ঢাকা ১৭ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

আমার গুরুগণ: ঊনআশি

Red Times
প্রকাশিত মে ১৪, ২০২৪, ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
আমার গুরুগণ: ঊনআশি
মোস্তফা মোহাম্মদ

 

তুমি চলে গ্যাছো,
তুমি চলে যাও দূর থেকে দূর,
আমার ছায়ার ভিতর দেখে ফেলে কেউ;

 

কী-খেলা খেলো তুমি,
নিত্য আর অনিত্যের লীলা,
তুমি চলে গ্যাছো তাই,
আমি টের পাই,
তোমার বুকের ভিতর উত্তাল যমুনার ঢেউ;

 

তুমি সামনে দাঁড়াও,
দাঁড়ালেই আমি খুঁজে পাই, বাঙ্গালী-করতোয়া-ইছামতী-ঘাগট,
ভস্তার বিলের অতল শিঙি-মাগুর-কই;

 

তুমি চলে যাও মরিয়ম,
নাইওরীর নাওয়ের বাদাম,
শাড়ির আঁচল উড়াও,
চোখের জলে বরষা নামাও,
মুক্তি-সুবোধ আর আমি,
চৈত্রের চিতাকাঠ যেন শেরপুরের শ্মশান;

 

—-মরিয়ম আর তার বড়ভাই কাশেম নৌকাযোগে ফুলবাড়ি থেকে চন্দনবাইশা ইউনিয়নের চানবাড়িয়ায় ফেরত যাবার পর মণ্ডলবাড়ির আবালবৃদ্ধবনিতা ইসমাইলের চলাফেরায় অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকায়! কী-দেখে তারা?
না-কি ইসমাইলের নিজের মনোলৌকিক ভাবালুতাজনিত দুর্বলতার প্রকাশ্য-প্রতিচ্ছবি অন্যের চোখমুখের স্বাভাবিক ভঙ্গির ভেতরেই উদ্ভাসিত হয়; এইটা কীসের আলামত–ইসমাইল নিজের কাছে নিজেই আজ অসহায়।

মরিয়মের চলে যাবার পর ইসমাইলের চোখে যমুনার সমস্ত জল আর ঢেউ বুকের ভেতর জমাটি ভাব দেখায়; বাঙ্গালী-করতোয়া-ইছামতী-ঘাগট–এই সমস্ত নদীর জলের তলায়, আর বানের ঢেউয়ের ডগায় যত মাছ ভাসে স্রোতের সীমায়; সকল মাছ মাঘের শীতের ঠেলায় আর মৎস্য-শিকারীদের জাল-পলো-বরশি-টেঁটা আর খরার পেলায় চতুর্দিক ভাসতে ভাসতে প্রাণ বাঁচানোর দিশায়, অতিবাহিত শীত-হেমন্ত দিনরাত্রির ছায়ায় চৈত্রের দাবদাহে বেতুয়ার বিল আর ভস্তার বিলের কচুরি-পানার তলদেশে লুকায়; আর বাদবাকি মাছেদের দল বড়বিলা অথবা লিসকির বিল অথবা দক্ষিণের টেংরাখালির দয়ের গহিনের বাসিন্দা হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের ভরা বরষায় যমুনা যখন ক্ষেপে যায়, তখন তার আর হুঁশজ্ঞানদিশাপিসা থাকে না; এক্কেবারে পাছার কাপড় তুইলা হিসু করতে করতে বাঙ্গালী, করতোয়া, ইছামতী আর ঘাগটের পার্শ্ববর্তী উঁচাউঁচা-টানটান ফসলী জমির বুক ভাসায় আর ভাসায়, ডুবায় আর চুবায়–ইসমাইল আর সুবোধ দুইবন্ধুর কারোরই এই অবস্থা থাইকা রেহাই নাই; ক্ষেইপা গ্যাছে যমুনা–মুক্তি আর মরিয়মের প্রেমের ইশারায়।

 

