আমাদের আদি সংস্কৃতি ও সাম্প্রতিক অপসংস্কৃতি

প্রকাশিত: ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৯, ২০২১

আমাদের আদি সংস্কৃতি ও সাম্প্রতিক অপসংস্কৃতি

মীরা মেহেরুন

আমাদের আদি সংস্কৃতি গুলোর দিকে একটু পেছন ফিরে তাকাই। যেমন–কবি গান, পালা গান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, যাত্রা পালা আরো বহুবিধ সংস্কৃতি ছিলো বাংলার অঙ্গন জুড়ে। যাত্রা পালা বাঙ্গালি জাতির সবচেয়ে বৃহৎ প্রেক্ষাপটে এক আদি সংস্কৃতি। সিনেমা এসে এ ভুখন্ডে তখনও পৌঁছায় নি, অষ্টাদশ শতক অর্থাৎ ১৭০০ সালে যাত্রা ধারণাটি ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশের বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে। বিভিন্ন তথ্য সূত্র মতে জানা যায়, অষ্টম ও নবম শতকে পালা গান ও পালার অভিনয় হতো। এসব পালা গান বা যাত্রা পালার সুরে সুরে উঠে আসতো সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার ইতিকথা। ইতিহাস ভিত্তিক, দেশপ্রেম মূলক , ভক্তিমূলক, যাত্রা পালার আবেদন ছিলো একেবারে অন্যরকম। এছাড়া পৌরাণিক, মিথ, রূপকথার গাঁথা নিয়ে যাত্রাপালার ও বেশ জনপ্রিয়তা ছিলো।
সাধারণত নবান্ন উৎসবের সঙ্গে এসব সংস্কৃতির একটি গভীর যোগসূত্র ছিল। অক্টোবর থেকে শুরু হতো পালা গান বা যাত্রা পালার আয়োজন।
আদিতে জমিদার বাড়িতে যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। পরবর্তীতে বিভিন্ন মেলায় বা এক্সিবিশনে যাত্রার আয়োজন থাকতো। আমরা খুব ছোট বেলায় যাত্রার আয়োজন দেখেছি এক্সিবিশনে। এসব নির্মল সংস্কৃতি তখনকার সহজ সরল মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলো যেন অপার আনন্দের উৎস আর উৎসবে।
ইউসুফ জুলেখা, লাইলীমজনু, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রাণী, রিক্সাওয়ালা, গরীবের মেয়ে, টিপু সুলতান, বনবিবি, খুদিরাম, আলতাবানু, সিরাজুদ্দৌলা, ওপরতলার মানুষ, সোনাভান, তিতুমীর, শাহজাহান, মধুবালা, বিন্দুমতি, আনারকলি, পুস্পমালা, ভেলুয়া সুন্দরী, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান এরকম হাজার হাজার রকমের যাত্রার আয়োজনের মাইকিং এর মাধ্যমে মহড়া চলত গ্ৰামে গঞ্জের পথে প্রান্তরে ।
১৮৬০-৭৮ সময়কালে ঢাকায় পালা কার ছিলেন কৃষ্ণকমল গোস্বামী। পরবর্তীতে মুকুন্দ দাস দেশপ্রেম, স্বদেশী, সমাজ সংস্কার মূলক, জাতি ভেদ বিরোধী, পণপ্রথা বিরোধী বক্তব্য ও কাহিনী ভিত্তিক যাত্রা পালা রচনা করেন। তাঁর রচিত স্বদেশী যাত্রা ইংরেজ শাসকদের রোষানলে পড়ে। পরবর্তীতে মনমোহন বসু, মীর মশাররফ হোসেন ও পালা লিখেছেন।
