আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে খেলোয়াড় হিসেবে নিয়ে যান

প্রকাশিত: ১:৩৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৮, ২০২২

আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে খেলোয়াড় হিসেবে নিয়ে যান

পুলক ঘটক

আমি শিশুকাল থেকে কিছু আজব কল্পনার ঘোরে আচ্ছন্ন থাকতে অভ্যস্ত। নতুন কিছুতে নিয়োজিত না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা করেও সেসব কল্পনা থেকে বের হতে পারি না। যেমন গত কয়েকদিন থেকে ভাবছি, আমি লটারিতে এক বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছি। অর্থাৎ এক লাফে বড় ধনীদের কাতারে চলে গেছি। সেই টাকায় কি করব? বাংলাদেশে একটি ফুটবল ক্লাব বানাবো। সারাদেশ থেকে ১২-১৩ বছরের খেলুড়ে শিশুদের দিয়ে শুরু করব। গ্রাম পর্যায়ে আন্তঃপাড়া এবং আন্তঃস্কুল ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করে প্রতিবছর সম্ভাবনাময় ২০০ শিশু বের করে আনব। সেই শিশুদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের সমস্ত দায়িত্ব নেব। ক্লাবের আন্ডারে বিকেএসপির মতো একটি প্রতিষ্ঠান বানিয়ে সেখানে তাদের উন্নত কোচিংয়ের ব্যবস্থা করব। প্রতি বছর এভাবে ২০০ শিশু বের করে আনলে ৫ বছরে তাদের মধ্য থেকে ১১×৪= ৪৪ জন প্রতিভাবান ফুটবলার বের করে আনা সম্ভব। তাদের মধ্যে বাছাইকৃত ১১ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে জাতীয় দল গড়তে পারলে আমাদের দল বিশ্বকাপে লড়তে পারবে। প্রয়োজনে আফ্রিকার কোনো দারিদ্র পিড়িত দেশ থেকে এরকম কিছু বাছাই করা শিশুকে নিয়ে এসে সরকারি সহায়তায় তাদের নাগরিকত্ব দিয়ে আমাদের জাতীয় দলকে আরও সমৃদ্ধ করব। কিন্তু বিশ্ব আসরে যাবই। এই কল্পনা থেকে বের হতে পাচ্ছি না।
আমাদের মতো মানুষের কল্পনা আছে, কিন্তু সামর্থ্য নেই। আমাদের দেশে এখন অনেক শিল্পগ্রুপের মালিক আছে, যাদের সামর্থ্য আছে, কিন্তু দেশকে নিয়ে কল্পনা নেই। তারা কিন্তু চাইলেই এটা বাস্তবায়ন করতে পারে। আমাদের খেলা পাগল জনতার স্পিরিটকে কাজে লাগিয়ে ফুটবলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। জনগণের যে টাকা পূজিপতিরা বিদেশে পাচার করে, চাইলে সেই টাকায় নানা ক্ষেত্রে নিজেদের দেশটাকেই এগিয়ে নিতে পারে। নিজের দেশকে উন্নত করতে পারলে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয় না।
মূল দায়িত্ব সরকারের হলেও কোনও সরকারই একা দেশকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে না। দেশপ্রেমিক জনগণের অংশগ্রহণ লাগবে। পূঁজিবাদে প্রাইভেট সেক্টর যদি দেশাত্মবোধ নিয়ে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে জাতীয় কল্যাণে কাজ না করে, তাহলে এগোনো কঠিন। তবে আবারও বলছি, মূল দায়িত্ব সরকারের। খেলাধুলায় উন্নতি করতে হলে শিশুদের জন্য সারাদেশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ লাগবে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে আমাদের জনগণের উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা দেখে ভাবনা আসে। আমাদের নিজেদের দল যদি বিশ্ব আসরে খেলতে পারত তবে এ নিয়েই আমরা একটি উচ্ছসিত প্রাণবন্ত গরিমাময় জাতি হিসেবে দশাত্মবোধে আরও সুসংবদ্ধ হতে পারতাম। ফুটবল বাদ দিলে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে কে চেনে? সাহিত্যের আসরে বাঙালি তাদের চেয়ে সমৃদ্ধ। অর্থনৈতিক দিক থেকেও তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে নেই। অথচ ফুটবলের কারণে গোটা পৃথিবী তাদের চেনে। আপনি ইউরোপ বা দক্ষিন আমেরিকার যে কোনো দেশে গিয়ে দেখুন; সেখানকার সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের নামও জানে না। অথচ ফুটবলের কারণে সেই সদূরের আর্জেন্টিনার নাম আমাদের গ্রামের শিশুরাও জানে। পৃথিবীর ১৯৩টি দেশের নাম আমরা সবাই জানি না। তবে ব্রাজিলের নাম আমাদের শিশুরাও বলতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বজনতার কাছে আজও অজানা দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশকে চেনাতে হলে বিশ্ব আসরে খেলতে হবে।
ক্লাব ফুটবলকে প্রানবন্ত করতে না পারলে ফুটবল আগাবে না৷ এই ক্লাবগুলো কিন্তু সরকারি নয়। ক্লাব যদি খেলোয়াড় তৈরির কারখানা না হয়ে মাস্তানি, নেশা আর জুয়ার আঁকড়ায় পরিণত হয় তাহলে ফুটবলের অগ্রগতি কিভাবে হবে? মাঠ পর্যায়ে খেলাধুলার বিকাশে সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঘাটতি রয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো খেলোয়াড় সিলেকশন। মাঠ থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে উপরে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে দুর্নীতি থাকলে আশা করা বৃথা। মানুষের দুর্নীতিমূলক প্রবৃত্তি এই জাতির অগ্রগতির আসল অন্তরায়।

সালাউদ্দিনের মতো একজন ফুটবলার বাফুফের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা কতই না আশাবাদী হয়েছিলাম! অথচ তিনি চুড়ান্ত ব্যর্থতার রেকর্ড রেখে যাচ্ছেন। বাঙালি জাতিকে আমার মতো মানুষের কল্পনার রাজ্যে ঘোরাবেন না। জাতীয় উন্নতির আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিন। আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে দর্শক হিসেবে নয়, খেলোয়াড় হিসেবে নিয়ে যান। সরকারের কাছে ও শক্তিমান ব্যক্তিবর্গের কাছে একজন স্বপ্নঘোর সাধারণ মানুষের এই আবেদন ।

 

পুলক ঘটক ঃ সাংবাদিক 

লাইভ রেডিও

Calendar

January 2023
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031