সুবোধ লাহিড়ীর জেলজীবন শুরু হবার পর থেকেই মুক্তি কুণ্ডু শেরপুর-টু-বগুড়া কলেজ করার ফাঁকে ফাঁকে নিয়ম করেই ঢু-মারে অর্থাৎ, খোঁজ-খবর নেয়; প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো মাথায় রেখেই সন্তর্পণে বগুড়ার রাজনৈতিক কর্মীদের সুসংগঠিত করার কাজটিও করে চলেছে মুক্তি–প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মী অথবা মূল দলের সমর্থনপুষ্ট ছাত্রসমাজের কাছে পার্টির জন্য কী করণীয়, পার্টির নেতার জেল-মুক্তির ক্ষেত্রেইবা অবশ্য কর্তব্য কী?—সেই সমস্ত দিকনির্দেশনা মুক্তির মাধ্যমেই সুবোধ পাঠায়।

গতকাল জেলগেট থেকে বিদায় নিয়ে বগুড়ার সাতমাথার দিকে আসার পথেই বিড়ি-শ্রমিক আন্দোলনের নেতা কমরেড মোখলেসুর রহমানের সাথে দেখা হয় মুক্তির। সরকারি আযিজুল হক কলেজের ছাত্রদের মাঝে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির অধিকার আদায়ের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার উপর পথসভায় দেওয়া এক বক্তৃতায় মোখলেসুর রহমানের সাথে পরিচয় হয়েছিলো মুক্তির; সেই সূত্র ধরেই সুবোধের বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ হলো আজ। মুক্তি বাড়ি ফিরে এসে নিতাইয়ের মাধ্যমে সাত্তার আর সিদ্দিক সর্দারের কানে মোখলেসুর রহমানের দৃঢ় মনোবলের প্রসঙ্গে বলে: প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে তাদের দ্বিধা নাই। সুবোধের মুক্তির লক্ষ্যে তারা জেলগেট পর্যন্ত মিছিল নিয়ে যেতেও পিছপা হবেন না।
—ইসমাইলের কাছে এই খবর পৌঁছানোর দায়িত্ব বর্তায় সাত্তারের উপর। সোমবার শেরপুর হাটের দিন থাকায় ইসমাইল হাটের যাবতীয় কাজ সেরে ময়েন শেখের খাজনা আদায়ের গদিঘরে বসামাত্র সাত্তার, সিদ্দিক আর নিতাই গিয়ে হাজির হয়।

 

সাত্তার, সিদ্দিক, নিতাইয়ের মুখে সুবোধ সংক্রান্ত মুক্তি কুণ্ডুর মারফত প্রেরিত মোখলেসুর রহমানের সংগ্রামী মানসিকতায় ইসমাইল উজ্জীবিত হয়; সুবোধের ছাড়া পাওয়ার সাধনায় শ্রমজীবী-পেশাজীবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আগুনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ইসমাইল আগত তিন সহযোদ্ধার সাথে কথা বলতে বলতে শেরপুর সকাল বাজারের ভিতর ভোলা ঘোষের কাপড়ের দোকান পর্যন্ত এসে থিতু হয়। ইতোমধ্যে হাটের গাট্টি-বোচকা তথা, কাপড়ের গাট্টি বহনকারী ঠেলাগাড়ির পেছনে পেছনে টাকার থলি হাতে ভোলা ঘোষের উপস্থিতি ইসমাইলের মনোবল বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ।
ঠেলাগাড়ির গাট্টি নামানোর ফাঁকেই ভোলা দোকান সংলগ্ন বাড়ির ভিতর থেকে হাতমুখচোখ ধুয়ে পোশাক পাল্টানোর পর দোকানে এসে বসে আরাম করে চায়ের কাপে চুমুক দেয় সংগ্রামী যোদ্ধাগণসহ। চা শেষ হলেই ইসমাইল কাজের দিকে মনোযোগী হয়; সিদ্দিক, সাত্তার আর নিতাইকে পাঠায় বিশু চৌধুরী, মনোরঞ্জন দত্ত আর রমণী ঘোষকে জরুরি বৈঠকে যোগ দেবার জন্য। তিন যুবকর্মী তাদের নেতা সুবোধ লাহিড়ীর জেল মুক্তির জন্য সদাগতিশীল বলেই তিনদিকে দ্রুতবেগে ছুটে যায়। ভোলা আর ইসমাইল মুখোমুখি, একাকী নির্জন ব্যক্তিগত আলাপমত্ত কিছুক্ষণ–নৃত্যবিভঙ্গে তুমি কেনো এতো গীতিময় প্রীতিময়, একান্ত ভালো লাগায় পেরিয়ে যায় কিছুটা সময়–হঠাৎ মুখ ফসকে কয়ে ওঠে ইসমাইলের অচেতন মন–যার রেশ করতোয়া সাঁতরিয়ে, বুক ভাসিয়ে সটান এগিয়ে যায় যমুনায়; সুবোধের মুক্তি কুণ্ডু আর ইসমাইলের মরিয়ম সময়ের ফাঁক বুঝে অনেকটুকু জায়গা দখল করে নেয় বন্ধুর আড্ডায়; চর দখলের মতোই খানিকটা।
এখানে লাঠিয়াল নাই, সর্দার নাই, নাই কোনো ভূমিদস্যুতার বালাই; আছে প্রেম, আছে সবুজ ফসলের স্বপ্ন, ফলবীজভারানত সংসার যাত্রার অনির্দেশ্য ইঙ্গিত। ইসমাইল আর ভোলার ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসে বিশু, মনোরঞ্জন আর রমণী মোহন ঘোষ।

