আজকের প্রজন্ম আগামী দিনের ভবিষ্যৎ -তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষ জনশক্তিতে পরিনত করতে হবে

প্রকাশিত: ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২২

আজকের প্রজন্ম আগামী দিনের ভবিষ্যৎ -তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষ জনশক্তিতে পরিনত করতে হবে
অধ্যক্ষ ড. গোলসান আরা বেগম।
আজকের প্রজন্মকে নিয়ে আমাদেরকে বেশী ভাবতে হবে। আগামী দিনে এরাই দেশের, সমাজের সুখের উন্নয়নের হাল ধরবে। আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে দিবে  সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। জাতীয় উন্নয়নের চাকা ঘুরাবে সন্মুখ গতিতে। তরুন প্রজন্ম আকাশ চুম্বী কল্পনা ও ধাঁধার জগতে হাবুডুবু খাইতে থাকে। এক পা আগানুর পর পরের পা কি ভাবে আগাবে তা সবাই বুঝে না। অন্ধকার জগতে ঘুরতে থাকে। এই অবুঝ, সবুজ, তারুণ্যের শিরা উপশিরায় পৌঁছে দিতে হবে সোনালি জীবনের স্বপ্ন বীজ। সুপথে তোলার দায়িত্ব বহন করতে হবে অভিভাবক, শিক্ষক ও রাষ্ট্রকে।
শিশু জন্মের পর মায়ের  চোখে চোখ রেখে প্রথম শিক্ষা গ্রহন করে তাঁর মায়ের কাছে।পরিবার হলো  তার প্রথম শিক্ষালয়। পারিবারিক শিক্ষা সন্তানের উপর সব চেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে।আমাদের দেশে প্রায় ৮০% জনগণ বসবাস করে গ্রামে।জাতীয় শিক্ষার উন্নয়ন বা অবনতির পরিকল্পনা উদ্ভাবনের সময় প্রাধান্য দিতে হবে গ্রাম্য শিক্ষার উপর। সেখানকার অধিকাংশ মা বাবা সন্তানের খোঁজ খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করে না, তাদের সন্তান আদৌ স্কুলে যায় কি না, কি পড়ে বা কেমনে পড়ে, এমন কি কোন ক্লাশে পড়ে তাও জানে না।তবে সব অভিভাবক যে উদাসিন বা বেখেয়ালি তা বলছি না।গ্রাম থেকেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে ওঠে আসে খ্যাতির উচ্চ শিকড়ে। দেশ ও দশের মুখ উজ্জল করে।
শিশুর হাতে কলমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম স্তর হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে তার শিক্ষা দাতা শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব এর সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় ঘটে। শিক্ষক যে শিক্ষা দেয়, তা তোতা পাখীর মতো গ্রহন করে। ধীরে ধীরে তাঁর নিজস্ব সত্ত্বার বিকাশ ঘটে, আচরণিক চাল চলনে নিত্য নতুন পরিবর্তন সংযোজিত হতে থাকে। মষ্তিস্কের রন্ধ্র কোষে জ্ঞানের জগতের নানা তথ্য সংযুক্ত করে, তাদের বুদ্ধি মেধাকে করে সমৃদ্ধ। শিশুরা নেচে,গেয়ে,খেলাধূলা, আকিঁবুকি করতে করতে পড়াশুনা করতে বেশী স্বাছন্দ বোধ করে। এ কারনেই শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়নের পর প্রথম শেণিতে ৫ +বয়সের শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার আয়োজন  করে সরকার। প্রায় শত ভাগ শিশুকে টেনে আনে শিক্ষার আওতায়। এই স্তরে কোন পরীক্ষা গ্রহনের পদ্দতি  নাই।তবে তিন মাস অন্তর বিশেষ মুল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মেধা যাচাই করা হয়। ২০২৩ সাল থেকে প্রাক- প্রাথমিক স্তরে ৪+ ও ৫+ বয়সের শিশুদের ভর্তি করা হবে, শিক্ষার ব্যাপ্তি হবে দুই বছর মেয়াদী।
