ঢাকা ২৫শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯শে জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

আমার গুরুগণ: আশি

Red Times
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২৪, ০২:৪১ পূর্বাহ্ণ
আমার গুরুগণ: আশি

মোস্তফা মোহাম্মদ

 

নীড়ের দিশায় তুমি,
ফিরে যাও,
সোহাগ-চাঁদবদনী,
নৌকায় দূরের কোনো গাঁয়,
বিরহের মাতম তোলো নূপুর পর‍্যা পায়;

 

গাড়ির চাকায় শুনি,
শৃঙ্খলিত করুণ-মধুর ধ্বনি,
চিক্কন-নিক্কন-ঘুঙুর,
পিষ্টস্বপ্ন রাত্রিলগ্ন বজরায় সুমধুর,
জেল কয়েদ হাজত,
বিরহবেদনার কিছু কোনোটার মুগুর;

 

বুকের যাতনা আমার,
ধরাশায়ী ধ্যানীবক,
আকাশ-নদী-বিল,
যায় চলে যায় ঢাকায় সুবোধ,
উড়ে যাও যমুনায় তুমি নীলাভ-শঙ্খচিল;

 

—-মরিয়মের বাপের বাড়ি চানবাড়িয়ায় প্রত্যাবর্তন এবং বগুড়া জেলখানায় কারারুদ্ধ সুবোধ লাহিড়ীর রাতারাতি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের
অন্ধকার প্রকোষ্ঠে স্থানান্তরের মাধ্যমে নিক্ষেপণ–কোনোটাই স্বাভাবিক ঘটনা নয়; মরিয়মের ক্ষেত্রে কিছুটা সামাজিক বিধিনিষেধজনিত অভিজ্ঞান, আর অন্যটা রাজনৈতিক দুরাচার বলেই ইসমাইল আজ খুব অসহায় অবস্থার শিকার।
ইসমাইল ভাবে:
ভালোবাসাহীন যোগাযোগ আর যোগাযোগহীন সম্পর্ক–দুইটাই যাপিত জীবনের জন্য ক্ষতিকর;
মানবিক সম্পর্কের ফাটলের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির দিকটা আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে তখন, যখন নিজ দেশের সম্পদ এবং স্বচ্ছলতার উপর অন্য কেউ, অন্য-কোনোখানের মানুষ উড়ে এসে জেঁকে বসে ঠাঁটবাট চাগায়; পায়ে-পা-দুলিয়ে পিঠে চাবুক-বেত্রাঘাত চালিয়ে শাসন-শোষণ-নির্যাতন- দুঃশাসন চালায় অবিরত।
ব্রিটিশের শোষণের জাঁতাকলের শিকার সাধারণ জনগণ মুক্তি চায়; তারা বাঁচার জন্য পথ খুঁজে বেড়ায় সারাক্ষণ; কিন্তু বেরোনোর দরজা কই? কে শোনাবে পরিত্রাণের অভয় বাণী?
—সুবোধ স্কুলজীবনেই অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য বনে যায়; শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। জেলের অন্ধকার গুহায় সুবোধ এই প্রথম গেলো এমন নয়, এই নিয়ে একাধিকবার; স্থানীয় থানার ধরপাকড় তো লেগেই আছে–আজ মিছিলে দৌড়ানি-ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া তো কাল-পরশু লাঠিচার্জ লেগেই আছে তার পিঠের উপর।

মুক্তি কুণ্ডুর জ্যাঠতুতো-ভাই যামিনী ডাক্তার এবং তার বন্ধু নৃপেণ কুণ্ডু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষশক্তি বলেই কমবেশি পরিচিত; তবে শেরপুরের কমলোকই তাদের এই গোপন কর্মকাণ্ডের খবর জানে, কেউ কেউ কালেভদ্রে রাখেন তাদের খবরাখবর। মুক্তি এদের অন্যতম–বগুড়া কলেজে পড়ার পাশাপাশি মহিলা সমিতির সক্রিয় সদস্য হবার কারণে মুক্তি সচেতন খুব; অন্যদিকে মুক্তির জ্যাঠতুতো-ভাই যামিনী ডাক্তারের বাড়িতে দলীয় গোপন সভায় স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিন পালের উপস্থিতির কল্যাণে সুবোধ লাহিড়ীর সাথে দেখাসাক্ষাৎ করার সুযোগ হয় সুবোধ আর মুক্তি কুণ্ডুর একাধিকবার। বয়সের নিরিখেই নয় শুধু, নেতৃত্বের মাপকাঠি অনুযায়ী মুক্তি সুবোধ লাহিড়ীকে দাদা বলেই সম্বোধন করতো। প্রায় বিশ বছরের বয়সের তারমধ্য থাকা সত্ত্বেও এই যুগল আদর্শিক সখ্যের নৌকার মাঝি হয়ে প্রেমের জোয়ারে করতোয়া হয়ে বাঙ্গালী নদীর জলধারায় ভেসে যায়।

