চিত্রণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্তের জীবনাচার সম্পর্কে জানা যায়।
‘দোজখের ওম’ গল্পে প্রতিনিয়ত মৃত্যু আহ্বানকারী কামালউদ্দিন নেতি থেকে ইতিতে পৌঁছে যায়। সারাক্ষণ স্বপ্নাচ্ছন্নতার মধ্যে কেটে যায় তার কল্পনাগুলো। একসময় ঘরকেই সে ভেবে নেয় পরবাসী আস্তানা। কিংবা ঘরে থেকেই ঘরহীন দোজখের আস্বাদন লাভ করে সে; এবং এর থেকে পরিত্রাণ পেতে একমাত্র মৃত্যুকেই সে কামনা করতে থাকে। স্বপ্নে সে মৃতা স্ত্রী ও মৃত ছেলেকে দেখে। কামালউদ্দিন চরিত্রে কোথাও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অথবা বেঁচে থাকার কিংবা সংগ্রামের চিহ্নমাত্র নেই। কামালউদ্দিন চরিত্রের ঋণাত্মক গঠনে পাঠক হতাশ হয়ে পড়ে সহজেই। কামালউদ্দিনের মৃত্যুচিন্তাবিষয়ক স্বপ্ন-কল্পনাকে ইলিয়াস ভাবালুতা ও ইমোশানহীন করে গড়ে তুলেছেন, উপরন্তু জীবনের জটিল বিষয়কে হালকা অথবা হালকা বিষয়কে জটিল করে উপস্থাপন করেছেন ইলিয়াস। ‘দোজখের ওম’ গল্পেও বিকল্পরহিত বাস্তবতায় গৃহবন্দি কামালউদ্দিনের সময়ের স্থবিরতার বোধ তাকে এক অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দান করে। ফলে সবকিছুকেই সে দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। এর মধ্য দিয়ে সময়ের পল-অনুপলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সে সবকিছুকে দেখে এবং বিচার করে। এসব বর্ণনায় ইলিয়াস দুর্লভ সামর্থ্যরে স্বাক্ষর রেখেছেন।
‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ (১৯৯৭) গল্পগ্রন্থটি ‘ফোঁড়া’, ‘প্রেমের গপ্পো’, ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’, ‘কান্না’ এবং ‘রেইনকোট’— এই পাঁচটি গল্পের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ। ‘ফোঁড়া’ গল্পে দুঃখপীড়িত, রোগজর্জর, দারিদ্র্যক্লিষ্ট এক রিকশাচালকের জীবনের দুর্ভোগ বর্ণিত হয়েছে। যে নিজের ঊরুতে ফোঁড়ার জন্য ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারে নি, ফলে ঈদের দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। পরিণামে তার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে ঈদের খাদ্য ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। এ ফোঁড়া যেন সমস্ত সমাজকে রক্ত-পুঁজে ক্লেদাক্ত করেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফোঁড়ার অনুবীজ নিহিত। যার বিষক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ, বঞ্চিত।
‘প্রেমের গপ্পো’ জাহাঙ্গীর ও বুলার সাংসারিক জীবনের ছায়ায় নির্মিত। গল্পে জাহাঙ্গীরের পুরাতন অভিজ্ঞতা ও খেলোয়াড়োচিত অতীত কাহিনীর মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরের গুলশান-বনানী এলাকার অভিজাত শ্রেণির মানসচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সংস্কৃতিগত বৈষম্য যে অনেকাংশেই পরিবার ও সমাজজীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে গল্পটিতে সে ধারাই লক্ষ করা যায়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহাঙ্গীর, যে বুলার স্বামী, শারীরিক শিক্ষা ও কসরৎ যার প্রিয় অনুষঙ্গ। বুলা