আমবাগানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের আড়ালে কে?

প্রকাশিত: ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২১, ২০১৮

আমবাগানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের আড়ালে কে?

স্টাফ রিপোর্টার
আশুলিয়ার আমবাগান এলাকায় ব্যাপক অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদাররা এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগের মূলহোতা হিসেবে কাজ করছে। আর এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। অনেকক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে তারা বোকা বানিয়ে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে গ্যাস বিলও আদায় করছে।
স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আমবাগানে ৪-৫ জন গ্যাসের ঠিকাদারের কাজ করেন। এদের মধ্যে আলীম, খায়রুল, মেহেদী, মিলন ও দেবাশীষের নাম জানতে পারা যায়।
আমবাগান এলাকাটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত হওয়াতে এখানে জাহাঙ্গীর নগরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন। আর আশুলিয়ার মতো একটি অন্যতম শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে একটি ব্যাপক জনবসতি রয়েছে। এদের কেউ কেউ এখানে ভাড়া থাকেন। আবার কেউ নিজস্ব ফ্লাটে থাকেন। একারণে রিয়েল এস্টেট বিজনেস এখানে জমজমাট হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরে এখানে অনেকগুলো ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের ফ্লাটগুলোও দ্রুত বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকার থেকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় ফ্লাটের ক্রেতারা বা মালিকরা পড়ছেন বিপাকে। আর এসব মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে একটি ঠিকাদার চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। তারা আমবাগানের বিভিন্ন ভবনে দিচ্ছেন অবৈধ গ্যাস সংযোগ। অনেক ক্ষেত্রে কিছু ভবনে একটি বা দুটি বৈধ লাইন থাকলে সেখানকার রাইজার থেকে নেয়া হচ্ছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। আর এসব সংযোগের মূলহোতা হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদাররা।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, গ্যাসের ঠিকাদার মেহেদী এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে। মাস ছয়েক আগে আমবাগানে ৬ তলা ২২ ইউনিটের একটি ভবন তৈরী হয়। ঐ ভবনটির ১১ জন মালিক রয়েছে। ভবনটিতে মাত্র একটি ইউনিটের গ্যাস সংযোগ বৈধ। বাকি ১৯ টি ইউনিটে অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। আর এই ১৯ টি ইউনিটের সংযোগই মেহেদী দিয়েছে বলে জানান তিনি।
এব্যাপারে ঐ ভবনের মালিক সাত্তার হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের ভবনে একটি ইউনিটে বৈধ সংযোগ ছিল। সেই সংযোগের রাইজার থেকে আরো তিন-চারটি ইউনিটে সংযোগ নেয়া হয়। তবে সম্প্রতি গ্যাস অফিস থেকে লোক আসলে তারা সে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।
তবে তাদের ভবনটিতে কে বা কারা এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান করলো তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
আমবাগানের অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সে ভিডিওতে মোক্তার হোসেন নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তার সাক্ষাতকার নেয়া হয়। সেসময় তিনি বলেন, জাবি স্কুল এবং কলেজের সহকারী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান আসাদ তার বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়েছে। এ নিয়ে আমবাগানে সৃষ্টি হয় ব্যাপক চাঞ্চল্য। একজন শিক্ষক কী করে গ্যাসের ঠিকাদার হতে পারে! এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় অনুসন্ধান। আর সে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মোক্তার হোসেনের সাথে একাধিক বার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নানা ব্যস্ততার অজুহাত দেখাতে থাকেন। একপর্যায়ে মঙ্গলবার (১৯শে জুন) তিনি সাক্ষাতকার দিতে রাজি হন। তিনি রেডটাইমসকে দেয়া সেই সাক্ষাতকারে বলেন, ৬ মাস আগে স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদার দেবাশীষের সাথে তার কথা হয়। দেবাশীষ তাকে বৈধ সংযোগ এনে দেয়ার কথা বলে। এজন্য দেবাশীষের সাথে তার ২০ হাজার টাকার চুক্তিও হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও সরকার নতুন গ্যাস সংযোগের অনুমোদন না দেয়াতে দেবাশীষ ব্যর্থ হয়। পরে দেবাশীষের এক সহকর্মী তাকে বিশেষ সংযোগের কথা বলে। সেই বিশেষ সংযোগ সম্পর্কে মোক্তার হোসেনকে বলা হয়, এই সংযোগের যাবতীয় খরচ বাড়ির মালিককে বহন করতে হবে। আর যাবতীয় খরচ বাদে আরো ২০ হাজার টাকা তাদের দিতে হবে। গ্যাস বিল বই পাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতে হবে। এসময় মোক্তার হোসেনকে এ সংযোগ বৈধ বলে আশ্বাস দেয়া হয় এবং এও বলা হয় এ সংযোগে তার কোনো অসুবিধা হবে না।
