আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও তাঁর বন্ধ দরজায় ধাক্কা

প্রকাশিত: ৩:৪২ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০২১

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও তাঁর বন্ধ দরজায় ধাক্কা

সালেহা চৌধুরী
আলোর সওদাগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে সকলেই জানে। যিনি আলোকিত মানুষের সন্ধানে। যিনি আলোর স্কুলের প্রধান। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নানাবিধ ঘটনার পুরোধা। বাইবেলের সেই অমর বাণীর মতই তিনি বলেন Ñ ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। আলো! কি চমৎকার দুই অক্ষরের শব্দ। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন Ñ নিরেট কমলহীরে শিক্ষা আর তার কালচার হলো আলো । ঠিক তেমনি আলোর যাত্রী তিনি।
আবুদুল্লাহ আবু সায়ীদকে প্রথম দেখি বাংলা বিভাগের নবীন বরণ উৎসবে। আমরা নবীন আর ওরা সব প্রবীন ব্যাপার এমন নয়, কিন্তু ওরা চলে যাবেন আর আমরা চার বছর থাকব ঘটনা এই। সেইদিন ছিল তাঁদের বিদায় পর্ব অনুষ্ঠান। আমি বিস্ময়ভরা চোখে ওদের দিকে তাকিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল ওঁরা সব ত্রিকালদর্শী আর আমরা একেবারেই নবীন, আনকোড়া। আমি যখন নবীনদের পক্ষ থেকে কথা বলবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে নার্ভাস হয়ে কথা ভুলে বিদিকিচ্ছি কান্ড করেছি ওঁরা তখন সেই আসরেই কি মজা করে জমিয়ে গল্প করছিলেন। তবে আমার নার্ভাসনেসে ওঁরা হাসেননি। ওঁদের কথা বলবার ভঙ্গি ছিল নদীর মত অনায়াস। মনে মনে ভাবছিলাম চারবছর পড়া শেষ হলে আমরাও এমন করে কথা বলতে শিখব। কিন্তু সে ধারণা একেবারে ভুল। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মত কথা বলা আমার কেন অনেকের পক্ষেই সম্ভব হবে না। যেমন প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর মত বক্তৃতা কতজন দিতে পারবে? এমন চমৎকার কৌতুকে হেসে হেসে কথা বলা? সেটা সকলে পারবেন কি? কথা বলবার এই ভঙ্গিটি পশ্চিমের। পশ্চিমে কেউ মারা গেলেও তাঁর স্মরণসভায় ওরাএই ভাবে কথা বলে। আর এই ভাবে কথা বলা একপ্রকার আর্ট বলেই আমার বিশ্বাস। সেদিন তিনি চমৎকার করে একটি বোতামের গল্প করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গেলেও তাঁর স্মৃতি কেমন করে আজীবন বহন করবেন। একটি লোক আর একজন লোকের সার্টের বোতাম ধরে গল্প করছিল। গল্পকার থামছে না। শেষপর্যন্ত লোকটি উপায় না দেখে কেচি দিয়ে বোতাম থেকে সার্ট বিচ্ছিন্ন নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। ( কথা হলো পথের মধ্যে কেচি কোথায় পেলেন)। সেটা ঘটনা নয়। ঘটনা হলো এরপর লোকটি সেই বোতাম ধরেই গল্প করেছিলেন, থামেননি। জানেন না যে যাবার সে চলে গেছে। তিনি বলছিলেন আমাদের য়ুনিভার্সিটির স্মৃতি সেই বোতামধরা মানুষটির মত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে না কিন্তু স্মৃতি তাড়িত আমরা সেই স্মৃতির বোতাম ধরে কথা বলেই যাব। (পাঠক এবার আমাকে একটু ধন্যবাদ দিন এতদিন আগের