জাহাঙ্গীরের স্ত্রী— সংগীত বিষয়ে যার ফ্যাসিনেশন পুরোপুরি। সুনীলদা, কুমিল্লা শহরের বাসিন্দা— বুলার সংগীত শিক্ষক। মুশতাক— বুলার বড় ভাইয়ের বন্ধু এবং বুলার সংগীত সহযোগী, উপরন্তু সুনীলদার ছাত্র। সুনীলদার অসুস্থতা ও করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গল্পের সমাপ্তি ঘটেছে। সুনীলদা শিক্ষিত কষ্টসহিষ্ণু সমাজের প্রতিনিধি— অনাহার ও অর্থকষ্টই যাদের নিত্যসঙ্গী। বিপরীতে মেধাহীন জাহাঙ্গীরদের কাছে গোটা সমাজ বন্দি, যারা শুধু মেধার চেয়ে মেদ-মজ্জার বদৌলতে সমাজকে করায়ত্ত করতে চায়।
মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ের সামাজিক সত্যের দগদগে-সুন্দর চিত্রাবলি ফুটে উঠেছে ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’ শীর্ষক গল্পে। বুলেট চরিত্রের প্রবহমান ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে ইলিয়াস সমকালীন সমাজ-সময়কে ধারণ করতে পেরেছেন। ইমামুদ্দি, লালমিয়া, বুলেট ও বুলেটের মা— ক’টি উজ্জ্বল চরিত্র। বুলেট ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মধ্যে প্র¯্রাব করে হাশেমের সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দেয়। এ প্র¯্রাবের মাধ্যমে সমস্ত সমাজের মুখেই যেন প্রতিবাদের প্র¯্রাব ছুড়েছে বুলেট। গল্পটিতে স্বপ্ন ও বাস্তব পাশাপাশি চলেছে। জীবনও তাই; শুধু বাস্তব বা শুধু স্বপ্ন দিয়ে জীবন চলে না, জীবনে সাফল্যের জন্যে দরকার উপযুক্ত স্বপ্ন বা কল্পনা ও বাস্তবের পরিমিত সমন্বয়— এটিই এ গল্পের মূলশিক্ষা।
‘কান্না’ গল্পে আফাজ আলি চরিত্রটির আর্থিক সংকট ও সংকটময় জীবনসংগ্রামের মাধ্যমে ইলিয়াস আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফুটিয়ে তুলেছেন। সমগ্র বাংলাদেশ যেন কবরস্থান আর এর উপরকার স্বার্থপর মানুষগুলো শ্রেণিবিভক্ত হয়েও স্ব-শ্রেণিতে মৃতপ্রায়। অবৈজ্ঞানিক-শিক্ষা, অর্থনৈতিক অনিয়মানুবর্তিতা, রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা সর্বোপরি দেশপ্রেমহীনতা আমাদের দেশকে ধীরে ধীরে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করে তুলেছে। এক শ্রেণির মানুষের হাতে অর্থ এবং ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যাওয়ায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অমানুষিক কষ্টের শিকার হচ্ছে। ‘কান্না’ গল্পে মৃত্যু, মৃত্যুচিন্তা ও ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে শ্রেণিবৈষম্যের যে ছবি পাওয়া যায় তা আমাদের অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে যায়। আফাজ আলি ও শরীফ মৃধা ঢাকার অভিজাত কবরস্থানের প্রধান রক্ষক, মৃতদের আত্মার মাগফেরাত কামনার জন্য মৃতজনের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়, ছেলে-মেয়ে কিংবা বন্ধুবান্ধবদের ফরমায়েশ হাসিল করেন অর্থের বিনিময়ে। দোয়া-দরুদ পড়েন, কোরান তেলাওয়াত করেন কিংবা কবরে গোলাপ অথবা রজনীগন্ধার চারা লাগিয়ে দেন। সেই আফাজ আলি নিজের সন্তান হাবিবুল্লার মৃত্যুঘন সময়ে তার কাছে থাকতে পারে না। হাবিবুল্লাহ আফাজ আলির ছেলে। সে বরিশালে গ্রামের বাড়িতে বসবাস