আমরা সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য সোনার মানুষ তৈরী করার লক্ষে বিভিন্ন ভাবে শিক্ষার পসরা সাজিয়েছি। সরকারী,বেসরকারী,এনজিও,বিদেশী শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে শিশু থেকে উচ্চ স্তরের শিক্ষা বিস্তারে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী কাম্য শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছি না তরুন প্রজন্মকে। অভিভাবকরা নিজে না খেয়ে হলেও সন্তানকে রাখে বা রাখতে চেস্টা করে দুধে ভাতে। প্রতিদিন কপালে স্নেহের চুম্বন দিয়ে মা তাঁর সন্তানকে পাঠিয়ে দেন কচিং এ বা শিক্ষা প্রতিষ্টানে। কিন্তু সেই সন্তান যদি কাঙ্কিত গন্তব্যে না গিয়ে, এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়,যুক্ত হয় নেশা বা অপরাধ জগতেঅতঃপর নির্ধারিত সময়ে ফিরে যায় বাড়িতে। এ হেন অবস্থায় অভিভাবক কি করবে।তাঁরা তো ঘূর্ণাক্ষরেও এমনটি চিন্তা করেননি। এমন ক্ষেত্রে বলবো অভিভাবক সন্তানের কাছে অপ্রত্যাশিত ভাবেই অসহায়।
মোবাইল, ফেইজ বুক, নেশা সামগ্রী দারুন ভাবে ধংসের টিকে ঠেলে দিচ্ছে অমনযোগী শিক্ষার্থীদের। রঙিন চশমায় যা দেখে তাই তাদেরকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে।বিশেষ করে গাঁয়ের ছেলেরা দল বেঁধে ছুটে চলে ভ্রান্ত পথে অন্ধকারের অ
চলায়তনে। সবাই যে নষ্ট হয়ে যায় তা নয়।সেখানেও গোলাপের চাষ হয়। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আলোকিত করে সমাজের কানাগলি। তবে তুলনামুলক ভাবে তার শতকরা হার কম।
সত্তর – আশির দশকে আমরা যখন স্কুল – কলেজ- বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন শিক্ষক,শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিলো ভয়, ভীতি ও মধুর। ক্লাশ চলাকালিন সময়ে আমাদের চোখ থাকতো শিক্ষকের চোখে আবদ্ধ।ডানে, বামে বা পেছনে ঘাড় ঘুরানোর সাহস পেতাম না। তার ব্যতিক্রম হলে সংশ্লিস্ট শিক্ষার্থীর পিঠে পড়তো বেত বা ডাষ্টারের পিটুনী।পড়া না শিখলে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ব্যঞ্চের উপড়ে। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যেতো। শিক্ষকরা তাঁর প্রিয় শিক্ষার্থীর মাথায় রেখে হাত করতো আর্শিবাদ। সহনশীল, মানবিক,দক্ষ মানুষ হওয়ার নীতি শিক্ষা দিতেন।বাড়ি বাড়ি ঘুরে খোজঁ খবর নিতেন শিক্ষার্থী বাড়িতে পড়ে কি না।শিক্ষর্থীরা পা ছুঁয়ে শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতো। সেই দিন কোথায় হারালো। পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষার্থীর উপর থেকে  শারীরিক ও মানষিক শাস্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে । তাঁর ভালো মন্দ প্রভাব কি প্রতিফলন ঘটিয়েছে, তা আজকের প্রেক্ষাপট বলে দেয়।
