আমাদের সীমানা কতদূর

প্রকাশিত: ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০২২

আমাদের সীমানা কতদূর

এইচ বি রিতা

অর্কাস- হল অত্যাধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণী যাদের মস্তিষ্ক আমাদের মস্তিষ্কের চেয়েও জটিল হতে পারে। একে ঘাতক তিমিও বলা হয়।

অর্কাস খোলা সমুদ্রে থাকে। তাদেরকে যখন ট্যাঙ্কে থাকতে বাধ্য করা হয়, তখন তারা গুরুতর শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করে। হয়তো এ কারণেই তারা মাঝে মাঝে নির্বিকার হয়ে প্রশিক্ষকদের আক্রমণ করে বসে। অর্কাসকে বিনোদন দেওয়ার জন্য যদি আপনাকে বা আমাকে এমন ট্যাঙ্কে বাস করতে হয়, তবে আপনি বা আমিও হয়তো পাগল হয়ে যেতে পারি।

মানুষ-প্রাণী আমরা সকলেই মুক্তিকামী। আমাদের স্বাধীনতা, ইচ্ছা, আবেগের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে আমরা সকলেই মানুষিক স্বাস্থ্য সঙ্কটে পড়তে পারি। মানুষের মতো পশুদেরও মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কট রয়েছে। পশুরাও মানসিক রোগে ভুগে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রায়শয়ই ‌‌অন্যদেরও সঙ্কটে ফেলতে পছন্দ করা মানুষগুলোর ব্যক্তি জীবন নানান সঙ্কটে ভরপুর।

তাদের অনেকেই সরাসরি কিছু চাইতে বা প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন। বরং কৌশলে আড়ালে থেকে যে কোন কাজ বাগিয়ে নিতে তারা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। অন্যের ভালো কিছুতে তারা কখনোই সরাসরি প্রশংসা জানাতে পারেন না। তারা মনে করেন, অন্যের এই প্রাপ্তিটা তো আমার পাবার কথা ছিলো! Why not me?

এখন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো কৌশলের এপিঠ-ওপিঠের অবস্থানটাও দেখতে হবে। কৌশল মূলত একটা দক্ষতা, পদ্ধতি, উপায়, শিল্প। বলতে জানা, চাইতে জানা, আদায় করতে জানাও এই শিল্পের মধ্যেই পড়ে। যে কোন শিল্প জগতে এই কৌশলটা দরকার আছে।

আকাশের তারা ছুঁতে আজ মই দরকার হয়না। কল্পনা আছে। আবার অর্থের বিনিময়ে ফুল কিনে নিয়ে শহীদ মিনারে দিতে হয় না। বাকেট বানাতে জানলে পাশের বাড়ির বাগানের ফুলগুলোই কাজে দিতে পারে। পুরস্কৃত হতে মেধার দরকার নেই, সখ্য-পরিচিতিই যথেষ্ট। বলতে পারেন, এগুলোও তো কৌশল, যা শিল্প তো বটেই!

হ্যাঁ! যে কোন নতুন আবিস্কারই শিল্প। তার মানে এই নয় যে নতুন পদ্ধতিতে কোন মেয়ের যোনী পথে কাঁচের টুকরো বা বোতল ঢুকিযে দেয়াও শিল্প। ‌কিংবা ‌অন্যের বদান্যতায় নিজেকে বিখ্যাত কেউ বানিয়ে ক্রেডিট নেয়া এবং পুরস্কৃত করাও শিল্প। এগুলো শিল্পের নতুন কৌশল, নতুন আবিস্কার, তবে নেতিবাচক পন্থা যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

যদি পেরেন্টিং চার ধরণের কৌশলের কথা বলি, তবে শুরুতেই অথোরিটেটিভ বা অধিকারমূলক পেরেন্টিং এর কথা বলতে হয়। অথোরিটেটিভ পেরেন্টিং কার্যকরভাবে সবচেয়ে ফলপ্রসু একটি পেরেন্টিং কৌশল যেখানে মা-বাবা সাধারণত সন্তানের জন্য নিয়মাবলি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও সেটা কেন করেছেন এবং তার সুফল/কুফল কী হতে পারে—তা সন্তানকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। সন্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ করেন ঠিকই, তবে তাদের ওপর কোনো কিছু একচ্ছত্রভাবে চাপিয়ে না দিয়ে সন্তানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রাধান্য দেন এবং মা-বাবার নির্ধারিত প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যথার্থ কারণ নিয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করেন।

বাকি আরো তিন ধরনের পেরেন্টিং হল-অথোরিটেরিয়ান বা কর্তৃত্বপরায়ণ, পার্মেসিভ বা সহনশীল এবং আন-ইনভলভড বা বিচ্ছিন্ন অভিভাবকত্ব- অথোরিটেরিয়ান পেরেন্টিংয়ে দেখা যায়, মা-বাবাই সন্তানের জন্য যাবতীয় নিয়মকানুন ও নির্দিষ্ট সাফল্য নির্ধারণ করে থাকেন। এখানে সন্তানের পছন্দ-অপছন্দ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার তেমন কোনো প্রাধান্য নেই। একচ্ছত্রভাবে মা-বাবাই নির্ধারণ করেন সন্তানের সব সিদ্ধান্ত। এই জাতিয় মা-বাবারা অনেক সময় সন্তানের ভুলের জন্য তাকে শাস্তি দিয়ে থাকেন।