করে। তার চাকরিহীন, বয়স্ক ছেলে দাস্ত-বমির প্রকোপে মারা যায়। তার কবর জেয়ারত করেই আবার ঢাকার পথে পা বাড়ায় আফাজ আলি মৌলভি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত কলেজ লেকচারার নূরুল ইসলামের উপর অমানুষিক শারীরিক মানসিক নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘রেইনকোট’ গল্পটি। নূরুল ইসলামের শ্যালক মিন্টু একজন মুক্তিযোদ্ধা— মিন্টুর ফেলে যাওয়া রেইনকোটটি গায়ে জড়িয়েই নূরুল ইসলাম আস্ত মুক্তিযোদ্ধা বনে যায়; যার ফলে তার ওপর পাক বাহিনীর চোখ পড়ে, চলে নির্যাতন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানার খবর দেয় নি মিলিটারিদের কাছে।

চার
বাংলাদেশের সবগুলো রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক সত্যকে ঔপন্যাসিক গুণাবলির রসায়নে জারিত করে বাস্তবমুখী সমাজ-নির্ভর উপন্যাস রচনা করে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) এবং ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬)— এই দুটি মাত্র উপন্যাসে তিনি প্রায় দুশো বছরের ইতিহাসকে ধারণ করতে পেরেছেন। সেই ঐতিহাসিক সত্য শিল্পরসসমৃদ্ধ হয়েছে, কারণ তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ পরিমিতিবোধ।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের ঘটনার সূত্রপাত এবং শেষ ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে। তবে পূর্ব বাংলার একটি গ্রামের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সংযুক্ত করেছেন একটি চিঠির মাধ্যমে। গল্পের অন্যতম চরিত্র শিক্ষিত আনোয়ারকে যমুনার চর এলাকায় গরু চুরি রোধের জন্য আহ্বান জানানো হয়। উপন্যাসের বর্ণনায় একদিকে রাজধানী শহর ঢাকা রাজনৈতিক উন্মাদনায় উত্তাল, অন্যদিকে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতেও সেই তরঙ্গের ঢেউ লেগেছে। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান রাজধানী ঢাকার বাইরে কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল তার হদিশ মেলে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে।
‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর ওসমান, আবুতালেব, রহমতুল্লাহ, আলাউদ্দিন, হাড্ডিখিজির— এরা ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এদের কাজকর্ম মূলত ঢাকা শহর কেন্দ্রিক। তা সত্ত্বেও এদের জীবনাচরণকে ঘিরেই সমগ্র দেশের মানুষের উত্তাল গণজোয়ারকে ধারণ করতে পেরেছেন ঔপন্যাসিক। একটি নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবু তালেবের মৃত্যু দিয়েই উপন্যাসের শুরু। যে মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক এবং অনভিপ্রেত। পুলিশের গুলিতে নি¤œবেতনভুক্ত কর্মচারী আবু তালেবের মৃত্যুর খবরের মাধ্যমে ঢাকা শহরের মানুষের রাজনৈতিক ধ্যানধারণা, আবেগ, উদ্বেগ ও সংশয়াকুল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সহায়ক ভূমিকা রাখে। ওসমান একটি ভাবলেশহীন চরিত্র; যে শুধু পর্যবেক্ষণ করে জীবন ও সমাজসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি ঘটনা এবং কষ্ট পায়। আবুল তালেবের লাশ নিয়ে মিছিল করা হবে কি হবে না, এই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সময়ই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়।