পরবর্তীতে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর এলাকার অন্যান্য লোকজন মোক্তার হোসেনের বাড়িতে গ্যাস সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বিপাকে পড়ে যান। গত ১১ই জুন কিছু গণমাধ্যম কর্মী তার এই সংযোগকে অবৈধ বললে তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যান। এমতাবস্থায় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য জাবি সহকারি অধ্যাপক আসাদুজ্জামান আসাদ তার বাড়ির গ্যাস সংযোগ সম্পর্কে জানেন বলে বক্তব্য দেন।
তিনি কেনো আসাদুজ্জামান আসাদের নাম বললেন এমন প্রশ্নের জবাবে মোক্তার হোসেন বলেন, আসাদ স্যার আমাদের আমবাগান উন্নয়ন কমিটির সভাপতি। এলাকার যাবতীয় মানুষের সমস্যা তিনি দেখেন। সম্প্রতি তাদের একটি প্রজেক্টের সাথে আসাদ স্যার যুক্ত আছে। তাই তার সাথে একটি সুসম্পর্ক থাকায় এবং সংযোগটি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে থাকায় আসাদ স্যারের নাম ভিডিওতে বলেছেন বলে জানান।
আমবাগানের মেহেদী এবং অন্যান্য গ্যাসের ঠিকাদাররা এ অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে বলে জানান মোক্তার হোসেন।
এব্যাপারে জাবি শিক্ষক এবং উন্নয়ন কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আমি কোনো গ্যাসের ঠিকাদার নই যে মানুষের বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দিতে যাবো। স্থানীয় কিছু লোভী ঠিকাদারদের জন্য এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারা অন্যায় করছে আর সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশেষ বৈধতার নামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতাচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্র। তারা অনেক বাড়ি থেকে প্রতি মাসে বিলের টাকাও সংগ্রহ করছে। আমরা বিষয়টি যখনই জানতে পেরেছি তখনই এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলেছি।
আমবাগারে অবৈধ গ্যাস সযোগের ব্যাপারে স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদার মেহেদীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, আমি কি করে অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে বলবো। এব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদার দেবাশীষ ও তার কিছু সহকর্মী এ সংযোগ দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
এসময় মেহেদী আরো বলেন, আমবাগানে একমাত্র তারই গ্যাসের ঠিকাদারি করার বৈধতা রয়েছে। সরকার থেকে তাকে এ বৈধতা দেয়া হয়েছে। আর অন্যদের কোনো প্রকার বৈধতা নেই বলে জানান তিনি। যাদের বৈধতা নেই তারাই এসব সংযোগ দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, দেবাশীষ ও তার কিছু অনুগতরা এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে। দেবাশীষ এসব সংযোগে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মেহেদী বলেন, দেবাশীষ কেনো কোনো ঠিকাদারই এসব কাজে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থাকে না। তারা তাদের কিছু লোক ও মিস্ত্রি দ্বারা এ সংযোগ দেয়ায় বলে জানান তিনি।
আমবাগানের এ অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে গ্যাস অফিসের কর্মকর্ত ইউসুফ বলেন, সম্প্রতি আমরা কিছু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। খুব শীঘ্রই সবগুলো অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। কে বা কারা এসব অবৈধ গ্যাস সংেযোগের সাথে জড়িত এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব কাজ যারা করে তারা অনেকটা আড়ালে থাকে। স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ করে এসব সংযোগ দেয়া হয় বলে জানান তিনি। মূলত এসব সংযোগের জন্য তিনি স্থানীয় গ্যাসের ঠিকাদারদের দায়ী করেন।

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com