আপসহীনেরা নির্যাতিত , নির্বাসিত এবং মৃত

প্রকাশিত: ২:২৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০১৮

আপসহীনেরা  নির্যাতিত , নির্বাসিত এবং মৃত

অনন্য আজাদ

সবাই যে আমির খানের মতো সমাজের বাস্তব ভুলত্রুটি, দুর্নীতি, ভ্রূণহত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা ইত্যাদির পরিসংখ্যান এবং মানুষের পাষণ্ডতা সকলের সামনে তুলে ধরতে পারবে এমন কোন কথা নেই। সবার পক্ষে দীপিকা পাডুকোন বা সুস্মিতা সেন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো ব্রেস্ট ফিডিং, ক্লিভেজ, পিরিয়ড, সিঙ্গেল মাদার, সন্তান দত্তক নেওয়া, সেক্স ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করাও সম্ভব নয়। কেউ কেউ শাইনি আহুজার মতো ধর্ষক হবে বা শক্তি কাপুরের মতো লম্পট হবে বা তাপস পালের মতো ধর্ষণের হুমকিদাতা হবে এটাই স্বাভাবিক। আমির খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, সুস্মিতা সেন হওয়ার জন্য যেই আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তার এবং সাহসিকতার প্রয়োজন হয় তা সকলের মধ্যে থাকা সম্ভব নয়। কেউ কেউ মমতা হবে, মোদী হবে, লক্ষণ শেঠ হবে। তেমনই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কেউ কেউ আল্লামা শফী, হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ, মাহী বি চৌধুরী, গোলাম মাওলা রনি, আন্দালিব রহমান পার্থ, শাফিন আহমেদ হবে, বাল ভট্টাচার্য হবে এটাও স্বাভাবিক।

বাঙলাদেশের জন্ম যেভাবে হয়েছিলো সেটা পুরো পৃথিবীর জন্যই একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারতো। কিন্তু বাঙালি জাতি সেই মর্যাদা নিজ হাতে গলা টিপে মেরেছে। বাঙালি এমন এক জাতি, যে জাতির মানুষ ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে জানে না! বাঙালি যতোটা না বাঙালি, তার থেকেও মুসলমান এবং অধিকাংশ সময়ই মনুষ্যত্বহীন। ধর্মের ভাইরাস প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কে এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে তারা এখন আর সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতেও বিভক্ত।

বর্তমানে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি বিরাজমান তাতে সকলকেই মুসলমান হতে হবে। মুসলমান ব্যতীত কেউ নিরাপদে থাকতে পারবে না। কিছুদিন আগে লেখক জাফর ইকবালকে মৌলবাদীর আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিলো। সুস্থ হয়ে তিনি একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন, ‘আমি ভীত নই’। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি এতোটাই ভীত এবং সংকোচিত হয়েছেন যে তিনি একাধিকবার নিজেকে বিশ্বাসী প্রমাণে কলাম ও বক্তব্য রেখেছেন।

সম্প্রতি অভিনেতা মোশাররফ করিম একটি অনুষ্ঠানে ধর্ষণে পোশাক দায়ী নয় উল্লেখ করার পর তাকে নাস্তিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা চেয়েছেন। তিনি পরিস্থিতি ও বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই সম্ভবত ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি একজন মুসলমান এবং খুব ভালো করেই জানেন যে পুরুষতন্ত্র তথা ধর্মপ্রাণ মুসলিমের অযৌক্তিক বিশ্বাসের উপরও যে বিন্দুমাত্র বাক্য ব্যয় করবে তার পরিণাম জবাই করে মৃত্যু। যে সমাজে আইনের শাসন এখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নি, সে-সমাজে ধর্মের ব্যবহার প্রকট। এবং এই ধর্ম গোটা দেশকে ডোবাতে যথেষ্ট। কেউই দ্রুত মৃত্যু চায় না এবং কেউই অস্বাভাবিক মৃত্যু কল্পনা করে না। জাফর ইকবাল বা মোশাররফ করিম বাঙলাদেশের অন্যান্য মুসলমানদের মতোই। অর্থাৎ বাঙলাদেশের মানুষ যতো বড় বড় কথাই বলুক না কেন, বিপদ সন্নিকটে এলে বা পূর্বাভাস পেলেই আবহাওয়ার মতোই দৌড়ে পালায়।

সবার পক্ষে আহমদ শরীফের মতো জ্ঞানী, নীতিবান হওয়া সম্ভব নয়। সবাই যে জাহানারা ইমামের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হতে পারবে এমনও নয়। সকলের পক্ষে হুমায়ুন আজাদের মতো আপোষহীন হওয়াও সম্ভব নয়। কিংবা আহমদ ছফা মতও হওয়া সম্ভব নয়। কেউ কেউ শামসুর রাহমান হবে, মুনতাসীর মামুন হবে, শাহরিয়ার কবির হবে, জাফর ইকবাল হবে, মোশাররফ করিম হবে এটাও স্বাভাবিক।

সবার পক্ষে নিজের বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। কেউ কেউ সত্য বা সঠিক বলার পরেও ক্ষমাপ্রার্থনা চাইবে, কেউ কেউ নিজেকে আবার নতুন করে প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। এ-ভূখণ্ডে আজ মেরুদণ্ডহীন ও ভীরু মানুষেরাই বিখ্যাত এবং আপসহীনেরা  নির্যাতিত , নির্বাসিত এবং মৃত।

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031