ঢাকা ২৫শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

আমার গুরুগণ: একাশি

Red Times
প্রকাশিত মে ২২, ২০২৪, ০২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
আমার গুরুগণ: একাশি

মোস্তফা মোহাম্মদ

 

সিনান করি আমি,
নদীর জল,
করে টলমল সিনার ডাইনে সুবোধ;

 

পাঁজরভাঙা গান,
কালের যাত্রাধ্বনি বামাবোধিনী তুমি,
মরিয়ম আর আমি,
দূরের নিক্ষেপিত শেল দূর জানালায়;

 

বিরহ-ঘণ্টাধ্বনি,
অমরাবতী নীলাম্বরী অভিমানী,
তুমি আর সুবোধ ভেসে যাও,
মেঘেদের ভেলা সাজাও,
গাঙুরের জল করে টলমল দখিনা বাও;

 

আমি বসে আছি,
একাকী সুদূরের হাতছানি,
আমার প্রাণ,
সেই সুর ভাজে আজি দখিনা পবন;

 

—-বিপন্ন সময়ের স্রোতোধারায় মুক্তি আর মরিয়মের বিষণ্ন চোখের মণিদ্বীপের অন্তরালের খোঁজ রাখার মন আছে কয়জনার?
—ইসমাইল শেরপুর হাটবাজারদোকানপাট ইত্যাদির কাজ সম্পন্ন করার পর করতোয়ার স্রোতের অনুকূল-প্রতিকূল ভেবেচিন্তে নিজের কাছে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয় কবির ভাবনায়!
কবি-না-পাগল-না-মাতাল, কোনোটার সংজ্ঞা তার জানা নাই; শুধু জানে মানুষ সুখে অথবা দুঃখে, আবেগের আতিশয্যে কিংবা বিষাদের নিমগ্নতায় নিজের ভেতরের লালিত আশা-ভালোবাসা স্বপ্ন কিংবা হতাশা প্রকাশ করে তার নিজের দেখা চোখের ভাষায় আর দুই কানের শোনায়।
—কিছুটা ভাবনা, কিছুটা বাস্তবতার জঞ্জাল ঠেলেই মানুষ এগিয়ে যায়; আজ তার ব্যত্যয় না-ঘটিয়েই খেয়ানৌকায় উঠে দাঁড়ায় ইসমাইল।

 

