আন্ধারমানিক: হরিরামপুরের হরষিত মন

প্রকাশিত: ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২২

আন্ধারমানিক: হরিরামপুরের হরষিত মন

মোস্তফা মোহাম্মদ
আন্ধারমানিক নাম শুনেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। নামজানা দুটি বিশেষ আকর্ষণ-গুণসম্পন্ন স্থাননামচিত্র ভেসে উঠলো আমার দৃষ্টিতে; একটি দেখা, আরেকটা পঠিত জ্ঞান থেকে আহরিত।

বরিশাল এলাকার আন্ধারমানিক নদীর কথা আমি জানি, দেখেছি অনেকবার; যাত্রাপথে, নৌকায়, মনে ভেসে ভেসে। আর বান্দরবানের থানচি এলাকার দুর্গম-নিষিদ্ধ-মায়ানমার সীমান্তসংলগ্ন আন্ধারমানিক দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তবে গতকাল হাতের কাছেই মুক্তার ছোঁয়া, ‘হাত বাড়ালেই মুঠি ভরে যায় প্রেমে’র মতো আন্ধারমানিকের দেখা পেলাম–মানিকগঞ্জ জেলার সর্বদক্ষিণের উপজেলা পদ্মাবিধৌত হরিরামপুর উপজেলার লুকানো সৌন্দর্য আন্ধারমানিকের দেখা পেয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম।
আমার স্নেহধন্য কাফির প্রিন্ট প্যালেস-এর চিফ ডিজাইনার রজ্জব আলীর বৌভাত, ১৩ জুলাই দুপুর ১: ৩০টায়। কথা দিয়েছিলাম আমি যাবো। সেই ১৯৯৮ সালে নৌকায় ভেসে মানিকগঞ্জ থেকে হরিরামপুর উপজেলা কমপ্লেক্সের অফিসার্স কোয়ার্টারে অধ্যাপক ড. আফসার আহমদ’র ছোটভাই বন্ধুবর মান্নান-এর বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম। উপভোগ্য ছিল অনুষ্ঠান, উপরন্তু বর্ষাকাল। ১৯৯৮-এর সর্বপ্লাবী বন্যাখ্যাত সময়ে বরযাত্রী ছিলাম আমরা। মানিকগঞ্জ শহরে ছিল বরজমায়েত; আফসার স্যারের বড়ভাই, হাই-স্কুল প্রধান শিক্ষক আব্দুস সামাদ; যিনি দেশালখ্যাত ফ্যাশন-ডিজাইনার কনক-এর বাবা, তাঁর বাড়ি। কনকের বড়ভাই আমিন, বড়বোন বিনু প্রমুখের আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ। তাদের বন্ধুপ্রতিম ছোটচাচার বিয়ে বলে কথা।
দুপুরে কনকদের বাড়িতে পদ্মার প্রমাণ সাইজের তাজা-ইলিশের মুখমাখাঝোল, মুরগির মাংস, খাশির মাংসের অপূর্ব রান্নায় তৃপ্ত হয়ে শহরের সেঁওতার বাসা থেকে সেঁওতাখাল বেয়ে দুইটি বড়-নৌকাভর্তি বরযাত্রী হরিরামপুরের উদ্দেশে যাত্রা করি। খাল থেকে কালীগঙ্গা নদী, নদী থেকে মাঠ, মাঠ থেকে গ্রামগঞ্জঘরবাড়ি সব সয়লাব বানের জলে; ভেসে গেছে হরিরামপুর উপজেলা চত্তর।
‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’। নৌকা গিয়ে থামলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিয়েবাড়ির ডুবন্ত নিচতলায়। আমরা পানিবেয়ে-সিঁড়িবেয়ে দোতলায় উঠে যাই। বিয়ের আচারাদির শেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় বৌভাতের খাবার খেয়ে রাত আটটায় মানিকগঞ্জের দিকে ফিরতে শুরু করি। বর্ষাকাল, বন্যাপ্লাবিত হরিরামপুর, কর্দমাক্ত মাঠঘাটপ্রান্তর। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে জোনাকির আলোয়, শিয়ালের ডাকে শিহরিত প্রাণে আমরা অসংখ্য ব্রিজের নিচ দিয়ে খুব সাবধানতায় মানিকগঞ্জ ফিরে এলাম রাত ১১টায়। একটা ব্রিজের নিচ দিয়ে স্রোতের বিপরীতে পার হতে গিয়ে পিলারের ধাক্কায় অল্পের জন্য ডুবতে-ডুবতে ভাসতে-ভাসতে প্রাণে বেঁচে গেলাম। অধ্যাপক আহমদ আর আমি পাশাপাশি। ব্রিজের পিলারের সাথে ধাক্কা খাওয়ার পর স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, সেই রাতেই হয়তোবা ডুবে যেতাম, সলিলসমাধি ঘটতো গুরু-শিষ্যের। আজও স্যারের উষ্ণভালোবাসা টের পাই। গতবছর–২০২১ সালের ৯ অক্টোবর সিভিয়ার