আব্দুল গাফফার চৌধুরীঃ একটি অমর সঙ্গীতের রচয়িতা

প্রকাশিত: ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২২

আব্দুল গাফফার চৌধুরীঃ একটি অমর সঙ্গীতের রচয়িতা

 

 

তাজুল মোহাম্মদ 

 

ভারত ভাগের অশ্রুকনা- দ্বিখণ্ডিত বাংলা।

 

উদ্ভব রাষ্ট্র পাকিস্তান। আরো কত ঘটনা সে সময়ের। বিশ্বকবির সোনার বাংলা বিভক্ত। পূর্বাংশ যুক্ত হলো অদ্ভুত এক রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ হিসেবে। তাও হাজার মাইল দূরত্বে। আর জন্মের পর থেকে বাংলায় কথা বলতেন শতকরা ৫৬ ভাগ। অথচ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবেনা। এই হচ্ছে পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইসলাম। জিন্নাহর এ ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করলো ছাত্র সমাজ। প্রতিবাদ উঠেছিল তাৎক্ষণিক। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকায়। তারপর অন্যান্য জেলায়- মহকুমায়। প্রতিবাদ উঠেছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আর জাফলং থেকে সুন্দরবন অবধি। দুর্বার আন্দোলন হয়েছে কোথাও। বরিশাল শহরও টল-টলায়মান আন্দোলনের চাপে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগঠিত হয় মিছিল। সমবেত কণ্ঠে ধ্বনি উঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। এখানে ওখানে ছোট বড় সমাবেশ। উত্তেজিত কণ্ঠে বক্তৃতা।

