আমাদের চন্দ্র কারিগর

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০২১

আমাদের চন্দ্র কারিগর

(শ্রদ্ধাঞ্জলি হুমায়ুন আহমেদের প্রতি)
লুতফুন নাহার লতা 

সময় কি ফিনিক্স পাখী, চোখের পলকে উড়ে চলে যায়! কতগুলো বছর হয়ে গেল তিনি নেই। আকাশের অনন্ত নক্ষত্রবীথি থেকে ঝরে গেলেন বড় প্রিয় মানুষটি। লেখক, সাহিত্যিক, নাট্যকার, গল্পকার, গীতিকার, চিত্রকর পরিচালক আর বৃক্ষপ্রেমী একজন মানুষ। আমার প্রথম সিরিজ নাটকের এক অলৌকিক কারিগর হুমায়ুন আহমেদ।
তাঁর নাটকে কাজ করার অনেক স্মৃতি। সেসব স্মৃতি ভিড় করে আসে মনে। হুমায়ুন ভাই মারা যাবার কয়েকদিন আগে সেবার ছেলেকে নিয়ে ইউরোপ ঘুরব বলে বেরিয়েছিলাম। লন্ডন জার্মানী হয়ে নরওয়েতে গেলাম, সেখান থেকে দিন তিনেক পরে রওনা হলাম লন্ডনের পথে। বাসা থেকে বের হব, টি ভি তে শোনা গেল হুমায়ুন আহমেদের অবস্থা খুবই খারাপ। আবার লেখক প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম মিডিয়াকে জানাচ্ছে পরিস্থিতি ভালর দিকে। আসলে কি হচ্ছে জানিনা। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে বেরিয়েছি। জানি লন্ডনে পৌঁছেই সঠিক খবর পাবো।
ঘন্টা দুই তিনেকের মধ্যে লন্ডনে পৌছে খবর পেলাম হুমায়ুন ভাই আর নেই। সেদিন ১৯ শে জুলাই। ক’দিন আগে এই জুলাইয়ের নয় বা দশ হবে। আমি নিউইয়র্ক থেকে বেরিয়ে পড়ার আগে একদিন গেলাম বেলভিউ হাসপাতালে তাঁকে দেখতে, কিন্তু তিনি যেখানে আছেন সেখানে সবাইকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে নার্সদের বলে কয়েও তাঁকে এক নজর দেখার জোর চেষ্টা করলাম। দেখা হল না। ততোক্ষণে আঁধার নেমেছে ম্যানহ্যাটানের রাস্তায়। নিয়নের আলোয় ধীর পায়ে একা একা ঘরে ফিরছি হঠাৎ মনে হল পিছন থেকে কেউ আমাকে ডাকছে ‘মিস মিলি!’ আমি চারিদিকে চেয়ে কাউকে দেখলাম না। বেলভিউ হাসপাতাল থেকে এফ ট্রেনের সাবওয়ে স্টেশান বেশ দূর। এই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে ফিরে যাচ্ছি একা। মন বলছে আর দেখা হবেনা এ জীবনে।
শেষ দেখা হয়েছিল জামাইকায় তাঁর বাসায়। সেদিন বাসন্তি পূজো। পরেছি বাসন্তি রঙের শাড়ী। হলুদ গাঁদা ফুলে সাজিয়েছি খোঁপা। পূজোর অনুষ্ঠানে মঞ্চের উপরে আমি। আমার একক পরিবেশনা চলছে। দূর থেকে দেখি মুনিয়া ঢুকছে। মুনিয়া মাহমুদ। আগেই কথা ছিল অনুষ্ঠান শেষে ওদের সাথে একসাথে যাব হুমায়ুন ভাইকে দেখতে। রাত তখন বেশ হয়েছে। বাইরে কেমন উদাস হাওয়া বইছে সেদিন। কেবল মনে হচ্ছে কেমন দেখব হুমায়ুন ভাইকে। পার্সোনস বুলোভার্ড পেরিয়ে আরো কিছুটা গিয়ে গাড়ি পার্ক করা হল। পিছনের ছোট্ট গেট পেরিয়ে বাসায় গিয়ে দেখি, বসার ঘরে মায়ের কোলে নিষাদ কেঁদে চলেছে কারন ছোট ভাই নিনিত তাকে ধাক্কা মেরেছে। নিনিত দূরে দাঁড়িয়ে অভিনয় করে দেখাচ্ছে সে কেমন করে ভাইকে মেরেছে। লজ্জা পেয়ে নিষাদ মার কোল থেকে নেমে দৌড়ে গেল বাবার কাছে। ভারী ক্লান্ত শাওন। কত কত রাত সে ভালো করে ঘুমায় নি। ওর মুখের দিকে চেয়ে মন খারাপ হল। দিনের পরে দিন ওই মেয়েটির উপর দিয়ে বয়ে চলেছে এক অকালবৈশাখী।
হুমায়ুন ভাই শোবার ঘরে। সম্ভবত দেশে কারো সাথে কথা বলছেন। আমি এসেছি সে খবর পেয়েছেন কিনা বোঝা গেল না। কিছুক্ষণ পরে এক হাতে নিষাদকে পেটের উপর বেঁধে নিয়ে অন্যহাতে লুঙ্গির গিট ধরে, খালিগায়ে,খালিপায়ে এসে দাঁড়ালেন আমাদের সামনে। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই এক রকম জোরেই হেসে উঠলাম। সারা মাথা, মুখ, বুক, পেট বেয়ে নামছে দুধের ধারা। সব সাদা। বাবার সাথে বনিবনা না হওয়ায় ছোট্ট নিনিত দুধের বোতল ছুড়ে মেরেছে আর তা খুলে গিয়ে বাবার মাথায় পড়ে এই অবস্থা।