হার্ট-অ্যাটাকে যশোর থেকে ঢাকা এয়ারপোর্টে নেমেই মৃত্যুবরণ করেন অধ্যাপক আহমদ। এম্বুলেন্সের চাদরে ঢাকা হিমায়িত কফিনের সামনে নির্বাক দাঁড়ালাম, মানিকগঞ্জের জামশা গ্রামে তাঁর দাদাপীরের উঠানে, বাবা সৈয়দ আলী মাস্টারের কবরের পাশে তাকে শোয়ানো হলো। তখন আরেকবার টের পেলাম সলিলসমাধির হিমায়িত-উষ্ণতার রেশ। আর আজ হেমায়েতপুর হয়ে সিঙ্গাইর পার হয়ে হরিরামপুরের দিকে যাচ্ছি তখন মনে পড়ে যায় কতবার আমি জয়মণ্টপ পার হয়ে বামদিকে মোড় নিয়ে জামশা গ্রামে গিয়েছি; কবি, গীতিকার, নাট্যকার, লেখক,গবেষক আফসার আহমদের পিতৃভিটায়। কিছুটা স্মৃতির পাখায় ভর দিয়ে আমরা যাচ্ছি হরিরামপুর রজ্জবের বিয়ে খেতে, সাথে আমার স্ত্রীলক্ষ্মী হোসনে আরা বেবী ও আমার কন্যা অরণি। গাড়ি চলছে ছায়াঘেরা সবুজশ্যামলস্নিগ্ধ ঢাকা-মানিকগঞ্জের পথে, সিঙ্গাইর হয়ে হরিরামপুরের নিশানায়। পথিমধ্যে গ্রামীণ শোভনতায় ছাওয়া চায়ের দোকানে দুধ-চায়ে তৃপ্ত হলাম। কিছুক্ষণ খোলা দোকানের পুবের আকাশে নীল আর সাদামেঘের ভেলায় সবুজে হারালাম নিজেকে। আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা।
বেতিলা থেকে বামে মোড় নিয়ে আমরা এগুতে থাকি হরিরামপুরের দিকে। আর ভাবি ‘কত অজানারে’ কিংবা ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’। আমাদের গাড়ি হরিরামপুরের দিকে ছুটে যায় সবুজের বুকচিড়ে, আকাশের নীল গায়েমেখে, ঝকঝকে রোদের সোনায় মুখরিত দুপুরের উজ্জ্বলতায় ভর দিয়ে। সদ্যনির্মিত কালীগঙ্গা সেতু পার হয়ে বামে মোড় নিয়ে সামনে এগিয়েই ডানে মোড় নিয়ে দক্ষিণ চাঁদপুরের বিয়ে বাড়িতে পৌঁছে যাই। রজ্জব আমাদেরকে সাদরে খাবার টেবিলে নিয়ে যায়। জুলাইয়ের কাঠফাটা রোদে উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিগণ ঘামছেন। গ্রামীণ পরিবেশে উন্নত খাবার পরিবেশনে আমরা মুগ্ধ। সাদাপোলাও, মুরগির রোস্ট, গরুর মাংসের ভুনা, সালাদ, ঘরে বানানো দই সহযোগে পরিতৃপ্ত হয়ে নববধূকে আশীর্বাদ করে আমরা দ্রুত রওনা দেই আন্ধারমানিকের দিকে। এক থেকে দেড় কিলোমিটার গিয়েই আমরা পেয়ে যাই কাঙ্ক্ষিত আন্ধারমানিক স্পট।
তখন ঘড়িতে দুপুর তিনটা। প্রমত্ত পদ্মা। ঘাটেবাঁধা অসংখ্য ছোটবড় নৌকা। পাশেই ভাসমান রেস্তোরাঁ। ‘পদ্মার ঢেউরে মোর শূন্য হৃদয়ে পদ্ম দিয়ে যা, যারে’ অমর গানের কলি বেরিয়ে আসে অন্তর থেকে। বেবি, অরণি নৌকায় উঠবে-তো-উঠবেই, আমি ভয় পেয়ে যাই। একে তো উত্তরাঞ্চলের মানুষ আমি; জলেই আমার যত ভয়। কী আর করা, ‘তোর জলেই নেমেছি কুমির’ জপতে জপতে বড় একটা ট্রলার ভাড়া করে উঠে পড়ি আমরা। আরো দুই পরিবারের জনাদশেক সদস্য মিলিয়ে মাঝিসহ আমরা ১৭ জন প্রমত্ত পদ্মার বুকে ভেসে চলি।
জুলাইয়ের ১৩ তারিখ, রৌদ্রকরোজ্জ্বল-নীলাভ আকাশ। মাঝে মাঝে সাদামেঘের ভেলা, পদ্মার বুকের দুরন্ত-দস্যি হাওয়ার সাথে মিলিয়ে দূরের কাশবন হাতছানি দিয়ে ভাবালুতার জগতে নিয়ে যায়। বেবি ও অরণি যাবে ঐ চরে, আমি ভয় পেয়ে যাই। কী আর করা, নসিবে যা আছে তাই হবে। আধাঘণ্টায় আমরা অজানা-অচেনা এক দুর্গম চরে সকলে নেমে পড়ি। আমাদের সাথী আইয়ুব নামের একজনের কাছে জানলাম এটি বয়ড়ার চর। এই চরেই তার পূর্বপুরুষের বসবাস ছিলো। পদ্মার করালগ্রাসে ঘরবাড়ি হারিয়ে ৪০ বছর হয় তারা বসবাস করছে গাজীপুরের ভাওয়াল এলাকায়। আর তাড়ায় কে? একেবারে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্থান; বন্যামুক্ত, নিরাপদ, কিন্তু প্রাণহীন। ওখানে নেই