আজরাইলের ডানা

প্রকাশিত: ৬:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২১

আজরাইলের ডানা

-জেসমিন মুননী

আহন আহে না দুলাবাই। মনডা আমার কাইপা কাইপা চমকায়। বইন আমার টেরাই টেরাই চায়। রাইতের বেলায় পুকুর পাড়ে চান্দের ছায়া দাঁত ক্যালাইয়া হাসে। তেঁতুল গাছে দ্যাহি পেতনির ছাওর নাচন। বিরান মাঠের মধ্যে পিচাশের হাসি দেইখ্যা ডরাইয়া দেই দৌড়। দ্বিগবিদিগ দৌড়। দৌড়াইতে দৌড়াইতে বমি করি।
উচাটন মন আঁখির। শরীরে তার বিষ ফোঁড়া। তলপেটে হাত। সেখানটা ডিমওয়ালা মাছের মতো স্ফীত।
-জোছনা ডুইবা মরছে রাইতের ভিতর। বিলাই কাঁন্দে ঘরের চালে। হুতুম ডাকে হুম.. হুম..।
অসহায় আঁখি এক দৌড়ে পুকুর পাড়ের ঘাট পেড়িয়ে পশ্চিম দিকের ঘন জঙ্গলের পথ ধরে। নিদ্রাহীন গাছেরা চেয়ে থাকে তার দিকে। তারা সব জানে। সব কালের সাক্ষী। তারা আজ মুখ খুলতে চায়..
-বাপ-মা মরছে শিশুকালে। বড় বইন তাই মাও বাপও। আর দুলাবাই! দুলাবাই কি বাপ। আদর সোহাগ দিয়া বানাইছে ডাঙ্গর। গঞ্জ থেইক্কা আনছে লাল চুড়ি, নীল ফিতা। কানের কামরাঙা। নাকে সোনার মরিচ ফুল। আরো আনছে জব্বর জিনিস! পাখিড্রেস। তাই পিন্দাইয়া বইন আমার কয়-
‘লেংটা পুটুনি বিয়া বইবি নি
জামাই আইলে কাইন্দা দিবি নি।’
জামাইর কথা শুইনা আঁখি লজ্জ্বা পায়। কামনার ব্যাঙ লাফায় কুয়ার ভিতর। কুকুর ঘুরে কুকুরীর পিছে। মোরগের নিচে মুরগীর সমর্পণ দেখে দুই চোখ লুকায়। আহারে! সে রাতে কে যেন আঁখিকে কামড়ায়।
বমি শেষ করে আঁখি বসে। সর্বাঙ্গ তার ব্যাথা। তলপেটে নদীর কামট পাক খায়। বনের ঘুমন্ত পশুরাও তার চিৎকারে চোখ মেলে তাকায়। বাড়ির ন্যাড়ি কুকুরটা তার সঙ্গী।
-পূব পাড়ার কাইন্যাবুড়ি দিসে বড়ি। কইছে, সাত মাসের পোয়াতি হইলি ক্যামন কইরা। ঘুমাইয়া আছিলি মাগী!
ঔষুধ খেয়ে আঁখি কৈ মাছের মতো কানে হেঁেট গড়াগড়ি দেয়। দু’ই হাঁটু বুকের সঙ্গে চেপে মাটিতে নখ বসিয়ে দেয়। নিজের বাহুতে দাঁত বসায়। বেতের কাটা ঝোপের মধ্যে জালে আটকে পড়া মাছের মতো দাপায়। তড়পায়। তন্দ্রা চোখে দেখে, আসমান জমিন ভাইঙা আইতাছে আজব একখান ছাও। কপালে একখান চক্ষু। চাইরডা পাও। লম্বা একখান ল্যাজ। হ্যাপর দিয়া হেই ছ্রাওয়াল আমার পাইনে ছুইডা আসে। আমি ডরাইয়া উসটা খাই। তলপেটের ব্যাদনায় গাছের শিক্কর ধইরা হ্যাচকা টান দেই।
সমূলে উৎপাটিত হয় শিশুবৃক্ষ। অন্ধকার জঠরের গহীন গহ্বর থেকে শিশু বের হয়। জ্যোৎ¯œা-রক্তে মাটি ভেজে। শেকড় বাকরে পেচান আজব এক শিশু।
-আমি ড্যাবড্যাব কইরা শিশুরে দ্যাখি। হাত দিয়া হ্যাচকা টানে নাড়ি ছিড়ি। যন্ত্রনা মাটিত মিইশ্যা গ্যালে আবেশে চোখ বুজি। আহ! যন্ত্রনা সুখ- সুখ যন্ত্রনা।.. যেই পথ ধইরা আইল ছাও হেই পথে যন্ত্রণা দিছিল ক্যাডায়! শইল্য হাতাইছিল কেডা? কে দিছিল হেই রাইতে কামড়! আমার ডেগা শইল্যের অজাগায়- বেজাগায় লড়ছিল কার হাত? কামড় বসাইছিল ক্যাডায়! অপুষ্ট স্তন্যে সুখ সুখ যন্ত্রণা দিসিল কেডা! ডরাইয়া-চমকাইয়া চুপ মাইরা সহ্য করি আমি।