আমরা সবাই মিলে তাকে মুছানোর চেস্টা করলাম। উনি এক মুখ হাসি ছড়িয়ে আমার দিকে সরাসরি চেয়ে বললেন ‘মিস মিলি আপনার কি কোনোদিন বয়স বাড়বে না!’ সাথে সাথে সমস্ত আকাশ উঠলো হেসে, পুরো পরিবেশ গেলো বদলে। কোথায় ভেবেছিলাম হুমায়ুন ভাইকে দেখে কেমন করে কান্না লুকিয়ে হেসে হেসে কথা বলব। মনে মনে তার একটা রিহার্সাল মত ভেবেও রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম হুমায়ুন ভাইকে বলব ‘এই সব দিনরাত্রির বাবলু’র কথা। তার সেই বিখ্যাত ডায়লগ ‘হৈয়ার বাড়ি গেছিলাম দুধ ভাত দিছিল দুধভাত খাইছিলাম!’ সেই কথা। বাবলু এই শহরেই থাকে, অনেক বড় হয়ে গেছে —এইসব।
নাহ সে কথা বলার আর অবকাশ রইল না। আমিও হেসে বললাম হ্যাঁ হুমায়ুন ভাই সেই যে আপনি আমাকে মিস মিলি বানিয়েছিলেন বয়স ওখানেই আটকে আছে। কথায় কথায় রাত বেড়েছে আরো। এবার ঘরে ফেরার পালা। বের হয়ে আসার আগে দরজা পর্যন্ত এসে দাঁড়ালেন আমাদের পিছু পিছু—–
আমার মনে পড়ল ১৯৮৮ তে আমরা যখন বহুব্রীহি নাটকের কাজ করছি তখন টেলিভিশনে ‘রাজাকার’ শব্দটি বলা যেত না। কিন্তু কি অসম দৃঢ়তায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের কালা কানুন ভেঙ্গে পাখীকে চরিত্র বানিয়ে সেই পাখীর মুখ দিয়ে রাজাকার আলবদর পাকিস্তানের দোসরদের বিরুদ্ধে সারা জীবনের ঘৃনা ও ধিক্কার জানিয়ে দিলেন। বাংলার মানুষ আবার দীর্ঘকাল পরে জ্বলে উঠল ঘৃনায়। ফিরে যেতে যেতে চোখ বেয়ে আমার জলের ধারা নামল। বিপন্ন বাসনা তবু তাঁর মঙ্গল কামনায় নতজানু হল। আমি যেনো সারা আকাশ জুড়ে থৈ থৈ পূর্ণিমার ধু ধু জোতস্নায় হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টিয়ার মুখে সমস্বরে সেই ধিক্কারের স্লোগান শুনতে পেলাম। তুই রাজাকার! তুই রাজাকার! তুই রাজাকার !!!
লন্ডনে মহা সমারোহে চলছে অলিম্পিকের আয়োজন। সারা পৃথিবী থেকে ক্রীড়ামোদীরা এসে ভরে গেছে এই শহর। তিল ধারনের ঠাই নেই এমন অবস্থা। ২০ সে জুলাই সারাদিন কেটে গেল বাকিংহাম প্যালেসের সামনে, লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কোয়ার, লন্ডন টাওয়ার আর লন্ডন ব্রীজের আশেপাশে, হুমায়ুন ভাই নেই সেই সংবাদের ভার বুকে নিয়ে। এবারের ইউরোপ যাত্রায় আমার ছেলে সিদ্ধার্থ আমার সঙ্গী। তার লিস্ট অনুসারে অনেক কিছু দেখার ইচ্ছে থাকলেও মায়ের মন খারাপের কারনে এবার তা দেখা হল না বলে তার মন একটু খারাপ হল।
কথা ছিল ফ্রাংকফুর্ট, বার্লিন হয়ে লন্ডনে এসে কয়েকটি দিন থাকব আর সে সব ঘুরে ঘুরে দেখবে। কিন্তু এর মধ্যে থেকে তিন, চার দিনের জন্যে আবার নরওয়েতে যাবার প্লান করায় সেটা আর হল না। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল পিকাডিলি সার্কাসে একটি সন্ধ্যা কাটানোর। লন্ডনে এলে সব সময় আমার প্রিয় হ্যারডস থেকে এক চক্কর না ঘুরে আসলে আমার মনেই হয় না, লন্ডনে এলাম। মনের অতৃপ্তি মনে রেখে আর আমার দিকে কপাল কুচকে চোখ সরু করে তাকিয়ে পরদিন হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে সে ফিরে গেল নিউইয়র্ক আর আমি চললাম বাংলাদেশে।
সারাটি পথ মনে পড়লো কত কথা। কত বছর নাটক করিনি অথচ চোখ বন্ধ করলেই আমার চোখের সামনে আজো বাংলাদেশ টেলিভিশনের তিন নাম্বার স্টুডিওর ক্যামেরা গুলোর লালবাতি জ্বলে ওঠে। সেখানে আমি কেবল এইসব দিনরাত্রি’র সেট দেখতে পাই।
২২ জুলাই রোববার সকালে প্লেনের জানালা দিয়ে লাল রঙের মাটি দেখা গেলে আমার আত্মা বরাবরের মত হু হু করে কেঁদে উঠল। ঐ তো, ঐ তো আমার দেশের মাটি। আমার দেশ। প্লেন রানওয়ে স্পর্শ করল, আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌঁছুলাম। এয়ারপোর্টের ঝামেলা শেষ করে বের হবার সময় একজন অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম ‘আজ তো নিউইয়র্ক থেকে লেখক হুমায়ুন আহমেদের আসার কথা, উনি কি এসেছেন?’ ‘কিছু একটা সমস্যা হয়েছে ম্যাডাম, সেজন্য আজ নয়,উনি কাল সকালে এসে পৌঁছবেন।’
