আমার গুরুগণ: আটষট্টি

প্রকাশিত: ১০:১৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২৪

আমার গুরুগণ: আটষট্টি

মোস্তফা মোহাম্মদ

 

হায়দারের মায়ের অকাল মৃত্যুতে ইসমাইলের পাঁজর ভেঙে যায়। আশাহত পাখির বেদনা নিয়ে ইসমাইল বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ চরায় আর ক্ষেতের আল ধরে ঘুরে বেড়ায়।
মৌসুম বুঝে ধান-পাট-গম-ভুট্টার বীজ বুনে দেয়, ফসলের ঘ্রাণে ভরে ওঠে প্রাণ। তিল-তিষি-সরিষা নানান জাতের তৈলবীজের চাষেও ইসমাইলের সমান দক্ষতা—একথা সর্বজন বিদিত; জানেন কৃষি অফিসের সাহেব-সুবোগণ।
সবজি, ফল, ফসল এবং নতুন জাতের দেশীয় ফসল ফলানোর কায়দা-কানুন মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ; উন্নত জাতের প্রতি আকর্ষণ যথোচিত। কৃষির উন্নতির কলায় দেশের সমৃদ্ধির আশায় কাজ করে সারাদিন—যাকে বলে ব্যস্ততায় দিন গুজরান; কেটে যায় সময়।

ইসমাইল জানে ব্যস্ততাই জীবন, অর্থাৎ সংকট উপস্থিত হলে কাজের মধ্যে ডুবে যেতে হয়—কর্মের ঠিকুজির মাঝেই হারানোর বেদনা লীন হয়ে নতুন আধারে বীজ গজে ওঠে বৈশাখী পূর্ণিমায়।

গতকাল সকালে ফজরের নামাজের পর বৈঠকখানার দক্ষিণের জানালা খুলে যখন কোরান তেলায়াতে মনোযোগ দেয় ইসমাইল; ঠিক তখন জ্যাঠাতু ভাই আজিম উদ্দিন মণ্ডলের খুলির বড় আম গাছের ডাল থেকে রঙিন একটা পাখি ডানা মেলে পুবের আকাশে আবছা আলোয় উড়ে যেতে দেখেছিলো। পাখিটা কী পাখি!
না-কি হরিয়ালরুপী হায়দারের মা; ইসমাইল চিন্তায় পড়ে যায়।—আরে দূর ছাই মরা মানুষ আসবে কী-করে; এই সকালে গাছের ডালে আর পাতার ফাঁকে, আমের ছায়ায়!
—-ইসমাইল ভাবে আর কোরান শরীফ পাঠ করে যায়।
ধর্মীয় বাণীর আড়ালে জীবনের বিভায় মুখরিত প্রতিভাস ইসমাইলকে সময়ের পরিক্রমায় দাঁড় করিয়ে দেয়, জীবন-সংগ্রামী সুবোধের মুখোমুখি।
দীর্ঘ বিরতির পর সুবোধের সাথে আজ সকালের বোধ ভাগাভাগি করতেই সুবোধ বলে ওঠে:
‘তুমি যাকেই আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসবে’,
‘আমি তাকেই তোমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাবো। এবং তোমাকে একা করে রাখবো’
—-স্রষ্টার অমোঘ বাণী, আমার মুখের কথা নয়, বন্ধু;
—-সুবোধের ধর্মবোধসম্পন্ন জীবনঘনিষ্ঠ অমোঘ বাণীমিশ্রিত বক্তব্য শুনে ইসমাইল সুবোধের মুখের দিকে বিস্ময়ের চাহনিতে তাকিয়ে ঘোরের জগতে ডুবে যায়।
ইসমাইল ভাবে,—সুবোধ ইসলাম ধর্মের এবং অন্যান্য ধর্মের বিষয়াদি এত সূক্ষ্মভাবে রপ্ত করলো কীভাবে?
—-এই কথা ভাবার তিল ঠাঁই ধারনের সময় না-দিয়েই মূল দরোজার কড়া নাড়ার আওয়াজে সুবোধ ও ইসমাইল কিছুটা ভয়, কিছুটা হতাশায় নিমজ্জিত হয়;—পুলিশ চলে এলো বুঝি বাসায়।

সুবোধের খোঁজে, অথবা কানুপুরের করতোয়ার বাঁক-ঘেরা নদীর ঘাট থেকে প্রভাত বেলায় পায়ে হেঁটে আসার পথে কেউ-কী দেখে ফেলেছে আজ।

তাদের কেউ-কী থানায় খবর দিয়েছে; যার দরুন পুলিশ ধরতে এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির সদর দরোজায়।
বিশৃঙ্খল চিন্তার সমাপ্তি ঘটে মুক্তি কুণ্ডু আর সর্দারপাড়ার ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সুবোধের রাজনৈতিক শিষ্য সিদ্দিক সর্দারের গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের অভিযাত্রায়।