পড়ন্ত-কর্মক্লান্ত বিকালের সোনারোদ করতোয়ার স্রোতের টানে ভাটিতে মিলায় হারানো যৌবনের মতো; পয়মন্ত টান টান দুপুর উত্তেজিত চুম্বনের কাতরতা নিয়ে বসন্ত আর বরষায় অজানার উদ্দেশে চলে যায় বটে, রেখে যায় স্মৃতির ডানায় কত-না-বলা-কথা কতগান; কতই-না-মান-অভিমান। হাটবাজারফেরতা মানুষের ভীড়ভাট্টাহুল্লুরহাঙ্গামা নাই, সন্ধ্যায় তাই বাড়ি ফেরার তাগাদা কম থাকায় ইসমাইল চিন্তার ফুরসত পায়–ইসমাইল দক্ষিণের শ্মশানের দিকে মুখ উঁচিয়ে তাকায় আর বাতাসের সাথে বুলি আওড়ায়: চিতাভস্ম ধুয়ে যায় করতোয়ার জলের ধারায় অবলীলায়, আমাদের প্রাত্যহিক জীবন!
—মনসুর মাঝি ইসমাইলের চোখের বিস্ময়ের সাথে মুখের বুলির মিল খুঁজে না পায়, না পায় তল: মামু আজ বেলা ডুব্যা গেলে গোসাইবাড়ির কামলারা আপনের জমির কাম কর‍্যা যখন বাড়িত ফিরিচ্ছিলো তখন সগলেই হাত ভর‍্যা ভর‍্যা, গামছার মাথাত পুটলি বান্দ্যা বান্দ্যা বাগুন-পুটল-খুইরা-ডাটা আর কাঁচামরিচ লিয়া গেলো; ওরা আপনের শাগসগজির ভিটামাটি শ্যাষ কর‍্যা দিবি, কনু মামু।
—ইসমাইলের শীতকালীন শাকসবজি-পটলবেগুন-আলু-মরিচ-ধনিয়ার আবাদের জন্য প্রতিদিনের নিড়ানিসহ নানাবিধ কৃষিশ্রমিক দরকার হয়; এই দিনমজুর আসে নদীর পশ্চিমপাড় শেরপুর শহরের গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গোঁসাইবাড়ি, হাঁপুনিয়া, বাগড়া, টুনিপাড়া, মহীপুর কলোনিতে বসবাসরত মানুষজন–এরা সাতচল্লিশের দেশভাগ এবং হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার জালে নিমজ্জিত মুসলমানদের বিপুল সংখ্যক মানুষ ওপার বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের বগুড়ার শেরপুরের হিন্দুঘনবসতিপূর্ণ সরকারি খাসজমির উপর বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়। ক্ষুধার কামড়ে এরা নাকাল, কাজের জন্য তারা দিশাহারা–কৃষিপ্রধান এই থানা শহর অধ্যুষিত মফস্বল এলাকায় পিন্দনের কাপড়ই শুধু নয়, পাছার কাছায় ধুতিলুঙ্গিশাড়ি দিয়া ইজ্জত রক্ষাসহ বৌবাচ্চাবাপমা বাঁচানোর ক্ষেত্রে একমাত্র কৃষিশ্রম ছাড়া তাদের আর দ্বিতীয় উপায় নাই; ইসমাইল মনসুর মাঝির কথায় কান না দিয়া উদ্বাস্তু মানুষের জীবনের কষ্টকরুণ জীবনের চিন্তন- কথকতায় আচ্ছন্ন হয় এবং মনসুর মাঝিকে সাবধানে নৌকা চালানোর প্রতি তাগাদা দেয়।

 

এই মনসুর মাঝিডা একটা জাউরা, একটা আস্ত বেত্তমিজ; শালায় কুনোদিন আপনাক মামু ডাকবার চায়; আবার কখনো কখনো চাচমে কর‍্যা কয়!
—মাড়ের নৌকা থেকে নামা মাত্রই আরিফ এসে ইসমাইলের পাশাপাশি বাড়ির পথ ধরে হাঁটার সময় এই কথা আলোচনায় বিষয় বানায়; তারা এগিয়ে যেতেই ভূপেন ঘোষ মুখোমুখি দাঁড়ায়: ঝাঁজোরের নিধুয়া পাথারের ধানজমিন দেখার জন্য দুপুরের পর গিয়েছিলো–এই কথা শুধানোর সাথে সাথেই সুযোগ বুঝে আরিফ ভূপেন ঘোষের বেতুয়ার বিলের দক্ষিণের মণ্ডলদের গারার জমির পাশের বড় বড় দুইটা ধানক্ষেত আধা-আধি হিস্যায় চাষ করার প্রস্তাব দিতেই ভূপেন ঘোষ ইসমাইলের মুখের দিকে তাকিয়েই রাজী হয়ে যায়–আরিফ মণ্ডলের আনুকূল্য পেয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার অনাবিল আনন্দ পায়; একদিকে মনসুর মাঝির সামাজিক-আক্ষরিক মাত্রাজ্ঞানের অজ্ঞতার ধরায়, অন্যদিকে ইসমাইলের বন্ধু ভূপেন ঘোষের জমি বর্গাচাষের জন্য বাগিয়ে নেওয়ায়; আরিফ মহাখুশি আজ।

 