বরিশাল শহরের বিদ্যালয়গুলো থেকে ছাত্ররা মিছিল করে সমাবেশে যোগ দিতেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন অশ্বিনী কুমার ইনস্টিটিউশনের শিক্ষার্থী আব্দুল গাফফার চৌধুরী। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অংশ গ্রহন করেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। তবে, অন্য দশজন থেকে আলাদা করে দেখার মত কিছু নন। গ্রাম থেকে সদ্য আগত এক কিশোর মাত্র। মেহেন্দিগঞ্জ বরিশাল জেলারই একটি উপজেলা। সেখানকার উত্তর শাহবাজপুর এলাকার উলানিয়া গ্রামের হাজী ওয়াজেদ রেজা চৌধুরীর পুত্র। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসা ও হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে এসেছেন বরিশাল শহরে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকালে এ.কে. ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণীর ছাত্র তিনি। অন্যদের ন্যায় নিজেও যোগ দিয়েছেন আন্দোলনে। গ্রেফতারও হয়েছিলেন।
১৯৫০ সাল। মেট্রিক পাস করলেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। কিন্তু কলেজে যেতে দেরি করেছেন অনেক। ১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র। বাস করতেন কলেজ হোস্টেলে। চার বছর ধরে চলে আসা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় সে বছর। আব্দুল গাফফার চৌধুরীও জড়িয়ে পড়েন প্রথম থেকে। মানসিকভাবে আছেন ১৯৪৮ সাল থেকে। ঢাকায় এসে যুক্ত হলেন বৃহত্তর কর্মকান্ডে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফ্রেবুয়ারী। বর্ধমান হাউসে বসবে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন। আর ছাত্রসমাজ পরিষদ ভবন অভিমুখে মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
আন্দোলন বানচাল করতে সরকারও ছিল সক্রিয়। ঘোষণা করে ১৪৪ ধারা। মিছিল মিটিং সবই নিষিদ্ধ। তাতে ছাত্র সমাজ তোয়াক্কা করেনি মোটেই, চললো প্রস্তুতি। সকাল থেক ঢাকা নগরির সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন ছাত্রনেতারা। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা- প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বটতলায় তখন বিশাল জামায়েত। রাস্তায় সশস্ত্র পুলিশ। কোনোভাবেই বেরোতে দেবেনা ছাত্রদের। ছাত্ররাও মরিয়া, মিছিল নিয়ে নামবেনই তারা রাস্তায়। কিন্তু কিভাবে? এ নিয়ে আরো আগে থেকেই চলছিল শলা- পরামর্শ। বিভক্তিও দেখা দেয়। এক পক্ষ তখন মিছিল করার বিরুদ্ধে। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে চাননি। কিন্তু সাধারন শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করার পক্ষে। তবে, পুলিশ ব্যারিকেড অতিক্রম করাও সহজ কথা নয়। যে অবস্থায় একটি প্রস্তাব আসে- ১০জন করে এক একটি গ্রুপ মিছিল নিয়ে বেরুবেন। তাতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হবেনা। কিন্তু পুলিশ বাধা প্রদান করে তাতেও। শুরু করে লাঠি পেটা, অনেকেই আহত হলেন। কেউ ধস্তাধস্তি হাতাহাতিতেও লিপ্ত হন-পুলিশের সাথে। সেতো অল্প সময়ে মাত্র। তারপরেই শুরু হয়ে যায় গুলি, লুটিয়ে পড়েন বহু ছাত্র। তাৎক্ষণিক শহিদ হন ৪২ জন। গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ছটফট করছেন অসংখ্যজন। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গিয়েছেন কেউ। ছাত্রনেতারা গ্রেফতার এড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। পরিচিত অপরিচিত নানা জনের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজছেন। ভয়ার্ত রূপ নিয়ে ঢাকা নগরী। আতংক বিরাজ করছে প্রতিটি বাড়িতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, কল কারখানা সবখানেই শোকের ছায়া।
আব্দুল গাফফার চৌধুরীও অন্য দশজন ছাত্রের ন্যায় ছিলেন, প্রতিটি কর্মসূচিতে উচ্চকন্ঠে স্লোগান উচ্চারণ করেছেন “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। সেদিনও সকাল থেকে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। প্রতিটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন স্বচক্ষে, অংশগ্রহণও আছে। দশজনি মিছিলে অংশ নিয়েছেন তিঁনি। আরো ৯ জনের সাথে মিশে হয়েছেন ১০ জনের ১ জন। স্লোগান দিতে ভেঙেছেন পুলিশের ব্যারিকেড। নেমেছেন রাস্তায়, মিছিলসহ এগিয়ে যাবার প্রয়াস ছিলো তাঁরও। টিয়ারগ্যাসের জ্বালায় অস্থির হয়ে ছুটোছুটি, চোখ বন্ধ করে কানামাছি খেলার ন্যায় দৌড়াদৌড়ি। আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনে কান ঝালাপালা হয়েছে। নিজেকে রক্ষার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত তখন। নিজের চোখ দেখলেন রফিক উদ্দিনের বুলেটবিদ্ধ দেহ, নিঃশেষিত হয়ে গেছে তাঁর শরীরের সমস্ত শোনিতধারা। রফিকের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ আর নিজের রক্তে স্রোত সৃষ্টি হয়েছে অন্তর জুড়ে। রক্তের সেই চাপই কি তাড়িত করেছে পরবর্তী কর্মসূচিতে নিয়ে যেতে? কে জানে সে রহস্য। নিজেও পারেননি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে। প্রশ্ন করলে বলেনঃ
