ঢাকা ২৫শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

আমার গুরুগণ: ছাপান্ন

redtimes.com,bd
প্রকাশিত জুলাই ১৩, ২০২৩, ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
আমার গুরুগণ: ছাপান্ন

মোস্তফা মোহাম্মদ

যাদের পাখায় আমি পথচলি

মণ্ডলের পাঠের জমিডো কী বৃন্দাবনের মাঠ?—ওই শালা লোটি-মাগির ছোল তেকানি ফকির কী কৃষ্ণ না-কি-যে বৃন্দাবনের মাঠোত, আর কদমতলাত বাঁশি বাজায়া-বাজায়া, লাচ্যা-লাচ্যা বোষ্টুমি ঠাবায়া মণ্ডলের খিলের ভিওত লীলা করবি! ওই শালার কি ধর্মকর্ম, আল্লারসুল নাই? আল্লাগো আল্লা, এই ভরদুপুর বেলা পাটের জমিত পুকুর পুকুর কর‍্যা পাটের ফলন কমায়া দ্যাশোত আকাল আনবি না-কি ওই বানচোদ পাঁঠা শালা? শালা মানুষও লোস, মানুষের জন্মাও লয় গো; বাপুরে বাপু! জাউরা শালা বউ লিয়া এই বিষ্টির দিনোত পাঠের জমিত কি মজা পায়?
মোদ্দা-শালাক ধর‍্যা গোটা কাট্যা দেওয়া লাগবি বুঝল্যা বাপু, বুঝল্যা না—ক্ষোভ ঝাড়তে ঝাড়তে মোল্লা আর আকন্দ আর পরামানিক পাড়ার মোদ্দামাগিরা পাছার কাপড় হাঁটু পর্যন্ত তুলে তেকানি ফকিরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে বাড়ির দিকে যায়। তেকানি ফকির ইসমাইল মণ্ডলের ঘোড়ার চাবুকের আঘাতে যতটুকু না, তার চেয়ে বেশি লজ্জায় দৌড়ে গিয়ে তার পুবদুয়ারি দোচালা মাটির ঘরের দরোজার খিড়কি লাগায়। তেকানির দৌড়ের সাথে সাথে পাড়ার সকল ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পিছু নেয়। তেকানির বাড়ির দক্ষিণ পাশে খোন্দকারদের পরিচ্ছন্ন খড়ের চারচালা ঘরের পাশের ডাব-শুপারি বাগানের ফাঁকে ফাঁকে গোলাপ গাছ আর জবা ফুলের ঝাঁকড়া ডাল এবং বকপুষ্প আর কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। সন্ধ্যায় দূরের চরা থেকে আহার শেষে বক-শালিখ-ঘুঘু-পেঁচাসহ ছোটবড় পাখির দল মণ্ডলদের কান্দরের জমির উত্তর-পশ্চিম সিথানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সিন্দুরিয়া আমগাছের ডালে, পুকুরপাড়ের আম-জাম-নারকেল-বেল গাছের ডালে, আকন্দদের চিনাধুপি আমের মগডালে এবং খোন্দকারদের কৃষ্ণচূড়ার ফুলের লালে বসে কিচিরমিচির শব্দ করে গ্রাম উতালা করে রাত্রি নামায়।