আকন্দবাড়ির ছোট ছেলে আরিফ, যার ডাকনাম উন্তুম–রশিদ খোন্দকার কোত্থেকে যে, এই উন্তুম নামের আগমন ঘটালো আজও এর ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে পারেনি ইসমাইল। আরিফের স্বভাবটাই রসিক ধরনের; গ্রামের মানুষ যাকে বলে রসালো কথাবার্তায় মনভেজানোর ওস্তাদ–বিশেষত, রসবোধসম্পন্ন মানুষের চারিত্র‍্যবিশ্লেষণপূর্বক এই উন্তুম অর্থাৎ সবজান্তা সমশের অর্থাৎ উন্তুম নামেই আরিফ এখন পরিচিত বেশি; আর এই নাম দিয়েছে রশিদ। মাওলাবক্স, আজিমউদ্দিন, দিল মোল্লা–এরা আরিফকে উন্তুম নামেই ডেকে মজা পায়; আরিফও সাড়া দেয় সমভাবেই। ইসমাইল কোনোদিন উন্তুম নামে ডাকে না, একটা সম্মানবোধ ইসমাইল সকলের ক্ষেত্রেই মান্য করে চলে সবসময়। ফুলবাড়ি খেলার মাঠের পাকুড়তলায় এসে আরিফ মহাখুশি খুশি ভাবে বলে ওঠে: চাচমে এবার একখান শগের মেলা লাগান মাঠোত; হামরা এনা মজা করি, কী-কন চাচমে? দুই বছর হয়া গেলো আপনি আর মেলা বসালেন না, হামরা আনন্দ করা থাক্যা বাদ পড়্যা গেনু চাচমে!
—এলাকার মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্য কৃষিমেলা লাগিয়েছিলো ইসমাইল দুইবছর আগে; সাথে ছিলো খাবারদাবার-পিঠাপুলি-লাঠিখেলা-হাডুডু-দাড়িয়াবান্ধা-গোল্লাছুট-বালিশখেলাসহ যেমন খুশি তেমন সাজো–সারাদিনব্যাপী এলাকায় ছিলো আনন্দের ঢল। মাঝখানে বিভিন্ন ঝামেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের স্থান চণ্ডিজান হবে, না ফুলবাড়ি খেলার মাঠের উত্তর সিথানের পাকুড়তলায় খোলামেলা জায়গায় হবে; এই নিয়ে হানিফ ডাক্তারের সাথে বিরোধে জড়িয়ে এলাকার মানুষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ায় আর আনন্দমুখর রঙবেরঙের অনুষ্ঠান করা হয়ে ওঠেনি। এবার যাতে হয়, সেই কথা আরিফ উত্তোলন করায় ইসমাইল কিছুটা খুশি হয় এজন্য যে, এই বালক অত্র এলাকার মানুষের জীবনের কথা নিয়া চিন্তাই শুধু করে না, তাদের মধ্যে সংস্কৃতির আদানপ্রদানের মাধ্যমে মেলবন্ধন চায়। বাড়ির কাছে এসে আরিফের কথার মূল্যায়ন করবে জানিয়ে বাড়ির ভিতরে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আরও কিছু কথা বলে আরিফকে বিদায় জানায় ইসমাইল।

 

আরিফ চলে গেলে ঘরেফেরা ক্লান্ত ঈগল কৃষকবন্ধু ইসমাইল একাকিত্বর জ্বালায় কষ্ট পায় ভীষণ–একপাখায় মরিয়ম আর অন্যপাখায় সুবোধ আগামীর দিশায় উড়তে চায়; আগামীকাল হাল সনের খাজনা আদায়ের ধার্যকৃত দিন থাকায় দহপাড়ার পাইক-বরকন্দাজরা এসে বৈঠকখানায় সন্ধ্যা থেকে বসে আছে অপেক্ষায়। রাতের সামান্য খাবার গ্রহণপূর্বক ঔষধ সেবন করে বড় চাকর লেদুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরা ঘরের বারান্দায় বসে আগামীকালের করণীয় বাতলে দিয়ে ওজু-নামাজ সেরে প্রাত্যহিক ডায়রি লেখার কাজ সম্পন্ন করে ঘুমাতে যায় ইসমাইল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30