দেশে যখনি যাই প্রতিবারের মত এবারেও এয়ারপোর্টে বিশেষ সম্মান, বিশেষ যত্নের এতোটুকু ত্রুটি হল না। আমাকে বসিয়ে আমার নাটকের কথা বলতে কেউ ভুললেন না। এবারে তার সাথে যুক্ত হল আমার অধিকাংশ নাটকের প্রিয় নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের নাম। কেমন করে তারা অধীর অপেক্ষায় বসে থাকতেন আমাদের নাটকের জন্য। হুমায়ুন আহমেদের প্রথম টেলিভিশন সিরিজ নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ প্রচারিত হত মঙ্গলবারে। সেদিন সন্ধ্যার পরেই ঢাকা শহর শুন শান হয়ে যেতো। সবাই নাটক দেখবে বলে ঘরে ফিরে আসত তাড়াতাড়ি। এমন অনেক কথার ফাঁকে ফাঁকে সবাই ছল ছল চোখে হুমায়ুন আহমেদের আত্মার শান্তি কামনা করলেন। একটি ছোট্ট জীবনে এতো মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছে এ এক অপার বিস্ময়। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সাদা শাড়ী পরে রেডি হলাম শহিদ মিনারে যাবার জন্য। প্রতি বছর এই সময়টাতে আমি দেশে আসি। আর শহিদ মিনারে ছুটে যেতে হয় কারো না কারো জন্যে বিদায়ের এই মহাসমারোহে। গত বছর এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম অনন্যসাধারন দুই সংস্কৃতি কর্মী, ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের অকাল প্রয়ানে। আজ আবার প্রিয় হুমায়ুন ভাইয়ের জন্যে।
বহুদূর থেকে হুমায়ুন ভাই এসেছেন আজ সকালে। সারা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পড়েছে শহিদ মিনারে। লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার, নাট্য ব্যাক্তিত্ব, অভিনেতা, অভিনেত্রী, ছাত্র, শিক্ষক, সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, সকল মিডিয়া আর হাজার হাজার মানুষ এসেছে স্রোতের মত সারা বাংলাদেশ থেকে। লোকে লোকারন্য। সকল টিভি চ্যানেল গুলো এসে তাদের অবস্থান নিয়েছে অনেক আগেই। ক্রেনের মত লম্বা স্কাই স্ক্র্যাপারের সাহায্যে ক্যামেরাম্যান উপর থেকে ক্যামেরা প্যান করে স্ক্রল আপ বা স্ক্রল ডাউন করে ছবি নিচ্ছেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কর্মীদের কেউ কেউ ধারাবর্ননা দিচ্ছেন।
সব কটি টি ভি চ্যানেল সরাসরি সমপ্রচার করছে এই বিদায় উৎসব। হ্যাঁ উৎসব ই তো। মানুষের স্রোত চলেছে সারি দিয়ে। প্রিয় লেখক, প্রিয় নাট্যকার, প্রিয় পরিচালক, প্রিয় মানুষ হুমায়ুন আহমেদকে শেষ বারের মত দেখতে। তাদের হৃদয় নিংড়ান শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে। হুমায়ুন আহমেদের প্রিয় ফুল কদম। যত দূর চোখ যায় প্রায় সবার হাতে কদম। সেই সাথে বকুল, জুঁই, বেলী, দোলনচাঁপা সহ নানা রকম সাদা ফুলে ওদের দু’হাত ভরা। জীবনে তিনি যেমন উজাড় করে দিয়ে গেছেন তার পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের তেমনি আজ ওরাও প্রান উজাড় করে এনেছে ওদের পরম ভালোবাসা একজন হিমু’র জন্যে।
ওনাকে রাখা হয়েছে একটি অস্থায়ী মঞ্চের মত বানিয়ে সাদা শামিয়ানা দিয়ে ঘেরা। তার পেছনে আর একটি শামিয়ানার তলায় হাজারো ভীড়ের মধ্যে আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে পাথরের মত বসে আছেন ওনার মা বেগম আয়েশা ফয়েজ। মায়ের পাশে দাঁড়ানো ওনার ভাই ডঃ জাফর ইকবাল। মায়ের মুখোমুখি শাওন। শাওনকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে অভিনেত্রী তানিয়া। কত যে মানুষ সে দৃশ্য যে না দেখেছে তাকে তা বলে বোঝান যাবে না।
আমি গিয়ে দাঁড়ালাম হুমায়ুন আহমেদের মায়ের পাশে। ওনাকে জড়িয়ে ধরলাম শুধু, কিছুই বলতে পারলাম না। অথচ বলতে চেয়েছিলাম, ‘খালাম্মা আপনি তো কোন সাধারন মা নন আপনি ৭১এ দেশের জন্য স্বামীকে হারিয়েছেন। আজ জননন্দিত সন্তান হারিয়েছেন, আপনি হুমায়ুন ভাইয়ের মা, আপনাকে তো ভেঙ্গে পড়লে চলবে না।’
শাওনের দিকে তাকানো যায় না এই চার পাঁচ দিনে সে যেনো ঝরে পড়া একটি শুকনো পাতার মত ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সে থেকে থেকে কেঁদে উঠছে ,অনর্গল কথা বলছে। আমাকে দেখে আবার সে গুঙিয়ে উঠলো। হাত দু’খানি ধরে কেবল বললাম ‘শাওন, শান্ত হও, শান্ত হও’
হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর আগে ওনার শেষ ইচ্ছা কি ছিল বা কোথায় উনি সমাহিত হতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়নি তখনো। সেই বিতর্কে, সারা পরিবার, সারা দেশের মানুষ ,সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা অগনিত হুমায়ুন ভক্ত দ্বিখন্ডিত। জাফর ভাইয়ের সাথে কথা বলে বুঝলাম পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে ওনারা বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে চান।।
হুমায়ুন ভাইয়ের কফিনের পাশে সৈয়দ শামসুল হক, রামেন্দু মজুমদার ও অন্যান্যের সাথে সাদা কাগজের মত দাঁড়িয়ে আছে নোভা্‌, শিলা আর কালো ফ্রেমের চশমা পরা নুহাস। নুহাস কিছুক্ষন পর পর বাবার কফিনের উপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে। আমি শিলাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলে শীলা তার ভার ছেড়ে দিয়ে কেঁদে উঠলো। নোভাকে খুঁজছিলাম আমি নোভার কাছেই। মাথায় ওড়না বেঁধে রাখায় আমি ওকে চিনতেই পারিনি। বিপাশা আমেরিকা থেকে এখনো এসে পৌছায়নি। একটা গভীর বেদনা বুক চিরে ওঠে বারে বারে। ওরা তিন বোন আমাদের কত প্রিয় ছিল। ওরা ‘এইসব দিনরাত্রি’ র সেটে এসে বসে বসে খেলা করত। আমরা ওদের সবাইকে ডাকতাম টুকটুকি বলে। আমাদের ঐ নাটকে ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল যার নাম টুকটুকি। ‘বহুব্রীহি’ নাটকের সেটে ওরা এলে আনন্দ বয়ে যেতো। এই নাটকের মা ( আলেয়া ফেরদৌসি ) আমাদের জন্য খাবার বানিয়ে আনতেন। হুমায়ুন ভাইয়ের তিন মেয়ে, পরিচালক নওয়াজিশ আলী খানের ছেলে তোরসা আর ছোট্ট মেয়ে রেহনুমাকে সাথে নিয়ে আমরা সবাই সেই খাবার খুব মজা করে করে খেতাম। হুমায়ুন ভাইও বাদ পড়তেন না। আর নুহাস,সে তো সেদিন হল, ও আমার ছেলে সিদ্ধার্থের কয়েক মাসের ছোট।
সময় শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। ঈদ গা মাঠে নামাজে জানাজা হবে সেখানে যেতে হবে। কেউ এসে জানান দিলে সবাই গিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়ালাম তার কফিনের পাশে। ফুলে ফুলে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা জুড়ে। এই সব মূহুর্তে মন কেমন এক অপার্থিব শূণ্যতায় ভেসে বেড়ায়। কফিনের উপর থেকে একটি তাজা বকুলের মালা তুলে নিলাম হাতে। দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিরব। ‘হুমায়ুন ভাই আপনার কি মনে হচ্ছে আপনার প্রিয় বই তারাশংকরের ‘কবি’ থেকে সেই উদ্ধৃতি “জীবন এতো ছোট কেনে!”
হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে এগিয়ে গেল তাঁর শেষযাত্রা। পিছনে অগনিত মানুষের মিছিল। ক্রন্দন। হাহাকার। ফুল। পায়ের কাছে পড়ে থাকা বর্ষার প্রথম কদম। কিছুক্ষনের মধ্যে আস্তে আস্তে শুন্য হয়ে এলো শহিদ মিনার। আজ দাফন হবে না। আজ রাতে তিনি থাকবেন বারডেমের হিমঘরে। কাল পারিবারিক সিদ্ধান্ত হলে তারপর শেষ হবে এই পার্থিব বিদায়ের আয়োজন।
অপার্থিব এক যাত্রায় তিনি একাকী চলেছেন সেই আনন্দধামে। আমার হাতের ভেতর তাঁর কফিন ছোঁয়া শেষ চিহ্ন একটি বকুলের মালা। ছোট নয় তাঁর বিশাল জীবনের সুষমায় ভরা এই ফুল। আমার মনের তেপান্তরে আমি যেনো শুনতে পাচ্ছি সেই অনন্তধামের পানে ছুটে চলা এক স্বর্গ সংগীত গীত হতে। তা যেন সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিব্যাপ্ত হয়ে কী এক অজানা ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দিয়ে গেলো আমার উপলব্ধির উপকূলে। আমি শহিদ মিনার থেকে পা বাড়ালেম এই জেনে ‘তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
চলে গেছে সবাই। শহীদ মিনারের শূণ্য সিঁড়িতে পড়ে আছে গুটিকয় কদম। আমি খুব ক্লান্ত। দীর্ঘ জার্নিতে জেট ল্যাগ কাটেনি আমার। ফিরে যাচ্ছি ঘরে। না এদেশে তো আমার ঘর নেই। ফিরে যাচ্ছি চিরচেনা এই দেশে আমার ঘরহীন ঘরে। আবার সেই ডাক শুনতে পেলাম ‘মিস মিলি!’ কেমন যেনো নিশিতে পাওয়া মানুষের মত আবারো আমি চমকে উঠলাম। আমার চারিদিকে চেয়ে রইলাম। কোথাও কেউ নেই।

