আমাদের মূল্যবোধ চর্চা ও তরুণ ছাত্র সমাজ

প্রকাশিত: ২:১৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২১

আমাদের মূল্যবোধ চর্চা ও তরুণ ছাত্র সমাজ

 

সুহেলী সায়লা আহমদ

মানবজীবন শিল্পকর্মের মতোই সুন্দর। তবে এই শিল্পকর্ম আমাদের ভাব, চিন্তা, কর্ম, আচার, প্রজ্ঞা, বিশ্বাস, সংস্কার, যুক্তি ইত্যাদি দিয়ে সযতেœ গড়ে তুলতে হয়। তাই ঘরে বাইরে সর্বত্র আমাদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। যখন আমরা আমাদের সংযম, সহিষ্ণুতা, সৌজন্যতার সীমা অতিক্রম করি তখনই আমাদের জীবন নামক শিল্পকর্মের উপর ধূলোর স্তর পড়ে। আমরা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ গুলোকে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়তে দেখি। কবির ভাষায় – “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি, আজ চোখে দেখে তারা, যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নাই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপারমর্শ ছাড়া।”
আমাদের আদর্শচ্যুত চিন্তা-চেতনা, স্বার্থ-সর্বস্ব কর্মকান্ড, আত্ম-কেন্দ্রিক মনোভাব মানুষ হিসাবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এড়ানোর মত অপরাধে জড়িয়ে ফেলেছে। আর আমরা ক্রমাগত এর দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছি আমাদের ছাত্র-সমাজের উপর। আমাদের তরুণ শক্তির উপর। আমরা বলছি এই প্রজন্ম অন্ধকারে নিমজ্জিত। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে অবজ্ঞা করে, উপেক্ষা করে তরুণ ছাত্র সমাজকে প্রলম্বিত অন্ধকারে নিমজ্জিত করার মত দু:সাহস আমাদের থাকা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন, “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।”