এমন সময় শিশু কেমন মোচর দেয়। সব ভুলে আঁখি চমকায়। শিশু হাত পা ছুঁড়ে তার অস্তিত্ব জানান দেয়। ওয়া.. ওয়া.. করে কান্নার ধ্বনি তোলে। অবাক বিষ্ময়ে আঁখি মুখ ঝুলিয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে। বাস্তবতা ও বর্তমান অবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে ভাবে, এটা কি তার সন্তান!’ আঁখির কথাগুলো গভীর বনের ভেতর ক্রমশ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কালের সাক্ষী গাছগুলো যেন পাতা নেড়ে সমর্থন জানায়।
– ভাবি,স্বপ্নন নাতো! চিমডি কাডি শইল্লে। নাহ! স্বপ্নন না। এই ছাওয়ালডা স্বপ্ননেডার লাহান না। কি সোন্দর! আকাশ থন চান্দডা টুপ কইরা মাডিত পরছে। আমি চান্দডারে মাডি থেইক্কা তুইলা কোলে নেই। চান্দডা য্যান কার লাহন!
শিশুর মুখের মতো জ্যোৎ¯œা নামে বনের গভীরে। মাতৃ অনুভূতিতে চিৎকার দেয় আঁখি, হাছাই কি এইডা আমার ছাওয়াল। ও চান্দ, ও ছাইতান গাছ, ও তেঁতুল গাছের পেতœী, ও বিলাই, ও হুতুম প্যাচা, ও ন্যাড়ি কুত্তা এই দ্যাখ, এইডা আমার ছাওয়াল। এইডা আমার ছাওয়াল!
অশ্রু সজল চোখে আঁখির সেই আনন্দের চিৎকারে সুর মিলায় বনের শিয়াল। হুয়াক্কা হু.. হুয়াক্কা হু..। আঁখির বুক কাঁপে। শরীর কাঁপে। শিশুকে কোলের আড়াল করে। বুকের ভিতর বান নামে। দুধের ভারে স্তন্য টন টন করে। শিশু ঠোঁট চুক্কুর চুক্কুর করে। জঠর থেকে বেড়িয়ে শিশু এই প্রথম ক্ষুধা অনুভব করে।
– দ্যাখি, বনের বেবাক গাছ য্যান ছাওয়াল হইয়া যায়। চুক্কুর চুক্কুর করে। ঠোট ফাক কইরা হা করে। তারপর আমি বান খুলি।
জৈষ্ঠ্যের ধরীত্রী যেন প্রাণ ভরে তার তৃষ্ণা নিবারণ করে। আঁখি প্রশান্তিতে চোখ বন্ধ করে।
-আচমকা মাডির দিক চাইয়া দ্যাখি কিসের য্যান ছায়া। জোছনার আলোয় ছায়া য্যান গাছের চাইতে লম্বা। ইয়া লম্বা পাও। লম্বা লম্বা হাত। আজরাইলের ছায়া কি ডানা মেইলা আসমান থেইক্কা নাইমা আইছে? আমার বুকের ধরপরানি বাইরা যায়। মনে মনে আল্লাহ খোদার নাম লই। ছোড বেলার কথা মনে পরে। আপায় কইছিল, মার মরনের আগের রাইতে আজরাইল ডানা মেইলা মাডিত নাইমা আইছিল। হেই রাইতেও জোছনা আছিল। আপায় নিজের চোক্ষে দেখছিল মা ডানায় ভর কইরা আসমানে উইড়া গেল। আইজকা কি আজরাইল আমারে নিয়া যাইব! আমি ভয়ে ছাওয়ালরে বুকের ভিতর চাইপ্পা ধরি।
ঠিক তখন ছায়ামুর্তি শিশু ফেলে আঁখির চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টান দেয়। বলে, হারামজাদি দুধ কলা দিয়া হাপ পালছি। অহন আমারে কামড়াইবার চাস!
মুহুর্তে আঁখির কাছে সব স্পষ্ট হয়। সেই রাতের ঘটনা।
-হেই রাতে কে আমারে কামড়াই ছিল! হেই রাইতে আপায় গেছিল ওয়াজ মাহফিলে সোয়াব কামানের লাইগা। আর দুলাবাই..
-উঠ হারামজাদি। এতো সাহস তুই কই পাইলি!
খোদার কসম লাগে, আমারে মাইরা ফালাও। ছাওয়াল মাইর না।
-কাকা-পক্ষী কেউ জানব না। এই ল নুন মুখে পুইরা দে।
আঁখি সন্তান বুকে নিয়ে দৌড় দেয়। উসটা খায়। আবার দৌড়ায়। বনের গাছেরা সব কালের সাক্ষী। জ্যো¯œা ডুবে মরে রাতের ভেতর। আজরাইলের কান্না যেন শিয়ালের মতো। হুয়াক্কা হু…।
৪.
পরদিন সকালে দুলাভাই পুকুর পাড়ে অজু করতে গিয়ে দেখে তার পুত্রের ধরহীন মাথা।
আমি তহন মধ্য উডানে গায়ের বসন খুইল্যা গান গাই-
‘লেংটা পুটুনি বিয়া বইবি নি
জামাই আইলে কাইন্দা দিবি নি।’

ছড়িয়ে দিন