চন্দ্র কারিগর (দুই)

২০১২’র জুলাই মাস। লন্ডনে মহা সমারোহে চলছে অলিম্পিকের আয়োজন। সারা পৃথিবী থেকে ক্রীড়ামোদীরা এসে ভরে গেছে এই উজ্জ্বল উচ্ছল নগরী। তিল ধারনের ঠাই নেই এ শহরে। নরওয়ে থেকে লন্ডনে নেমেই হুমায়ুন ভাইয়ের চলে যাবার সংবাদে বরফ জমা জলপ্রপাতের মত স্তব্ধ হয়ে আছি। সব কিছু করছি কেমন ঘোর লাগা মানুষের মত। মনে হচ্ছে কেউ আমাকে একটা টাইম মেশিনে করে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ১৯৮৫’র বাংলাদেশ টেলিভিশনের তিন নাম্বার স্টূডিওতে। আমি দেখতে পাচ্ছি হুমায়ুন ভাই আমাদের সেটের একপাশে চেয়ারে বসে বসে দেখছেন ডলি জহুর আর বুলবুল আহমেদের ছোট্ট মান অভিমানের অংশটি ক্যামেরায় ধারন করার দৃশ্য। নূর ভাই আর আমি সেটের কোনায় দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে নাটকের ডায়লগ মুখস্থ করছি। ছোট্ট টুনি দাদুর ঘরের খাটের উপর একপাশে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবলু ফাঁক পেলেই ক্যামেরার সামনে দিয়ে দৌড়া দৌড়ি করছে আর ক্যামেরার রেকর্ডিং বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আবুল খায়ের ভাই, দিলারা জামান আপা, ওরা বাবলুকে সামলাচ্ছেন। মুস্তাফিজ ভাই উপরের প্যানেল থেকে চিৎকার করে বলছেন ‘কাট।’
পরদিন ২০ সে জুলাই সারাদিন কেটে গেল বাকিংহাম প্যালেসের সামনে, লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কোয়ার, লন্ডন টাওয়ার আর ব্রীজের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে। এতো আলো চারিদিকে, জুলাই মাসের লন্ডনে আকাশ থেকে সোনা ঝরে পড়ে। সব কিছু অসহ্য লাগছে। সবকিছু নির্লজ্জ মনে হচ্ছে। কী আশ্চর্য হুমায়ুন ভাই নেই, বাংলাদেশের অগনিত কিশোরের হিমু নেই। মিসির আলি নেই। বাংলাদেশের গল্পের যাদুকর নেই অথচ এই শহর তবুও ছুটে চলেছে অবিরাম। মানুষ হাসছে! মানুষ খাচ্ছে! লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের সামনে গার্ড বদল হচ্ছে উহ! বিষাক্ত হয়ে গেল এই আলো এই জল। আর আমার পোড়ামুখি মন! সেও প্যালেসের সামনের গার্ডেনে সাদা নরম কোমল রাজহাসের মৃদু সন্তরণ দেখে ক্ষণিকের জন্যে মুগ্ধ বিস্ময়ে সব ভুলে গেল!
মুহূর্তেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল আবার। হু হু কান্না আমাকে চৌচির করে দিতে চাইছে। আমার চোখে মুখে নাকে ঠোঁটে চামড়ায় চামড়ায় সেই কান্না দানা বেঁধে রইল। আসেপাশে কেউ নেই যার সাথে এই বেদনার ভার ভাগ করে নেই। লন্ডনের টিউবে করে চেনা পথে ফিরব বলে ভুল করে নেমে গেলাম অন্য কোন অচেনা স্টেশানে।
এবারের ইউরোপ যাত্রায় আমার ছেলে সিদ্ধার্থ আমার সঙ্গী। তার লিস্ট অনুসারে অনেক কিছু দেখার ইচ্ছে থাকলেও আমার মন খারাপের কারনে আর তার কিছুই দেখা হল না। কথা ছিল ফ্রাংকফুর্ট, বার্লিন হয়ে লন্ডনে এসে কয়েকটি দিন থাকব আর সে সব ঘুরে ঘুরে দেখবে। কিন্তু এর মধ্যে থেকে তিন, চার দিনের জন্যে আবার নরওয়েতে যাবার প্লান করায় এবং ফেরার পথে হুমায়ুন ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদে সে সব কিছু আর হল না।
আমারও খুব ইচ্ছে ছিল সোহো বা পিকাডিলি সার্কাসে একটি সন্ধ্যা কাটানোর। লন্ডনে এলে সবসময় সেজে গুঁজে আমার প্রিয় হ্যারডস থেকে এক চক্কর না ঘুরে আসলে, আমার মনেই হয় না, লন্ডনে এলাম। সিদ্ধার্থ মনের অতৃপ্তি মনে রেখে আমার দিকে কপাল কুচকে চোখ সরু করে তাকিয়ে পরদিন হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে, ফিরে গেল নিউইয়র্ক আর আমি টিকেট বদলে নিউইয়র্কের বদলে চললাম বাংলাদেশে। হঠাত কেন আমি দেশে যাচ্ছি! কথা কিন্তু ছিলনা তেমন। এবার শুধু ইউরোপ ঘুরে আমেরিকায় ফিরে যাব সেই কথা ছিল। আমি চলেছি ঢাকায়। কেউ কি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে!