 

সুবোধের জেল স্থানান্তরের বিষয়টি মুক্তির জন্য কিঞ্চিত হতাশার কারণ হলেও একেবারেই দমে যাবার পাত্রী মুক্তি নয়–বড় ভাই শ্যাম কুণ্ডু এবং তার মা সুবোধের সাথে মুক্তির সম্পর্কের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে মুক্তির বিয়ের ঘটকালি এবং উপযুক্ত পাত্র আনাগোনার বিষয়টির প্রতি নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করতেন নির্দ্বিধায়। এই বিষয়টির জন্য শেরপুরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিশেষত, সনাতনী-প্রাচীনপন্থী হিন্দুসমাজের কাছে কম নাকানিচুবানি খেতে হয়নি কুণ্ডু পরিবারের মানুষদের। সকলের মতের বিরুদ্ধাচারণ করে একসময় মুক্তি গোঁ-ধরে বলেই বসলো: বিয়ে যদি করতেই হয় তো সুবোধ লাহিড়ীকেই করবো। এই কথা ফাঁস হওয়ার সাথে সাথে স্যান্ন্যালপাড়া, দত্তপাড়া আর ঘোষপাড়াসহ চারদিকের পিসিমা-মাসিমা-দিদিমা আর ডাগরডোগর-রসালো বৌদিরা ওরে রাম, ওরে আমার কৃষ্ণ; ওরে আমার রাধা–এই হতচ্ছরি ছুঁড়িটা, এই আইবুড়ো মাগিটা বলে কিরে! ও নাকি ওই পঞ্চাশ বছরের বুড়ো-ভাদাইম্যা-পাঁঠার গলায় মালা পরাবে! ঠাকুর, ঠাকুর তুমি আমাদের মেয়েদের এই মতিভ্রম থেকে রক্ষা করো ঠাকুর;–এই বলে অনেকেই মন্দিরে প্রার্থনা করেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি, আস্ত আস্ত পাঁঠা বলি দিয়ে, কচুরি আর লুচিমাংস পূজারী ব্রাহ্মণসহ পাড়ার মানুষদের খাওয়াতেও দ্বিধা করেনি তারা।

 

মিউনিসিপালিটির ঘাট অথবা বারুনির ঘাটের স্নানশুরু কিংবা সমাপনান্তের পর অথবা, পাড়ার বৌদিরা করতোয়ার ঘাটে স্নান করা, কাপড় ধোয়ার ফাঁকে-ফাঁকে গালগল্প হিসাবে মজা নেয়; তারা মুক্তির দুর্দশাগ্রস্ত ভবিতব্য-চিন্তায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে নানারকম মুখরোচক রসালো কথা বাতাসে ছড়াতেও কুণ্ঠিত নয়; উপরন্তু, কলেজে যাবার সময় পাড়ার বৌদিরা মুক্তিকে দেখলেই টিপ্পনী কেটে আকাশের দিকে মুখ তুলে বাতাসে বাক্য ছেড়ে দেয়: বিয়ে তো নয়, যেন গয়াকাশীবৃন্দাবন গমনের অভিলাষ! ভালো হবে জীবদ্দশায় অর্থাৎ, বাসর রাতেই শ্মশানচিতার প্রজ্জ্বলন মাত্র; অন্ধকার রাত্রিবেলায় ঘিয়ের বাতি খোঁজার অভিলাষ মাত্র, বিশুষ্ক সলতের নিভে যাবার আগে দপ করে প্রজ্জ্বলন প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
—পরিপার্শ্বের টিটকারী আর টিপ্পনী থোরায় কেয়ার করে না মুক্তি; এগিয়ে যায় সামনের দিকে, শিক্ষায় এবং রাজনীতির আলোক শিখায়।