আজ এই সন্ধ্যাকালে অন্যান্য দিনের তুলনায় পাখিসকল এত জোরে জোরে চিল্লাপাল্লা করে কেন? পাখিরা কী মানুষের ভাষা বোঝে? মানুষের জীবনের সুখদুখমাখা জীবনঘনিষ্ঠ কষ্টকথা? এই পাখিরা কী তেকানি ফকিরের গানের সুরে অথবা শ্মশানঘাটের মস্ত মস্ত বটপাকুড়ের নিচে বসে নিশুতি রাতে তেকানি আর মেছো জলিলের বাজানো বাঁশির সুরে নিজেদের ভাষা ও বোধ খুঁজে পায়?
ইসমাইলই-বা-কেন তেকানি ফকিরের অপকীর্তির উপযুক্ত শাস্তি না দিয়া লোক-দেখানো চাবুকপেটা দিয়া তেকানিকে পালানোর সুযোগ করে দেয়? এই চিন্তা মাথায় আসার পরেও দুষ্টু ছেলেদের মধ্যে নিজের বীরত্ব জানান দেওয়ার আশায় বুদ্ধি আঁটার চিন্তায় মগ্ন হওয়ার ফাঁকে অত্যন্ত সন্তর্পণে, পা-টিপে টিপে রশিদ খোন্দকারের নারকেল গাছের মাথায় উঠে একঝোঁপা নারকেল ছিঁড়ে আকন্দবাড়ির ছোটছেলে আরিফ তেকানির টিনের চালের উপর ধপাস করে ফেলে দেয়। পড়ন্ত ডাবের ধপাস এবং গুড়ুম করে ওঠা আকাশবিদারী শব্দে তেকানি ফকির ভয় পেয়ে তার বউ আগ্নিকে টেনে নিয়ে ধানের মাচার তলে লুকায়। এই শব্দে বাদরের দলের মতো ছেলেমেয়েরা আবার ছুটে আসে তেকানি ফকিরের বাড়ির উঠানে আর খুলিতে। ফকিরের বন্ধ দরোজা-জানালার ফাঁক দিয়ে সান্ধ্যপিদিমের আলোয় তারা ছায়াবাজির মতো তেকানি ফকির আর তার রসালো-বৌ-আগ্নির মুখ দেখার চেষ্টা করে বিচ্ছুর দল। আরিফ রশিদ খোন্দকারের উঁচু-ডাবগাছ বেয়ে সরৎ-সরৎ শপাং-শপাং শব্দে নেমে এসে বীরদর্পে বলে, ‘ফকিরোক এনা ভয় দেখাবার জন্নি ডাবের ঝোপার বোমা মারিছিনু।’—এই কথা বলতেই রশিদ খোন্দকার অন্ধকার ঠেলে বারদুয়ারি হাটের ইজারাদারির ক্যাশিয়ারগিরির টাকার হিসাব কোরবান শেখের গদিঘরে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ির উঠানে দাঁড়াতেই আরিফের মুখোমুখি হতেই আরিফ ইতস্তত ভাব দেখাতেই রশিদ বলে, ‘ এই উন্তুম, তুই এই সন্ধ্যার অন্ধকারে বাগানে কী করছিস?—তোর মতলব কী-রে পাজি?’—দুষ্টু আরিফকে আদর করে রশিদ উন্তুম বলেই ডাকে। রশিদ খোন্দকারের মেজাজ দেখেই কেটে পড়ে আরিফ। রশিদ বাড়ির ভেতরে গিয়েই হবিবরের মায়ের কাছ থেকে জেনে ফেলে তেকানির কম্ম।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে আসে কোলাহলপূর্ণ ফুলবাড়ি গ্রামের চোখ জুড়ে। হাটুরেরা বাঁশের বাঁক কাঁধে করে ফিরে যাচ্ছে যে যার মতো। কেউ পাড়ি দিয়েছে ঘোষপাড়া ঘাট; কেউ-বা-কষা-নৌকাযোগে শ্মশান-ঘাটের এপারে ঈদগাহ মাঠের ঢালুতে নেমে দহপাড়ার ভেতর দিয়ে ফুলবাড়ি-চকপাথালিয়া হয়ে রানীনগর হয়ে খামারকান্দি-শিবপুর কিংবা নগর হয়ে বিলচাপড়ির দিকে; অথবা দামুয়া থেকে ডানে মোড় দিয়ে খামারকান্দি হিন্দুপাড়া ছাড়িয়ে ঝাঁজোর-বিলনোথার-এলাঙ্গিগ্রামের দিকে চলে যায়। আরেকদল মণ্ডলদের বাড়ি পার হয়ে ডানে মোড় দিয়ে জয়নগর-লিসকিপাড়ায় মিলায়। চাঁদ-পূর্ণিমার রাত অথবা আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র মাসের গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির ছিটায় মাথাল অথবা ছাতা মাথায় কেরোসিনের ভুটিয়া অথবা বাঁশের চোঙ্গার মাথায় সলতে কিংবা পেট্রোম্যাক্সের তৈরি হ্যাজাক জ্বালিয়ে দলে দলে জারিগান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরে।
হাটুরেরা সন্ধ্যার পর হাটশেষে দূরের গায়ে একসাথে দলবদ্ধভাবে ফিরে যায় ঘরে—কেউ খেয়ানৌকায় পার হয়ে গ্রামে ফিরে গেলো কি-না সব খবর মুখস্ত মনসুর মাঝির। ঘাটের মাঝি হলে কি; জীবনের জারিজুরির সকল কায়দা তার হাতের মুঠোয়। ব্রিটিশের জাঁদরেল দারোগা লোকমান হাকিম বিকেল বেলা হাফপ্যান্ট পরে প্রায়ই হাওয়া খেতে নদীরঘাটে আসে; এবং খাতির রাখে মনসুরের সাথে—চোর, বদমাইশ, গুণ্ডা; এমনকি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কোনো কর্মী খেয়ানৌকা পাড়ি দিয়ে শেরপুর শহরে এলো কি-না; অথবা শহর পাড়ি দিয়ে ফুলবাড়ি-খামারকান্দির পার হয়ে ঝাঁজোর-এলাঙ্গী-ধুনট পাড়ি দিয়ে গোসাইবাড়ি হাট হয়ে তারাকান্দির ওপারে কিংবা উত্তরদিকের সারিয়াকান্দির পুবের জনপদ হাট-শেরপুর হয়ে সরিষাবাড়ির উপর দিয়ে জামালপুর হয়ে নেত্রকোণার দিকে যায় না-কি কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামী?—যেমনটি শুনেছে কমরেড রবি নিয়োগী এবং কমরেড মণি সিং এই পথে গোপনে আসা-যাওয়া করে।
এই রাজনৈতিক নেতারা, ব্রিটিশ সরকারের শোষণ-বিরোধী গুণ্ডারা; সন্ত্রাসীরা জামালপুর হয়ে ধুনটের দিকে প্রবেশ করে জনগণকে ব্রিটিশের রাজত্বের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুললো কি-না? যেমনটি করে শেরপুরের সুবোধ লাহিড়ী? —এই সমস্ত ভয় ও হতাশা সরকারি চাকুরেদের সার্বক্ষণিক তাড়িয়ে বেড়ায়। পুলিশের সোর্স হিসাবে মনসুর কাজ করে;—এই কথা সারা গ্রামে রটে যাবার পর স্বাধীনতা সংগ্রামিরা শেরপুর শহর থেকে ফুলবাড়ি ঢোকার ক্ষেত্রে বিশেষত, করতোয়া নদী পারাপারের ক্ষেত্রে বিকল্প পথ হিসাবে বারুনিঘাট অথবা শ্মশানঘাট বেছে নেয়।
শ্মশান-ঘাটকে অনেকেই বৈরাগীর দহ হিসাবেই জানে। কার্তিক বৈরাগী অথবা তার বাবা অথবা তার দাদার দাদাদের মৃতদেহের ওপর নির্মিত ইটের গম্বুজাকৃতির সমাধির জন্যই নদীপাড়ের মুসলমানেরা শেরপুর মহাশ্মশান এলাকার গভীর জলবেষ্টিত নদীকে বৈরাগীর দহ হিসাবেই চিনে।