প্লেনে বসে আছি। সত্যিই আমি দেশে যাচ্ছি। একরকম হুমায়ুন ভাইয়ের সাথেই। সারাটি পথ মনে পড়লো কত কথা। কত বছর নাটক করিনি অথচ চোখ বন্ধ করলেই আমার চোখের সামনে আজো তিনটি ক্যামেরার লালবাতি জ্বলে ওঠে। ১৯৯৬ মে মাসে নিজের জীবন বাজী রেখে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষার জন্য ঢাকার প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদের দূর্গ গড়ে তুলেছিলাম। নেমেছিলাম রাজপথে। সেই ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষা পেয়েছিল যখন ইলেকশানে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলো। ওরা বেঁচে আছেন। ওরা দেশে আছেন। এই ক্ষুদ্র আমি ওদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বাজী করে রাজপথে নেমেছিলাম। সেকথা অজানা নয় কারো ১৯৯৬তে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের তো বটেই অথচ দেশের কাছে,সরকারের কাছে আমি রয়ে গেলাম অবহেলিত, মূল্যায়নহীন। যে দেশ ও তার মানুষের জন্য আমার কতনা হাহাকার সেই প্রিয় স্বদেশের সীমানা ছেড়ে, দেশান্তরী হয়েছিলাম আমার পাঁচ বছরের একমাত্র সন্তান সিদ্ধার্থকে নিয়ে। পেছনে ফেলে গেলাম আমার জননী, জন্মভূমি। আমার কর্মক্ষেত্র, বাংলাদেশ রেডিও, টেলিভিশন, আর আমার গভীর ভালোবাসার শেকড়, আমার নাটক।
১৯৯৭ তে আসবার আগে হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। নুহাস চলচ্চিত্রের অফিসে আমাকে ডেকে জানতে চাইলেন কেন আমি চলে যেতে চাইছি। উনি চেয়েছিলেন দেশে থেকে আমি আরো ভাল ভাল কাজ করি। সত্যি কথা, হুমায়ুন ভাই চাননি আমি চলে যাই। তবু আমাকে সিদ্ধান্তে অবিচল দেখে বলেছিলেন আমেরিকাতে যদি চলেই যাই আর আমি উচ্চতর পড়াশুনা করতে চাই, সেটা যেন করি। সম্ভব হলে উনি যোগাযোগে সাহায্য করবেন। হুমায়ুন ভাইয়ের সাথে দেশে সেই শেষ দেখা।
লন্ডন থেকে ঢাকা খুব দীর্ঘ পথ নয়। তবু সময় আর কাটছেনা। কত কি যে এলোমেলো ভাবছি! আচ্ছা হুমায়ুন ভাই কিভাবে আসবেন! নিশাদ বা নিনিতকে কোলে নিয়ে প্লেনের ভি আই পি সীটে বসে!বসতে বসতে পা টন টন করলে কি কিছুক্ষন প্লেনের ভিতরে সীটের পাশে আইল ধরে হাঁটাহাঁটি করবেন? দীর্ঘ পথ, সেই নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা। হুমায়ুন ভাই হয়ত কিছুক্ষন পর পর শাওনকে বলবেন আর কত ক্ষণ লাগবে কুশুম! হিসেব মত ২২ জুলাই রোববার সকালে আমি ঢাকায় যখন পৌঁছবো, তখন হুমায়ুন ভাইও নিউইয়র্ক থেকে এসে এয়ার পোর্টের ইমিগ্রেশান সামলাবেন। জানি উনি আসবেন কার্গোতে। একই প্লেনে অন্যরা যখন উপরে সীটে বসে আসবেন হুমায়ুন ভাই তখন ঘুমিয়ে থাকবেন কার্গোতে অসাড়। সেই একই পথ দিয়ে ফিরবেন যে পথ দিয়ে এই তো কিছুদিন আগেই তিনি গিয়েছিলেন। এই কথা ভাবা মাত্রই আমার বুকের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে ব্যথার প্লাবন বয়ে যাচ্ছে। আমি কিন্তু কাঁদছি না ।
প্লেনের জানালা দিয়ে লাল রঙের মাটি দেখা গেলে আমার আত্মা বরাবরের মত হু হু করে উঠল, ঐ তো ,ঐ তো আমার দেশের মাটি। আমার দেশের রাঙা মাটি! প্লেন রানওয়ে স্পর্শ করল, আমি লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌছুলাম। এয়ারপোর্টের ঝামেলা শেষ করে বের হবার মুখে একজন অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম ‘আজ তো নিউইয়র্ক থেকে লেখক হুমায়ুন আহমেদের আসবার কথা তাই না! উনি কি পৌছে গেছেন?’ জবাবে উনি যা বললেন তাহল কিছু একটা সমস্যার জন্য আজ এসে পৌঁছবেন না, তবে কাল সকালে উনি আসবেন।
দেশে যখনি যাই প্রতিবারের মত এবারেও এয়ারপোর্টে বিশেষ সম্মান, বিশেষ যত্নের এতোটুকু ব্যত্যয় হল না। আমাকে বসিয়ে আমার নাটকের কথা বলতে কেউ ভুললেন না। এবারে তার সাথে যুক্ত হল আমার অধিকাংশ নাটকের প্রিয় নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের নাম। কেমন করে তারা অধীর অপেক্ষায় বসে থাকতেন আমাদের নাটকের জন্য। প্রথম টেলিভিশন সিরিজ নাটক ‘এই সব দিন রাত্রী ‘ প্রচারিত হত মঙ্গলবারে। সেদিন সন্ধ্যার পরেই যাদুকর হুমায়ুন আহমেদের যাদুতে ঢাকা শহর সুনসান হয়ে যেতো, সবাই কাজসেরে ঘরে ফিরতেন নাটক দেখবে বলে। এমন অনেক কথার ফাঁকে ফাঁকে এয়ারপোর্টের মানুষ গুলোও ছল ছল চোখে দূরে চেয়ে থাকেন।
বাড়ি থেকে ভাইয়ের গাড়ি এসেছে নিতে। এয়ারপোর্ট রোড ধরে ঘরে ফিরছি। ট্রাফিক, মানুষ আর কোলাহল ভেদ করেও কড়া রোদ্দুর আমাকে সূর্যস্নান করিয়ে দিচ্ছে কিন্তু কি আশ্চর্য আমার কেবলই মনে হচ্ছে এ সূর্য নয়, রোদ্দুর নয়, এ চাঁদের আলো। মনে হচ্ছে সেই