মানিকগঞ্জের আব্দুল করিম, নরসিংদীর জালাল উদ্দিন, হিরেন্দ্র কৃষ্ণদাস, মুন্সীগঞ্জের আরশাদ আলী, কেরানীগঞ্জের রফিকুল, পটুয়াখালীর মাস্টার সেকেন্দার আলী, খুলনার ডুমুরিয়ার এম এ মজিদ, নান্দাইলের কফিল উদ্দিন, মানিকগঞ্জ সদরের ডা. সদর আলীসহ অনেক যাত্রাপালাকার সেকালে মানুষকে উপহার দিয়েছেন এক সুস্থ বিনোদন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম চন্দ্র, সহ সমস্ত সাহিত্যিকদের সাহিত্যের মধ্যেও উঠে এসেছে যাত্রা সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট।
এসব সংস্কৃতি একদিকে যেমন ছিলো অত্যন্ত সমৃদ্ধ অপরদিকে সুস্থ, নির্মল, শুদ্ধ বিনোদন ভিত্তিক।
যাত্রাপালার দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা খুব জরুরি। প্রথমত পালার যে দৃশ্যের মাঝে কোনো অপরাধমূলক সিকোয়েন্স তৈরি হতো সেখানে হঠাৎ করে ‘বিবেক’ নামক একটি চরিত্রের উপস্থিতি ঘটতো যা কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দিতো এক ইতিবাচক পরিসমাপ্তির দিকে। এসব সংস্কৃতি তৎকালীন সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনস্তত্ব গড়তে সহায়ক হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পালা কারদের একটি আদর্শ ও প্রতিশ্রুতি ছিলো–তারা এ সংস্কৃতির ভেতরে কখনো কোনো অপসংস্কৃতি, অশ্লীলতা, যৌনতার অনুপ্রবেশ ঘটতে দেননি। মঞ্চ নাটকে যে পরিচ্ছন্ন তা আজও বিদ্যমান। তদুপরি যে কোথাও কখনো এসব ঘটেনি তা নয়। অশ্লীলতার দায়ে পরবর্তীতে অনেক যাত্রাপালার বিলুপ্তি ঘটেছে। আলোর পাশে যেমন অন্ধকার বিরাজমান তেমনি সবকিছুতেই ভালো মন্দ দুইই আছে।
বলা হয়ে থাকে সংস্কৃতি মানুষকে অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখে। এবং একটি সংস্কৃতি মূখী জাতিই পারে মূল্যবোধ ভিত্তিক একটি সুশীল সমাজ গড়ে তুলতে।
সমাজ কখনো পিছায় না। এগিয়ে যায় শিক্ষায়, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তথা সমস্ত কিছুতে।
প্রথমত; টিকটক, লাইকি তৈরি এবং এসব ভিডিও তৈরির পেছনের যে ইতিহাস ক্রমাগত উঠে আসছে তাতে এদেশের সাংস্কৃতিক বা সামাজিক অঙ্গনে কোন্ ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটেছে ?
দ্বিতীয়ত; সারাদিনের কর্মক্লান্তি শেষে কখনো কখনো বিনোদন প্রয়োজন যা পরবর্তীতে মানুষকে কর্মোদ্দীপ্ত করে তোলে। ডিজে পার্টি, পুল পার্টি কেন্দ্রিক যে অসুস্থ এবং নোংরা বিনোদন আমাদের যুব সমাজকে যেভাবে গ্ৰাস করছে সেখানে কোনো বিবেকের উপস্থিতি তো নেই বরং এসব সংস্কৃতি কে কেন্দ্র করে সংঘঠিত হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ যার চিত্র উঠে আসছে বিভিন্ন মিডিয়াগুলোতে। এ দায় কার? সমাজের দূর্নীতি গ্ৰস্ত পিতা-মাতার অবৈধ সম্পদের পাহাড়ে চড়তে গিয়ে নৈতিকতার স্খলনে পা ফসকে পড়ে যাচ্ছে যুব সমাজের একাংশ। অবিলম্বে লাগাম টানা দরকার এসব অবৈধ সম্পদের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা অপসংস্কৃতি গুলোর।
আমরা কোন্ যুবসমাজের কাছে রেখে যাচ্ছি ভবিষ্যত রাষ্ট্র ও সমাজ?

ছড়িয়ে দিন