আগস্ট ’০৭ এর ছাত্র বিদ্রোহ

প্রকাশিত: ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২১

আগস্ট ’০৭ এর ছাত্র বিদ্রোহ

মুশতাক হোসেন

২০০৭ সালের কথা, আগস্টের ২০ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে ছাত্র বিদ্রোহের ঢেউ শাসকদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। এ বিদ্রোহে শ্রমজীবী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ শুরু করায় শাসকদের আতংক আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। ব্যাপক দমন-পীড়নের মাধ্যমে সরকার একে নিয়ন্ত্রণ করার পথ বেছে নেয়। ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকাসহ সারা দেশের বড় বড় শহরে কারফিউ জারী করা হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতৃবৃন্দকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বড় কলেজগুলোর ছাত্রদেরকে পাইকারী গ্রেপ্তার ও ছাত্রীদেরকে নির্যাতন করা হয়। আবাসিক হল ও মেসগুলোতে গিয়ে ১৯৭১এর পাক হানাদার বাহিনীর কায়দায় ছাত্রদেরকে বেধড়ক মারপিট করতে করতে ট্রাকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। প্রায় লাখ খানেক ছাত্র-জনতাকে আসামী করে মামলা দায়ের হয়।

মামলায় শিক্ষক ও ছাত্রদেরকে সাজা দেয়ার জন্য সরকারের অভ্যন্তরের নিয়ন্ত্রক শক্তি বলে কথিত মহল মরিয়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সরকারের দৃশ্যমান নেতৃত্ব এ ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব নিয়ে বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারে বারবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করলেও তারা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। এর মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের অর্ধেক রদবদল করা হল। বহুবার আশ্বাসের পরেও ছাত্র-শিক্ষকদের মুক্তি ঝুলে থাকায় ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দ অবশেষে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হলেন। নবপর্যায়ে ডিসেম্বর ২০০৭ থেকে আবার ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সমাজ এক হয়ে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করল। তবে এবার কোন ধর্মঘট ডাকা হয় নি। বিক্ষোভ-ও ছিল শান্তিপূর্ণ। কারণ এবার পুলিশ-মিলিটারি কোন উস্কানীমূলক আচরণ করে নি। অবশেষে ২২ ও ২৩ জানুয়ারী ২০০৮ সরকার সব ছাত্র-শিক্ষককে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। যদিও ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে মিলিটারী গাড়ী পোড়ানোর মামলা এখনো প্রত্যাহার করা হয় নি।

গত বছর আগস্টে ছাত্র সমাজ বিশেষ করে বিশ্ব^বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ কেন উত্তাল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং শ্রমজীবী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোনো নেতৃত্বের নির্দেশনা ছাড়াই ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনে সামিল হলেন? সরকার কেন শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে নি? এমনকি স্বয়ং মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ওপর সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের বাড়াবাড়ি আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশের পরেও কেন পরিস্থিতি শান্ত করা গেল না? আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো কেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেশিয়াম ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাস থেকেই সেনাবাহিনী দখল করে রেখে সেনা ছাউনী স্থাপন করেছিল। প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন যখন যুগপৎভাবে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন ২২ জানুয়ারী ২০০৭ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়। সে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য সারা দেশে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেশিয়ামেও সেনা ছাউনী স্থাপিত হয়। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক বিএনপি-জামাত জোটের প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের কারণে সকল রাজনৈতিক দল (বিএনপি-জামাতের চার দলীয় জোট বাদে) সে নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে ও সামরিক বাহিনীর চাপে ১১ জানুয়ারী ২০০৭ প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদত্যাগ করে ও রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন ২২ জানুয়ারীর সংসদ নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে। সারা দেশে জারী করা হয় জরুরী অবস্থা।

সংসদ নির্বাচন বাতিল করা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেশিয়াম থেকে সেনা ছাউনী প্রত্যাহার করা হয় নি। কারণ জরুরী অবস্থা কার্যকর করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেনা ছাউনী রাখাটা সরকারের জন্য জরুরী ছিল। এরশাদ আমলের মত ক্নো ধরণের ছাত্র বিক্ষোভ যেন দানা বাঁধতে না পারে, সে জন্যই ছিল এ ব্যবস্থা।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকবৃন্দ প্রথম থেকেই জরুরী অবস্থা ও ক্যাম্পাসে সেনা ছাউনী থাকার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও পরে সরাসরি সেনা ছাউনী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করে। পত্রিকায় বিষয়টি সম্পর্কে লেখা পাঠানো হলেও কোন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে লেখা ছাপাতে সাহস করে নি। কিন্তু ক্যাম্পাসে সেনা উপস্থিতি সম্পর্কে চাপা ক্ষোভ সব সময়ই ছিল। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত চরিত্রের সাথে রাষ্ট্রীয় দমনমূলক সংস্থার সহাবস্থান একেবারেই বেমানান। এছাড়াও ছাত্র সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই স্বাধীনচেতা ও স্বৈরাচারবিরোধী। চাপা অসন্তোষে বিক্ষোভের অগ্নিস্ফূলিংগ ঘটায় ২০ আগস্ট জিমনেশিয়ামের খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর কয়েকজন জোয়ান কর্তৃক ছাত্র-শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনা।

