আজ তোমার জন্মদিন

প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

আজ তোমার জন্মদিন

আব্দুল্লাহ আল ইমরান

আজ তোমার জন্মদিন।
এমন এক অস্থির সময়ে এবারের জন্মদিন এলো যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে আমি গৃহবন্দী। আর তুমি অসহনীয় এইসব দিনরাত্রি অবসানের প্রার্থনায় নিমজ্জিত।

দিনভর তাই জন্মদিন ঘিরে আমাদের পুরনো স্মৃতিগুলোই মনে পড়েছে ঘুরে ফিরে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তোমার সঙ্গে পরিচয়, সেই পরিচয় থেকে প্রণয়, স্বল্প সময়ে প্রণয় পরিণত হলো পরিণয়ে। ইতোমধ্যে যৌথজীবনের অনেকগুলো বছরও কেটে গেছে।

একবার জন্মদিনের ভোর হয় হয় রাতে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের সামনে ফুল দিয়ে তোমার নাম লিখেছিলাম। সকাল সকাল তোমাকে চমকে দিতে গিয়ে দেখি কিচ্ছু নেই। ঝেড়ে-মুছে সাফ করে ফেলেছ হলের খালারা। কি মন খারাপটাই না হয়েছিল আমার! এখন ভেবে অবাক হই, এসব পাগলামিও করেছি এক সময়!

একবার তোমার জন্মদিন ভুলে গেলাম।
কতোক্ষণ হবে? মাত্র ত্রিশ মিনিট! এগারোটা পঞ্চাশ পর্যন্ত আমার মনে ছিল। তারপর হলের আড্ডাবাজিতে জড়িয়ে ঠিক বারোটায় তোমাকে আর শুভেচ্ছা জানানো হলো না। কল করতে করতে বারোটা বিশে। এই কয়েক মিনিটের ব্যর্থতা আমার জীবনটা তছনছ করে দিল। সারাটা দিন কি দুর্বিষহ কেটেছে আমার!
তোমাকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছিলাম না। কিভাবে করবো? তুমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলে না, আমি তোমার জন্মদিন ভুলে যেতে পারি!

একবার জন্মদিনের প্রথম প্রহরে তোমাকে কল দিয়ে বললাম, আকাশের দিকে তাকাও। তুমি বললে, কি সেখানে। আমি বললাম, একটা চাঁদ পাঠিয়েছি। তুমি হেসেই খুন। হাসতে হাসতেই বললে, কবি-লেখকদের আর কিছু থাকুক না থাকুক, কথা দিয়ে মুগ্ধ করার ক্ষমতা আছে!
আমি বললাম, তাহলে আরও একটু মুগ্ধ করি। জলদি হলের সিড়ির মধ্যবর্তী ল্যান্ডিংয়ের জানালাটার কাছে আসো।
তুমি বললে, কেন?
আমি বললাম, এতোক্ষণ তো প্রকৃতির চাঁদ দেখেছো, এবার না হয় তোমার চাঁদটাকে দেখো!
তুমি চমকে উঠে বললে, মানে কি?
তারপর দৌঁড়ে এসে দাঁড়ালে ভেন্টিলেটরের ফোকড়গুলোর সামনে। আবছা অন্ধকারে তোমাকে দেখা না গেলেও ল্যাম্পপোস্টের উজ্জ্বল হলদে আলোয় তুমি ঠিকই আমাকে দেখতে পেলে। আমি সন্ধ্যায় কেনা ক্যাকটাস হাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলাম তোমার হলের সামনে নীরব রাস্তাটায়, যাতে তুমি আমায় আরও কিছুক্ষণ দেখতে পাও।
এরপর থেকে তোমাকে হুটহাট মধ্যরাতে দেখতে ইচ্ছে হলেই ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে গিয়ে দাঁড়াতাম আমি। তোমাকেও ডেকে আনতাম সিড়ির ল্যান্ডিংয়ে। আহারে! কখনও ছায়া, কখনও মোবাইলের আলোয় এক-আধটা চোখ দেখার সেইসব বুক ধুকপুক দিন!

