আবার কি নতুন করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে ছাত্র আন্দোলন !

প্রকাশিত: ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯

আবার কি  নতুন করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে  ছাত্র আন্দোলন !

আবার কি নতুন করে গড়ে উঠতে যাচ্ছে ছাত্র আন্দোলন । বামধারার ছাত্র সংগঠনগুলো দাঁড়িয়েছে আহত ভিপি নুরুল হক নূরের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পাশে । পাসাপাশি শুক্রবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের ঘোষণা দেন ১২ ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

প্রগতিশীল ছাত্র জোটের ব্যানারে থাকা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্টের দুই অংশ ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সঙ্গে বামপন্থি সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের দুই অংশ, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন, নাগরিক ছাত্র ঐক্য, স্বতন্ত্র জোট, ছাত্র গণমঞ্চ ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এই জোটের শরিক হয়েছে।

সন্ত্রাস-দখলদারিত্বমুক্ত নিরাপদ গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ নামে জোট গড়েছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা ও ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন বলেন, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব জারি রেখে ক্যাম্পাসগুলোকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করা হয়েছে। প্রশাসন এই সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে এর বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

শিক্ষাঙ্গনের এমন দমবন্ধ ও অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে বাধা প্রদান করছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ভুলুণ্ঠিত করছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা ‘সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ গঠন করেছি।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদি হাসান নোবেল, ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি আল কাদেরী জয়, ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবু রায়হান খান, ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা, শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি তাসনিম আফরোজ ইমি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এগুলো হল- নুরুল হক নূরসহ সব শিক্ষার্থীর ওপর হামলাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কার ও আইনানুগ বিচার, ডাকসু ভবনে হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অপসারণ, ভিপি নূর ও তার সঙ্গীদের নামে মামলা প্রত্যাহার ও হামলায় আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার প্রশাসনের বহন এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ হলে হলে দখলদারিত্ব ও গেস্টরুম-গণরুম নির্যাতন বন্ধ করা।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত বছর বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে জোরাল আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দেয় সরকার। ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিতি পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নুরুল হক নূর।

সেই পরিচিতি কাজে লাগিয়ে গত মার্চে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন নূর, স্বাধীনতার পর ছাত্র সংগঠনগুলোর প্যানেলের বাইরে থেকে প্রথম ভিপি হন তিনিই।

ওই নির্বাচন ঘিরে নূরের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে, যে অভিযোগ এখনও করছেন ছাত্রলীগ নেতারা।

ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে গিয়ে এই প্রসঙ্গে কথাও বলেছিলেন নূর।

তিনি বলেছিলেন, “আমি ছাত্রলীগের স্কুল কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় হলের উপ-মানব সম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পদে ছিলাম। অথচ কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে, বিনয়ের সঙ্গে বলব যে, আমার ছাত্রলীগের ভাই-বন্ধুরাও কেন যেন আমাকে জামাত-শিবির বানানোর জন্য অপপ্রচার তুলেছিল।

অথচ আমার পুরো পরিবার ছিল আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ডের।

শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা নূরের সংগঠনের সঙ্গে জোট বাঁধার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রগতিশীল ছাত্র জোটভুক্ত ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি নোবেল বলেন, আজকে আমাদের ঘোষণাপত্রে বলেছি, সকল সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক সংগঠনের বাইরে থেকে আমরা এটা করেছি।

কারও বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে তাকে বা তাদেরকে জোট থেকে বের করে দেওয়া হবে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ রুখতে ২০০২ সালে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে আত্মপ্রকাশ করে প্রগতিশীল ছাত্র জোট।

ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সঙ্গে ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সমিতি ছিল এই জোটে। যে কোনো ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, অনিয়ম ও শিক্ষার্থী নিপীড়নের প্রতিবাদে সরব ভূমিকা রেখে আসছে এই জোট, যদিও বেশ কয়েক বছর আগে ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সংগঠন সেখান থেকে বেরিয়ে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে নূরের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর সমালোচনা করেন আখতার হোসেন।

তিনি বলেন, ডাকসু ভিপির ওপর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। ভিপিকে রক্ষা না করে তিনি সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছেন। তিনি ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, অথচ সেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তিনি রক্ষা করতে পারেন না। আমরা তার পদত্যাগ দাবি করছি।

এদিকে বিকেলে নূরসহ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে পরিষদের নেতাকর্মীরা।

শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের ঘরের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে রাজু ভাস্কর্য হয়ে শাহবাগে ফিরে সমাবেশ করেন নেতাকর্মীরা। অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।

সমাবেশে সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, ডাকসু ভবনে সেদিনের হামলায় আমাদের কারও হাত ভেঙে গেছে, কারও পা ভেঙে গেছে। আমাদের মামলা এখনও নেওয়া হয়নি। পুলিশ বলছে, তাদের করা মামলার সাথে আমাদের অভিযোগ সংযুক্ত করা হবে। পুলিশ আমাদের অভিযোগটি আমলে নিয়েছে কি না সেটা আমরা এখনও জানি না।

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এই নেতা বলেন, “নির্যাতন করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, আইসিউতে পাঠানো হয়েছে। আবার আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এটা দুঃশাসনের নমুনা। এসব এ সরকারের আমলেই সম্ভব।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা দিয়েছিতো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্র সমাজ জেগেছে’, ‘মামলা করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘নির্লজ্জ প্রশাসন, ধিক্কার ধিক্কার’, ‘হামলা করে মামলা, মানি না মানব না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

ডাকসু ভবনে হামলার ঘটনায় তথ্য-প্রমাণ দিতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গঠন করা তদন্ত কমিটি।

বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ডাকসু ভবন এবং মধুর ক্যান্টিন এলাকায় সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য উপাচার্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিকট থেকে ঘটনার বিবরণসহ (প্রমাণ যদি থাকে) আগামী ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখ বেলা ২টার মধ্যে লিখিতভাবে তথ্য প্রদানকারীর নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বরসহ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ডিন, কলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর দপ্তরে সংরক্ষিত বক্সে জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

তদন্তের স্বার্থে তথ্যদাতার নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

গত ২২ ডিসেম্বর ডাকসু ভবনে নিজের কক্ষে হামলার শিকার হন ভিপি নূর ও তার সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একদল নেতা-কর্মী।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ভিপির কক্ষে ঢুকে বাতি নিভিয়ে সেখানে থাকা সবাইকে এলোপাতাড়ি পেটায় বলে আহতদের ভাষ্য।

এই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘দুঃখজনক’ আখ্যায়িত করে সোমবার ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে ছয় কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।