আমাদের শিশুরা কেন কথা শুনে না ?

প্রকাশিত: ১:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২, ২০২১

আমাদের শিশুরা কেন কথা শুনে না ?

আমাদের ‌অনেকেরই শিশু সন্তানদের প্রতি একটা অভিযোগ রয়েছে, তা হলো, আজকের যুগের শিশুরা বাবা মায়ের কথা শুনেনা।অভিযোগটা অনেকাংশে সত্য হলেও, কেন আমাদের শিশুরাকথা শুনছে না, তা নিয়ে ভাবছেননা অনেকেই।কিংবা ভাবা জরুরী মনে করছেননা কেউ কেউ। আমেরিকান একজন বিজ্ঞ লেখক রবার্ট ফুলগাম বলেছেন, “শিশুরা কখনোই আপনারকথা শুনছে না, এমন চিন্তা করবেন না; বরং এটা ভেবে উদ্বিগ্ন হোন যে তারা সর্বদা আপনাকে দেখছে।” অর্থাৎ, পিতা মাতাদেরতারা অনুসরণ করছে।

 

একটা বিষয় আমাদের জানা খুব জরুরী যে, শিশুদের শুনতে না শেখানো পর্যন্ত তারা কখনোই শুনবে না। কেননা ‘শোনা’ একটিশিক্ষাগত আচরণ। শিশুদের শোনার এই প্রশিক্ষনটি শুরু হয় যখন থেকে বাবা-মা তাদের ‘হ্যা’ এবং ‘না’ শব্দগুলো শিখাতেশুরু করেন।

 

প্রতিটা বাবা মা’ই নিজের শিশু সন্তানের লালন পালনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তবু, শিশুদের জন্য সর্বোচ্চো চেষ্টা করার পরওকেন অনেক শিশুরা বাবা মায়ের কথা শুনতে রাজি না? এর হয়তো অনেক কারণ রয়েছে। তবে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু কারণ হল-

সব সময় শিশুদের বক্তৃতা দেয়া, তাদের পছন্দ নয় এমন সব শব্দ ব্যবহার করা, উচ্চস্বরে কথা বলা, তাদের মনযোগ আকর্ষণকরার আগেই নির্দেশনা দেয়া, কথা না শুনলে চিল্লানো, কথা শুনতে জোর করা বা বাধ্য করা, কথার পূনরাবৃত্তি করা, শিশুদেরজন্য মা বাবারা সঠিক রোল মডেল না হতে পারা এবং যদি কোন চিকিৎসাজনিত কারণ থাকে।

 

বাবা-মায়ের কথা বলার ধরণের উপর অনেক সময় নির্ভর করে তাদের শিশু সন্তানেরা কথা শুনবে কি শুনবেনা। বাবা-মা যদিশিশু সন্তানদের কথা বলার সুযোগ না দিয়ে শুধু নিজেরাই একচেটিয়া বলে যান, তবে তারা মনে করে যে এখানে মা বাবাইচিরকালের জন্য সত্য এবং তাদের কোন মূল্য নেই। বক্তৃতায় নিজেদের অবস্থান পুক্ত করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে স্বল্পপরিসরে এবং সব সময় তাদের শুধু নির্দেশনা না দিয়ে, পরিবর্তে বাচ্চাদের মতামত গ্রহণ করা ভালভাবে কাজ করে।

 

কিছু শব্দ, বিশেষ করে কিছু বিরুপ ও নেতিবাচক শব্দ যেমন- না, চুপ, কেন, তুমি/তুই, যদি, করতে পারবেনা, যেতে পারবেনা, খেলতে পারবেনা…ইত্যাদি শব্দগুলোর ব্যবহার তারা পছন্দ করেনা। অর্থাৎ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু করতে বাধ্য করা কিংবাতাদের পছন্দের জিনিসটা করতে বাঁধা দেয়া, শিশুদের অপছন্দের একটি বিষয়।

কথায় কথায় ‘তুমি/তুই’ শব্দগুলোর ব্যবহারে তারা ভাবে যে মা বাবা সরাসরি তাদের দিকে আঙুল তুলছেন বা আক্রমনকরছেন।