শুরুতো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভাষণ থেকে। বললেন, “উর্দু এন্ড উর্দু শেল বি দি স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।” ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ করলো ঢাকার ন্যায় বরিশালের মিছিল-মিটিং। অন্যদের ন্যায় আমিও অংশ নিয়েছি সে সবে। ১৯৫২ সাল। ঢাকার কর্মসূচিতে আমিও ছিলাম। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলেও আমি একজন। দেখেছি রক্তরাঙা রফিকের লাশ। অন্যদের মতো আমিও ছুটে চলেছি নিজের প্রাণ রক্ষা করতে। নিজের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি সেদিন। কলেজ হোস্টেল বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তা হলে যাবো কোথায়? ছুটতে ছুটে গেছি এক বন্ধুর বাড়িতে। এ সবগুলোই হচ্ছে অনন্ত স্বাভাবিকভাবে। অন্য সবাই যা করছে- আমিও তাই করছি। এর মধ্যে নেই কোনো অস্বাভাবিকত্ব।
অন্তরে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে আছে। ভীষণ কষ্টের স্মৃতি। সমস্ত জাতির মনেই কষ্ট। আলাদা করে নয় কিছু আমার। সেদিন কোনো এক সময় বসে পড়ি বন্ধুর টেবিলে। কি ভেবে টেনে নেই কাগজ-কলম। সাদা কাগজের উপর কালির কালো আঁচড় বসতে থাকি খসখস করে। যেন প্রয়াস চলছে একটি কবিতা লেখার। অনেক চিন্তা, অনেক কাটাছেঁড়ার পর দাঁড়ালো-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
কবিতা কি হচ্ছে, জানেননা আব্দুল গাফফার চৌধুরী। টুকটাক কবিতা লেখার প্রয়াস আগেও হয়তো ছিলো। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেননি। কবি, লেখক বা সাংবাদিক এরকম কোন পরিচিতিই গড়ে উঠেনি। কবিতার ব্যাকরণ নিয়েও পড়াশোনা হয়ে উঠেনি। তারপরও চলছে তাঁর কলম বিরামহীন। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শব্দ। সৃষ্টি করে চলছেন একটির পর একটি চরণ। থামলো এক সময় তাঁর কবিতা লেখার প্রয়াস। মনে করলেন পরিপূর্ণতা পেয়েছে কবিতা। তাহলে আব্দুল গাফফার চৌধুরী কি জানতেন ভূমিষ্ঠ হবার ১৭ বছর ২ মাস ৯ দিনের দিন যে কবিতা প্রসব করেছেন সেটি হবে ইতিহাস। এর মধ্য দিয়েই জাতীয় ইতিহাস জানার প্রয়াস চালাবে বাঙালি। বিশ্ববাসীও আগ্রহী হয়ে উঠবে এর ইতিহাস জানতে। নির্বিকারভাবেই উত্তর দিয়েছিলেনঃ
কেমন করে তা ভাববো। সে মুহূর্তে মনে যা এসেছে তাই লিখেছি। সেটি কি কবিতা হয়েছে নাকি অন্যকিছু- সে নিয়ে ভাবার কোনো বিষয় ছিলোনা। নিজের সম্বন্ধে উচ্চ কোনো ধারণাও পোষণ করিনি। ভাবলাম একটি কবিতা লিখেছি। আরো কতজনই কত কিছু লিখেছেন সেদিনের ঘটনাবলী নিয়ে। আমিও তাই করেছি, এই আরকি।
তিনি একজন ভাষা সংগ্রামী। ভাষার সংগ্রাম নিয়েই লিখলেন কবিতা। এগিয়ে আসলেন আব্দুল লতিফ। সুর সংযোজন করেন সে কবিতায়। হয়ে গেল সেটি গান। গীত হতে লাগলো লাখো মানুষের কণ্ঠে। বাংলা জনপ্রিয় গানের তালিকায় স্থান করে নেয় সেটিও। ১৭ বছর বয়সী সেই কিশোরের লেখা সে গানটিও পাকিস্তানের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে পড়ে। তাই পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খুনি নুরুল আমিন নিষিদ্ধ করেন এ গানটি। পরে দেশে ফেরেন আলতাফ মাহমুদ। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর অমর সেই গানে সুর সংযোজন করেন আবার। ১৯৫৪ সাল থেকে ২১শে ফ্রেবুয়ারীর প্রভাতফেরিতে গীত হতে লাগলো “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফ্রেবুয়ারী।” হয়ে গেলো একুশে সঙ্গীত। তখন রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও ২১শে ফ্রেবুয়ারীর প্রভাতফেরিতে এই গান গেয়েই ঢল নামে মানুষের। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ প্রতিটি মানুষ তাঁর সেই অমর গানে কন্ঠ মিলিয়ে মিলিয়েই ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যান শহিদ মিনারের দিকে। আমাদের শহিদ দিবস এক সময় পরিণত হলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। বিশ্বের নানা দেশে বহু ভাষাভাষী মানুষও কন্ঠ মেলান সে গানে।
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি” এখন একুশে সঙ্গীত। আব্দুল গাফফার চৌধুরীও শুনে আসছেন প্রায় সাত দশক ধরে। প্রভাতফেরিতে যান, নিজের গানে কন্ঠ মিলান নিজের। এর মধ্যে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এটি। তাহলে কি অনুভূতি হয় তাঁর এই দিনে? এ প্রশ্নেও উদ্বেলিত হননি। স্বাভাবিক তাঁর কন্ঠ এবং মুখাবয়ব। বললেনঃ
মাত্র স্কুল ছেড়ে আসা কিশোর আমি। অন্য দশজনের মতো লিখেছি কবিতা, সেটিও সুর দেয়ায় হয়ে গেলো গান। জানাজানি হলো সর্বত্র। ১৯৫৪ থেকেই একুশের প্রভাতফেরির গান। কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালামের প্রচেষ্টায় হয়ে গেলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গান। ১১/১২ টা ভাষায় অনূদিত হয়ে গীত হয়ে যাচ্ছে। শুনে-শুনে ভালোই লাগে। যে অনুভূতি হবার কথা তাই হয়ে থাকে আমারো। গর্ব অনুভব করে থাকি।
এই ভাষা আন্দোলনই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। তৎপরবর্তী যতো আন্দোলন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি নিয়ে সবইতো এই ভাষা আন্দোলনের ফল। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হলো। আমরা আন্দোলন করলাম এর বিরুদ্ধে। কাজী নজরুল ইসলামকে ইসলামীকরন করা হয়েছে। এই হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও আন্দোলন হলো। বাংলা হরফ পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা দাঁড়িয়েছি এর বিরুদ্ধে। যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি। তারপর ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গনঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুতেই সম্পৃক্ত হয়েছি। এ সবইতো ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে পরিচয় ১৯৪৮ সালে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কোনো একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে সাক্ষাত পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর। মেট্রিক পাস করে ঢাকায় আসার সময়তো বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব খুবই চার্মিং। তাঁর কাছাকাছি গিয়ে অনুভব করলেন তিঁনি একজন অসাম্প্রদায়িক লোক। তখন থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। সে ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিলেন নিজেকে। হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্তজন। তাঁর সাথে জেলেও ছিলেন ১৯৫৫ সালে। ১৯৪৮ সালে বরিশালে যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আব্দুল গাফফার চৌধুরী একজন। মাসখানেক ছিলেন কারারুদ্ধ। ১৯৫৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হলেন আবার। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলেই সাক্ষাত হয়েছে সেবার। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন চোখে মুখে দেখতে পেয়েছেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। নিজেও শানিত হয়েছেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হোক ছাত্র সংসদের সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে।
স্কুলের ছাত্র যখন বরিশালে তখন সে শহর থেকে প্রকাশিত হতো একটি কাগজ। নাম বরিশাল হিতৈষী। বাবার বন্ধু দুর্গা প্রসন্ন ছিলেন সম্পাদক। সে কাগজের চিঠিপত্র কলামে লিখতেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর বরিশাল থেকে বেরুলো সাপ্তাহিক নকীব নামে অন্য একটি পত্রিকা। তাতে লিখতেন কবিতা। আরো আগে থেকে কবিতায় হাত দিয়েছিলেন তিঁনি। ঢাকায় যখন পড়াশোনা করতে আসলেন, তখন ভাবতেন ঢাকায় পড়াশোনা চালানো এবং অন্যান্য খরচাপাতি নির্বাহ করার মতো অর্থের যোগান পিতা দিতে পারবেন? নিজে কিছু একটা করতে পারলে স্বাচ্ছন্দ্য আসতো। সেই ভাবনা থেকেই পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। সে সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক ইনসাফ। যোগ দেন সে পত্রিকায়। তারপর দৈনিক সংবাদ। সেখান থেকে মিল্লাত হয়ে ইত্তেফাক। এরপর আজাদ। এভাবে এই পত্রিকা, ওই কাগজ। কাজ করেছেন নানা কাগজে। ঘুরে ঘুরে সাংবাদিকতা চালিয়েছেন তিঁনি।
ষাটের দশক। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। আর, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধু। সে কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনগণকে সচেতন করার কাজটি কলমের মাধ্যমে যারা অগ্রসর করেছেন- তাঁদেরই একজন আব্দুল গাফফার চৌধুরী।
১৯৬৬ সালের ৬ ফ্রেবুয়ারী বঙ্গবন্ধু প্রদান করেন ৬ দফা দাবিনামা। পরবর্তীতে হলেন কারারুদ্ধ। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হয় রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য শীর্ষক মামলা। সাধারণ ভাবে যাকে বলা হতো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। সে মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে গড়ে উঠে আন্দোলন। গড়ে উঠে ডেমোক্রেটিক একশন কমিটি। যুক্ত হলো ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবিনামা। ৬ দফা এবং ১১ দফার ভিত্তিতেই গড়ে উঠে ছাত্র- গণ অভ্যুত্থান। এসব আন্দোলনের অন্যতম কলম সৈনিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী। লৌহমানব আইয়ুবের বিদায়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন। ক্ষমতা হস্তান্তর না করা এবং জাতীয় অধিবেশন বাতিলের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু আহ্বান করেন অসহযোগ আন্দোলন। তারপর মুক্তিযুদ্ধ আর প্রতিটি ঘটনার সঙ্গেই ছিল আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সম্পৃক্ততা। কি করেছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে? আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্য:
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের। আমি সেই প্রথম থেকেই এর সমর্থক। আমার লেখনীর মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব করেছি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে চলে যাই। সেখানে যা প্রয়োজন আমার পক্ষে যা সম্ভব সবই করার চেষ্টা করেছি। তারপর পত্রিকা বেরোলো। জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের নেতা এম.এন. এ। নির্বাহী সম্পাদক আমি। এই পত্রিকার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে যতটুকু সম্ভব অবদান রেখেছি।
ভাষা সংগ্রামী আব্দুল গাফফার চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের কলম সৈনিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী। সাংবাদিক, কলামিস্ট, সম্পাদক, কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থকার, উপন্যাসিক। আরো বহু অভিধায়ে অভিধায়িত করা সম্ভব। পরিচয় তাঁর অনেকগুলো। আজ ৮৫ বছর অতিক্রম কালে প্রশ্নটি জাগতেই পারে- কোনটি তাঁর বড় পরিচয়। এরকম একটি প্রশ্নে তিঁনি অবশ্য ছোট্ট করে উত্তর দিয়েছেন প্রবন্ধকার স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন নিজে। চূড়ান্ত অভিমত দিতে পারবেন পাঠক সমাজ। এক্ষেত্রে আমার নিজের মতামত হলো একুশে সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবেই বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী তিঁনি।

লাইভ রেডিও

Calendar

March 2024
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31