বারদুয়ারি হাটের সওদা নিয়ে হাটুরেরা পূর্বদিকের গ্রামে ফিরে যাবার সময় তারা শুকনা মৌসুমে বারুনিঘাট তথা শ্মশানঘাট এলাকা বেছে নেয় কারণ পাচ-পয়সা দশ-পয়াসা ঘাটের মাশুল তাদের গায়ে বাজে। ঘাটের মাশুল ফ্রি করে দেওয়ার জন্য এলাকাবাসির সুবিধার্থে ইসমাইল ও সুবোধ বগুড়ায় এসডু সাহেবের অফিসে একাধিকবার দরখাস্ত করেছে; কিন্তু ফল হয়নি। দামুয়ার হানিফ ডাক্তার, ভবানিপুরের আয়েব আলি পরামানিক ও তাদের পরিবার-পরিজন এবং সহযোগিদের কাচাপয়সার প্রতি দুর্বলতা অথবা গ্রামীণ জনপদের আধিপত্যজনিত মাতব্বরির কাছে ইসমাইল ও কমরেড সুবোধ লাহিড়ীর হিতজ্ঞান ধুলায় মিশে যায়। আর ব্রিটিশের চাকরেরা পায় আস্কারা; চলে মানুষের প্রতি আর্থিক পেশন, যাকে বলে শোষণ–এভাবেই গ্রাম-গঞ্জ-হাট-বাজার চলে যায় উঠতি অর্ধশিক্ষিত মানুষের হাতে।

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ইসমাইল রাতের আহার হিসাবে ঘিয়েভাজা একটা রুটি, বড় জামবাটির পুরো একবাটি শরপরা দুধ, একটা সন্দেশ, আর পুকুর পাড়ের বারোমাসি গাছের আষাঢ়িয়া আমের আস্ত দুইটা নিয়া যখন খাওয়া শুরু করবে ঠিক তখনি তার পুবদুয়ারি ঘরের বারান্দায় এসে গলা খাকারি দিয়ে রশিদ খোন্দকার বলে, ‘সাহেব আছো না-কি?’—রশিদের গলার স্বরে ইসমাইল বলে, ‘আছি মামু, ভেতরে আসো।’
(চলবে)

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30