আব্দুল জব্বার : দ্য লিজেন্ড অব কুলাউড়া

প্রকাশিত: ১:১৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

আব্দুল জব্বার : দ্য লিজেন্ড অব কুলাউড়া


মোস্তফা মহসীন

১৮ ক্যারেট মানের ৩৫ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননা সনদ, একটি রেপ্লিকা আর নগদ দুই লক্ষ টাকা; বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ দিয়েও এই অমিত প্রতিভাবান রাজনীতিককে আমি মনে করি, কখনোই মূল্যায়ন করা যাবেনা। আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দিত এই কারনে যে, মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে এবারে এমন একজন নেতাকে সেই পুরস্কারটি প্রদান করা হচ্ছে, এদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামে সংগঠক হিসাবে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যার রয়েছে একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা। কৃষিপ্রধান দেশ বইয়ের পাতায় পাতায় লেখা থাকলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে, রাষ্ট্রীয় নীতি -নির্ধারণ প্রশ্নে, এখানে কৃষকের ভূমিকা বরাবরই অত্যন্ত গৌণ। সেই বাস্তবতার জায়গায় দাঁড়িয়ে শস্য-শ্যামল বাঙলার মাঠ-প্রান্তরে শস্যবুনে, নিড়ানি দিয়ে ঘর্মাক্ত একজন কৃষক চলে যাচ্ছেন আইনসভার আসন অলঙ্কৃত করতে,পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষকলীগের সভাপতি হয়ে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে… গল্প-উপন্যাসে সম্ভব কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে এটি বিষ্ময়কর বৈকি।
ইতিহাসের টগবগ ঘোড়ায় চড়তে চড়তে যদি আমরা ক্লান্ত না হই, তাহলে দেখবো, ৭৯ সালে সামরিকজান্তা জিয়ার অধীনে এক পার্লামেন্ট নির্বাচন। ঘনঘোর তমসা। এই জাতির রাষ্ট্রচরিত্র, সংবিধান এবং স্বাধীনতার মূল কাঠামোটাই ধ্বংসের চূড়ান্ত আয়োজন। যেখানে রাইফেল -বেয়নেটের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে জনতার ব্যালটবৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এক ভোটবিপ্লব! সেনা শাসনের বিপরীতে গণতন্ত্রের পক্ষে বীর কুলাউড়া’র জনগণের গণরায়! প্রবল বৈরি এক পরিস্থিতিতে তিনি সংসদে তাঁর রাজনৈতিক দলের ৩৯ জন এর একজন। ক্ষয়িষ্ণু সেই পার্লামেন্টেও সেই বেঁটেখাটো মানুষটিকে দাবিয়ে রাখা গেল কি? ৫ম সংশোধনীর বিরুদ্ধে… অথবা তাঁরকন্ঠ যতোটুকু সময় বরাদ্দ পেয়েছে ,সেই সময়টুকুকে কী নিপুণ মুন্সিয়ানায় কাজে লাগিয়ে কথা বলেছেন দীপ্তকন্ঠে বাংলার কৃষককুলের স্বপক্ষে, কৃষিতে ভর্তুকির দাবীতে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শেষ সময়ে, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় আমি তাঁকে কাছ থেকে দেখা এবং জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন আমরা প্রতিবেশি। শুধু প্রতিবেশি হিসাবে নয় আমার পরিবারের তাঁর সম্পর্কটি ছিলো হার্দিক উষ্ণতার। চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দৃঢ় আনুগত্য এবং ঘাতক-দালাল, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি নির্মূল প্রশ্নে তাঁর ছিলো অনমনীয় মনোভাব। সেই অনমনীয় মনোভাবের সাথে কুলাউড়া’তে সেই আমলে আমার পরিবারটিও ছিলো হাতেগোনা একটি পরিবাররুপে তাঁর সহযাত্রী। আমার বাবার সাথে তাঁর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ এবং ভাবনাগুলো খাপে খাপে মিলে যেত, সেই কারনে খুব জমে ওঠতো! কম কথা বলতেন, শুনতেন বেশি আর যা বলতেন খুব দৃঢ়ভাবে বলতেন; অথচ লড়াইয়ের কী অমিত বিক্রম! কৈশোরে শিহরণ ছড়াতো শরীরে, যেন আমি এক সত্যিকারের রাজনীতি’র নায়ককে প্রত্যক্ষ করছি! পরে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এ ধরনের চরিত্রকেই বলা হয়েছে;প্রকৃত গণমানুষের নেতা। কখনো মনে হয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা হো চি মিন এর সংগ্রামী চরিত্রের সাথে তিনি খুব মানানসই। কারন হো চি মিনও তাঁর মতোই সাধারণ পরিবার থেকে ওঠে এসে অসাধ্য সাধন করেছিলেন। হো চি মিনও তাঁর মতো কথা কম বলতেন, কিন্তু ছিলো জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কী অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি! শ্রমিক -কৃষকের প্রতি নিঃশর্ত নিবেদন, শরীরের গড়ন আর জন্মগত সাংগঠনিক প্রতিভায় দু’জনের বেশ মিল আমি খুঁজে পাই। পার্থক্য শুধু হো চি মিন বামপন্থী আর আব্দুল জব্বার মধ্যপন্থি গণতন্ত্রের পূজারী ।
একজন কৃষক নেতা হয়েও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বোঝাপড়া এবং ব্যাখ্যা করার গভীরতা ছিলো আজকাল-কার তথাকথিত যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের চাইতেও বেশি।
আমি আনন্দিত এই কারনে যে, এই প্রথম একজন কৃষক নেতার মুক্তিযুদ্ধে অবদানকে অন্তত ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষার পাহারায় নিয়োজিত এই রাষ্ট্রযন্ত্রের আমলারাও স্বীকার করে নিলো! মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্ত মরহুম আব্দুল জব্বার হাইব্রিড আওয়ামীলীগারদের ভীড়ে নিজেকে যেন নতুন করে চেনালেন, প্রজন্মের কাছে। যার মৃত্যুও ছিলো গৌরবের দীপ্তিতে মহিমান্বিত। ১৯৯২ সালের বাঙালি জাতির শোকার্ত আগস্ট মাসে মাঠে হালচাষ করতে করতে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়লেন 😪 ক্ষণজন্মা মাটিলগ্ন মানুষটি। যিনি কিনা ভালোবাসতেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার
ধুলো-মাটি-কাদা-হাওড়-পাহাড়-জঙ্গল আর সর্বোপরি মেহনতি মানুষ এবং তাঁদের সততার জীবিকা ও যাপিত জীবনকে; ‘একুশে পদক’ প্রাপ্তির দিনে তাঁকে পুনরায় জানাই শ্রদ্ধা।

লেখক ঃ কবি ও আইনজীবী

ছড়িয়ে দিন