পদ্মার পদ্মিনী রুপ, নাই গর্জন, নাই সংগাম। নাই কুবের, নাই কপিলা, নাই মালা, নাই হোসেন মিয়াদের মধ্যস্বত্বভোগী কালাকানুন। নাই মুক্তবায়ু; আছে রুদ্ধদ্বার–জীবনের আরেক সংগ্রাম। পদ্মাপাড়ের মানুষের মতো সুঠামদেহী কুবের-কপিলা-মালারা আজ পেটের টানে গ্রাম ছেড়ে বস্ত্রবালা সেজেছে। নাই জয়নুল-সুলতানের স্বপ্নের পেশীশক্তিসম্পন্ন অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো পদ্মিনী নারী, বীর্যবান পুরুষ। আছে কর্পোরেট কালচারের স্থূলকায় প্রাণহীন মানুষ। তবুও মানুষ বাঁচতে চায়! আইয়ুব বয়ড়ার চরের মাটি স্পর্শ করার জন্য কোরবানির ঈদের ছুটিতে হরিরামপুরে এসেছে আত্মীয়ের বাড়ি; এরই ফাঁকে পদ্মা পাড়ি দিয়ে দেখে নিলো বাপ-দাদার নিশ্চিহ্ন ভিটেমাটির অবশেষ, কাশবান।
এখন ভরবর্ষা, উত্তাল পদ্মা। মাঝি জানালো শীতকালে বয়ড়ার চর ভরে ওঠে সবুজের সমারোহে আর হলুদ সরষে ক্ষেতের মনোহারিণী রুপে। কী-শীত কী-বরষায় এই আন্ধারমানিক দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। আন্ধারমানিক ট্যুরিস্ট স্পটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভাসমান রেস্তোরাঁ, নানাবিধ খাবারের দোকান। পদ্মার তাজা-ইলিশের স্বাদসহ অন্যান্য মাছের ঝোলে ও ঝালে পরিতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ আছে। ঈদের খাবারে পর এবং আজকের বিয়েবাড়ির খাবারের পর এই তাজা মাছের স্বাদ থেকে বিরত থাকতেই বাধ্য হলাম। চা, কফি, ফুসকা, ডাবের পানি, পিসফল (কাঠলিচু) খেয়ে, তাজা সবজি কিনে ব্যাংকটাউনের দিকে যাত্রা করি সন্ধ্যা ৬টায়। ফিরে আসি, নেমে পড়ি, কিছু কিনি মজা পাই। আমরা এসে দাঁড়িয়ে পড়ি কালীগঙ্গা সেতুর উপর। অসংখ্য মানুষ সেতুর উপরে ও নিচে, এপ্রোচ রোডে উন্মুক্ত আকাশের নীলে, গাছের ছায়ায় আনন্দ-উল্লাসে মত্ত। অনেকেই দলে দলে নৌকায় করে ভেসে যায়, চক্কর খায়। নাচে-গানে ভরপুর ধলেশ্বরীর বুক। তবে খেয়াল করে দেখলাম প্রতিটি নৌকায় বেজে চলেছে গানবিহীন গগনবিদারী গুগগুগগুগ অভাবিত শব্দ। কান-নাক-মুখ-বুক কোনোকিছুর জন্যই ভালো নয়, ক্ষতিকর। মিনিট বিশেক দাঁড়িয়ে অসহনীয় শব্দদূষণ ও নিয়ন্ত্রণহীন অসাংস্কৃতিক চেতনায় বেড়েওঠা যুবসমাজের দশা দেখে বিচলিত হয়ে গাড়িতে উঠে বসি। মনে পড়ে কবিতার অমর বাণী, ‘ধলেশ্বরী নদীতীরে পিসিদের গ্রাম, তার দেওরের মেয়ে, অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিলো ঠিকঠাক,..বহি চলে ধলেশ্বরী তীরে তমালের ঘনছায়া, আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা করে, তার পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিৃঁদুর’।
আমার ধারণা, যদি উপজেলা-জেলাপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা আন্ধারমানিকের দিকে সুদৃষ্টি প্রদর্শন করেন; যদি সরকারের পর্যটন বিভাগ ইকো-ট্যুরিজমের প্রয়াসে জনমানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন, যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ও নিরাপত্তাবিধানকল্পে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন তবে এই আন্ধারমানিক ঢাকার খুব কাছের একটা দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় মানুষদের অর্থ উপার্জনের দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার পাশাপাশি দর্শানার্থীদের তাজা-ইলিশের স্বাদ গ্রহণসহ হাওয়াবদল ও মনবদলের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে অনায়াসে।