আমার গুরুগণ: ছেষট্টি

প্রকাশিত: ৬:১৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২৪

আমার গুরুগণ: ছেষট্টি

মোস্তফা মোহাম্মদ

 

টিকটিক-টক, টক-টকাটক-টক—পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে সময় দেখে নিলো ইসমাইল। হাত ঘড়ি নয়, পকেট ঘড়িই ব্যবহার করে ইসমাইল—এর দুইটা কারণ: এক. লোকলজ্জার ভয়; দুই. বাহুল্যবর্জন এবং প্রয়োজন মেটানোটাই যথেষ্ট বলে মনে হয়।

 

লোকদেখানো ঠাঁট কিংবা ডাটমারা ভাব ইসমাইলের ধাতে নাই, স্বভাবেও মানা এবং ধর্মের রশিতেও টানা। তবে মালের কোয়ালিটির ব্যাপারে কোনোই ছাড় নাই। ইতালির লোকোস্মিথের তৈরি অথবা সুইজারল্যান্ডের সুইসস্টার কোম্পানির কি-না-কে-জানে! সিলভার কালারের পকেট ঘড়িটা ইসমাইল কিনেছিলো কলিকাতায় ডাক্তার দেখানোর কাজে গিয়ে নিউমার্কেট এলাকার ব্রাণ্ডের দোকান থেকে। সেই সাথে কিনেছিলো স্টপওয়াচ, হ্যাজাক-লাইট, পানি গরমের কেটলি, চায়ের কাপ, কালু ডাক্তারের দেওয়া জ্বরের ওষুধ কালো মেঘ কিংবা হাতে বানানো মিকচার জাতীয় তরল ওষুধের বোতলের ছিপি খোলার যন্ত্র—যাকে বলে কক-রিমোভার, জ্যামিতি বক্স, একটা পেন্সিল কার্টার, কাচের বোতলের ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য একটা স্টিলের হাতলওয়ালা ব্রাশ আর শরীরের জ্বর মাপার যন্ত্র—যাকে বলে থার্মোমিটার। বাহুল্যের চেয়ে প্রয়োজন, সৌখিনতার থেকে সম্ভ্রম বেশি প্রাধান্য পায় ইসমাইলের কাছে।

 

পকেট ঘড়িতে এখন সকাল ৮ বাজে। ঘড়িতে চাবি দিয়ে টেবিলে রেখে ওয়ালেস্টার, পাঞ্জাবি, গেঞ্জি খুলে আলনায় ঝুলিয়ে কলপাড়ে গিয়ে কুসুম-কুসুম গরম পানিতে গোসল সেরে নেয় ইসমাইল। বড় ভাতিজার বউ নূরজাহান পিতৃজ্ঞানে চাচাশ্বশুরের প্রতি খেয়াল রাখে সবসময়। জ্বরজারি-পেটেরপীড়া নানান অসুখবিসুখ এইটা-সেইটা লেগেই থাকে ইসমাইলের। হায়দারের বাবার মৃত্যুর পর দুইমাস না ছয়মাসের হায়দারের দায়িত্বসহ আত্মীয়-বন্ধু, গ্রামের সকল হিতাকাঙ্ক্ষী মানুষ আর মাতব্বর আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ-উপরোধ, জোরজবরদস্তির ফলে হায়দারের মাকে বিয়ে করে নতুন সংসার সাজায় ইসমাইল। পুরাতনের মাঝে নবজীবনের অভিজ্ঞান খোঁজার চেতনায় ধর্মে-কর্মে-মর্মে মেনে নিয়ে পথ চলতে গিয়ে পড়ালেখা চাঙ্গে ওঠে তার। ক্লাস নাইন মানে নাইনেই লেখাপড়া শেষ—ব্রিটিশ আমলে শেরপুর ডিজে হাইস্কুলের ক্লাস নাইন বলেই কথা; পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য খামতি থাকলেও, গ্রামীণ কৃষির অগ্রগতি এবং যৌথ-পরিবারের হাল ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াসহ গ্রাম্যমাতব্বরির জন্য যথেষ্ট শিক্ষিতই বলতে হয়, অন্তত সেই সময়ের লীলায়।
শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা, অফিস-আদালত, কোর্ট-কাচারি তদারকির জন্য যথেষ্টই ছিলো সেই সময়ের বাংলায়। শরবেস মণ্ডলের ছোট ছেলে হওয়াতে এবং বড়ভাই মিয়াজান মণ্ডলের জজের জুরি হওয়ার আনুকূল্যে এবং বন্ধু সুবোধ লাহিড়ীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞানের বিভায় ইসমাইল দীপ্তিমান, প্রজ্ঞাবান মানুষ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পায়। শেরপুর একটা হিন্দুপ্রধান প্রাচীন জনপদ হওয়ায় এবং করতোয়া নদীর দ্বারা ফুলবাড়ি গ্রাম ও শেরপুর থানাশহর বিভক্ত থাকায় প্রাকৃতিক-শাহুরিক-গ্রামীণ জীবন ইসমাইলের মাথায় সর্বজনীন মানবশিক্ষার রেখাচিত্র এঁকে দেয়—তাই তার হিন্দুবন্ধু সুবোধ, ভোলা, বিশু, সুনীল, কার্তিক, বেজি ঘোষ, রমণী মোহন ঘোষসহ আছে অনেকেই।