আজকাল প্রায় ক্ষেত্রে ছেলেদের উত্তক্ত,ইভটিজিং এর জন্য মেয়েরা স্কুল কলেজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। অনেক মেয়ে বেছে নেয় আত্মহননের পথ। অভিভাবকরা মেয়েকে বাল্য বিয়ে দিয়ে হয় দায় মুক্ত ।শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্কে দারুন ছন্দ পতন ঘটে। কখনও শিক্ষক শিক্ষার্থীকে বা শিক্ষার্থী শিক্ষককে অপমান,অপদস্ত, লাঞ্জিত এমন কী হত্যার মত জগন্য কাজে লিপ্ত হয়। এমন জগন্য পরিবেশ শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান থাকুক তা কেউ প্রত্যাশা করে না। সুশিক্ষিত জাতি ঘটনে ও জাতীয় উন্নয়ে তা অন্তরায় সৃস্টি করে। গ্লোবাল ভিলেজের সদস্য হিসেবে কম্পিউটার বিপ্লবে টিকে থাকতে হলে তরুন প্রজন্মকে বুদ্ধিবৃত্তিক জাতিতে পরিনত করতে সুচিন্তিত, পরিকল্পিত সিন্ধান্ত গ্রহন করতে হবে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে রয়েছে এ দেশের ছাত্র সমাজের ত্যাগী,সাহসি,রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত ভুমিকা। ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে জীবন দিয়ে মায়ের ভাষার স্বীকৃতি আদায় করেছিলো।অমর একুশের গর্বময় ও রক্তক্ষয়ী সফলতা অর্জনে রয়েছে ছাত্র সমাজের ত্যাগ তিতিক্ষাময় অবদান। একাত্তরে স্বাধীনতা বিজয়ের স্বপ্ন বীজ রুপন করা হয়েছিলো একুশের জঠরে।লাল সবুজের বিজয় পতাকার স্বাধীনতা অর্জনের পটভুমি রচনায় রয়েছে ছাত্র সমাজের অহংকারের প্রতিদান।এখনকার প্রেক্ষাপটে সেই ছাত্ররাই যদি ব্যক্তি বা আদিপত্য বিস্তারের স্বার্থে সহপাঠিকে মেরে ফেলে, চার তলা থেকে ফেলে দিয়ে শরীরে হাড় গুড়া দেয়, তা হলে মাথায় রেখে হাত হায় আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
আমরা শিক্ষকরা শ্রেণি শিক্ষা দানে অসহায় বোধ করি। লেকচার শুনে শিক্ষার্থীরা পাঠ উদ্ধারের পরিবর্তে করে হৈ চৈ,ফিসফিস গুঞ্জন,মোবাইল চেটিং।সামনের ২/৩ টা বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের  কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পেছেনে বসা শিক্ষার্থীদের বশে আনা কষ্টকর। এ অবস্থায় কাম্য শিক্ষা কি ভাবে প্রত্যাশা করবেন। প্রাতিষ্টানিক শিক্ষার চেয়ে কোচিং শিক্ষা বেশী পছন্দ করে। অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীরা এ কোচিং থেকে ও কোচিংএ দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে সারা বছর।এ সমস্ত উপসর্গ শত চেষ্টা করেও বাদ দেয়া যাচ্ছে না।
পরিশেষে বলবো –এই সুন্দর সুফলা,সুজলা,সবুজ, শ্যামল, স্বাধীন সার্বভৌম আঠারো কোটি জনগণের, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশটি আগামী প্রজন্মের হাতে ওঠিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়াতে হবে আমাদেরকে।আমরা যা করছি সবটুকু নির্যাসই আগামী প্রজন্মের মঙ্গলার্থে।সামান্যতম হলেও তাদের জন্য আরো ভালো সমাজ ব্যবস্থা রেখে যেতে চাই।আসুন নব আঙ্গিকে সুস্থ্য,আকর্ষনীয় শিক্ষাব্যবস্থা সাজাই,তরুনপ্রজন্মের চোখে রঙিন পৃথির স্বপ্ন এঁকে দেই। শত ভাগ দক্ষ, শিক্ষিত জনশক্তি,সহনশীল,অসম্প্রদায়িক চেতনা,মানবীয় মুল্যবোধের সোনার মানুষ উপহার দেই জাতিকে। বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিনত দেশটিকে নিজস্ব শ্রম ঘাম ব্যয় করে উন্নত দেশের তালিকা ভুক্ত করি। পদ্মা সেতুর মত বৃহৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমরাই পারবো নিশ্চিত।
লেখকঃ অধ্যক্ষ ড. গোলসান আরা বেগম, উপদেস্টা মন্ডলির সদস্য,বাংলাদেশ কৃষকলীগ,কেন্দ্রীয় কমিটি।

Calendar

August 2022
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031