আইয়ুব খানের পতন সকলেরই কাম্য, কিন্তু সেই পতনের চরিত্র নিরূপণে ইলিয়াসের দৃষ্টি সূক্ষ্ম এবং বিশ্লেষণধর্মী। এই বিশ্লেষণে পিওন, রিকশাচালক, বাস কন্ডাক্টর, ড্রাইভার, কুলি প্রমুখ পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানসিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেছেন ঔপন্যাসিক। এদের পাশাপাশি বস্তির বালকদের উত্তেজিত চেতনাকেও ধারণ করেছেন ইলিয়াস। অফিসপিওন, রিকশাচালক, বস্তির বালক, ছাত্র, যুবক, নেতা, কর্মী— এদের আকাক্সক্ষার স্বপ্নবীজ লুকিয়ে আছে দেশের স্বাধীনতার ওপর। আইয়ুব খানের পতনের পাশাপাশি রিকশার মহাজন রহমতুল্লাদের পতন হবে— এই হলো খিজিরদের প্রার্থনা। অর্থাৎ এক আরাধ্য মুক্তিকামী জনতার কণ্ঠ এবং ধ্যানধারণারই বয়ান ঘটেছে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে যে চিঠির মাধ্যমে রাজধানী শহর ঢাকার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল যমুনাতীরের গ্রামের সংযোগ ঘটানো হয়েছে, সে চিঠির প্রাপক ছিলেন আনোয়ার নামক এক শিক্ষিত যুবক। আনোয়ার, যার আত্মীয়-স্বজনরা এখনো গ্রামের অধিবাসী। গ্রামের আলোড়ন-বিলোড়ন, ন্যায়-অন্যায়ের সঙ্গে এঁরা জড়িত। খয়বার গাজী, চেংটুরা আনোয়ারের আগমনে কেউ খুশি হয়, আবার কেউ কেউ ভয়ে থাকে সন্ত্রস্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, রাজনৈতিক নিস্পৃহতা আনোয়ার চরিত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে দেয় নি। কারণ এলাকায় গরুচোরের উৎপাতে এলাকার সহায়সম্বলহীন কৃষকরা দিশেহারা : এই দিশেহারা কৃষকদের উপকার করার জন্য গ্রামে গিয়েও উপযুক্ত শাস্তি বিধানে ব্যর্থ আনোয়ার ক্ষুণœ মনে ঢাকায় ফিরে আসে। এভাবে পরিবর্তনকামী মানসিকতাকে নিয়ে আরো যে চরিত্রগুলো এ উপন্যাসে এসেছে তাদের মধ্যে হাড্ডি খিজির, জুম্মান উল্লেখযোগ্য চরিত্র।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ (১৯৯৬)। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ (১৯৮৬) প্রকাশের পর কিছু গল্প প্রকাশিত হলেও এই দীর্ঘ দশ বছর তিনি ধীরে ধীরে নির্মাণ করেছেন ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের বিশাল শরীর।
‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের কাহিনীর সূত্রপাত ঘটেছে কাৎলাহার বিল এবং এই বিলপাড়ের দুই গ্রাম গিরিরডাঙ্গা ও নিজগিরিরডাঙ্গাকে কেন্দ্র করে। মুক্তাবিন্দুর মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে পোড়াদহের মেলা। এই গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ি হাট, তরণীর হাট এবং পোড়াদহের মেলা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পু-্রনগরী, আজকের বগুড়া জেলা সদর থেকে প্রায় আট-দশ মাইল পূর্ব দিকে— যা যমুনা বিধৌত। যমুনা-বাঙ্গালি-করতোয়া-বিধৌত পূর্ব-বগুড়ার পলল-মৃত্তিকাগঠিত এই ভূ-ভাগের উর্বর মাটিতে প্রচুর কৃষিপণ্য উৎপন্ন হয়। এখানকার মানুষজন কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, কামার, কলু আবার কেউ কেউ ব্যবসায়ী। বৎসরে একবার মাঘ মাসের শেষ বুধবারে পোড়াদহের মেলা বসে। এই পোড়াদহের মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই এলাকার স্বতন্ত্র বিচিত্র সংস্কৃতি। লোক-সংস্কৃতির এক বিরাট বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে মেলাটি। ক্রমবর্ধমান নগর ও আকাশ-সংস্কৃতির করাল গ্রাসে কালের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব বাঙালি সংস্কৃতি। ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে লোক-সংস্কৃতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এসেছে :
পরশু পোড়াদহের মেলা। মেলা উপলক্ষে আশেপাশের মেয়েরা এসে গেছে বাপের বাড়ি, জামাইরা এখনো আসছে। পোড়াদহের চারদিকে গ্রামগুলো মানুষজনে গিজগিজ করছে। ইসমাইল এই সুযোগটা ছাড়তে চায় না। মেলার একদিন আগে গোলবাড়ি হাটে মুসলিম লীগের সভা। ইসমাইল হোসেন তো বলবেই, শামসুদ্দিন ডাক্তার কথা দিয়েছে খান বাহাদুর সাহেবকে নিয়ে আসার জন্যে সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে, বাকি আল্লাহর ইচ্ছা। বটতলা ঘেঁষে মঞ্চ তৈরি হবে, মঞ্চের জন্য তক্তপোষ পাওয়া গেছে মুকুন্দ সাহার কাছ থেকে, চেয়ার দেবে নায়েব বাবু।
ইলিয়াসের উপন্যাসে মানুষ এবং মানুষের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়াদি প্রধান হয়ে উঠেছে। এক আঁচড়ে গোটা এলাকার মানুষ এবং মানুষের জীবন সম্বন্ধে অবহিত হওয়া যায়। গ্রামীণ সাধারণ মানুষের জীবনে পোড়াদহের মেলার প্রভাব, যা আনন্দের। ইলিয়াসের রিঃ এবং যঁসড়ঁৎ বোধ সূক্ষ্ম :
পোড়াদহ মেলার সময় বাড়িত জামাই আসিছে, বুঝলা না? শ্বশুর গেছে আমার শাশুড়ি আর শালিক আনতে। আর শালি না থাকলে মানুষে কি আর শ্বশুরবাড়ি আসে? বোঝো না, বৌ হলো ডালভাতের ডালি। রসের হাঁড়ি জোয়ান শালি।
কেরামত ও তমিজের সহজ সরল বাক্যালাপ থেকে এই এলাকার মানুষের জীবন এবং রসবোধ সম্পর্কে জানা যায়। পূর্ব-বগুড়ার এই বিরাট এলাকা জুড়ে আজো এ ধারা বহমান।
কাৎলাহার বিল, বিলপাড়ের মানুষ, পোড়াদহের মেলা, গোলাবাড়ি হাট, হাটের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, হিন্দু-মুসলমান, নায়েব-জমিদার, কৃষক, শোষক-শোষিত, রাজনীতিবিদ এবং বর্গাচাষী থেকে শুরু করে কলু, মাঝি, কামার সকলের বর্ণনা এসেছে ‘খোয়াবনামা’য় ধীরে ধীরে। গ্রামের মাঝখানে অবস্থিত একটি বিলকে কেন্দ্র করে এতো বড়মাপের উপন্যাস লেখা— ইলিয়াসের কৃতিত্ব এখানেই।
‘খোয়াবনামা’ একটি দলিল; রাজনীতির ইতিহাস। শোষিত-শোষক শ্রেণির ইস্তেহার, গ্রামীণ অর্থনীতির পূর্ণ-বৃত্তান্ত। মাঝি, চাষি থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের জীবনী প্রতিমা। কৃষক-শ্রমিক সকলের জীবনের সূক্ষ্ম অনুষঙ্গগুলোর বর্ণনাতেও ইলিয়াসের অনন্যতা ধরা পড়ে। সামাজিক পদস্থ ব্যক্তি দ্বারা কুলসুমরা, তমিজরা থাকে তটস্থ নির্যাতিত। তারা তাদের ঘামের, শ্রমের মূল্য পায় না। ঘর-সংসার করা, সুখভোগ করা হয়ে ওঠে না তমিজের। কুলসুম, ফুলজানের প্রাণখোলা হাসি তমিজের ভাগ্যে বেশিদিন সহ্য হয় নি। শেষপর্যন্ত তমিজকে