 

গতরাতে সুবোধের পাঠানো গোপন-চিঠি পড়ার পর থেকে কিছুটা উদভ্রান্ত ইসমাইল। নাস্তা সেরে লাল টাট্টুঘোড়ায় গদি চাপিয়ে ইসমাইল শেরপুরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে নতুন ইশারায়, অথবা কোনো কাজের দিশায়। আজ মন ভালো নাই, তাই খেয়াঘাট পার হয়ে ঘোষপাড়ার ভেতর দিয়ে ডানে মোড় নিয়ে, শেরপুর থানার সামনে দিয়ে, গোঁসাই বাবুর কাচারি-সংলগ্ন করতোয়ার ঘাটে এসে টাট্টু থামায়।

 

সকালের সোনারোদ আর শীতের ঘুলঘুলি-পাকানো ওমের মায়ায় আর করতোয়ার স্রোতের লীলায় ইসমাইল বুদ হয়ে যায়। রাধিকা দত্ত শ্বেতকায় সুপুরুষ সাদাধুতির কোচ সাদা পাঞ্জাবিতে ঝুলিয়ে বেতের লাঠি হাতে কালো চামড়ার জুতা পায়ে দিয়ে নদীতে অপেক্ষারত নৌকার দিকে আগাতেই ইসমাইলের সাথে দেখা তার। কুশল বিনিময়ের পর রাধিকা গোঁসাইয়ের চকের দিকে পা-বাড়ায়। ইসমাইল ভাবে: এই রাধিকা সারাদিন গোঁসাই বাবুর পরিত্যক্ত জমির কাগজপত্র নিয়ে এই অফিস সেই অফিস, এই কোর্ট সেই কোর্ট করে বেড়ায়; শালায় পারেও খুব!

 