সারা দেশের ছাত্র সমাজের মধ্যে এ আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়লো কেন? কারণ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জেলাসমূহে সেনা ছাউনীতে অবস্থানরত সেনাদের খবরদারীতে ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। ১১ জানুয়ারী ২০০৭ তারিখে সংসদ নির্বাচন বাতিল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বদল কাম্য হলেও জরুরী আইন জারী কাম্য ও আকাংখিত ছিল না। ২০০৭এর জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে ব্যবসায়ী সংগঠনের একজন নেতা প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে জরুরী আইন জারীর দাবি জানালে তাৎক্ষণিকভাবে সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠন একযোগে জরুরী আইন জারীর আবদারের তীব্র প্রতিবাদ করে। প্রতিরোধ আন্দোলন এবং চার দলীয় জোট কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা – এ দুই মুখোমুখী অবস্থান যখন আপোষ মীমাংসা কিংবা আন্দোলন – কোনটির মাধ্যমেই ফয়সালা করা যাচ্ছিল না, তখন সে সুযোগে এদেশের ব্যবসায়ী মহলের অংশবিশেষ, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, একশ্রেণীর সুশীল সমাজ নামধারী শাসক শ্রেণীর তাত্ত্বিক মুখপাত্ররা ও শাসকগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক মুরুব্বীদের যৌথ স্বার্থে জারী হয় জরুরী অবস্থা। জনদাবির মুখে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হলেও, রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে। শুধুমাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য এ নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে নি, এ কথাটা নতুন সরকারের উপদেষ্টামন্ডলী ও সামরিক বাহিনীর নেতারা প্রকাশ্যেই একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন। সেটা যে শুধু অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নয়, বরং শাসকদের অনুগত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সেটা বুঝতে কারো কষ্ট হয় নি। ফলে দুর্নীতি দমন অভিযান, যা প্রথম দিকে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছিল, রাজনৈতিক নীল নকশা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে তা ব্যবহার শুরু হওয়ায় তা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সংস্কার না করে শুধুমাত্র ব্যক্তি দমনের ফলে প্রথম দিকে দুর্নীতিবাজ চক্র ঘাবড়ে গেলেও পরে সামলে নেয় এবং নাশকতামূলক তৎপরতা শুরু করে। ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী তথা জনগণের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। অপরদিকে শ্রমজীবী মানুষ বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষের বাসস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা না করে ঢালাওভাবে বস্তী উচ্ছেদ, রাস্তার পাশে স্বনিয়োজিত হকার ও ক্ষুদ্র দোকানীদের উচ্ছেদ, রিকশাসহ পরিবহন শ্রমিকদের ওপর পাইকারী নির্যাতন প্রভৃতি শ্রমজীবীদেরকে চরম বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এসবের মোট ফল দাঁড়ায়, জনগণের মোহমুক্তি ও ক্ষোভের বারুদ জমা হওয়া। এ ধরণের পটভূমিতেই ঘটে যায় ২০০৭এর আগস্ট বিদ্রোহ।

রাজনৈতিক দলগুলো এ ছাত্র বিদ্রোহকে জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলনে পরিণত না করা এবং ছাত্র সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এর নেতৃত্বে আসতে না পারার কারণে আন্দোলন ধারাবাহিকতা পায় নি। অপর দিকে যে সব ছাত্র-ছাত্রী এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সরকারের বর্বর নিপীড়নকে মোকাবেলা করে তারা এগোতে পারেন নি। আগস্ট ছাত্র বিদ্রোহের গতি-প্রকৃতি ছিল অনেকটা ক্ষণে ক্ষণে ফুঁসে ওঠা গার্মেন্ট শ্রমিক বিদ্রোহের মত। গার্মেন্ট শ্রমিকগণ বেশ কয়েকবার বীরোচিত সংগ্রামের সূচনা করলেও মালিকদের ও সরকারী নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন এবং সংগঠিত নেতৃত্বের অভাবে তার ধারাবাহিকতা থাকে নি। তবে এতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ থেমেও থাকে নি। অনুরূপভাবে বলা যায় আগস্টের ছাত্র বিদ্রোহ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারলেও দেশে স্বৈরাচারী শাসন অব্যাহত থাকলে মাঝে মাঝেই এ ধরণের ছাত্র বিদ্রোহ ঘটবে এবং এক পর্যায়ে তা সংগঠিত রূপ নেবে। ছাত্র-শ্রমিক-পেশাজীবী-জনতা স্বৈরাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করবে।

তবে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ছিলেন সম্মানজনক ব্যতিক্রম। কঠিন নির্যাতনের মুখেও তারা মাথা নত করেন নি। রিমান্ড ও জেলজীবনের কঠোর কঠিন অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নি। শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন স্বৈরাচারের হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহী ছাত্রদের কাছে তারাই ছিলেন প্রেরণা। ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের অপ্রকাশিত উপস্থিতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীরবতা ও সমাজের অন্যান্য অংশের আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ পালন করেছেন অভিভাবক ও নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছে। এদেশের গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির আন্দোলনে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজ। আগস্ট বিদ্রোহ দীর্ঘদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষক সমাজকে পুনরায় সম্মানিত আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারই স্বীকৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ২৩ আগস্টকে প্রতি বছর ’নির্যাতন বিরোধী দিবস কালো দিবস’ অভিধায় পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐতিহাসিক হয়ে রইবে এ সিদ্ধান্ত।

মুশতাক হোসেনঃ ১৯৮৯-৯০ সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সাধারণ সম্পাদক। সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের সভাপতি।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930