‘যদি’ বিবৃতিতে শিশুরা মনে করে যে তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ‘কেন’ শব্দ ব্যবহারে আমরা তাদের আচরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যাদিতে বাধ্য করি যা অনেক সময় তারা বয়সের কারণে ব্যাখ্যা করতে পারেনা। এবং তখন তারা খুব অসহায় বোধ করে।

উচ্চকণ্ঠে শিশুদের সাথে কথা বললে তারা এটাতেই অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আর সহজ ভাষায় কথা শুনানো যায়না, উচ্চকণ্ঠেই বলতে হয়।

 

অনেক সময় শিশুরা নিজেদের আনন্দে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় বাবা-মা কথা বলতে শুরু করেন। এটা না করে বাবা-মায়ের তাদেরশিশুদের জানানো দরকার যে, তারা কথা বলবেন এবং এখানে শিশুদের মনযোগ দরকার। তারা যা করছে তা শেষ করতে দেয়াদরকার এবং তারপরে বাবা-মায়ের কথা বলা দরকার। এতে শিশুদের মনযোগ পাওয়া সম্ভব।

অনেক সময় শিশুরা কথা না শুনলে কিংবা নিজের ব্যক্তিগত হতাশার কারণেও মা-বাবারা তাদের উপর চিৎকার করেন। এতেকরে বাচ্চারা আরো বেশী নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন এবং কখনোই বাবা মায়ের কথা শুনতে উৎসাহিত হননা। বরং নরম কণ্ঠেকথা বলা কার্যকরী।

 

একবারের নির্দেশনা যদি কাজ না করে তবে নির্দেশনার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তির কখনোই কাজ করবেনা। পরিবর্তে, মা বাবা তাদেরবিধি বিধান পরিবর্তন করতে পারেন।

 

প্রতিটা শিশু পিতা মাতার ক্রিয়াকলাপ অনুকরণ করে। তাই নিজেদের জীবন যাপন, আচরণ, অভ্যাস, প্রকাশ ও প্রচারে সতর্কতাঅবলম্বন করতে হবে। শিশুদের জন্য পিতা-মাতাদেরই উত্তম ‘হিরো’ বা মডেল হতে হবে।

 

এতকিছু চেষ্টা করার পরও যদি আমাদের শিশুরা কথা শুনতে না চায় তবে ধরে নেয়া যেতে পারে যে তারা কখনোই কথা শুনবে নাবলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেক্ষেত্রে হয়তো তাদের আরো কিছুটা সময় দেয়া দরকার। কিংবা হয়তো তাদের শারীরিক, মানসিক বামনস্তাত্ত্বিক কোন সমস্যও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে নেয়া জরুরী।

 

প্রতিটা পিতা মাতাকেই মনে রাখতে হবে যে, তাদের শিশুরারা কেবলই শিশু।এবং কখনও কখনও তারা পিতা মাতার কথা শোনবেনা । এটা স্বাভাবিক। আমাদের ভাবতে হবে, যখন আমরা শিশু ছিলাম তখন আমরা কি কিছুটা এমন ছিলাম না? আমরা কিমা বাবার সব কথা শুনেছিলাম? অবশ্যয়ই না।

সব শিশুরাই নিজেদের বড় মনে করে। বড়দের মতো আচরণ করতে তারা পছন্দ করে। যা তাদের পছন্দ, তারা সেটা করতেইআগ্রহী হয়। কারো বাঁধা তাদের চরম রাগের কারণ হয়ে উঠে।

 

তাই শিশুদের মনযোগ আকর্ষণে ইতিবাচক প্যারেন্টিং কৌশল অত্যন্ত জরুরী। কথা শুনাতে আপনার সন্তানের স্তরে নামুন, আইকনটাক্টের মাধ্যমে কথা বলুন এবং তারপর আপনি অনুরোধ করুন। আপনার শিশু সন্তানটি আপনার কথা মানছে কিমানছেনা, তা পরের ব্যপার কিন্তু

আপনি কমপক্ষে নিশ্চিত হবেন যে আপনার শিশু সন্তানটির আপনাকর কথাগুলো শুনেছিল কিনা।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930