হতে হয় ফেরারি আসামি, সংসারবিমুখ এক পথচারী-বিদ্রোহী। এই চিত্র কি সেদিনের শুধু সেই কাৎলাহার বিলপাড়ের তমিজ-কুলসুমের না-কি সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র? কাৎলাহার বিলপাড়ের শোষিত মানুষের আর্তচিৎকার কাৎলাহারের বিলপাড় ছাড়িয়ে বাংলার আকাশ-বাতাসকে ভারি করে তোলে। এখানেই শিল্পী ইলিয়াস সার্থক। স্থান-কাল-জনপদ উৎরে গিয়ে ‘খোয়াবনামা’ সর্বকালের, সর্বস্থানের, সর্বজনের লালিত স্বপ্নের ঠিকানায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের উপন্যাস তথা বাংলা উপন্যাস। ব্যক্তির সর্বস্বতা থেকে ব্যক্তির আর্তচিৎকার থেকে উপন্যাস মুক্তি পেয়ে সামাজিক আশা-আকাক্সক্ষার দিকে মোড় নিলো, যা আমাদের বড় পাওয়া। তমিজের সমস্যা একার নয়, সমষ্টির। সামাজিক সমস্যাগুলোই খতিয়ে দেখানো হয়েছে ‘খোয়াবনামা’য়— যা এতোদিনের বাংলা উপন্যাস থেকে আলাদা। ইলিয়াস কোনো সত্যকে ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, কোনো পথ ব্যক্তিকে বাৎলে না দিয়ে শুধু ব্যক্তি ও সমাজের অসাম্যকে দেখালেন। ইলিয়াসের হাতে এই দু’শো বছরের ব্যবধান শৈল্পিক মর্যাদা পেয়েছে : ‘দু’শো বছর আগে গোরা সেপাই টেলরের বন্দুকের গুলিতে নিহত মুন্সী বয়তুল্লাহ মৃত্যুর পর উঠে বসে কাৎলাহার বিলের ধারে প্রাচীন পাকুড় গাছে। সেখান থেকে সে দু’শো বছর ধরে বিল শাসন করে।’ এ-বর্ণনা অভিন্ন সময়-বোধে শিল্পিত পরিশীলিত-মার্জিত এবং শাণিত। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেই আমাদের এই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভূ-ভাগে ঘটে গেছে অনেক কিছু। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ এবং ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ— যদি এ-সময়গুলোকে ধরেই বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে পলাশীর যুদ্ধ, সিপাহী বিদ্রোহ, দেশবিভাগ, ফকির বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস ইত্যাদি বহুবিধ রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে গেছে, যা ‘খোয়াবনামা’য় এসেছে ধীরে ধীরে, বর্ণনার জন্য বর্ণনা নয়, চরিত্রের প্রয়োজনেই এসেছে। তাই কোনো বর্ণনাকে চাপানো সত্য মনে হয় না, বরং সত্য সত্যের মতোই, জীবন জীবনের মতোই স্বচ্ছ এবং প্রবহমান।
একটি মহৎ সৃষ্টির জন্য প্রস্তুতি দরকার। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এবং ‘খোয়াবনামা’ এ-দুটি মহৎ উপন্যাসের প্রস্তুতি চলছিল; ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ প্রকাশের পর থেকেই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গদ্যভঙ্গি বাংলাদেশের পূর্বজ এবং সমকালীন গদ্যশিল্পীদের থেকে আলাদা, উপরন্তু পশ্চিমবঙ্গীয় গদ্য থেকেও ভিন্নস্বাদের। এখানেই তাঁর বিদ্রোহ, এখানেই তাঁর অনন্যতা।
তথ্যনির্দেশ :১.আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ‘চাকমা উপন্যাস চাই : ঘিলে কোজাই; (সুখেশ্বর চাকমা সম্পাদিত), পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৯৭, পৃ. ১২-১৩।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com