গল্প আমার হুবহু মনে আছে দেখে)। আমার সহপাঠিনী নীনা আখতার বানু গর্বিত চোখে বলেছিলেন Ñ উনি আমার লাল্লু ভাই। উনি সবসময় এমন করেই গল্প করেন। এরপর লাল্লুভাই আমাদের কমনরুমের প্রিয় মানুষ হলেন। তিনি কোনদিন কোন গল্প করেছেন সেসব নীনা আমাদের বলতো। একবার নীনা বলেছিল Ñ জানিস কি হয়েছে? আমরা প্রশ্ন করলাম কি হয়েছে রে নীনা। ও বললো লাল্লুভাই কোলকাতা গিয়েছিলেন সেখানে এক মজার ঘটনা ঘটেছে। আমরা ঘিরে ধরলাম কি মজার ঘটনারে নীনা? ও বলে Ñ লাল্লুভাই একটা বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাড়িটা ছিল একেবারে একটা গলির ভেতর। হঠাৎ তিনি শোনেন একজন মহিলা একটু উঁচু গলায় বলছেন Ñ এই শুনেছিস ওই বাড়িতে একজন মোচলমান এসেছেন একদম বোঝা যায় না মোচলমান। গল্পটি নীনার বানানো না হলে লাল্লুভাইএর বানানো হতে পারে কিন্তু কমনরুমে সেদিন আমরা খুব মজা পেয়েছিলাম। দিনে দিনে তিনি আমাদের প্রিয় মানুষ হয়ে উঠছিলেন। না দেখে প্রিয় হয়ে ওঠা বিরল ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ কি এইসব ভেবেই লিখেছিলেন Ñ এখনও তারে চোখে দেখিনি। শুধু বাঁশি শুনেছি। নীনা আখতার সে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল, না দেখা মানুষের বাঁশি শোনা। এই প্রসঙ্গে আমি বলি Ñ বাহাত্তর সালে আমরা যখন শান্তিনিকেতনে বেড়াতে যাই সেখানে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আমরা পৌষালী রেস্টুরেন্টে খেতে গেছি হঠাৎ সেই দোকানের মালিক আমাদের বলেছিলেন Ñ আপনারা মোসলমান? আমরা বুঝতেই পারিনি। কেবল পানি বললেন আর জ্বি বললেন তাইতে। আমি উত্তর দিয়েছিলাম Ñ কেন মোসলমানরা দেখতে ঠিক কেমন হয় সেটা জানতেন না ? ২০১৫ সালে আবার সেই পৌষালীতে গিয়েছিলাম। ওরা খুব যতœ করেছিলেন। তখন আর এমন প্রশ্ন করেননি। মনে হয় ততদিনে অনেক মোসলমান দেখা হয়ে গেছে ওঁদের।
আগেই বলেছি এমনি সব গল্প শুনতে শুনতে আমরা সেই অদেখা মানুষটির অনেক কিছু জানতে পারছিলাম। তাঁর বন্ধ দরজায় আমি ধাক্কা দিয়েছিলাম অনেক পরে। একবার ওঁকে কিছু বই দেব বলে ঠিক করলাম। অযতœ ছাপার ফলে ভুলভাল সব বই। সেই প্রথম তাঁর পুরানো কেন্দ্রের ছাদে বসে গল্প। আর চা সিঙ্গারার সঙ্গে আলাপ হলো। আমি লন্ডনে। এরপর মাঝে মাঝে দেখা হয়েছে। তবে প্রথম আলাপে বিকালের নরম আলোতে চা সিঙ্গারার সঙ্গে গল্প করতে করতে মনে হযেছিল তিনি সতিই অসাধারণ কথক। মনে ইচ্ছা ছিল তিনি যদি আমাকে কোন ইংরাজি বই অনুবাদ করতে দেন আমি করব। কিন্তু মনের কথা বলতে পারিনি। এরপর কতবার দেখেছি তাঁকে। কতবার তাঁর বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়েছি তার ঠিক নেই। উজ্জ্বল হাসির সঙ্গে দরজায় খুলেও গেছে। একবার বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে আমার বইপত্র বা সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি বিশাল আলোচনা সভার আয়োজন করেন কতিপয় নবীন লেখক। সময় ২০০০ সাল। আমি তাঁকে আমার একটি বইএর আলোচনা করতে অনুরোধ করি। আমার লেখা গল্পের বই Ñ কাবার্ড ও কাবার্ড জাতীয় গল্প। দুইবার আমার বই