যে গান, হুমায়ুন ভাই লিখেছিলেন, ওই যে ‘চাঁদনি পসরে কে আমায় স্মরণ করে কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে। তাহারে চিনিনা আমি সে আমারে চিনে।’

চন্দ্র কারিগর (তিন)

খুব ভোরের দিকে আজানের সুরে একটা অনন্ত কষ্টের ভেতর দিয়ে একটু একটু করে ঘুম ভাঙল। বুকের ভেতরটা মুচড়ে মুচড়ে নিঙড়ে নিতে থাকল। কেমন যেন একটা হাহাকার নিয়ে সকাল হল। সূর্য উঠেছে। চারিদিক ঝলমল করছে। তবু মনে হচ্ছে কি যেন নেই। কি যেন নেই।
বেলা বাড়ছে। দ্রুত বয়ে যাচ্ছে সময়। হুমায়ুন ভাই নিউইয়র্ক থেকে এসে পৌঁছেছেন। টিভিতে সরাসরি তা দেখাচ্ছে। শহিদ মিনারে আসতে আসতে প্রায় দুপুর। প্রতিবছর এই সময়টাতে আমি দেশে আসি আর প্রায়ই শহিদ মিনারে ছুটে যেতে হয় কারো না কারো জন্যে বিদায়ের আয়োজনে। গত বছর এখানে এসে দাঁড়িয়েছিলাম অনন্যসাধারন দুই সংস্কৃতি কর্মী, ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের অকাল প্রয়ানে। এবার এখানে হুমায়ুন আহমেদ।
বহুদূর থেকে হুমায়ুন ভাই এসেছেন। সারা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পড়েছে শহিদ মিনারে। লেখক, কবি, শিল্পি, সাহিত্যিক, নাট্যকার , নাট্য ব্যাক্তিত্ব, ছাত্র, শিক্ষক, সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, সকল মিডিয়া আর হাজার হাজার মানুষ এসেছে স্রোতের মত সারা বাংলাদেশ থেকে। লোকে লোকারন্য। সকল টিভি চ্যানেল গুলো এসে তাদের অবস্থান নিয়েছে অনেক আগেই। ক্রেনের মত লম্বা স্কাই স্ক্র্যাপারের সাহায্যে ক্যামেরাম্যান উপর থেকে ক্যামেরা প্যান করে স্ক্রল আপ বা স্ক্রল ডাউন করে ছবি নিচ্ছেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কর্মী কেউ কেউ ধারাবর্ননা দিচ্ছেন।
সব কটি টি ভি চ্যানেল সরাসরি সমপ্রচার করছে এই বিদায় উৎসব। হ্যাঁ উৎসবই তো, মানুষের স্রোত চলেছে সারি দিয়ে প্রিয় লেখক, প্রিয় নাট্যকার, প্রিয় পরিচালক, প্রিয় মানুষ হুমায়ুন আহমেদকে শেষ বারের মত দেখতে। তাদের হৃদয় নিংড়ান শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে। হুমায়ুন আহমেদের গল্প পড়ে পড়ে সবার জানা তাঁর প্রিয় ফুল কদম। যত দূর চোখ যায় বেশীর ভাগ লোকের হাতে হাতে এক গুচ্ছ করে কদম। সেই সাথে বকুল, জুঁই, বেলী, দোলনচাঁপা সহ নানা রকম সাদা ফুলে ওদের দুহাত ভরা। এ এক অপার্থিব দৃশ্য। জীবনে তিনি যেমন উজাড় করে দিয়ে গেছেন তার পাঠকদেরকে তেমনি আজ ওরাও প্রান উজাড় করে এনেছে ওদের পরম ভালোবাসার পাত্র এক চন্দ্র কারিগরের জন্যে। আসলেই তো উনি চান্দের কারিগর। ওনাকে কল্পনার চোখে দেখি দীঘি লীলাবতীর জলে উনি গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নায় ভাসিয়েছেন চান্দেরই সাম্পান।
হুমায়ুন আহমেদকে রাখা হয়েছে একটি অস্থায়ী মঞ্চের মত বানিয়ে তাতে দুগ্ধ ধবল শামিয়ানা দিয়ে ঘিরে। তার পেছনে একটু ডানে আর একটি শামিয়ানার তলায় হাজারো ভীড়ের মধ্যে আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে পাথরের মত বসে আছেন ওনার মা। মুখোমুখি শাওন। শাওনকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে অভিনেত্রী তানিয়া। মায়ের পাশে দাঁড়ানো ডঃ জাফর ইকবাল। এছাড়াও কত যে মানুষ! সে দৃশ্য যে না দেখেছে তাকে তা বলে বোঝান যাবে না।
আমি গিয়ে দাঁড়ালাম হুমায়ুন আহমেদের মায়ের পাশে। ওনাকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে রইলাম। কত কথা বলতে চাই কিন্তু কে যেনো আমার কন্ঠ রোধ করে আছে, কিছু বলতে পারছি না। মনে মনে বলছি ‘খালাম্মা আপনি তো কোন সাধারণ মা নন, আপনি হুমায়ুন ভাইয়ের মা, আপনাকে তো ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। ৭১এ দেশের জন্য স্বামীকে হারিয়েছেন আজ দেখেন কেমন জননন্দিত সন্তান আপনার!’ কিন্তু না কিছুই বলিনি।
শাওনের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ১৯ থেকে ২৩ আজ এই চার পাঁচ দিনে সে যেনো ঝরে পড়া একটি শুকনো পাতার মত ফ্যাকাশে! সে থেকে থেকে কেঁদে উঠছে ,অনর্গল কথা বলছে। আমাকে দেখে হাত বাড়িয়ে আবার সে গুঙিয়ে উঠলো। আমি তার হাত দুখানি ধরে রইলাম বোবার মত দাঁড়িয়ে রইলাম। রামেন্দু দা, কোন এক টিভি কে ইশারা দিলেন আমার কাছে আসতে তাঁর বক্তব্যের পরে, একটি তরুন মেয়ে কাছে এগিয়ে এলো- আপা আপনি কিছু বলবেন! মেয়েটির দিকে চেয়ে মনে হল সে খুব বিরক্ত এবং সম্ভবত আমাকে চেনেও না। আমি সরাসরি তার মুখের দিকে চেয়ে মাথা নাড়লাম, বললাম, ‘না, ইচ্ছে করছে না।’
হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর আগে ওনার শেষ ইচ্ছা কি ছিল বা কোথায় উনি সমাহিত হতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত হয়নি তখনো। সেই বিতর্কে, সারা পরিবার, সারা দেশের মানুষ, সারা পৃথিবীতে ছড়িতে থাকা অগনিত হুমায়ুন ভক্ত দ্বিখন্ডিত। জাফর ভাইয়ের সাথে কথা বলে বুঝলাম পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে ওনারা বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে চাইছেন।
কফিনের ওপাশে সাদা কাগজের মত দাঁড়িয়ে আছে নোভা, শিলা আর কালো ফ্রেমের চশমা পরা নুহাস। মাঝখানে সৈয়দ শামসুল হক। নুহাস কিছুক্ষন পর পর বাবার কফিনের উপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে। আমি শিলাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিলে শীলা তার ভার ছেড়ে দিয়ে কেঁদে উঠলো। নোভাকে খুঁজছিলাম নোভার কাছেই। মাথায় ওড়না বেঁধে রাখায় আমি ওকে চিনতেই পারিনি। বিপাশা আমেরিকা থেকে এখনো এসে পৌঁছায়নি। ওরা তিন বোন আমাদের কত প্রিয় ছিল। ‘এই সব দিন রাত্রী’ র সেটে এসে বসে বসে খেলা করত ওরা। আমরা ওদের সবাইকে ডাকতাম টুকটুকি বলে। আমাদের ঐ নাটকে ছোট্ট মেয়ে লোপা ছিল, নাটকে যার নাম টুকটুকি। এই সব দিনরাত্রি’র পরে আবার যখন ‘বহুব্রীহি’ নাটক তৈরি হচ্ছে তখনও সেটে ওরা এলে আনন্দ বয়ে যেতো। এই নাটকের মা ( আলেয়া ফেরদৌসি আপা) আমাদের জন্য সবসময় বাড়ি থেকে মজার মজার খাবার বানিয়ে আনতেন। শুটিং এর ফাঁকে হুমায়ুন ভাইয়ের তিন মেয়ে, পরিচালক নওয়াজিশ আলী খানের ছেলে তোরসা আর ছোট্ট মেয়ে রেহনুমাকে সাথে নিয়ে আমরা সেই মজার নুডল বা ফ্রায়েড রাইস , পিয়াজু বা ছোলা বুট, কাবাব বা মজার হালুয়া খেতাম। হুমায়ুন ভাইও কিন্তু বাদ পড়তেন না সেই সব মজার খাবার থেকে। আর নুহাস সে তো সেদিন হল। বহুব্রীহি নাটক শেষ হবার প্রায় দুবছর পরে ওর জন্ম।
দীর্ঘ লাইন শেষ আর হয় না, কিন্তু সময় তো স্থির নয় সে কেবল অশ্রুর ধারা হয়ে বয়ে বয়ে যায়। এখানে এই শহীদ মিনারে মানুষের ঢল যতই বাড়ুক সময় কিন্তু শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। এবারে ঈদগাঁ মাঠে নামাজে জানাজা হবে, সেখানে যেতে হবে এখুনি। কেউ যেন এসে ডেকে গেল আমাদেরকে। সবাই গিয়ে ঘন হয়ে দাঁড়ালাম তার কফিনের পাশে। ফুলে ফুলে পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা জুড়ে। এই সব মূহুর্তে কেমন যে লাগে তা কি করে বোঝাই! মন কেমন যেন এক অপার্থিব আলোকে ভেসে বেড়াচ্ছে আমার। কফিনের উপর থেকে একটি তাজা বকুলের মালা তুলে নিলাম হাতে। দুহাতে শক্ত করে ধরে নাকের সাথে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলাম। হুমায়ুন ভাইয়ের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম ‘হুমায়ুন ভাই আপনার প্রিয় বই তারাশংকরের ‘কবি’ থেকে সেই লাইনটা মনে পড়ছে যে, সেই যে উদ্ধৃতি ‘জীবন এতো ছোট কেনে’
আহা, আমার হুমায়ুন ভাই, জীবন এত ছোট কেনে!
হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর শেষযাত্রা। পিছনে অগনিত মানুষের মিছিল, ক্রন্দন, হাহাকার। নুহাস পল্লীতে লিচু গাছের ফুল, দীঘি লীলাবতীর টলমল জল, ওষধি বৃক্ষের পাতারা কাঁপছে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা বর্ষার প্রথম কদম কান্নায় মুখ ঢেকেছে আজ।
দেখতে দেখতে কিছুক্ষনের মধ্যে শুন্য হয়ে এলো শহিদ মিনার। আজ দাফন হবে না। আজ রাতে তিনি থাকবেন বারডেমের হিম ঘরে। কাল পারিবারিক সিদ্ধান্ত হলে তারপর শেষ হবে এই পার্থিব আয়োজন। হতে পারে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নয়তো শহর থেকে দূরে নুহাস পল্লীতে লিচুগাছের নীচে। যেখানে হয়ত তিনি চেয়েছিলেন একদিন শেষ শয্যা পেতে নিতে।
অপার্থিব এক যাত্রায় আজ তিনি একাকী চলেছেন সেই আনন্দধামে।আমার হাতের ভেতর তাঁর শেষ চিহ্ন কফিনের উপরে পড়ে থাকা এই বকুলের মালা। ছোট নয় এ মালা। তাঁর বিশাল জীবনের সুষমায় ভরা এর প্রতিটি ফুল। আমার মনের শুন্যপ্রান্তরে আমি যেনো শুনতে পাচ্ছি সেই অনন্তধামের পানে ছুটে চলা এক স্বর্গ সংগীত গীত হতে। যেন তা সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিব্যাপ্ত হয়ে কী এক অজানা ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দিয়ে গেলো আমার উপলব্ধির উপকূলে। আমি শহিদ মিনার থেকে পা বাড়ালেম এই জেনে, ” তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে”

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930