বিয়ের পর প্রতিটা জন্মদিনের প্রথম প্রহরেই তোমার কপালে শুভ কামনার স্পর্শ এঁকে দিতে পেরেছি। ঘুচেছে কাছাকাছি থাকতে না পারার বেদনা। কখনও দুজন দূরে কোথাও ঘুরতে গেছি, কখনও আবার অফিস শেষে নিজেদের একান্ত কিছু সময় কাটিয়েছি কোনো রেস্তোরায়, নয়তো আশপাশের প্রিয় কোনো স্থানে বসে থেকে।

এবারই এর কিছুই হলো না।
প্রথম প্রহরটা একসঙ্গে ছিলাম ঠিকই, তবু যেন কতো দূরে। আর জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে কোথাও যাওয়া হলো না আমাদের।
অনলাইনে একটা কেক এনেছিলাম। কিন্তু তাতে শুভেচ্ছা বার্তা লেখা নেই। বহু কসরত করে কেকের উপর তোমার নাম লিখেছি। এক বড় ভাইকে দিয়ে আনিয়েছি একতোড়া ফুল। ফেসবুকে পাঠানো ছবি দেখে দেখে মেরুন রঙের একটা শাড়িও কিনেছি।
তবু তোমার জন্মদিনের আনন্দটা কি ফিরিয়ে আনা গেল?
প্রিয়মানুষ করোনায় জর্জরিত থাকলে, মাসভর গৃহবন্দী জীবন কাটালে, জন্মদিনের আনন্দ উপভোগের কি আসলে সুযোগ থাকে?

গতকাল রাতে তোমার মুখ ভার।
আমি যেহেতু এখনও পজেটিভ তোমাকে তাই খুব একটা কাছে আসতে দেই না। তবু মাথায় হাত রেখে বললাম, শোনো মেয়ে, আমরা একসঙ্গে আছি, বেঁচে আছি, এরচেয়ে বড় জন্মদিনের উপহার আর কি হতে পারে, বলো?

তুমি মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলে। আমি ঠিকই বুঝলাম, তোমার চোখ ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে।

দেখো, আমাদের আবার আনন্দময় দিন হবে।
জন্মদিনের স্মৃতি তৈরির সুযোগ হবে। জীবন ফের সুযোগ করে দেবে অজস্র সুখ কুড়াবার। কেননা হেলাল হাফিজ বলেছেন,
‘…এই দিন সব নয়– শেষ নয়
আরো দিন আছে,
ততো বেশি দূরে নয়
বারান্দার মতো ঠিক দরোজার কাছে…।’

একটা মানুষ কত উপায়ে যে আরেকটা মানুষকে নির্ভরশীল করে তুলতে পারে, তা আমার কোনোদিনই জানা হয়ে উঠতো না, যদি না তোমার সঙ্গে পরিচয় হতো।
প্রায়ই তুমি বলো, একটা পুরো সংসার সামলানোর পাশাপাশি অগোছালো একটা বাচ্চাকেও তোমার সামলাতে হয়, রাখতে হয় চোখে চোখে!
জন্মদিনের এই ক্ষণে আমার চাওয়া, অনাগত দিনেও আমাকে সামলানোর এই চোখাচোখি তোমার চলতে থাকুক। আর আমি প্রতিদিন একটু একটু করে তোমাতে মুগ্ধ হতে থাকি।

এক পৌষের সন্ধ্যায় তোমাকে প্রথম দেখে আমার হৃদয়ে যে ধাক্কাটুকু লেগেছিল, এখনও সে ধাক্কা আমি টের পাই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে, তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালে আমার বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে, মনে হয় নিত্য সংগ্রামের ক্লান্তিকর টানাটানির মধ্যেও এই বেঁচে থাকা নেহাত মন্দ নয়!

চিরকাল এমনই থেকো,
এভাবেই প্রতিনিয়ত হৃদয়ে ধাক্কা দিয়ে স্বাভাবিক রেখো আমার নি:শ্বাসের গতি!

শুভ জন্মদিন বউ।

ছড়িয়ে দিন