হারিয়ে অনেক বলে কয়ে একটি সমালোচনা মূলক বক্তৃতা আদায় করতে পেরেছিলাম। তিনি অবশ্যই ভালো বলেছিলেন। আমাকে কোন উপদেশ দিয়ে বলতে চাননি তাঁর জ্ঞানের কথা। একটি ব্যাক্য আমার আজো মনে আছে। তিনি বলেছিলেন আমার লেখা গল্প প্রসঙ্গে Ñ ‘সালেহার গল্পের ভাষায় আমার রক্তক্ষরণ হয়’। এরপর থেকে আমার লন্ডনের বাড়ির দেয়ালে তাঁর ছবি বাঁধিয়ে রেখে দিয়েছি। কারণ? আমার লেখার সেই ‘থ্রন বার্ডকে’ সেই রক্তগোলাপকে তিনি শনাক্ত করতে পেরেছেন এবং সেই কথা বলেছেন। কাঁটা হ্রদয়ের যত গভীরে ফুটে যায় ততই মিষ্টি গান করে থ্রনবার্ড। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। আমারও বলতে ভালো লাগে Ñ ওঁর লেখার ব্যাক্য গঠন, শব্দ চয়ন, বলবার ভঙ্গি, কৌতুক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, বিশ্লেষণ সবই আমার ভয়ানক প্রিয়। তাঁর সহজ গভীর গদ্য আমাকে তন্ময় করে, চিন্তান্বিত করে। এবং তাঁর বই আর লেখা পড়তে আগ্রহী করে। আমার মনে হয় বাংলাভাষায় তাঁর দখল প্রশ্নাতীত।
তিনি অনেক বই লিখেছেন। বহে জলবতী ধারা, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, ভালোবাসার সাম্পান, আমার বোকা শৈশব এমনি সব বই আমি অনেকবার পড়েছি। প্রাণ থেকে প্রাণে, বহুমুখিতায় ও স্বপ্ন চারিতায়, সোনালী শস্যকণা, ওড়াওড়ির দিন, তার বি¯্রস্ত জার্নাল সবই আমার পড়া এবং বিশ্বাস অনেকের। তাঁর ‘বাংলাদেশের গল্প সংকলনে’ ভেবেছিলাম আমার একটুখানি জায়গা হবে। হয়নি। আশাকরছি পরে হবে। শ্রেষ্ঠ বিদেশী গল্প মনে হয়েছে একটু দায়সারা কাজ। আরো কিছু বিদেশী গল্প অনায়াসে সেখানে ঠাঁই পেতে পারতো। আশা করছি দিনকাল ভালো হলে অনেক গল্পে সাজিয়ে একটি বিদেশী গল্পের সংকলন করবেন। আপাতত একটি বই নিয়ে আমি কিছু বলব। কারণ বইটির সাহিত্য আলোচনা আমার ভালো লেগেছিল।
‘বন্ধ দরজায় ধাক্কা’ গ্রন্থে আছে এগারোটি প্রবন্ধ। কিছু কিছু প্রবন্ধ আমার মনের কথা। আমার কাছে যে বইটি ছিল ( একজন নিয়ে গেছে। এখনও ফেরত পাইনি) সেখানে কোন সূচিপত্র ছিল না বলে সবগুলোর নাম লিখতে পারছি না। এর মধ্যে একটি রচনার নাম Ñ ‘জনপ্রিয় লেখকরা কি অলেখক।’ নিঃসন্দেহে একটি চিন্তামগ্ন উৎকৃষ্ঠ প্রবন্ধ। সেখানে তাঁর সঙ্গে আমি কোন কোন জায়গায় একমত। সাহিত্যে বিনোদন থাকা ভালো না খারাপ তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন Ñ‘এই গুণ থাকতেই হবে শিল্পের মধ্যে না হলে তা শিল্প হবে না। পাঠক বা দর্শকের মনে মাধুরীপ্রবাহ জাগিয়ে তার হ্রদয়জগতে লেখক তাঁর গভীর উপলদ্ধিগুলোকে কিছুতেই রক্ত কণিকার অনন্যসম্পদ করে তুলতে পারবেন না। ( এখন বই সামনে নেই। সবটুকু ঠিকমত হলো কিনা পরীক্ষা করতে পারছি না) এরপর তিনি বলেছেন Ñ ‘যে ছবি দর্শকের মনকে ভোলাতে বা খুশী করতেই পারলো না, তার ভালোবাসা বা আনন্দের জিনিস হয়ে উঠলো না, অমন দিগি¦জয়ী আর্ট ফিল্ম হয়ে তার যে কি লাভ হলো তা বোঝা কঠিন।’ এখানে আমি একমত হয়ে তাঁরই জবানীতে বলি রবীন্দ্রনাথ লেখেন শরৎচন্দ্রের জন্য আর শরৎচন্দ্র লেখেন আপামর জনসাধারণের জন্য। বোধকরি এই কারণ। ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকার’ পাঠক নাকি সারা পৃথিবীতে ছাব্বিশ জন। কিন্তু তাই বলে ওইসব ইঁটের মত কঠিন বই লেখা যে বন্ধ হবে না তাতো নয়। আর তাইতো আমরা যাই সেই সব বইএর কাছে যেখানে রস থাকে আর থাকে ভালোলাগার ফল্গুধারা। প্রাণ থাকে আর থাকে আমাদের ভোলানোর গূন। সেই গুনের নাম যদি বিনোদন হয় ক্ষতি নেই। বেদনা-ভালোবাসার ককটেলে শরৎচন্দ্রের টিয়ারগ্যাস যে আমাদের সময়ে অসময়ে দরকার হয়। বিন্দুবাসিনী ওষুধ খেতে চাইলেন আর পাঠক কাঁদতে শুরু করলো। খুবই মজার ব্যাপার। কিন্তু এই মজার ব্যাপার না হলে আমরা বই পড়তে চাইবো না। ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমাটিকার’ মত রেহেলে রেখে সকালবিকাল কেবল বইএর ধুলো ঝাড়ব। শশধার দত্ত বা কিরিটি রায়ের উপকারিতায় বলা যায় কেমন করে বই আমাদের সঙ্গী হয়, সময় সময় এইসবের স্বাদেও জানা যায়। হোক না ডিডেকটিভ, ধরে রাখে কি অসাধারণ কৌশলে, বোতাম ধরে থাকা মানুষের মত।
একসময় তিনি একটু কটুভাষায রবীন্দ্রনাথের দুর্বলতা নিয়ে লিখেছিলেন। এই বইতে রবীন্দ্রনাথের শক্তির কথা আছে। রবীন্দ্রনাথ কি মৌলিক কবি প্রসঙ্গে লিখেছেন Ñ ‘আপাত মৌলিকতা খুঁজলে রবীন্দ্রনাথকে ততটা উজ্জ্বল মনে নাও হতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে এত বড় তার কারণ তাঁর মধ্যে গত তিন হাজার বছরের ভারতীয় সংস্কৃতি এবং হাজার বছরের ইউরোপীয় সংস্কৃতি শক্তিশালী আবেগে পুনরজ্জীবিত হয়েছে। কাজেই ছোট লেখকদের মত এদের ডালপাতার আড়ালে আবডালে মৌলিকতা খুঁজে বেড়াতে গেলে হতাশ হয়ে পড়া বিচিত্র নয়।’ আমার পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল এমন একটি প্রশ্ন কেন ওঠে। এবং কেন এই প্রশ্নের উত্তরই বা দিতে হবে। তিনি রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে সত্যনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ঠিকমত খুঁজে পেতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের মৌলিকতার স্বরূপ। এই গ্রন্থের তৃতীয় প্রবন্ধটি ‘শিল্পের বাস্তব’। সুখপাঠ্য এবং যুক্তিও তর্কে সুন্দর। তবে তাঁর মতে পোস্টমাস্টার যদি মিলনান্তক হতো তাহলে এটা যে একটি হিন্দি সিনেমার মত তরল ব্যাপার হতো সে নিয়ে আমার একটু মতান্তর আছে। আমি যদি বলি Ñ ‘পালে বাতাস লাগিয়াছে, তখনি পোস্টমাস্টার বলিলেন মাঝি নৌকা ফেরাও। উঠোনের এক কোনে পোটলা বুকে রতন দাঁড়াইয়া আছে। ডান হাত বন্ধ বলিয়া বাঁ হাত দিয়ে চোখ মুছিতেছে। তিনি রতনের পিঠে হাত রাখিয়া বলিলেন Ñ চল রতন। তোরও কেউ নেই। আমারও কেউ নেই।’ তাহলে কি হতো? ব্যাপারটি একেবারে মন্দ হতো না। আর যে রতন আমার কেউ নেই ভেবে কাঁদে তাকেও তো তিনি সাšত্বনা দেন। তবে সে অন্যগল্প। একটি নিঃসহায় বালিকা পৃথিবীর উদাসিনতায় প্রতিদিন কোথায় হারায়! আহা এমন রতনের জন্য কোথাও না কোথাও একটি আশ্রয় থাক।