আমাদের শক্তি আমাদের তরুণ প্রজন্ম। “আমি আছি, বিশ্ব আছে। রক্তে রক্তে জীবন নাচে। মৃত্যু কোথা বল? তরুনেরা এই মনোবল নিয়েই সামনে এগিয়ে চলে। আর তাদের এই চলার পথে আলো দেখাবার দায়িত্ব কিন্তু আমাদের অর্থাৎ আমরা যারা অভিভাবক, বাবা-মা, শিক্ষক সবার এ দায়িত্ব। আলোর কান্ডারি হয়ে আমরা সামনে দাঁড়াবো- সে পথের জীর্ন-জড়তা আর ক্লেদকে দু’হাতে সরিয়ে নতুন করে সমাজের হাল ধরবে এটাইতো তারুণ্যের ধর্ম। তাই কিশোর তরুণ ছাত্র সমাজকে শুধুমাত্র দেহাকৃতি সম্পন্ন মানুষ হলেই হবেনা। অর্জন করতে হবে মনুষ্যত্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে মনুষ্যত্ব অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। এটা জন্মগতভাবে লুব্ধ বা সহজাত বিষয় নয়। তাই মনুষ্যত্ব অর্জনে আমাদের সুস্থ সংস্কৃতি র্চচা করতে হবে। এর মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠলে আমাদের জীবনবোধে একটি শূন্যতা থেকেই যাবে। মনুষ্যত্ব কলুষিত হবে। সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রন করতে হবে। সংস্কৃতি হলো একটি জনগোষ্ঠীর জীবন যাপন পদ্ধতি। যা অর্জন করতে হয়। শিখতে হয়। চর্চা করতে হয়। নাচ, গান থিয়েটার সংস্কৃতি নয়। এগুলো সংস্কৃতিকে তুলে ধরার উপায় বা মাধ্যম মাত্র। মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাই বলেছেন, সংস্কৃতি মানে উন্নতর জীবন সমন্ধে চেতনা, সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সমন্ধে অবহিতি। তিনি আরো বলেছেন, “ ইন্দ্রিয়ের পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে জীবন সাধনারই অপর নাম কালচার। মন ও আত্মার সাথে যোগসূত্র করে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বকের নব জন্মদানই কালচারের উদ্দেশ্য তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী সংস্কৃতিবান মানুষ নিজেকে নবায়িত করে চারপাশের পরিবেশের ও নবায়ন ঘটায়। তিনি আরো বলেছেন সংস্কৃতি মানে “ঠধষঁবং” সম্বন্ধে ধারনা আর সৌন্দর্যই সংস্কৃতির লক্ষ্য। বাংলা ভাষায় মূল্যবোধকে বোঝায়। “মূল্যবোধ বা মূল্যের বোধ হলো কোন জিনিস মূল্যবান, কোন জিনিস কম মূল্যবান ও কোন জিনিস মূল্যহীন সেই সম্পর্কিত বোধ বা চেতনা। বলা যায়, সৌন্দর্যবোধ ও বিচার ক্ষমতারই অপর নাম মূল্যবোধ। ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, কর্তব্য-অকর্তব্য ইত্যাদি নির্ণয়ের ইচ্ছা দ্বারা আমাদের মনের যে অবস্থাকে বোঝানো হয় তাকেই বলা হয় মূল্যবোধ।
মূলবোধ চর্চার মধ্য দিয়ে একটি সমাজের বা কোন মানবগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই এই কথা বলা কঠিন যে আমাদের তরুণরা মূল্যবোধের চর্চা করছে না বা তারা অবক্ষয়ের শিকার। অবক্ষয় আসে যখন ব্যক্তি শ্রেয়সচেতনারিক্ত হয়ে পড়ে। কেবল প্রেয়স চিন্তায় আত্মমগ্ন থাকে। তাই মানুষকে চেষ্টা করতে হবে সবসময় সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। জীবনের কোন একটি দিককে অবহেলা করে পূর্নাঙ্গভাবে জীবনের স্বাদ উপভোগ করা যায় না। সুন্দর ও মহৎ জীবন যাপনের জন্য মানুষকে কাজ করতে হয়। মানুষের সংস্কৃতির পরিচয় তার কর্মের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। মানুষ যদি তার নেতিবাচক প্রবৃত্তির দাস হয়ে যায় তবে তার পক্ষে সমাজকে কিছু উপহার দেয়া সম্ভব নয়। মানুষের সকল কাজের মধ্যদিয়েই তার সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। নাচ, গান, নাটক, কবিতা খেলাধূলা, উৎসব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে কোন মানব গোষ্ঠীর সংস্কৃতির আংশিক পরিচয় পাওয়া যায়। কোন মানবগোষ্ঠকে পরিপূর্ণ জানতে হলে জানতে হবে সেই মানবগোষ্ঠীর জীবন-যাপন পদ্ধতি ও সার্বিক কর্মকান্ড সম্পর্কে। এই সকল কর্মকান্ডই তুলে ধরবে সেই সমাজের মূল্যবোধকে। এ প্রসঙ্গে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন “নিকটবর্তী স্থূল সুখের চেয়ে দূরবর্তী সূক্ষ সুখকে, আরামের চেয়ে সৌন্দর্যকে, লাভজনক যন্ত্রবিদ্যার চেয়ে আনন্দপ্রদ সুকুমার বিদ্যাকে শ্রেষ্ঠ জানা এবং তাদের জন্য প্রতীক্ষা ও ক্ষতি শিকার করতে শেখা- এসবই মূল্যবোধের লক্ষণ, আর এ সকলের অভাবই মূল্যবোধের অভাব।”
প্রাচীন ভারতবর্ষে ছাত্রদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, “ছাত্রানাং অধ্যায়নং তপ” অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের সাধনাই ছাত্রজীবনের একমাত্র সাধনা। তবে সুস্পষ্ট যে, যে কোন সাধনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। শরীর ও মনের প্রস্তুতি প্রয়োজন। ছাত্র সমাজের শরীর ও মনকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে না পারলে ছাত্র সমাজ এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবে না। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “তীর্থে অনেকেই যায় কিন্তু তীর্থের যথার্থ ফলাফল সকলে লাভ করতে পারে না।”