 

বন্ধুরা ছুটে এলে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে আলোচনা-পর্যালোচনা এগিয়ে গিয়ে সুবোধের জেলমুক্তির কালাকানুন, আইনী-লড়াই এবং ব্রিটিশ-সরকারের একমুখো দমন-পীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব প্রদানসহ দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে এই মর্মে সিদ্ধান্ত স্থির হয় যে, আগামী পরশু রবিবার দশটা গয়না নৌকাভর্তি মানুষ সুবোধের মুক্তির জন্য সকাল ছয়টায় শেরপুরের ঘোষপাড়া করতোয়ার ঘাট থেকে মিছিল করতে করতে বগুড়া জেলা শহরের নবাববাড়ি ঘাটে নেমে বগুড়া বিড়ি-শ্রমিক আর সমস্ত পেশাজীবী শ্রমিকদের মিছিলের সাথে যোগ দিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে কমরেড মোখলেসুর রহমানের যোগসূত্রতায়। শেরপুরের কামার-কুমার, মেথর-মুচি-সূতার থেকে শুরু করে ঠেলাগাড়ি-ঘোড়ারগাড়ি চালকসহ জেলে-জোলা-তাঁতী-নাপিত-ধোপারাও যাতে এই মিছিলে সাধারণ কর্মী এবং নেতাদের, বন্ধুদের সাথে একত্রিত হয়ে সুবোধের জেলমুক্তির বিষয়টাকে অনিবার্য করে তোলে সেদিক বিবেচনায় ইসমাইল ফুলবাড়ি-খামারকান্দিসহ অত্র এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাবে বলে শক্তি জোগায়; উপরন্তু, আরও দূরের গ্রামজনপদ বিশেষত, ঝাঁজোর-এলাঙ্গী-বিলচাপড়ির মানুষজনকেও যার যার মতো বগুড়ার মিছিলে যোগ দেবার জন্য শ্রম দিতে কুণ্ঠিত হবে না।
ইসমাইলের সাহসের সাথে সাংগঠনিক দক্ষতায় বিশু চৌধুরী এবং অন্যান্য বন্ধুরা তালি দিয়ে তাৎক্ষণিক হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সভাকে পরবর্তী কার্যক্রমের ক্ষেত্রবিশ্লেষণের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় এবং সুবোধীয় রাজনীতি তথা জেলমুক্তির পরম্পরায় মাইলফলক হিসাবেই ধরে নেয়।