এরপর তিনি বলেছেন বাংলা সাহিত্যে একজন সত্যিকারের পুরুষ নেই কেন। কারন হিসাবে হয়তো বলা যেতে পারে নারীর দুঃখ বেদনা নিয়েই বার বার লেখা হয়েছে। নারীর স্থান ও মান নির্ধারনই মূখ্য ব্যাপার হয়েছে। আর তাই এসেছে পুরুষ এসেছে প্রধান নয় পার্শ্ব চরিত্র হিসাবে। চাঁদবেনের মত পুরুষ তেমন তৈরী হয়নি। তিনি মনসার পূজো নেবেন না। এমন একগুঁয়েমি অনেক পুরুষের থাকতে পারে। ইংরাজিতে যাকে বলা হয় ‘মাচো’ বা ‘মাস্টারফুল’। কখনো তা বড় গোঁফ এবং সাইডবন্ডের মত স্পষ্ট। তবে সত্যি সত্যি পুরুষ হয়ে ওঠার রেসিপি যে কি তা ঠিক স্পষ্ট নয়। সময় হয়ে গেছে আসুক তেমন পুরুষ যিনি বই পড়া বা আলোর সন্ধানে সময় ব্যয় করাকে অযৌক্তিক মনে করেন না এবং যার ব্যাক্তিত্ব আমাদের ভয় পাইয়ে দেয় না। বরং শ্রদ্ধাশীল করে। আমাদের ভেতরে ভালোবাসা জাগায়। এই প্রসঙ্গে আমার আনিসুজ্জামান স্যারের কথা মনে পড়লো। তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাদের ভয় দেখায় না বরং তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হতে সাহায্য করে। মনে হয় না তাঁকে অশ্রদ্ধা করবার ধৃষ্টতা কোনদিন কারো হবে। আমার বইতে আমি পুরুষ সৃষ্টি করবার চেষ্টা করেছি। একদিন না একদিন সেইসব বই তিনি পড়বেন বলে বিশ্বাস।
আধুনিক কবিতার ঈঙ্গিত একটি মনোগ্রাহী ও শিক্ষামূলক রচনা। সব কথা কবিতায় বলা যায় না। সব কথা বলে দিলে রচনা প্রাঞ্জল হয়। কিন্তু পাতাবরণের সকল রহস্য ও সৌন্দর্য অপহরণ করে। কবিতার আলোআঁধার টিউব বাতির জ্বলে ওঠার মত কটকটে হয়ে ওঠে। ‘আমার তখন নবন শ্রেনী আমার তখন শাড়ি।’ তারপর আর বলবার দরকার আছে কি? কবিতায় সবকিছু বলে দেওয়া সত্যিই এক ধরণের অপরাধ। পাঠক ব্য্খ্যা করুক যেমন তাঁর পছন্দ। একবার খলিল জীব্রানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল Ñ আচ্ছা আপনি একটু বুঝিয়ে বলুনতো এই পংক্তির মানে কি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন Ñ লিখবার সময় আমি আর ঈশ্বর জানতাম এই পংক্তির মানে কি। এখন কেবল আমার ঈশ্বর জানেন। অতএব পাঠক যেমনই ভালোলাগে তেমনই ব্যাখ্যা করুন। স্বাধীনতা আপনার। কবির কবিতা লেখার শর্ত একটিই তা কবিতা হয়ে উঠতে হবে। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন Ñ ‘প্রদীপ ভেসে গেল অকারণে’ এই সামান্য পংক্তির ব্যাখ্যা করতে আমাদের সারাজীবন চলে যাবে। কবিতা নিয়ে এক জায়গায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন Ñ ‘যারা লড়াকু থাকার ধাতু নিয়ে অবিমিশ্র থাকে তারাই শেষপর্যন্ত কবিতাকে উত্তেজিত রাতের নিঃসঙ্গ শিস শোনানোর ক্ষমতা অর্জন করতে জানে। আর বাকি সব ভোরের অনেক আগেই ঝরে পড়ে আর মিশে যায় যে কোথায় তা অজানা থেকে যায়।’ ( এইটি আমি তাঁর গ্রন্থ ‘আমার কিছু কথাতে’ পেয়েছি)।
সবগুলো প্রবন্ধের কথা আমার লেখায় নেই। তবু বলি আমরা সাহিত্য- চিন্তার কারণে বা সন্ধানে এমন বই আরো পড়তে চাই।
তিনি আছেন এবং আমরা জানি আলোকিত শব্দটির মানে কি? এ এক চিরায়ত গ্রন্থের মত চিরায়ত চাওয়া। ক্লসিকতার এমন বাংলা আর কে করবেন? চিরায়ত সাহিত্য। আমাদের জীবনের বট গাছ গুলো একের পর চলে যায়, তিনি থাকবেন আরো অনেকদিন এমন বিশ্বাস হৃদয়ে লালন করি।

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com