ইসমাইল সুবোধের ধর্মীয় বাণীর আড়ালে লাকানো ক্ষোভ ও দুঃখ মেশানো অভিমান এবং আল্লাহ’র একেশ্বরবাদ, এবং বহুত্ববাদী ঈশ্বরচিন্তার মূল সুর খোঁজার চেষ্টায় চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দেয় বিছানায়; অর্থাৎ পা-দুখানা ছড়িয়ে দিয়ে খাটের কোণায় চোখ বন্ধ করে চুপ হয়ে যায়। ইসমাইলের ধ্যানস্থতার সুযোগে সুবোধ আবার শুরু করে তার বক্তব্য:
‘কখনো বলবে না আমি তাঁকে ছাড়া বাঁচবো না।
তবে আমি তাকে ছাড়াই তোমাকে বাঁচাবো৷
এবং পেছনের অনুগত সব আবেগ কেড়ে নিয়ে, তোমাকে দিব্যি সামনে নিয়ে যাবো!
তুমি কী দেখোনা? ঋতুরাও বদলাতে থাকে। ছায়াদানকারী বৃক্ষের পাতাও যায় শুকিয়ে।’
—-এই সব আমার মুখের কথা নয়, ইসলাম ধর্মের মৌলবাণী।
—সুবোধ ইসমাইলের ঘাড়ে টোকা দিয়ে বলে,
‘কীরে মণ্ডল ঘুমিয়ে গেছিস, না জেগে আছিস?’
—-ইসমাইল ভাবালুতার জগত থেকে সুবোধের টোকা খেয়ে সম্বিত ফিরে পেয়ে চোখ খুলেই দেখে সিদ্দিক আর মুক্তি কুণ্ডু বারান্দায় কাকীমার দেওয়া মুড়ির নাড়ুর কটমট আর দুধের সাথে খাঁটি আখের গুড়ের চা—যাকে বলে ঘন দুধের সাথে কড়া লিকারের চায়ের স্বাদে বুদ হয়ে ঝিমায় আর টুকটাক কথা চালায়।
কাকী এসে জানানোর পর সুবোধ, ইসমাইল, সিদ্দিক আর মুক্তি কুণ্ডু মুখোমুখি হয় দীর্ঘদিন পর।

 

চোস্ত শিক্ষিত বাম রাজনীতির নেতা বলেই কথা; সুবোধের পঠন-পাঠন-অধ্যয়ন এবং জ্ঞানান্বেষণের প্রচেষ্টা আর বক্তব্য প্রদানের ভাবগাম্ভীর্য সে-কথার প্রমাণ দিতে যথেষ্ট। আর একবার কোনো প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে কিংবা রেফারেন্স হিসাবে এসে গেলে, সেইটার যথোপযুক্ত উত্তর দেওয়াটা সুবোধের জন্য অনিবার্য মনে হয় তার কাছে; ইসমাইল বিষয়টি উপভোগ করে এবং নিজের ধর্মের কালাকানুন সম্পর্কিত বিরল দক্ষতায় বন্ধু সুবোধের অধীত বিদ্যার প্রতি কুর্নিশ করে শতবার।

 

কুশলাদি বিনিময়ের পর সুবোধ লাহিড়ী ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে আবার বলে:
‘ধৈর্য হারিয়ে যায়।
কিন্তু তোমার স্রষ্টা ধৈর্যশীল ও পরম দয়ালু, সেই ঝরে যাওয়া পাতার ডাল থেকেই আবার সবুজ পাতা গজায়, তুমি কী দেখো না তোমার স্রষ্টার এই নিদর্শন?
যে মানুষটাকে তুমি নিজের অংশ ভাবতে,
সেই মানুষটাই একদিন অচেনা হয়ে যায়৷
তোমার মন ভেঙে যায়!
এমনকি তোমার বন্ধুও শত্রুতে পরিণত হয় আর শত্রুও খানিক সময় পরে পরিণত হয় বন্ধুতে;
যে মানুষটাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি
ভালোবাসতে সেও প্রতারণা করে। তবে তুমি কেন স্রষ্টা বিমুখ হয়ে মানুষকে ভরসা করো?
অদ্ভুত এই পৃথিবী!’

—-সুবোধের পাণ্ডিত্যে সদ্য স্ত্রী হারানো শোকগ্রস্ত বিমুগ্ধ শ্রোতা ইসমাইল; দীর্ঘ আলোচনায় বুদ হয়ে থাকা ইসমাইল মুক্তি কুণ্ডু ও সিদ্দিক সর্দারের সামনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ইসমাইল সুবোধের বক্তব্যের রশি ধরে টান দিয়ে বলে: ‘বলো সিদ্দিক আছো কেমন?
মুক্তির তোমার খবর কী?
—-কীরে সুবোধ মুক্তি আর সিদ্দিকের সাথে এতদিন পর তোর দেখা, তুই কুশল জিগানোর থাইকা আমারে ধর্ম আর মানবতার জ্ঞান দিতাছোস; একটু থামো হুজুর।’
—-একথা সত্য যে, পাঁচটা পীরের দরগা, কিংবা নয়টা কাঠমোল্লা অথবা তিরিশটা পূজারী ব্রাহ্মণকে কেঁচে-গণ্ডুষ করলে ধর্মের যে-জ্ঞান না-পাওয়া যেতো, সুবোধের একঘণ্টার আলাপেই কিস্তিমাত।
ইসমাইল বলে ওঠে:—‘তোর পড়াশোনার আর বক্তব্যের ধারে আমি ডুবে যাই সুবোধ; আমার ঈর্ষা হয়,
কেন আমি তোর মতো বলতে পারি না।’
—-মুক্তির সামনে বক্তব্যের মোড় ঘোরানোয় মুন্সিয়ানায় সুবোধ থেমে যায়, এবং স্বাভাবিক আড্ডায় ফিরে আসার ফুসরত খুঁজে পায়।

 

মানুষের জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাসঞ্জাত বক্তব্য শুনে ইসমাইল সাহস পায়। হায়দারের মায়ের মৃত্যুর শোক ভুলে নতুন ভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভেতরে ভেতরে শক্ত ভীতের ওপর দাঁড়িয়ে যায় ইসমাইল।
সুবোধের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মুক্তি আর সিদ্দিকের সাথে ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে মেতে ওঠে চারজন।