আলোচনা শেষে সকলেই ফিরে যায় নিজ নিজ ডেরায়; ইসমাইল ঘোষপাড়ার দধিকারখানায় কর্মরত ঘোষেদের কারখানার কূপিবাতির ব্যস্ত আলোয় পথ পাড়ি দিয়ে খেয়াঘাট পার হয়ে ধীরে ধীরে মৃদুপায়ে বাড়ি আসে আর ভাবে, আগামী পরশু রবিবার তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জের দিন–অপেক্ষায় নিশ্চিত বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের ঋণ; আগামীর পথচলায় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক মরিয়ম আর মুক্তি কুণ্ডু আমাদের দুই বন্ধুর মতো।
রবিবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক জীবনের কাজকর্ম শেষ করে ছয়টার আগেই খেয়াঘাটে এসে ইসমাইল দেখে লোকারণ্য—সুবোধের মুক্তি চাই, মুক্তি চাই; জেলের তালা ভাঙবো, সুবোধকে আনবো; জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো;–ইত্যাদি স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত খেয়াঘাট এবং সমগ্র শেরপুর। মুক্তি কুণ্ডুও কম নয়; মিছিলের আবহ এবং গুণগত মান সর্বজনীন করার জন্য মুক্তি কুণ্ডু তার অনেক বান্ধবী এবং প্রগতিশীল ছাত্রীদেরসহযোগে এক বিরাট মিছিল নিয়ে ব্যানার হাতে নৌকার অগ্রভাবে স্লোগানে ব্যস্ত। ব্যাপক লোকসমাগম এবং মিছিলের হল্লা-পাল্লায় ঘোষপাড়া-দত্তপাড়া-গোঁসাইপাড়াই শুধু নয়, মহীপুর-চণ্ডিজানসহ করতোয়া নদীতীরবর্তী মানুষজন নদীর পাড়ে এসে সমবেত হয়ে মিছিলের আর স্লোগানের সাথে কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে গলা মিলায়। মানুষের আগমনে এবং ঐকান্তিকতায় ভয় পেয়ে যায় শেরপুর থানার পুলিশ। ভয় পেয়েছে বটে, তবে মিছিলের গতিরোধ করে নাই, মারপিট তো দূরের কথা—মিছিলে আসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিরূপণসহ নেতাকর্মীসাধারণজনগণের তালিকা করেই শুধু পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি; বগুড়া সদর পুলিশ এবং জেলা পুলিশ প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট জরুরি টেলিগ্রাম করতেও দ্বিধা করে নাই। বগুড়ার নবাববাড়ি ঘাটে নামার সাথে সাথে জেলার শ্রমিক নেতা কমরেড মোখলেসুর রহমানের বিপুল কর্মী এবং নেতাগণসহ মিছিল যোগে জেলখানার ভেতরেও খবর চলে যায়; ডিসি অফিস, এসডিও অফিসের সামনের-পেছেনের রাস্তা পেরিয়ে মালতীনগর, সাতমাথা, বাদুরতলা, কাটনারপাড়া হয়ে রাজাবাজার, ফতেহ আলী ব্রিজ পর্যন্ত গিয়ে মিছিল ঘুরে রেল লাইনের পাশ দিয়ে আযিজুল হক কলেজের দিকে যেতেই পুলিশ মিছিলের উপর ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে–মিছিলে লাঠিচার্জের খবর বিদ্যুতের গতিতে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সমস্ত বিড়ি কারখানার সকল শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ার সাথে সাথে রাস্তায় জঙ্গিমিছিলসহ নেমে আসে জামিল কারখানার বিড়ি-সাবান-সিগারেট কর্মীগণ। মিছিল আর কারো দখলে থাকে না; জ্বালাও-পোড়াও স্লোগানের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নয় মিছিল, তারা রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং স্টেশনের কিছু অংশে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটায়। বগুড়ার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্তাগণ দ্রুত একত্রিত হয়ে সুবোধ লাহিড়ীর মুক্তির জন্য সরকারের কাছে ফরিয়াদ জানাবেন এই মর্মে মিছিল স্তিমিত করে কর্মীদের বাড়ি ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করেন। মিছিলকারীরা ফিরে গেলে বগুড়ার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কর্তারা রাতারাতি সুবোধকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30