গোঁসাইয়ের কাছারিবাড়ির সামনে, করতোয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে কাঁঠাল-তাল-আম-নারকেল গাছের ছায়াময়-মায়াময় জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী-যেন ভাবে, কী-যেন খোঁজে ইসমাইল; যা রাধিকা দত্তের চোখেরও আড়াল হয় নাই। রাধিকা ভাবে আর বিড় বিড় করে ঠোঁট কাপায়:
‘মনে হইতাছে শালার সুবোধ লুকিয়ে এসে এই ঘাটে নৌকা থেকে নেমে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে উলিপুর মসজিদের পাশে তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে উঠবে’—কথা বুঝে ওঠার আগেই ধুতির কোঁচা বামহাতে আর মাথা-বাঁকানো বেতের লাঠি ডানহাতের কবজিতে ঘুরিয়ে ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে রাধিকা জোর গলায় বলে:
‘মণ্ডল সাহেব ধর্মকর্ম সমাজ-সাঙ্গাত অনেক হলো; এইবার সংসারের দিকে মনোযোগ দাও। আমি যাই, ওপারে যাবো; একটু জমিজমার খবর নিয়া আসি।’
—রাধিকা দত্তের কথায় চিন্তার নিমগ্নতা এবং প্রাকৃতিক ভাবালুতা কেটে যায় ইসমাইলের; রাধিকার কথায় সে ভাবে, ধর্মের দুইটা দিক—আত্মার শুদ্ধতার নিরিখে চেতনার উদ্ভাষণ; আর লোকদেখানো সামাজিকতায়—কোনটা চায় রাধিকা?
সুবোধের প্রতি রাধিকা দত্ত নারাজ, শুধু রাধিকার দোষ দিয়ে লাভ কী—মাইটা জমিদার, মধ্যম মানের ভূস্বামী থেকে শুরু করে শেরপুরের মুন্সী বলি আর চৌধুরী বলি; দত্ত, ঠাকুর, ঘোষ, সান্ন্যাল যাদের ১০০ বিঘা কিংবা ২০০ বিঘার মতো জমি আছে, তারা সকলেই সুবোধের কম্যুনিস্ট রাজনীতির বিরুদ্ধেই সবসময়।—‘আর আমি তো সুবোধের বন্ধু, এই কথা তো আমাকে শুনতেই হতে পারে’—ইসমাইল রাধিকার খোঁচামারা কথার আরেকটা কারণ খুঁজে পায়। মনে মনে ভাবে, ‘রাধিকারা আমার পারিবারিক খবর রাখে; করতোয়ার এপার-ওপার— রাখতেই পারে, খবর রাখাটা দোষের নয়। আমার স্ত্রীর মৃত্যু এবং আমার দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণের অনীহাসুলভ মনোভাবের মাঝে রাধিকা দত্ত হয়তোবা বৈরাগ্য সাধনের জুজু খুঁজে দেখার চাল দিয়েই নদীর ওপারে গেলো জমির কাগজযোগে তহসিলদারসহ।’

—আর দুইদিন পরেই রোজার শুরু, একমাস পরেই ঈদ। ঈদের পরে কোনোভাবে সংসারের ঝামেলা চুকিয়ে মুক্ত বায়ু সেবনের জন্য কোথাও উড়াল দেওয়া যায় কি-না ইসমাইল ভাবে আর ঘোড়ার দড়ি খুলে ঘোড়ায় চড়ে উড়াল দেয় সুবোধের মায়ের বাড়ির ঠিকানায়। কিন্তু একটা প্রশ্ন জাল বিস্তার করে তার মাথায়:
‘গোঁসাই বাবুর জমি-হালট-কাচারির মালিক রাধিকা হলো কীভাবে? অকৃতদার গোঁসাইয়ের মৃত্যুর পর এই দূর সম্পর্কিত রাধিকারা পুরনো কাগজের দোহাই দিয়ে সম্পত্তিগুলো ভোগে ব্যস্ত। শালার চোরের মায়ের বড় গলা
‘—ইসমাইল স্বস্তি পায়, রাধিকার মতলব খুঁজে পাওয়ায় তার মাথা পরিষ্কার হয়। আরও ভাবে, সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ সুবোধের প্রতি নাখোশ তো হবেই রাধিকা; সেই সাথে ইসমাইলের প্রতিও বিরাগভাজন হবে সমানে সমান, পারলে সুবোধ আর ইসমাইলের গলায় গামছা বেঁধে নদীতে চুবায়ে মনের ঝাল মেটায় রাধিকা—কিন্তু সেই সাধ্য কী আর রাধিকাদের আছে? ছিলো হয়তো কোনোদিন, কোনোকালে—জমিদারি, তালুকদারি, নবাবী আমল শেষ। ‘আর এখন এই শালার নব্য-সাম্যবাদীদের হইছে চুলকানির স্বভাব; ভূমির বণ্টনবৈষম্য নিয়ে তারা মানুষের মাথা খায়, উস্কায়া দেয় জোতদারদের বিরুদ্ধে এবং জমিদারদের অন্যায্যতার মওকার হিসাব উড়ায়।’—রাধিকার সাথে থাকা চামচা বিড়বিড় করে কথাগুলো আওড়ালেও মর্মার্থ বুঝে নিতে সময় লাগে না ইসমাইলের। ইসমাইল ঘোড়া থামিয়ে দরোজার কড়া নাড়তেই কাকী-মা অর্থাৎ সুবোধের শিক্ষিকা মাতৃদেবী দরোজা খুলে ভেতরে নিয়ে বসতে দেয়।