তরুণ সমাজকে গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন এই শিক্ষাকে প্রয়োগ করার মানসিকতা। প্রয়োজন শিক্ষা গ্রহনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী। তাই গোটা সমাজে মূল্যবোধের চর্চা থাকতে হবে। প্রতিদিনকার জীবন যাত্রার প্রতি অনুসঙ্গে শিক্ষালাভের মনোবৃত্তি গড়ে তুলতে পারে মূল্যবোধের চর্চা। শিক্ষা লাভ ও সেই শিক্ষাকে প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করাটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারন একখন্ড পাথর বরাবরই পাথর। কিন্তু বীজ হচ্ছে সম্ভাবনার প্রতীক। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে এখান থেকে ফুল ও ফল পাওয়া সম্ভব। আমাদের তরুণ ছাত্র সমাজ ও তেমনি সম্ভাবনার গেীরবে গৌরবান্বিত হবে যদি আমরা তাদের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে দিই। সম্ভাবনার পথ তৈরী করে দিলে ছাত্র সমাজও জ্ঞান লাভের তপষ্যায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে।
“রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ভ্রুনকে গর্ভের মধ্যে এবং বীজকে মাটির মধ্যে নিজের উপযুক্ত খাদ্যের দ্বারা পরিবৃত হইয়া থাকিতে হয়। প্রকৃতি তাহাকে অনুকূল অন্তরালের মধ্যে আহার দিয়া বেষ্টন করিয়া রাখে, বাহিরের নানা আঘাত অপঘাত তাহার নাগাল পায় না এবং নানা আর্কষণে তাহার শক্তি বিভক্ত হইয়া পড়েনা।
আসলে ছাত্রজীবন ও তেমনি শিশু, কিশোর, তরুণদের জন্য মানসিক ভ্রুন অবস্থা। এই সময়েই তাদের অনুকূল পরিবেশ দরকার। সামাজিক মূল্যবোধের এমন একটি বেষ্টনী তৈরী করতে হবে যেন তারা কোন বিভ্রান্তিতে পড়ে বিচ্যুত আচরণ (উবারধহঃ নবযধারড়ৎ) না করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি মূল্যবোধের এই সামাজিক বেষ্টনী কোমলমতি ছাত্রসমাজকে মননশীলাতর চর্চায় ব্যস্ত রাখবে। মানুষ যেমন করে খাদ্য শোষন করে শরীরের শক্তি সঞ্চয় ও পুষ্টি সাধন করে তেমনি একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তিকে আরো সুদূঢ় করবে। কেবলমাত্র জ্ঞান শিক্ষা নয়, সমাজে এমন সংস্কৃতি বিরাজ করতে হবে যা থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বোধের শিক্ষা নিয়ে জীবনকে প্রকৃতই শিল্পকর্মে রূপ দিতে পারবে।
একটি সুস্থ, সুন্দর ও আলোকিত সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন তারুণ্যের ঝিলিক। তারুণ্যকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন সাধনা। বাব-মা, শিক্ষক, অভিভাবক এর তরুণ ছাত্র-সমাজকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সধনা বা তপস্যা করতে হবে। সৃষ্টিকর্তার কাছে সাধনা লাভের শক্তি অর্জনের জন্য প্রার্থনা করতে হবে। উপনিষদে এই প্রার্থনাকে প্রকাশ করেছে এইভাবে,
“ওঁ আপ্যায়ন্ত মমাঙ্গানি, বাক্ প্রাণশ্চক্ষু: শ্রোত্রমথ বলমিন্ত্রিয়ানি চ সর্বাণি।”
(অর্থাৎ, আমার অঙ্গসমূহ বাক্ প্রাণচক্ষু শ্রোত্র বল ও সকল ইন্দ্রিয় পুষ্টিলাভ করুক।)
আমাদের সকলের সাধনায় একই প্রার্থনা সমাজ গঠন। চিত্রকল্পের মত মানব জীবন গঠন। আমাদের তরুণ ছাত্র সামাজ ও এই প্রার্থনার শরীক হবে যদি আমাদের বোধের জায়গায় সর্বাগ্রে মূল্যবোধের চর্চা হয়। সামজের অবক্ষয় রোধ করার জ্য মননশীলতাকেই বেশী প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের আদর্শে, ব্যক্তিতে¦, সামাজকিক দক্ষতা ও যোগ্যতায় এবং অংশগ্রহনে মূল্যবোধের চর্চা থাকতে হবে। তবেই আমরা বোধের সাথে জ্ঞানের, অঙ্গীকারের সাথে উদ্যমের, সাহসের সাথে শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারবো নিভীকচিত্তে। তারুণ্যের জন্য এমন ইতিবাচক কোন কাঠামো তৈরী করতে না পারলে আমাদের মানুষ্যত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমাদের মূল্যবোধের চর্চা যত সুদূঢ় হবে তারুণ্যের শক্তিতে শক্তিমান হয়ে সমাজও তত বেশী কঠিন আঘাতের ভেতর দিয়েই যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে নির্ভীকচিত্তে। তরুণ ছাত্র সমাজই দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিবে প্রগতির পথে, প্রাগ্রসরতার পথে।

আমাদের মূল্যবোধ চর্চা ও তরুণ ছাত্র সামাজ

 

সহকারী অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান),মানবিক বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা।

ছড়িয়ে দিন