অন্যদিকে, পার্মেসিভ পেরেন্টিং ধরনে মা-বাবা সাধারণত সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন ঠিকই, কিন্তু এখানে সঠিক শাসন বা নিয়মাবলিতে ঘাটতি থাকে। সন্তানের ব্যর্থতায় মা-বাবা তাদের শাস্তি দেন; তবে সন্তানকে সফল করে তুলতে কোন পদক্ষেপটি নেওয়া দরকার, তা নিয়ে ভাবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তান কোনো বড় ধরনের ভুল করে না বসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মা-বাবা হস্তক্ষেপ করেন না। এবং যেকোনো ভুলের কারণে তারা শাস্তি রাখেন, তবে সে ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, তার পক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি মনে করেন না।

এবং আন-ইনভলভড পেরেন্টিংয়ের পরিণাম আরো ক্ষতিকর বলে ধরা হয়। এই পেরেন্টিং ধরনে সাধারণত মা-বাবা সন্তানের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে থাকেন। তারা সন্তানের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হন। কিন্তু সন্তানের কাছে তাদের আশানুরূপ সাফল্য আশা করতে ছাড়েন না।এতে সন্তানদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে, হতাশা দেখা দেয়, রাগ বেড়ে যায়, অসামাজিক আচরণ বৃদ্ধি পায়, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, একাডেমিক সাফল্যে চরম ব্যর্থতা দেখা দেয়।

অর্থাৎ, আমরা দেখতে পারছি যে, এখানে চার ধরনের পেরেন্টিং কৌশলের মধ্যে কেবল প্রথমটি কাযর্করী ভূমিকা রাখছে, বাকিগুলো রাখছে না। তার মানে কৌশল কে একটি পদ্ধতি এবং শিল্প বলা গেলেও, সব কৌশল ইতিবাচকভাবে কাযর্কর নয়। কৌশল কখনো দক্ষতা, নিপুণতা, কারিগরি। আবার কখনো চাতুর্য; ফন্দিও।

আমাদের জীবনটাকে আমরা কীভাবে উপভোগ করবো বা পরিচালনা করবো, তা সম্পুর্ণ নির্ভর করে আমাদের চিন্তা-ভাবনা, বিবেচনা, ও সিদ্ধান্তের উপর। আর এই বিষয়গুলো জন্ম থেকে আমরা নিয়ে আসি না। এগুলো পরিবেশগত, পরিবারেই জন্মের পর থেকে আমরা শিখতে শিখি। পরিবারে প্রাপ্তবয়স্করা কীভাবে আচরণ করে, ভাবনা প্রকাশ করে, মতানৈক্য এবং আবেগ পরিচালনা করে, তা পর্যবেক্ষণ করেই শিশুরা তাদের শিশুকাল এবং পরবর্তি জীবন পরিচালনা করতে শেখে। তা-ই সুস্থ ও পরিপাটি শৈশবকাল আমাদের প্রত্যকের জীবনে বিরাট ভূমিকা রাখে।
অবহেলায় জর্জড়িত বিধ্বস্ত এবং বাধাপ্রাপ্তও শৈশব আমাদের বয়সকালে চিন্তা-ভাবনা ও আচরণের উপর বিস্তর প্রভাব ফেলে। এই যে আমাদের একে অন্যের ভালোটুকু বা সাফল্যটূকু গ্রহণ করতে না পেরে দু’মুখো সত্তায় সামনে স্বাভাবিক থেকেও আড়ালে মন্দ কিছু করতে তৎপর হওয়া, এগুলোই আমাদের মনের সঙ্কট, অসুস্থতা।

সর্বাবস্থায় আমাদের মনকে সুস্থ্ রাখতে পারলে শরীর ও যে কোন সঙ্কটপূর্ণ অবস্থায় লড়াই করতে পারে। মনকে সুস্থ্ রাখা মানেই মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ থাকা। বিশ্বের অনন্য দেশগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়, তুলনামূলকভাবে আমাদের বাঙালি সম্প্রদায়ে এই বিষয়টি নিয়ে তেমন কোন গুরুত্ব দেয়া হয়না। আমাদের পরিবার এবং সমাজে অনেকেই ভেবে থাকেন যে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা অসুস্থতা বিরল এবং এটিকে তেমন গুরুত্ব দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
প্রকৃতপক্ষে,মানসিক অসুস্থতাগুলি খুবই সাধারণ একটি বিষয়। মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানসিক স্বাস্থ্য সংঙ্কট, বিশেষত হতাশা, বিভিন্ন ধরণের শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।