 

জেলখানায় সুবোধের কাছে চিঠি লেখা ছাড়া মনের ভাব প্রকাশের আর দ্বিতীয় পথ খোলা নাই মুক্তির, দেখা করা তো দূরে থাক। নিরুপায় হয়ে কলেজের লেখাপড়া চালিয়ে যায় রীতিমতো, সেই সাথে মহিলা সমিতির কাজ সমানতালে চালাতেও কুণ্ঠিত নয় মুক্তি কুণ্ডু–প্রীতিলতা, নিবেদিতা, ইলামিত্র থেকে সমকালীন নারীদের জীবন ও কর্মের খোঁজখবর এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য পঠনপাঠন করেই কেটে যায় তার সময়। ব্যবসায়ী ভাইদের প্রাচুর্যের উপর নয়, ভাইবৌদের টিপ্পনি অথবা দয়াদাক্ষিণ্যের উপরও নয়; নিজের পায়ে দাঁড়াবার নিরন্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে পাড়ার ছেলেমেয়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে মুক্তি; সংকট থেকে পরিত্রাণের নিমিত্ত কাজই অবলম্বন–সুবোধের এই কথাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় মুক্তি।

 

ইসমাইল বারোদুয়ারি হাটে যাবার সময় যামিনী ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে বসেছিলো কিছুটা সময়। শেরপুর বাসস্ট্যান্ডের ঠিক পূর্বদিকের নদী বরাবর রাস্তার মোড়ের মাথায় যামিনী ডাক্তারের ডিসপেনসারি হওয়ায় বগুড়ার কলেজের ক্লাস চুকিয়ে শেরপুর বাসস্ট্যান্ডের বামদিকে নামার পর বাড়ির পথে ফেরার সময় বামে মোড় নেওয়ার সময় মুক্তি তাকাতেই দেখা পায় ইসমাইলের; মনে মনে একটু-আধটু আশাবাদী হয়ে ওঠে মুক্তি–ইসমাইলের কাছে নতুন কোনো খবর আছে কী-না মুক্তির প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগেই যামিনী ডাক্তার চেয়ার থেকে উঠে কিছু একটা আনার জন্য বাড়ির ভিতরে যায়। এই ফাঁকে সুবোধ লাহিড়ীর পাঠানো চিঠির মর্মার্থ সম্পর্কিত পার্টির গোপনীয় কর্মকাণ্ড ইসমাইলের কাছে বলে দেয় মুক্তি–সুবোধের মনে হয় আর ঢাকা জেলে থাকা হচ্ছে না, কোলকাতায় পাঠানোর কানাঘুঁষা শুনতে পেরেছে সুবোধ। জাল যার জলা তার–এই স্লোগান দেওয়ার সময় জেলপুলিশ বাঁধা দিলে জেলপুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মিছিলকারী কয়েদিদের সাথে হাতাহাতির ঘটনা ঘটায় অতিরিক্ত পুলিশ ডাকার ফলে সুবোধ ক্ষেপে গিয়ে আরও জোরে স্লোগান দিলে তার নাম উস্কানিদাতার দায়ে ব্ল্যাকলিস্টেড হয়; এইজন্যই হয়তোবা তার ভাগ্যে কোলকাতার জেলের ভাত জুটতে পারে, যেতে হতে পারে দ্বীপদেশ আন্দামান–হায়রে কপাল! হায় ভগবান!

 

ইসমাইল আর মুক্তির সংকট ঝড়ো হাওয়ায় একাকার; কিছুটা রাজনৈতিক, বাদবাঁকি সামাজিক তো বটেই; মানুষের স্বভাবজাত রোমান্টিক সম্পর্কসূত্রের ত্রিবিধ জটাজালের টানাটানির কারণে সুবোধ-মুক্তি, মরিয়ম-ইসমাইল–এই চারটি প্রাণ কষ্টনদীর স্রোতের টানে হাবুডুবু খেতে থাকে সারাজীবন, সারাদিনমান–করতোয়া হয়ে বাঙ্গালী আর যমুনার স্রোতোধারায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30