ঢাকা ১২ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


আমরা হয়তো তাদের নামও জানিনা

redtimes.com,bd
প্রকাশিত নভেম্বর ৩, ২০১৯, ১০:৩৬ অপরাহ্ণ
আমরা হয়তো তাদের নামও জানিনা

সাবিনা ইয়াসমিন

“স্যার, আপনার দেয়া এই হারমোনিয়ামটি ছুঁয়ে বলছি, এই আমি জীবনে প্রথম হারমোনিয়াম ছোঁয়ার সুযোগ পেলাম।”

ওর নাম কল্পনা। বাড়ি পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায়। গতকাল জেলা প্রশাসক এর কার্যালয় এ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিতে এসেছিলো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভাইভাতে আলাদা নম্বর বরাদ্দ রয়েছে। এজন্য সব পরীক্ষার্থীকেই আমরা যাচাই করেছিলাম আবৃত্তি, গান এমনকি ছবি আঁকা বিষয়েও তাঁর কোন পারদর্শিতা আছে কিনা। রাষ্ট্র যন্ত্র যে একটা সুন্দর সাংস্কৃতিক উত্থানকে আহ্বান করছে, এ উদ্যোগ তারই পরিচায়ক। যাহোক, পরীক্ষার্থীরা এই নম্বরের বিষয়ে সকলেই সচেতন। গান গাইতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করাতে হাতে গোনা কয়েকজন বাদে সবার কাছ থেকেই আমার প্রাণ যাহা চায় ( জোর করে মুখস্থ.. কথা ও সুর … গাওয়ার চেষ্টা আরও জোর করে) শুনতে শুনতে একপর্যায়ে প্রার্থীদের আমরা এভাবে বলতে শুরু করলাম, আমার পরাণ যাহা চায় বাদে কোন গান শোনাতে পারবেন কি না।
তো হাতে গোনা কয়েকজন আমাদের খুব মিষ্টি গলায় কিছু গান, হাতে গোনা কয়েকজন ভরাট গলায় আবৃত্তিও শুনিয়েছেন। একজন তো কবি সাবিনা ইয়াসমিন এর কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন।
তবে সকলের মধ্যে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে এই কল্পনা রানীর প্রতিভা। এত মিহি গলা, গমকে, ঠমকে মীড়ের যাদু প্রফেশনাল শিল্পী ছাড়া সচরাচর দেখা যায় না। সে গান শেখে কি না জানতে চাইলে সরাসরি স্বীকার করে বললো সে কখনও হারমোনিয়াম ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। সে সৌভাগ্য তার হয়নি। পরিবারের আয় অত্যন্ত সীমিত। এমনকি বাড়িতে ইলেকট্রিসিটিও নেই। কাজেই রেডিও, টিভি দেখারও সুযোগ নেই তাঁর। তাহলে এত সুন্দর কীর্তন কিভাবে শিখলো?(সে সেদিন কীর্তন শুনিয়েছিলো, রাই জাগো গো, জাগো শ্যামের মনমোহিনী, বিনোদিনী রাই )উত্তর… শুধু পূজার সময় মন্ডপের মাইক শুনে। এছাড়া স্কুলে বা কলেজ এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও মন দিয়ে দেখে দেখে। ভাইভা বোর্ড অভিভূত। জিজ্ঞেস করলাম হারমোনিয়াম কিনে দিলে সে গান শিখবে কি না। অমনি তাঁর চোখ ভিজে উঠলো। সে গান শিখতে চায়।
আমি জানি না মেয়েটি চাকরি পাবে কি না। যেহেতু চাকরি পাওয়ার জন্য শুধু ভালো গান বা আবৃত্তি নয়, বরং লিখিত পরীক্ষার স্কোর, ভাইবার অন্যান্য বিষয়ে ভাল করা, সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটা হারমোনিয়াম তো আমরা তাঁকে কিনে দিলে পারি। ভাইভা বোর্ডে বসেই একটা হারমোনিয়াম এর অর্ডার দেয়া হলো। আজ মেয়েটিকে ডেকে এনে তাকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটা হারমোনিয়াম উপহার দেয়া হলো। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মেয়েটি উপরের কথাগুলো বললো। ও হ্যাঁ, একটা গানও খালি গলায় গাইলো, আমার গানের মালা আমি করবো কারে দান…
কত বুনো ফুল যে এভাবে পড়ে আছে পথের ধারে, আমরা হয়তো তাদের নামও জানিনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031